Saturday, October 16, 2021
Home > গল্প > বলবো না – ফাহিমা খানম রোশনী

বলবো না – ফাহিমা খানম রোশনী

ফাহিমা খানম রোশনী: অনেকক্ষণ ভেবে অবশেষে রুমা তার মাকে বলেই ফেললো,”মা, তুমি সাইদ আংকেলকে বাসায় আসতে না করে দিবা। ওনার ব্যবহার আর চাহনি কেমন যেন হয়ে গেছে,আমার ভালো লাগে না।”
রুমার মা রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। হাতটা ধুয়ে ড্রইং রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন। সাইদ সাহেব তখনো চা খাচ্ছেন,”ভাবী, চা টা কিন্তু দারুন বানিয়েছেন।”
মিসেস রহমানের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি ভাবছেন অন্য কথা। এক অসহ্য অস্বস্তি গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে। চা টা শেষ করেই সাইদ সাহেব কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন,”রুমাকে দে…” কিন্তু বাক্যটা শেষ করতে পারলেন না।  তার আগেই রুমার মা মিসেস রহমান সাইদ সাহেবের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,” সাইদ ভাই, আপনি আমাদের বাসায় আর আসবেন না। ফোনে কলও করবেন না। আমি চাই না আপনি আমাদের সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখুন। ”
“কিন্তু ভাবী…হঠাৎ.. মানে..” সাইদ সাহেব বিস্ময়ের ধাক্কাটা এখনো সামলে উঠতে পারেন নি। একটু আগে যিনি হাসিমুখে চা দিয়ে গেলেন, হঠাৎ  তারই মুখে  এসব কথা? তবে কি রুমা..?
“আমি কী বলতে চাইছি আশা করি আপনি তা বুঝতে পারছেন। আপনার চা খাওয়া হয়ে গেলে, আপনি এখন আসতে পারেন” আবারও রক্ত  শীতল করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন মিসেস রহমান। দরজাটা খোলাই ছিল। সাইদ সাহেব মিসেস রহমানকে সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন। তিনি চলে যেতেই মিসেস রহমান সশব্দে দরজাটা লাগিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলেন।
রুমা এতোক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। বারান্দায় গ্রিল গলিয়ে নিচে তাকাতেই দেখতে পেল সাইদ নামের লোকটা মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছেন, মাঝে মাঝে অবশ্য মাথা তুলে রুমাদের বাসার দিকে তাকাচ্ছেন। রুমা বারান্দা থেকে একটু সরে এলো। আজ তার খুব আনন্দ হচ্ছে। সাইদ সাহেব বাসায় এলে নানা অযুহাত দেখিয়ে আর তাকে ওয়াশরুমে গিয়ে  লুকিয়ে থাকতে হবে না। রাত জেগে কাঁদতে হবে না। স্কুলে আসা যাওয়ার সময় ভয়ে ভয়ে গলির মুখের ঐ নীল বিল্ডিংটার দিকে তাকাতে হবে না যে বিল্ডিংটায় সাইদ আংকেল নামক লোকটা থাকেন। বিল্ডিংটা ক্রস করার সময় রিকশাচালক চাচাকে আর বলতে হবে না,”চাচা একটু তাড়াতাড়ি যাবেন।” রুমা মেয়েটা একসময় প্রচন্ড রকমের বৃষ্টিবিলাসী ছিল। কিন্তু গত ২ বছরে সাইদ আংকেল নামক এই মানুষটা তার জীবন পুরো এলোমেলো করে দিয়েছে।   শেষ কবে বৃষ্টিতে ভিজেছিল তাও এখন ভুলে গেছে।
কিন্তু আজ সে ভয়াবহ এক মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেল!

সেদিনের পর আজ প্রায় ৪ বছর হতে চললো সাইদ আংকেল নামক লোকটা আর রুমার সামনে আসেনি। বারান্দায় রাখা ইজি চেয়ারটায় বসে হুমায়ুন আহমেদের একটা উপন্যাস পড়তে পড়তে রুমা অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিল সেদিন মা কে কথাগুলো না বললে আজও তাকে কী এক ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হতো! পুরোনো স্মৃতি মনে করে রুমা শিউরে উঠলো।
বাইরে খুব বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির ঝাপটা এসে পড়ছে তার গালে।  অনেকদিন পর আজ রুমার আবার  খুব বৃষ্টিতে ভিজতে হচ্ছে। পুরোনো দিনের মতো আবারও  বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে রবীন্দ্রসংগীত  গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে! নিজের জগতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে…
(বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে)

Facebook Comments