Saturday, October 16, 2021
Home > সাক্ষাৎকার > তাবলীগের সাদ বিরোধী আন্দোলন ও একটি গ্রাম্য ফতোয়া

তাবলীগের সাদ বিরোধী আন্দোলন ও একটি গ্রাম্য ফতোয়া

বর্তমান মুসলিম বিশ্বের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার নাম হচ্ছে তাবলীগ জামাত। জাতিকে কীভাবে সঠিক পথের দিশা দেয়া যায় তা হচ্ছে এই জামাতের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কিন্তু এই হকপন্থী তাবলীগ জামাতকে ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে একটি চক্র। এই চক্রের সন্ধান দিতে অক্ষর বিডি.কম মুখোমুখি হয়েছিল মুফতি রেদওয়ান শফির। সিনিয়র মুহাদ্দিসঃ কাসেমুল উলুম কওমীয়া মাদ্রাসা, দক্ষিণগাঁও, ঢাকা। তিনি তাকমীল (মাস্টার্স ) সমাপন করেছেন দারুল উলুম দেওবন্দ, ইন্ডিয়া থেকে।
 
 
অক্ষর টিম : মওলানা সাদ এবং তাবলীগ বিষয়ে কিছু বলুন।
মুফতি রিদওয়ান : দেখুন, মওলানা সাদের ব্যাপারে কিছু বলাটা বেশ কঠিন। এ বিষয়টা তো এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে তবে মওলানা সাদ খুব শরীফ এবং ভদ্র পরিবারের সন্তান। তার চরিত্র নিয়ে আমি মনে করি, কারও কোন প্রশ্ন নেই। সুতরাং যারাই তাকে নিয়ে সমালোচনা করছে তাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ সমালোচকদের সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গাটা হচ্ছে যার সমালোচনা করা হচ্ছে তার চরিত্রের কলুষিত দিকটা কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি খুবই সফল। তিনি খুব ভদ্র মানুষ।
 
অক্ষর টিম : কিছুদিন আগে ‘মওলানা সাদকে অনুসরণ করা জায়েজ নেই’ বলে মওলানা আব্দুল মালেকের দেয়া ফতোয়ার বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখছেন?
মুফতি রেদওয়ান : যিনি সঠিকভাবে ফতোয়া দিতে পারেন তাকে বলা হয় ফতোয়াদাতা। আর যিনি গ্রামের মোড়লের মত আজেবাজে সিদ্ধান্ত দেন তাকে বলা হয় ফতোয়াবাজ। মওলানা আব্দুল মালেক মওলানা সাদের ব্যাপারে যে ফতোয়াটি দিয়েছেন এটাকে আমরা বলতে পারি ফতোয়াবাজি। কারণ, গ্রাম্য মোড়ল যেমন কারো কথার তোয়াক্কা না করে, সবাইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয় মওলানা আব্দুল মালেক ঠিক একই ভাবে কাউকে তোয়াক্কা করেন নি। না মাদারে দারুল উলুম দেওবন্দ, না তাবলিগী সালিশী বোর্ডে থাকা অন্য চারজন বিজ্ঞ আলেমের। যে ব্যক্তি কাউকে তোয়াক্কা করে না, শরীয়তের পরিভাষায় তাকে বলা হয় অহংকারী আর সামাজিক পরিভাষায় বলা হয় বেয়াদব। সুতরাং বিষয়টা কতদূর গড়িয়েছে একটু চিন্তা করে দেখুন। আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “ফাসাদ সৃষ্টিকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না।”
তো মওলানা আব্দুল মালেকের এই ফতোয়াবাজি দ্বারা সমাজের আম মানুষের মধ্যে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ যারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান ইত্যাদির খারাপ পথ ছেড়ে আল্লাহর রাস্তায় এসেছে, তারা মওলানা আব্দুল মালেককে চেনে না তারা চেনে মওলানা সাদকে, এমনকি তাকে মনেপ্রাণে ভালবাসে। সামাজিক দিক না দেখে ফতোয়াবাজি করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার অধিকার কিন্তু কারও নেই।
 
অক্ষর টিম : তাবলীগ জামাত নিয়ে কারা চক্রান্ত করছে?
মুফতি রেজওয়ান : পৃথিবীতে হকের পতাকা নিয়ে টিকে আছে একমাত্র আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত আর এই দলটার দুইটা ফরীক বা বিভাগ হলো মাদারে দারুল উলুম দেওবন্দ আর তাবলীগ জামাত। যার কারনে বাতিলপন্থীরা এই দুইটা দলকে ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এই দেশে বাতিলপন্থীদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় হচ্ছে সালাফি সম্প্রদায়। কুরআনের চর্চা তো মোটেও নেই তারা শুধু হাদিস হাদিস হাদিস বলে স্লোগান দিতে ব্যস্ত। আর এই সালাফিরা জঙ্গি মতাদর্শে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। এদের অর্থায়নে দুই তিনটি মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে হাদিস শেখানোর নাম করে। এবং তাদের মুখপাত্র হিসেবে দু-তিনটা পত্রিকাও আছে। সেই পত্রিকার মাধ্যমেই তারা জোরেশোরে তাদের আদর্শকে প্রচার করছে। বড় দুঃখজনক।
 
অক্ষর টিম : মওলানা শরীফ মুহাম্মদকে কওমি মাদ্রাসার অনেক ছাত্রই আদর্শ হিসেবে দেখে এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
মুফতি রিদওয়ান : মওলানা শরীফ মুহাম্মদ? তিনি কে? ও আচ্ছা আমার দেশ পত্রিকার শরীফ মুহাম্মদ। তাকে তো আমি মওলানাই বলি না। সে সাধারণ একজন সাংবাদিক মাত্র। আলেম কাকে বলে? যিনি সমাজে সম্প্রীতি, মমতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করবেন, তাই না? কিন্তু তার ভিতরে তো এসবের কিছুই নেই। সে সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক একজন মানুষ। বর্তমান যুগের অধিকাংশ সাংবাদিক সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে, আর এটাকে বলা হয় হলুদ সাংবাদিকতা। সেই হলুদ সাংবাদিকতার প্রতিনিধিত্ব করা শরীফ মুহাম্মদ একটা সময় সাম্প্রদায়িক এবং উস্কানিমূলক দৈনিক আমার দেশ-এ কাজ করত। আর ধর্মকে পুঁজি করে যে যত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াতে পারবে সেই তত বড় সেলিব্রেটি হিসেবে আমাদের মাদ্রাসা অঙ্গনে গণ্য হচ্ছেন। শরীফ মুহাম্মদ সেটার বড় উদাহরণ।
 
অক্ষর টিম : কিছুদিন আগে মওলানা আবদুল মালেককে ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলা নিয়ে অনেক জল ঘোলা হল এ নিয়ে কী বলেবেন?
 
মুফতি রিদওয়ান : ‘পাকিস্তানপন্থী’ হিসেবে শুধু মওলানা আব্দুল মালিক বলা উচিত হয় নি। এখনো মন থেকে পাকিস্তানকে ভালবাসে এরকম মাদ্রাসার অভাব নেই।
অনেক মাদ্রাসা আছে যাদের বাংলাদেশের পতাকার প্রতি কেন জানি আজন্ম ঘৃণা সৃষ্টি হয়েছে । অনেক হুজুরই বোধহয় এটা ভাবেন, বাংলাদেশকে ভালবাসা মানে আওয়ামী লীগকে ভালবাসে। অথচ এই দেশ শুধু আওয়ামী লীগের না এই দেশ ষোল কোটি মানুষের।
 
অক্ষর টিম : আল্লামা আহমদ শফী সাহেব সম্পর্কে কী বলবেন?
 
মুফতি রিদওয়ান : আল্লামা আহমদ শফী সাহেব আমার হৃদয়ের স্পন্দন। আল্লাহর কাছে তাঁর দীর্ঘ হায়াত কামনা করছি। শফী সাহেব হুজুর দামাত বারকাতুহুম কিন্তু একটা সময় বাতিলের মূর্তমান আতঙ্ক ছিলেন বিশেষ করে মওদুদী জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে তাঁর কলম এবং তার গলা ছিল সোচ্চার। লেখালেখিও করেছেন এ বিষয়ে প্রচুর, তবে জামায়াত-শিবিরের কিন্তু হুজুরকে ছেড়ে কথা বলে নি তারা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য স্বয়ং শফী সাহেব হুজুরের বড় ছেলে আনাস মাদানীকে দিয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসায় নৃশংস আক্রমণ চালিয়েছিল। যার কারণে আশির দশকে হাটহাজারী মাদরাসা আনাস মাদানী ও জামায়াত-শিবিরের ঘৃণ্য ছাত্রদেরকে বহিষ্কার করে। এমনকি এও শোনা যায় যে হেফাজত আন্দোলনকে অন্য পথে নেওয়ার অন্যতম কুশিলব ছিল এই আনাস মাদানী।
জীবন সায়াহ্নে এসে আজকে শফী সাহেব হুজুরের যত বদনাম হয়েছে সবকিছুর জন্য দায়ী তাঁর বড়ছেলে আনাস মাদানী। আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করুক আমিন!
 
অক্ষর টিম : অনেকেই অভিযোগ করেন মাওলানা আব্দুল মালেক দেওবন্দে না পড়ার কারণে জনমনে ফেতনা সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছেন, এই অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?
 
মুফতি রিদওয়ান : আমরা আমাদের জন্মের পর থেকে একথা শুনে আসছি যে দারুল উলুম দেওবন্দের বারান্দা দিয়ে হাঁটলেও ইলম পাওয়া যায়। এ কথার সত্যতা পেয়েছি দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর। কারণ দেওবন্দ মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্বয়ং রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে স্থাপন করে দিয়েছেন স্বপ্নযোগে। এটা কিন্ত বিশাল বড় ইতিহাস আপনারা পড়ে দেখতে পারেন। এ বিষয়ে প্রচুর বইও আছে। দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়লে চিন্তাভাবনার প্রসার হয়, বিবেক জাগ্রত হয়। দেওবন্দের ছাত্ররা অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী হয় সুতরাং যোগ্য এবং সামাজিক আলেম হতে হলে অবশ্যই আপনাকে দেওবন্দে পড়তেই হবে। সৌদি আরবে কিংবা পাকিস্তানে পড়লে কিছু আরবি কিংবা উর্দু শব্দ শেখা হয় কিন্ত যেহনিয়্যাত তৈরী হয় না, দেশের প্রতি মমতা জন্মায় না, মানসিকতার বিকাশ ঘটে না। উল্টো জঙ্গিবাদী মন মানসিকতা তৈরি হয় যা দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। সমাজের যত ফিতনা-ফাসাদ তৈরি হয় সব এই সমস্ত মন মানসিকতার লোক দ্বারা তৈরি হয়, এরা সমাজের বিষফোঁড়া। আমি মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবকে অনুরোধ করব তিনি জন্য অন্তত একবার হলেও দেওবন্দের বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসেন।
ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি-এর অন্যতম সাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহ আলাইহি এর উসুল অনুযায়ী মাওলানা আব্দুল মালেক এখনও তিফলে মক্তব। আর যোগ্যতার ক্ষেত্রে মওলানা আব্দুল মালেক মুফতি আমিনী রহমতুল্লাহি আলাইহির একটা পশমের সমান হয়েছেন কিনা সেটা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
 
অক্ষর টিম: মওলানা সাদ সাহেব যে ফতোয়াগুলো দিয়েছেন, সেগুলোকে যদি উদ্ভট বলা হয় তাহলে কি ভুল হবে?
 
মুফতী রেদওয়ান: অবশ্যই ভুল হবে, কারণ তিনি কুরআন হাদীস বিরোধী কোন কথা বলেন নি। তিনি কুরআন হাদিস পড়িয়ে টাকা নেওয়ার সাথে বেশ্যার তুলনা করে যে নিন্দা করেছেন ঠিক একই রকম নিন্দা ইবনুল আরাবী (রহঃ) করেছেন। আর মওলানা সাদের দেয়া ফতোয়াগুলোর অধিকাংশই বিভিন্ন মুহাদ্দিস কিংবা মুফাসসিরে কেরামের মতের সাথে মিলে যায়। আর মোবাইল নিয়ে মসজিদে ঢুকার ব্যাপারে সেই ফতোয়াটা তিনি দিয়েছেন সেটাকে আমি শতভাগ সমর্থন করি। কারণ আজকাল মোবাইল টিভি সেটকেও হার মানিয়েছে। টিভির ভিতরে যত নষ্টামী আছে তার থেকে বেশি নষ্টামি কিন্তু বর্তমানে মোবাইলে পাওয়া যায়। আর এই নষ্ট জিনিস পকেটে নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ালে কিন্তু নামাজে একাগ্রতা আসবে না। তাহলে এত কষ্ট করে নামাজ পড়ে কী লাভ হল ? আমাদের মূল সমস্যা হল আমাদের দেশে প্রতিবছর শত শত আলেম তৈরি হচ্ছে কিন্তু কোন তাহকীকওয়ালা যোগ্য আলেম তৈরী হচ্ছে না যার কারণে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কথাটা যদিও তিক্ত কিন্তু এটাই সমাজের করুণ বাস্তবতা, আফসোস!
 
অক্ষর টিম: আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মুফতী রেদওয়ান: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।
বিঃদ্রঃ এই সাক্ষাৎকারটির সাথে অক্ষর বিডি.কম এর সম্পাদকীয় টিমের মতামতের মিল থাকতে পারে এর কোন যৌক্তিকতা নেই। তাই উক্ত মতামতের কারনে সম্পদক দায়ী নয়।
Facebook Comments