রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২
Home > গল্প > ভালোবাসাময় ঈদ | মুন্না রহমান

ভালোবাসাময় ঈদ | মুন্না রহমান

Spread the love
অনন্যার সাথে আজ সারাদিন ঘুরতে হবে, নইলে মাহমুদের খবর আছে। আজ ঈদের দিন। রোজার ঈদের মজাটাই আলাদা। মাহমুদ তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে বের হয়ে নিউমার্কেটে চলে এলো। এখানেই অনন্যার আসার কথা। মাহমুদ এসে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অনন্যার কোন খোঁজ খবর নেই। অপেক্ষায় বসে থাকা বেশ বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। স্যার, কয়ডা টেহা দেবেন? মাহমুদের সামনে দশ এগারো বছরের একটা ছোট্ট ছেলে হাত পেতে দাড়িয়েছে। মাহমুদ ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, নাম কি রে তোমার?
– মালেক, আব্দুল মালেক।
– তুমি থাকো কোথায় ?
– আমাগো থাকার কুনো ঠিক নাই।
– মানে?
– মানে বুঝলেন না? যেইহানে রাইত হেইহানেই কাইত। আমরা তিনডা ভাইবোন। এ-ই ঈদে আমাগো কিছুই কামাই অয় নাই, আমি অসুখে পইড়া আছেলাম।
মাহমুদ ওর হাত ধরে কাছের একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে গিয়ে বসলো। টিনএজ ছেলেমেয়ের ভিড়ের মধ্যে জায়গা পাওয়া বেশ কষ্টকর। ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে মাহমুদ বুঝলো ও খুবই ক্ষুধার্ত। পেট ভরে এমন খাবার এখানে কি আছে, খুজে দেখে ফ্রাইড রাইসের অর্ডার দিলো, আর নিজের জন্য কফি নিলো। ছেলেটি খাবার সামনে রেখে না খেয়ে বসে আছে। মাহমুদ বললো কি ব্যাপার খাচ্ছো না কেন? ছেলেটা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। আশেপাশের ছেলে মেয়েরা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। মাহমুদের বেশ খারাপ লাগছে, ছেলেটির কান্না দেখে। ছেলেটি কিছুই খাচ্ছেনা, মাহমুদ আরও কোমল ভাবে বললো, কি হয়েছে, আমাকে বলো? ছেলেটি অভয় পেয়ে বললো, আমার মা বাবা কেউ নাই, ছোডো দুইডা ভাই বুন লইয়া পাইপের মইদ্দে থাহি। আমি অসুকে কয়দিন কাম কাইজ করতে পারি নাই, তাই খাওন জুটে নাই। ওরা না খাইয়া পইড়া আছে। অহন অগো রাইখ্যা এগুলা আমি একলা কেমনে খাই, কন?
মাহমুদের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। ও কোনরকম নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে ছেলেটিকে বললো, তোমার ভাই বোন কোথায় থাকে?
– ওই সামনে একটা বস্তি আছে ওর পিছে পাইপ ফালানো আছে, হের একটা পাইপের মইদ্দে থাহে।
মাহমুদ ওয়েটারকে ডেকে বললো খাবারটা প্যাকেট করে দিতে। তারপর আব্দুল মালেকের হাত ধরে বললো, চলো, যাই ওখানে। ইতিমধ্যে মাহমুদ ওয়েটারকে তিন প্যাকেট ফ্রাইড রাইসের পারসেল করে দিতে বলেছে। ওগুলো নিয়ে ওরা যখন বের হলো তখনই অনন্যা এসে হাজির।
– কি মাহমুদ রাগ করেছিস?
– না রাগ করিনি
– তোর সাথে কে এই ছেলে?
মাহমুদ, সংক্ষিপ্ত করে সব বললো। অনন্যা বললো, তাহলে আমাকেও নিয়ে চল। ওরা একসাথে হেটে পাইপের কাছে চলে এলো। পাইপের ভিতরে গুটিসুটি হয়ে দুটি বাচ্চা শুয়ে রয়েছে। আব্দুল মালেক ওদের ডাক দিলো। ওরা বেশ ক্ষুধার্ত এটা ওদের চোখ মুখ দেখে খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে। মাহমুদ আর অনন্যা ওদের কোলে বসিয়ে যত্ন করে খাইয়ে দিলো। অনন্যা বললো, মাহমুদ আজ তো ঈদের দিন, ওদের জন্য কিছু নতুন জামাকাপড় হলে ভালো হতো। মাহমুদ বললো আজ তো সব বন্ধ, চল দেখি কোনখানে খোলা পাই কিনা।
একটা অটোরিকশায় উঠে ওরা বিভিন্ন স্থান ঘুরে শেষে বঙ্গবাজারের একটা দোকান খোলা পেলো। ওদের সাথে করেই নিয়ে এসেছে মাহমুদ আর অনন্যা।
জামাকাপড় গায়ে দিয়ে খুব খুশি বাচ্চারা।
অনন্যা বললো, জানিস মাহমুদ, ওদের আনন্দ দেখে আমার যে কতটা খুশী লাগছে তা বলে বোঝাতে পারবো না।
বিকেল তো হয়েই গেলো, চল ওদের নিয়ে শিশু পার্কে যাই।
ওরা শাহবাগে চলে এলো।
বাচ্চাগুলো জীবনেও এত আনন্দ পাইনি মনে হয়। শিশু পার্ক থেকে চটপটি খেলো সবাই। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে, ছোট বাচ্চা দুটি হাই তুলছে, ওদের ঘুম চলে এসেছে।
অটোরিকশা করে ওরা পাইপের কাছে চলে এলো।
মাহমুদ মানিব্যাগ বের করে দেখলো হাজার খানেক টাকা আছে, অনন্যা ওর ব্যাগ থেকে একহাজার টাকা দিলো।
মোট দুহাজার টাকা ছেলেটির হাতে দিয়ে মাহমুদ বললো, টাকাটা দিয়ে ছোট খাটো ব্যাবসা শুরু কোরো, আমি কদিন পরে এসে খোঁজ নিয়ে যাবো।
ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো।
ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মাহমুদ আর অনন্যা বের হয়ে এলো।
প্রতি ঈদের মত এবার ঘোরাঘুরি হয়তো হলনা, দুজনের লুকিয়ে প্রেমও হলনা ঠিকই, কিন্তু যে অনাবিল আনন্দ তিনটি পথশিশুদের সাথে ভাগাভাগি হলো তা যেন এক ভালোবাসাময় ঈদ।
Facebook Comments