Saturday, October 16, 2021
Home > উপন্যাস > উপন্যাসঃ “রূপন্তী” (২য় পর্ব) – তকিব তৌফিক

উপন্যাসঃ “রূপন্তী” (২য় পর্ব) – তকিব তৌফিক

রাতের খাবার খেতে খাবার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে আছেন বেদার সাহেব। পাশাপাশি চেয়ারে বসে আছেন গুলবাহার বেগম। অল্প দূরে আরেকটি চেয়ারে বসে আছে রুহুল। সাহিদা আক্তার রান্নাঘর থেকে খাবারে বাটি এনে দিচ্ছেন। তার কাজে সাহায্য করছে রূপন্তী। রূপন্তীর বাবা আজহার হোসেন অফিস ট্যুরে সিলেট গেছেন। ক’টা দিন সেখানে’ই থাকবেন। তাই আজ তার চেয়ারটা খালি।
খাবার টেবিলে সব খাবার আসার পরে সাহিদা আকতার এল, সাথে রূপন্তীও এল। কিন্তু পৃথু তখনও খেতে আসেনি। খাবার টেবিলে পৃথুকে না দেখে বেদার সাহেব জানতে চাইলেন, ‘বুড়িটা কই! না খেয়ে ঘুমিয়ে গেলো নাকি? আমার ঘরেই তো কিছুক্ষণ আগে দেখেছিলাম!’
বেদার সাহেবের কথা শেষ হতে না হতেই পেটে হাত চেপে শব্দ করে হাসতে হাসতে খাবার ঘরে ঢুকল পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ুয়া পৃথু।
পৃথু রূপন্তীর ছোট বোন। বড্ড চঞ্চল আর বুদ্ধিমতী মেয়ে। সম্প্রতি সে কি এক রহস্য নিয়ে তার দাদাভাই বেদার সাহেবের ঘরে আসা-যাওয়া করছে। আগেও যেতো, তবে এ-যবত বেশি যাওয়া আসা করছে।
বেদার সাহেবের ঘরে সবার যাওয়ার অনুমতি নেই। এমনকি গুলবাহার বেগমেরও অনুমতি নেই। তারও আলাদা ঘর। আগে বেদার সাহেবের ঘরে গুলবাহার যেতে পারতো কিন্তু গত দুই বছর ধরে তার উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। তবে এ নিয়ে গুলবাহার বেগমের মন খারাপ হয় না। বেদার সাহেব প্রায় সময় গুলবাহারের ঘরে যান। কথা বলেন, সময় দেন। এটুকুতেই গুলবাহার বেশ খুশি থাকে।
বর্তমানে বেদার সাহেবের ঘরে ঢুকবার অনুমতি কেবল পৃথুর আছে। পৃথুর পনেরো বছর অতিক্রম হলে তার যাওয়াও নিষেধ বলে আগে থেকেই জানিয়েছেন তিনি।
বেদার সাহেব তার ঘর নিজেই ঝাড়ু দেন, মুছেন। তার ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কাজটাও তিনি দুর্বল শরীর নিয়ে নিজে করেন। তার এসব কাজে গুলবাহার বেগম প্রায়শই সাহায্য করতে চাইলে তিনি বাধা দেন। গুলবাহার বেগম মন খারাপ করেন না, হাসেন। তিনি হাসতে ভালোবাসেন। কারণেঅকারণে গুলবাহার যখন হাসেন বেদার সাহেব তখন বিরক্ত হয় না। তিনি গুলাবাহারের হাসিতে সম্মতি জানান। তিনিও হাসবার চেষ্টা করেন। তবে বেশির ভাগ সময় তিনি হাসতে পারেন না।
পৃথু হাসতে হাসতে রুহুলের পাশের চেয়ারে বসল। বেদার সাহেব পৃথুর আচরণে কোনো ভ্রূক্ষেপ করলেন না। তিনি ভাত খাচ্ছেন। গুলবাহার বেগম তার পাতে ভাত তুলে দেয়ার পর তিনি নিজের খাবার নিয়ে ব্যস্ত হলেন। খাবার টেবিলে তার এই কঠিন ব্যস্ততা বড্ড জোরাল।  বিছমিল্লাহ্ বলে খাওয়া শুরু করলে তিনি আর কোনো কথা বলেন না। আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে তিনি একেবারেই মনযোগী থাকেন না। এই সময়টায় যে যেমন খুশি কথা বলতে পারে,  ইচ্ছে হলে গালাগালও দিতে পারে। তিনি কিছুই শুনেন না, শুনলেও তা আমলে নেন না।
সাহিদা আকতার চেঁচিয়ে বললেন, ‘পৃথু! চুপ করো!’। পৃথু চুপ হল না। সে আগের মতই হাসছে। রুহুলের কানে কানে কি যেনো বললো সে। মুহূর্তেই রুহুল হেসে উঠল। হাসি থামাতে গিয়ে রুহুলের গলায় গোৎ শব্দ হতেই রুহুল আর পৃথু দু’জনেই আবার হেসে উঠল বিকট শব্দ করে। বেদার সাহেব তখনও খাওয়াতেই ব্যস্ত। এই হাসির শব্দও যেনো তার কান অবধি পৌঁছয়নি।
গুলবাহার বেগম বেদার সাহেবের পাতে কিছুক্ষণ পরপর তরকারি তুলে দিচ্ছেন আর হাসছেন। তিনিও নাতি-নাতনির দিকে খুব একটা নজর দিচ্ছেন না। তার ব্যস্ততা স্বামীকে ঘিরেই।
দুই ভাইবোনের হাসাহাসি দেখে রূপন্তীর কৌতূহল হল। ‘কি এমন হল যে তারা এতো হাসছে!’, ভেবেই জিজ্ঞাসা করলো, ‘কি রে তোরা এতো হাসছি যে?’
রুহুল কিছু বলল না। উত্তর দিল পৃথু, ‘আপু, লৈয়লৈম’।
‘কি!’, কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে বলে উঠল রূপন্তী।
পৃথু-রুহুল দু’জনেই আবার হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে রুহুল বলল, ‘টূএটিং’।
‘মানে কি এসবের! ঠাট্টা করছো আমার সাথে ভাইয়া?’, কিছুটা রাগ জড়ানো কন্ঠস্বরে বলল রূপন্তী।
‘ঠাট্টা নারে বোন! বিষয় গুলো জটিল। এই যেমন ধর, ত্রূইহ্’।
‘কি যা তা এসব! লৈয়লৈম, টূএটিং, ত্রূইহ্!’, বিরক্তভরা কন্ঠে বলল রূপন্তী।
পৃথু আর রুহুল কোনো উত্তর দিল না।  এবার তারা মুচকি হেসে খাওয়াতে ব্যস্ত হতে চাইল। সাহিদা বেগম এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। একটু চোখ রাঙ্গিয়ে বললেন, ‘তোরা এসব কি বলছিস বলতো! আর রূপকেই-বা কেনো পরিষ্কার ভাবে সব বলছিস না!  কি কথা বলেই দে না’।
পৃথু বলল, ‘মা! সুউলিও..’
পৃথু কথা শেষ করার আগেই সাহিদা বেগম বললেন, ‘পৃথু! চুপচাপ খেয়ে নাও। এতো বকবক কোথা থেকে শিখেছো তুমি! ভাইও একটা পেয়েছো!’
পৃথু কিছু বললো না। রুহুল আর পৃথু একে অন্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে আর খাচ্ছে। তা’ই দেখে রূপন্তীর রাগ দ্বিগুণ হল। নিজের প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে সে ফনা তোলা সাপের মতন ফোঁস ফোঁস শব্দে কয়েকবার নিশ্বাস ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। পৃথু-রুহুল দু’জনেই তার দিকে তাকালো। রূপন্তী রাগ করে খাবারের প্লেটে খাবার রেখেই নিজের ঘরে চলে গেলো।
সাহিদা আকতার রূপন্তীকে একবার ডাকলেন। রূপন্তী কোনো জবাব দিলো না, খাওয়া শেষ করতেও ফিরে এল না। সাহিদা আকতার রূপন্তীকে আর ডাকলেন না। তিনি জানেন রূপন্তীর মুখে আজ আর খাবার তুলে দেয়া সম্ভব হবে না। তাই বৃথা চেষ্টা না করে নিজের খাবারটা শেষ করে নিলেন।
গুলবাহার তখনও হাসছেন। গুলবাহারের এমন হাসিতে একজন কেবল বিরক্ত হয়, সাহিদা আকতার। অকারণে একটা মানুষ কেনো হাসবে! একটু আগে ভাই-বোনের মধ্যে একটা মনোমালিন্য হবার ঘটনা ঘটল। রূপন্তী না খেয়ে চলে গেলো। তাহলে সেখানে হাসবার কি আছে! বুঝতে পারল না সাহিদা। তাই মাঝেমাঝে শাশুড়ির উপর বড্ড বিরক্ত হয় সে। কিন্তু গুলবাহার বেগম সরলমনা মানুষ, তাই ভেবে সাহিদা আকতার কখনো কিছু বলেন না।
বেদার সাহেবের খাওয়া শেষ। তিনি ‘শোকর আলহামদুলিল্লাহ’ এই দুই শব্দ বলে নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। তার খানিক বাদে গুলবাহার বেগম, তারপরেই পৃথু-রুহুলও খাবার শেষ করে যে যার যার ঘরে চলে গেল। সাহিদা বেগম রান্নাঘর-খবার ঘর পরিষ্কার করে নিজে ঘরে চলে গেলেন।
ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটা। এই সময়টায় পৃথুর ঘুমানোর কথা কিন্তু সে জেগে আছে। যদিও আসছে দিনটা শুক্রবার।  সকাল সকাল স্কুল নেই। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে সে জাগে। আজও জেগে আছে। তবে আজ জেগে থাকার বিশেষ কারণ রয়েছে। অন্যান্য সময় তার জেগে থাকার কারণ কমিকস পড়া ছাড়া আর কিছুই থাকে না। কিন্তু আজ জেগে আছে একটা রহস্যে ঘেরা গল্প সে তার ভাইকে শুনাবে বলে। পৃথু অনেকদিন ধরে তার দাদাভাইয়ের ঘরে কিছু একটা বিষয় জানতে আসা-যাওয়া করছে। অনেকদিন যাবত সে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করে যাচ্ছিল। আর তা’ই নিয়ে সে ব্যস্ত ছিল। এতদিন সে কাউকে কিছু বলেনি। আজ সে রুহুলকে সব বলবে বলে মনস্থির করলো। রুহুলকে অবশ্য আগে এইসব ব্যপার একেবারেই অল্প সল্প বলেছিল। রুহুলেরও জানার আগ্রহ ছিল বেশ।
এই ব্যাপারে রূপন্তী কিছুই জানে না। যদিও পৃথু  রূপন্তীকে কখনো কিছু বলতে চায়নি। রূপন্তীও যে পৃথুর কোনো ব্যাপারে আগ্রহী ছিল তা কিন্তু নয়। আজ যা জানতে চেয়েছিল তাও কারণবশত, তাদের হাসবার কারণ জানার কৌতূহল থেকে। তাই পৃথু ঠিক করেছে তার জানার রহস্যটা সে কেবল তার ভাইকে বলবে, আর কাউকে নয়।
রুহুলের ঘরের সাথে ছোট বারান্দা। সে বারান্দায় পৃথু রুহুল দু’জনেই বসে আছে। আকাশ নিয়ে পৃথুর বড্ড কৌতূহল। যে রাতে পৃথু রুহুলের সাথে বারান্দায় বসে গল্প করে, সে রাতে আকাশ নিয়ে অজানা সব প্রশ্ন তার মনে জাগে। রুহুলকে সে প্রশ্ন করে, রুহুল তার জানা তথ্য থেকে প্রশ্নের ব্যাখ্যা করে। পৃথুর কাছে রুহুলের উত্তরগুলো রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। সে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে ভাইয়ের কোলে ঘুমিয়ে যায় আর সকাল হলেই সে নিজেকে নিজের ঘরে বিছানায় আবিষ্কার করে।
তবে রূপকথার গল্পের মতো আকাশের কোনো গল্প আজ সে শুনবে না। পৃথু আজ তার দাদাভাইয়ের ঘরের রহস্যের ব্যাখ্যা দেবে। যা রুহুলের কাছে রূপকথার গল্পের মতো মনে হলেও হতে পারে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ সময় কাটানোর পর রুহুল কৌতূহলবশত পৃথুকে প্রশ্ন করল, ‘কিরে বুড়ি! দাদাভাইয়ের ঘরের কি যেনো ঘটেছে বললি! কি কি যেনো উদ্ভট নাম বললি! খোলে বল সব কথা, নামগুলো মনে পড়লেই যে হাসি পাই আমার’, বলেই হাসল রুহুল।
‘ভাইয়া সে অনেক কথা’, বলল পৃথু।
‘সে অনেক কথা গুলো কি তা’ই বল না!’
‘আমরা যাকে দাদাভাই হিসেবে দেখি সে আসলে দাদাভাই না’।
‘কি! কি যা তা বলছিস!’ পৃথুর কথা শুনে চমকে উঠল রুহুল।
‘হ্যাঁ, ওটা দাদাভাই না ভাইয়া।’
‘কি বলছিস তুই! ছোট বেলা থেকে উনাকেই তো দাদাভাই জানি!’, হকচকিয়ে উঠে বলল রুহুল।
কিছু একটা ভেবে পৃথু জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা ভাইয়া তুমি কি কখনো আত্মা দেখেছো?’
‘না। আত্মা আবার দেখা যায় নাকি!’
‘যায়, মরে গেলে আত্মারা ঘুরে বেড়ায়। কেউ দেখে কেউ দেখে না’।
‘ না। মরে যাওয়ার পর কোনো আত্মা পৃথিবীতে থাকে না। সবাই পরপারে চলে যায়।’
‘আর যারা পরপারে যেতে পারে না তারা তো থেকে যায়!’
‘তারা থাকে না, চলে যায়।’
‘না তারা থাকে, আমি দেখেছি।’
‘কি! তুই আত্মা দেখেছিস?’
‘হ্যাঁ, আমি আত্মার দেখেছি। দাদাভাইয়ের শরীরে অন্য একটা আত্মা আছে। রাগী আত্মা। পেটুক আত্মা। আত্মাটা দাদাভাইয়ের শরীরে আছে বলে দাদাভাই এতবেশি খেতে পারে। এমনিতে তো দাদাভাইয়ের বয়সের লোকেরা এত খেতে পারে না; কিন্তু দাদাভাই বেশ খায়। খেয়াল করেছো?’, বলল পৃথু।
পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ুয়া পৃথুর মুখে এমন আধ্যাত্মিক কথাগুলো শুনতে রুহুলের কেমন যেনো লাগছে। তবে এটা ঠিক যে বেদার সাহেব অস্বাভাবিক পরিমাণের ভাত আহার করতে পারেন। ‘কিন্তু তার সাথে আত্মার সম্পর্ক কি!’ ভেবে সুরাহা পেল না রুহুল।
পরক্ষণে বলল, ‘তাহলে দাদাভাইয়ের শরীরে কার আত্মা ওটা!’।
‘লৈয়লৈম’।
‘লৈয়লৈম! এটা আত্মার নাম ছিল?’, অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল রুহুল।
‘হ্যাঁ। বড় আকার, বদমেজাজি ও খাদক আত্মা’।
‘তুই কি করে বুঝলি!’
‘আমি দেখেছি।’
‘তুই লৈয়লৈমকে দেখেছিস?’
‘হ্যাঁ। আরো অনেক আত্মা দেখেছি’, খুব স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে বলল পৃথু। পৃথুর কথা শুনে রুহুল নড়েচড়ে বসলো। মুহুর্তেই অনুভব করল তার ভেপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। নিজের চেয়ে  তেরো বছরের ছোট একটি বাচ্চা মেয়ে তাকে যা বলছে তা শুনে স্থির থাকা যায় না। তবুও রুহুল ধৈর্য্য রাখলো। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো।
‘লৈয়লৈম দাদাভাইয়ের শরীরে কি করছে?’, জানতে চাইল রুহুল।
‘ লৈয়লৈম দাদাভাইয়ের পুরোনো বন্ধু। বলতে পারো বাল্যবন্ধু। জীবিত অবস্থায় তার নাম ছিল লেয়াকত আলম। মরে যাবার পর ভূতপাড়ায় তার নাম দেয়া হয়েছে লৈয়লৈম।’
‘লেয়াকত আলম! তাও আবার দাদাভাইয়ের বাল্যবন্ধু! মরে গিয়ে ভূত হয়েছে, নাম দিয়েছে লৈয়লৈম! তুই কি আমার সাথে মজা করছিস! বানিয়ে বানিয়ে কি সব গল্প বলছিস?’
‘প্রমিজ বলছি, বিশ্বাস করো ভাইয়া’।
‘আচ্ছা যা বিশ্বাস করলাম। কিন্তু তুই কি করে এতসব জানলি?’, প্রশ্ন করল রুহুল।
‘তাদের সাথে আমার কথা হয়’, প্রত্যুত্তরে বলল পৃথু।
‘ভূতদের সাথে তোর কথা হয়?’, কাঁপা কন্ঠে জানতে চাইল রুহুল।
‘হ্যাঁ, কথা হয়’, বলল পৃথু।
‘তাদের তুই দেখতে পাস?’
‘হ্যাঁ দেখতে পাই, কিন্তু কি করে তাদের আমি দেখি তা আমি জানি না।’
‘মিথ্যা বলছিস তুই! আমাকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছিস?’
‘মিথ্যা হলে মিথ্যা, গল্প হলে গল্প; আমি গেলাম’, বলেই পৃথু উঠে দাঁড়ালো। মুহুর্তেই রুহুল তাকে টেনে বসিয়ে দিল।
‘তুই ওদের সাথে কি কথা বলিস?’
‘আমি নিজে কিছু বলি না। ওরাই বলে কেবল। আমি শুনি আর মাথা নাড়াই।’
‘কি বলে ওরা?’
‘দাদাভাইয়ের কথা’।
‘দাদাভাইয়ের কথা! ওখানে যত ভূত আছে সবাই দাদাভাইকে চেনে?’
‘হ্যাঁ। দাদাভাইকে চেনে-জানে বলেই তো ওরা সে ঘরে থাকে।’
‘তাহলে কি টূএটিং, ত্রূইহ্, সুউলিও এরাও ভূত?’
‘একদম…’
‘কি বলিস বোন! এত ভূত দাদাভাইয়ের ঘরে থাকে?’ কিছুটা ভীত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল রুহুল। রুহুলের অস্বস্তি বুঝতে পেরে পৃথু ঠাট্টা করে বলল, ‘হ্যাঁ দাদাভাইয়ের ঘরে অনেক ভূত। ভয় পাচ্ছো ভাইয়া?’
‘আরে ধুর না’। যদিও রুহুলের মধ্যে পায়চারি চলছিল তবুও  এ কথা বললে  রুহুলের বুকের ভেতর ধড়ফড়টা চাপাতে চাইল।
‘জানো ভাইয়া, দাদাভাইয়ের আরো একটা ছেলে ছিলো’, বলল পৃথু।
‘কি! মানে আমাদের চাচাজান! কিন্তু জন্ম থেকেই জানি বাবার কোনো ভাই  ছিল না। একটা বোন আছে। তার বিয়ে দিয়েছে সেই কতদূর… ‘
‘না, আমাদের একটা চাচাজান ছিল। যদিও আমি তাকে এখন টূএটিং চাচ্চু বলে জানি। সে’ই এ নামে ঢাকতে বলেছে।’
‘টূএটিং চাচ্চু! এ’ই আমাদের চাচাজান?’
‘হ্যাঁ। টূএটিং চাচ্চু খুব ছোট, উকুনবাছার  মতন’।
‘বুড়ি! তুই কিন্তু আমাকে এবার ভয় পাইয়ে দিচ্ছিস।’
‘না ভাইয়া। টূএটিং চাচ্চু খুব ছোট ভূত, ভালো ভূত।’
‘আচ্ছা! বেঁচে থাকাকালীন তার নাম কি ছিল? মারা’ই-বা গেল কি করে?’
‘সে জীবিত ছিল। কিন্তু জন্ম নেয়নি।  তাই তার আলাদা আর কোনো নাম ছিল না।’
‘অদ্ভুত তো! সে জন্ম’ই যদি না নেয় তাহলে জীবিত ছিল কি করে?’
‘দাদাভাইয়ের ঘরে আরেকটা ভূত আছে। বয়স্ক মেয়ে ভূত। নাম ত্রূইহ্। সে কোনো কথা বলে না আমার সাথে। ভূতদের সাথেও সে কথা বলে না। টূএটিং চাচ্চু বলেছে ওটা আমাদের আরেকটা দাদু। তার মা।’
‘টূএটিং চাচ্চুর মা! দাদাভাই দুটো বিয়ে করেছে? কখনো’ই শুনিনি একথা’।
‘না, দাদাভাই বিয়ে একটাই করেছে। হাসিবেগমকে’, বলেই হাসলো পৃথু। সে গুলবাহার বেগমকে হাসিবেগম বলেই সম্বোধন করে।
‘থাম, হাসিস না। তাহলে টূএটিং চাচ্চু, ত্রূইহ্ দিদা কোথা থেকে আসলো?’
‘সে কথা চাচ্চু আমাকে বলছে না। বলেছে বড়জন কাউকে পেলে বলবে’।
‘বড়জন কাউকে! আমাকে বলবে?’
‘হ্যাঁ বলবে। তবে এখনই না। সময় লাগবে। ভাব জমাতে হবে তোমার’।
‘আমায় এখন নিয়ে চল, ভাব জমাই’।
‘ওরা দাদাভাইয়ের ঘরে থাকে। লৈয়লৈম ছাড়া কেউ’ই সে ঘর থেকে বের হয় না। আর তোমার তো দাদাভাইয়ের ঘরে যাবার অনুমতি নেই’।
‘তাহলে কি করা যায়!’
‘ওসব পরে হবে, ভাইয়া।’
‘আচ্ছা। কিন্তু টূএটিং চাচ্চু আর তার মা কিভাবে মারা গেলো?’
‘দাদাভাই মেরে ফেলেছেন’।
পৃথুর কথা শুনেই রুহুলের মাথায় যেনো আকাশ চূর্ণবিচূর্ণ হল। বজ্রধ্বনিতে যেনো কানফেটে চৌচির।  চোখজোড়া ছানাবড়া হয়ে অদ্ভুত এক চেহারা প্রদর্শনে রুহুল বলল, ‘দাদাভাই খুন করেছে?’
‘হ্যাঁ ভাইয়া। আমি বিশ্বাস করিনি। এজন্যেই এতোদিন তাদের পেছনে লেগে ছিলাম’।
‘এখন এ-কথা বিশ্বাস কি করে হল?’
‘আমাদের বাসায় এক সময় সলিমুল্লাহ্ কাকা নামে একজন ছিলো মনে আছে?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু তোর মনে থাকার কথা না। তিনি মারা গেছেন অনেক আগেই। তখন তোর জন্ম’ই হয়নি। আমিও খুব ছোট ছিলাম।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু উনি যে আমাদের গ্রামের বাড়ির কামলা খাটতো তা তো ঘরে এখনো আলোচনা হয়। কতো ভারী ভারী কাজ তিনি করতেন। দিদামণি হাসিবেগম তো বলেন এখনো, সলিমুল্লাহ্ কাকা নাকি পা উপরের দিকে দিয়ে মাথা মাটিতে ভর দিয়ে ঘুরতে পারতো। কি বলে না?’
‘হ্যাঁ তা অবশ্য বলে।’
‘হ্যাঁ। তাকেও কিন্তু দাদাভাই মেরে ফেলেছে।’
‘মানে কি! সলিমুল্লাহ্ কাকা দাদা ভাইয়ের খুব বিশ্বস্ত ভালোবাসার কামলা ছিল। তাকে কেনো দাদাভাই মারবে?’
‘সে আমি এখন বলবো না। ঘুম পাচ্ছে আমার।’
‘বল, বুড়ি বল না বোন।’
‘এখন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে ভুলভাল বলবো ভাইয়া। বাকিসব কাল বলি?’
রুহুল কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘ তাহলে সলিমুল্লাহ্ কাকা’ই কি সুউলিও?’
‘হুম’, বলেই লম্বা একটা হাই তুললো পৃথু। তারপর ধীর কদমে নিজের ঘরে চলে গেলো সে। রুহুল তাকে বাধা দিল না।
মিনিট পাঁচেক যেতেই একটা গাঁ-ঝাড়া দিয়ে উঠল রুহুল। মুহুর্তেই মনে হল উদ্ভট এক রূপকথার গল্প থেকে সে বেরিয়ে এসেছে। ভাবনার রেশ পুরোপুরিভাবে কাটলো না। ‘পৃথুর কথাগুলো যদি সত্যি’ই হয় তাহলে তো মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে!’, ভাবল রুহুল। নিজের বিছানায় শুয়ে পুরো ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
তখন পূর্ব দিগন্তে ঊষার আগমনে আকাশখানা সাজ বদলে নিচ্ছে আপন অভিলাষে।
Facebook Comments