Wednesday, January 19, 2022
Home > খেলাধুলা > বিশ্বকাপ দল পর্যালোচনা “ব্রাজিল”

বিশ্বকাপ দল পর্যালোচনা “ব্রাজিল”

Spread the love
ব্রাজিল
ডাক নাম: সেলেসাও
অঞ্চল: কনমেবল (CONMEBOL)
বর্তমান র‍্যাংকিং: ২
উল্লেখযোগ্য ক্লাব: পালমেইরাস, সান্তোস, করিন্থিয়ান্স, সাও পাওলো, ফ্লামেঙ্গো
 
জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ: কাফু (১৪২)
সর্বোচ্চ গোল: পেলে (৭৭)
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ২১ বার (২০১৮ সহ)
সেরা ফলাফল: চ্যাম্পিয়ন (১৯৫৮,১৯৬২,১৯৭০,১৯৯৪,২০০২), রানার্স আপ (১৯৫০, ১৯৯৮)
২০১৪ এর ফলাফল: সেমি-ফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হার
 
মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা: কোপা আমেরিকা
অংশগ্রহণ : ৩৫ বার
সেরা ফলাফল: চ্যাম্পিয়ন ৮ বার
 
ফুটবল ইতিহাস:
বিশ্বকাপে মোট ম্যাচ:১০৪ জয়:৭০ ড্র:১৭ হার:১৭ পক্ষে গোলঃ ২২১ বিপক্ষে গোলঃ ১০২
ব্রাজিল ফুটবল নিয়ে কথা বলতে গেলে আরব্য রজনীর শেহেজাদের মত বিনিদ্র রাত পার করতে হবে। ব্রাজিল বিশ্বকাপকে বর্ণিল করেছে নাকি বিশ্বকাপ ব্রাজিলকে বর্ণিল করেছে এই নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু একটি কথা বিনা বাক্যে সবাই মেনে নেয়, আর তা হল ব্রাজিল না থাকলে যে কোন বিশ্বকাপই বিবর্ণ হত। আর তাই ৪টি করে বিশ্বকাপ জেতার পরেও জার্মানির গতিশীল যান্ত্রিক ফুটবল এবং ইতালিয়ানদের রক্ষণকে দূর্গ বানানোর ফুটবলের চেয়ে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সাম্বার ছন্দ দর্শকদের মনে দাগ কাটে। যদিও ২০০২ সালের আধিপত্য দেখানো রোনালদো-রিভালদো-রোনালদিনহোদের পরে আর কেউই তেমন সেই সুন্দর ফুটবল দেখাতে পারেনি। আর ফুটবলের কিংবদন্তীদের তালিকাটি যেন শেষই হবে না। ফিফার হিসেবে সর্বকালের সেরা পেলের কথা ভেবে আপনি হয়তো মনে করতে পারেন যে পেলেই হয়তো ব্রাজিলে ঈশ্বরতুল্য। না জনাব, ভুল ভাবছেন। ব্রাজিলের জনগণের কাছে বাঁকা মেরুদণ্ড, ভেতরের দিকে বাঁকানো ডান পা যা বাম পায়ের চেয়ে দু ইঞ্চি ছোট- এসব খুঁত নিয়ে জন্মগ্রহণ করা লোকটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। উরুগুয়ের সাবেক স্ট্রাইকার এদুয়ার্দো গালিয়ানি যাকে বলেছেন ফুটবল সর্বকালের সবচেয়ে বিনোদনদায়ক মানুষ ,সতীর্থ জালমা সান্তোসের চোখে যিনি ফুটবলের “চার্লি চ্যাপলিন”। সেই ফুটবলের সর্বকালের সবচেয়ে সেরা ড্রিবলারদের একজন গারিঞ্চার নাম ব্রাজিলের কিংবদন্তীর আলোচনায় মাঝে মাঝেই উপেক্ষিত হয়। ১৯৬২ বিশ্বকাপে পেলের ইনজুরির পর যিনি মোটামুটি একক প্রচেষ্টায় ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। দুইটি ফাইনালে গোল করা ভাভা আছেন, যিনি এই গারিঞ্চার সাথেই ১৯৬২ সালের সোনার বুট জয় করেছেন। ব্রাজিলের সর্বপ্রথম তারকার তকমাটা বোধহয় লিওনিদাসকেই দেওয়া যায় যিনি প্রথম বিশ্বকাপেই সোনার বুট ও সোনার বল জিতেছিলেন। এরপর পঞ্চাশের দশকের জিজিনহো, আদেমির, দিদি, ষাটের দশকের গারিঞ্চা, ভাভা, মারিও জাগালো, সত্তরের দশকের টোস্টাও, রিভেলিনো, গেরসন। আশির দশকটি ব্রাজিল ফুটবলের জন্য দীর্ঘশ্বাসের আরেক নাম। ’৮২ স্পেন বিশ্বকাপে জিকো, সক্রেটিস, ফ্যাল্কাও, এদের (Eder) নিয়ে গড়া বিশ্বকাপের শিরোপা না জেতা সর্বকালের সেরা দলটি পাওলো রসির ইতালির কাছে বিদায় নেয় দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বেই। আর ১৯৮৬ তে টাইব্রেকারে পরাজয় ফ্রান্সের সাথে। ১৯৯০ সালে প্রায় তারকাহীন ব্রাজিল ২য় পর্বে হেরে যায় ম্যারাডোনার পাস থেকে করা ক্লদিও ক্যানিজিয়ার ৮১ মিনিটে করা গোলে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায় তারা। বেবেতো, রোমারিও, আলদাইর, তাফারেলদের ব্রাজিল ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে দেয় ব্রাজিল। এরপর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দাপট দেখানো কাপ জয় আসে ২০০২ জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে। ব্রাজিলই প্রথম দল যাদের ডিফেন্ডারেরাও তারকা মর্যাদা পায়। জালমা সান্তোস তিন-তিনবার বিশ্বকাপের সেরা দলে ছিলেন, তিনবার ফাইনাল খেলেছেন কাফু, রবার্তো কার্লোস বাঁ পায়ের জোরালো শটের জন্য বিখ্যাত ছিলেন, ১৯৭০ সালের ফাইনালে কার্লোস আলবার্তোর করা ৪র্থ গোলটি এখনো সবার চোখে লেগে আছে। তবে এতকিছুর মধ্যেও দুটি ফাইনাল হারই ব্রাজিলবাসীকে এখনো কাঁদায়। ১৯৫০ সালে এগিয়ে থাকার পরও হেরে যাওয়া “মারাকানাজো” অনেক বর্ষীয়ান এখনো মানতে পারেন না। আর ১৯৯৮ সালে রোনালদোর রহস্যজনক অসুস্থতা তো এখনো ফুটবলের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি। আর হ্যাঁ আরেকজন সম্পর্কে তো তেমন কিছু বলা হয়নি। ফুটবল সম্রাট পেলে ১৭ বছর বয়সে সোনার বুট জিতেছেন, টানা দু’বার সহ তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন, ব্রাজিলের জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি। তবে শুধু পেলেই নন, ব্রাজিলের কিংবদন্তী বলতে তো চলে আসে ২০-২৫ জনের নাম!
২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ফলাফল: (ম্যাচ:১৮ জয়:১২ ড্র:৫ হার:১ পক্ষে গোল:৪১ বিপক্ষে গোল:১১ পয়েন্ট: ৪১
বাছাইপর্বে সর্বোচ্চ গোল: গ্যাব্রিয়েল জেসুস (৭), নেইমার ও পলিনহো (৬)
২০১৮ বিশ্বকাপ স্কোয়াড:
সর্বোচ্চ ম্যাচ: নেইমার (৮৪)
সর্বোচ্চ গোল: নেইমার (৫৪)
স্কোয়াড ভাবনা: ব্রাজিলের গোলপোস্ট সামলানোর দায় এবার পরেছে রোমার গোলরক্ষক আলিসন বেকারের কাঁধে । ব্রাজিলের হয়ে ২৫ ম্যাচ খেলা এই ২৫ বছর বয়সীর উপর চোখ পড়েছে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের। তার ডেপুটি হয়েই থাকতে হবে ম্যান্সিটির এডেরসনকে। ড্রপ কিকের জন্য বিখ্যাত গোলরক্ষক সিটিতে এসেছে নিজের জাত চিনিয়েছেন। ডিফেন্সের মাঝে থাকছেন অভিজ্ঞ থিয়াগো সিলভা-মিরান্ডা জুটি। প্রাক্তন কোচ দুঙ্গা সিলভাকে প্রায় বাতিলের খাতায় ফেলে দিলেও তিতের অধীনে তার ব্রাজিল ক্যারিয়ার আবার জীবন পায়। পিএসজি অধিনায়ক ব্রাজিলের ওইসব বিরলতম ডিফেন্ডারদের একজন যারা ডিফেন্ডিংকেই প্রাধান্য দেন। তিতের অধীনে ব্রাজিলের ডিফেন্সও দারুণ জমাট। তার পিএসজি সতীর্থ মারকিনহোস দলের সবচেয়ে কমবয়সী ডিফেন্ডার তিতে তাকে বিকল্প হিসেবেই রাখছেন। একসময়ে পর্তুগিজ লীগে মাঠ মাতানো পেদ্রো জেরোমেল এই ৩২ বছর বয়সে বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেয়ে নিজেকে নাগ্যবান মনে করতে পারেন। কিন্তু বাঁ পাশের মার্সেলোর বাছাইটিতে তিতেকে দু’বার ভাবতে হয়নি। তিনি এ মুহূর্তে আক্রমণাত্মক খেলোয়ারদের মধ্যে সেরা ১০-এই থাকবেন, রিয়ালের হয়ে শিরোপা জিতেই চলেছেন। তার বদলি ফিলিপে লুইস ইয়ুভেন্তাসের অ্যালেক্স সান্দ্রোকে হারিয়ে রাশিয়ার টিকিট নিশ্চিত করেছেন। দানি আলভেসের মত অভিজ্ঞ রাইটব্যাকের ইনজুরি ব্রাজিলকে বিপদে ফেলেছে। তার বদলি হিসেবে তিতে ডেকেছেন ৪ ম্যাচ খেলা করিন্থিয়ান্সের ফাগ্নারকে। কিন্তু ওই পজিশনে খুব সম্ভব খেলবেন দানিলো যিনি ম্যানসিটিতে এসে ইংলিশ দর্শকদেরকে ভালোই মাতিয়েছেন। তিতের মাঝমাঠে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে থাকবেন কাসিমিরো। রিয়ালের হয়ে হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতা মিডফিল্ডার যেমন জানেন প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কাড়তে, তেমনি আক্রমণে দারুণ সব পাস দেওয়াও তার আয়ত্বের বাইরে নয়। আশ্চর্য হলেও সত্যি তিনি এখনো পর্যন্ত জাদুবলে কখনো লালকার্ড দেখেননি। ম্যানসিটির ফারনান্দিনহোও থাকতে পারেন মিডফিল্ডে। তার ওয়ার্করেট আর জেদী মনোভাব তাকে ক্লাবের এক গুরত্বপূর্ণ ফুটবলারে পরিণত করেছে। একমাত্র চীনবাসী রেনাতো আগুস্তো আক্রমণে বেশ পটু, ব্রাজিলের হয়ে ৫টি গোল আছে তার। সদ্য ম্যানইউইয়ের হয়ে যাওয়া ফ্রেড (না না, ২০১৪ এর সেই স্ট্রাইকার নন) বর্তমানে ইনজুরি নিয়ে ভুগছেন। ইউক্রেনে খেলা ব্রাজিলিয়ানদের লম্বা তালিকায় আরেকটি নাম তিনি। উইলিয়ান দারুণ ড্রিবল করেন, দু’পায়েই বেশ নিখুঁত জোরালো শট আছে তার। তবে চেলসি উইঙ্গারের প্রতি অনেকেরই অভিযোগ তিনি পাস দেন না, স্বার্থপরের মত খেলেন। উইলিয়ান খেলেন বাঁ না খেলেন বার্সা মিডফিল্ডার ফিলিপে কুতিনহো অবশ্যই খেলবেন। তার ড্রিবলিং আর ডান পায়ের শট অনেক ইংলিশ ডিফেন্ডারকে নিশ্চয়ই এখনো দুস্বপ্ন দেখায়। পাওলিনহোর বার্সায় আসা নিয়ে অনেকেই মশকরা করেছেন, কিন্তু তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কেন ব্রাজিল দলে তিনি অনেক দিন ধরেই খেলেন। ডগ্লাস কস্তা বায়ার্ন থেকে ইয়ুভেন্তাসে এসে আবার নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন, দারুন ক্রসিং আর বাঁ পায়ের জোরালো শটে আতঙ্ক ছড়াবেন তিনি। ফিরমিনো আর গ্যাব্রিয়েল জেসুস্কে নিয়ে তিতে আছেন মধুর সমস্যায়। এই মৌসুমে যথাক্রমে ২৭ ও ২৪ গোল করা দুই স্ট্রাইকারই দলে জায়গা পাবার দাবিদার। দু’জনের কেউই হয়ত “ফেনোমেনন রোনালদো নন, তবে গোল বের করতে ওস্তাদ তারা। এদের ভিড়ে টাইসন সম্ভবত দর্শকের ভূমিকায়ই থাকবেন। আর আছেন একজন নেইমার। ব্রাজিলের জার্সি গায়ে দিলেই যেন “সুপারম্যান” হয়ে যান ২৬ বছর বয়সী মহাতারকা। গোলসংখ্যায় হয়তো ভবিষ্যতে পেলেকেও ছাড়িয়ে যাবেন। সেটা তো দূরের কথা, আপাতত আগামী ১৫ই জুলাই মস্কোতে তার হাতে বিশ্বকাপ দেখলেই স্বস্তি আসবে ব্রাজিলের ২১ কোটি মানুষের। স্বস্তিই তো, “মিনেইরোজো”-এর চেপে বসা জগদ্দল পাথরটাকে বুক থেকে নামাতে হবে না?
২০১৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ: ই
প্রতিপক্ষ: সুইজারল্যান্ড, কোস্টারিকা, সার্বিয়া
#হক_কথা
গ্রুপের কাঠিন্য: ৮.২
গোলকিপিং: ৮.০
ডিফেন্স: ৮.৪
মিডফিল্ড: ৯.০
ফরোয়ার্ড : ৯.৪
বেঞ্চের শক্তি: ৮.৫
অবস্থান:সবকিছু ঠিক থাকলে ইংল্যান্ড অথবা কলম্বিয়ার সাথে ১/৪ ফাইনাল খেলবে তারা। আর সেমি-ফাইনালে তো যে কোন কিছুই ঘটতে পারে। সেমিফাইনাল পর্যন্ত মোটামুটি নিশ্চিন্ত মনেই খেলতে পারবে তারা।
Facebook Comments