মানবজনম | সাদাত হোসাইন

বইয়ের নাম : মানবজনম
লেখক : সাদাত হোসাইন
রেটিং : ৭.৫/১০
রিভিউ : ফারিহা খান
 
কত সহজ একটা শব্দ “মানবজনম”। কিন্তু আমরা কি আদৌ জানি এই মানবজনম আসলে কি বা এর বিস্তৃতি ঠিক কতটা? এই জগৎ টা আসলে একটা চক্রের মতো। সেই চক্র ঘুরে ফিরে আবার একই জায়গায় ফিরে আসে। মাঝখানে শুধুই সময়ের ব্যবধান। সময় ছাড়া আর সকলই এক ও অভিন্ন। সময় চলে গেলেও এই জগতের গল্পেরা কোথাও চলে যায় না। তারা থেকে যায়। সকল গল্পেরা কোনো না কোনো ভাবে একই রকম থেকে যায়।

আচ্ছা ভাবুন তো, জন্মের পর থেকে যেই মানুষটাকে আপনি আপনার বাবা, মা, ভাই কিংবা বোন ভেবে এসেছেন। জীবনের এক পর্যায়ে এসে যদি আপনি জানতে পারেন, এতদিন যাকে আপনি বাবা, মা, ভাই কিংবা বোন ভেবে এসেছেন তারা আসলে আপনার কেউ নয়, রক্তের কোনো সম্পর্কই নেই এই মানুষগুলোর সাথে আপনার। কিংবা ধরুন বাবা-মায়ের সাথে রক্তের সম্পর্ক আছে, বাবা-মা দুজনের সাথেই আপনি আছেন,,, একদম একটি সুখী পরিবারের মত। অথচ আপনি জানতে পারলেন আপনি ছিলেন তাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। কোনো এক উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই হয়েছিলো আপনার জন্ম। জীবনের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে এসব সত্যগুলো জানতে পারলে কি করবেন আপনি? এসব জানার পরও স্বাভাবিক রাখতে পারবেন কি নিজেকে? আচ্ছা বাদ দিন… চলুন গল্পে ফিরে যাই।

গল্পের শুরু ফতেহপুর নামক এক গ্রামে। ফতেহপুর গ্রামের চেয়ারম্যান খবির খাঁর বাবা তৈয়ব উদ্দিন খাঁ অশীতিপর বৃদ্ধ। কিন্তু অবাক ব্যাপার এই বয়সেও তৈয়ব উদ্দিন খাঁ যথেষ্ট শক্ত সমর্থ মানুষ। তিনিই মূলত ফতেহপুর গ্রামের মাথা। তৈয়ব উদ্দিন খাঁ প্রথম যৌবনে অল্প বয়সেই বিয়ে করেছিলেন। অল্প বয়সের সেই স্ত্রী পরপর দুই সন্তানের জন্ম দিয়ে গত হয়েছেন। দুই সন্তানের বড়জন ফতেহপুরের চেয়ারম্যান খবির খাঁ, আর ছোটজন বেশির ভাগ সময়েই ঘর সংসার ত্যাগ করে বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়ানো দবির খাঁ।
প্রথম পুত্রের বয়স যখন কুড়ি তখন হঠাৎ দ্বিতীয় বিয়ে করলেন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ। দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম আমোদি বেগম। তিনি দেখতেও ছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী।

দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হলো। অনিন্দ্য রূপবতী সেই কন্যা। সেই কন্যার নাম রাখা হলো কোহিনূর।
তৈয়ব উদ্দিন খাঁ খুবই ভালোবাসতেন তার মেয়ে কোহিনূর কে। কোহিনূরের আচার-আচরণ ছিলো খুবই অদ্ভুত রকমের। আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলো কোহিনূর। কিন্তু হঠাৎ ই একদিন তৈয়ব উদ্দিন খাঁ, ঢাকা থেকে গ্রামে আসা এক অপরিচিত লোক যার নাম ফখরুল আলম তার সাথে কোহিনূরের বিয়ে দিয়ে তাকে ঐদিনই ঢাকা পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু কেন?? যে বাবা তার মেয়েকে এত ভালোবাসে সে এমন হুট করে অপরিচিত, চেনা নেই, জানা নেই এমন একজনের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে কেন দিলেন??
সেটা না হয় মানবজনম পড়ে আপনারাই জেনে নিয়েন নিজ দায়িত্বে…..

তারপর হঠাৎ ই একদিন কোহিনূরের ছেলে নয়ন এসে উপস্থিত হলো ফতেহপুর গ্রামে তার নানা বাড়িতে। নয়ন সদ্য এমবিবিএস পাশ করেছে। গ্রামে আসার পর এক রাতে নয়নকে সাপে কাটে। সাপের বিষ নামানোর জন্য খবর দেয়া হয় হোসনাবাদের আব্দুল ফকিরকে।

আব্দুল ফকির হলেন একজন পেশাদার ওঝা যার কাজ সাপের বিষ নামানো। কিন্তু সাপের বিষ নামানোর নামে তিনি নষ্ট করছেন একের পর এক মেয়ের জীবন। তিনি দেখতে খুবই জীর্ণ শীর্ণ, অতি সাধারণ সাধাসিধে একজন মানুষ। তবে কি এই অতি সাধারণ দেখতে চেহারার পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো হিংস্র, জঘন্য আব্দুল ফকির? নয়নকে কি সত্যি ই সাপে কেটেছিলো? নাকি সে সাপে কাটার অভিনয় করছিলো কোনো চরম সত্যি প্রকাশের জন্য?

তার কিছু দিন পরই নয়ন ঢাকা চলে গেলো। ঢাকায় নয়নদের বাসায় ফতেহপুর গ্রামেরই আসমা নামের এক মেয়ে কাজ করতো। যাকে নয়ন নিজের বোনের মত স্নেহ করতো। আসমা একবার গ্রামে এলো, গ্রাম থেকে আবার ঢাকায় ফেরার পর আসমা কেমন চুপচাপ হয়ে গেলো, তেমন একটা কথা বলতো না, লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতো। সেই সময়েই নয়ন আসমার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু একটা আবিষ্কার করলো, আসমা প্রেগনেন্ট। কিন্তু এটা কি করে সম্ভব? আমসা তো অবিবাহিতা। তবে কি নয়ন বা তার বাবা ফখরুল আলম ই আসমার সাথে খারাপ কিছু করেছে? আসমা কয়দিনের ভেতরেই আত্মহত্যা করে বসলো। নয়ন আসমার আত্মহত্যার পেছনের গল্প জানতে গিয়ে মুখোমুখি হয় এক কঠিন সত্যের।
তাছাড়া নয়ন তার মায়ের লেখা খাতা, ডায়েরি পড়েও জানতে পারে এমন এমন সব সত্যি যা কিনা নয়নের জীবনকেই পাল্টে দিতে পারে, এসব বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো তার। আচ্ছা নয়ন কি পারবে সেই চরম সত্যের মুখোমুখি হতে?

নয়নের ভালোবাসার মানুষ হেমা। হেমা আসলাম সাহেব এবং রেণুর একমাত্র মেয়ে। আব্দুল ফকিরের স্ত্রী নুরুন্নাহার মানসিক ভারসাম্যহীন। তাকে ঘরে তালা বন্ধ করে আটকে রাখা হয়। তাদেরই মেয়ে পারুল এবং পারুলের একমাত্র বান্ধবী লতা এদের কে নিয়েই আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে গল্প……

নয়ন আবারও গ্রামে এলো,,, তবে এবার আর নানা বাড়িতে গেলো না। এবার সে সোজা আব্দুল ফকিরের বাড়িতে এসে উপস্থিত। সে মুখোমুখি হতে চায় আব্দুল ফকিরের। এদিকে গ্রামের সকলেই আব্দুল ফকিরকে ভয় পায়, সমীহ করে চলে। কিন্তু নয়ন এসে আব্দুল ফকিরকে বাড়িতে পায়নি। অন্যদিকে পারুলের স্বপ্ন সে ঢাকায় আসবে, ঢাকার কোনো একটা ছেলেকে সে বিয়ে করবে। সেক্ষেত্রে নয়মকে প্রথম দেখাতেই পারুলের ভালো লেগে যায়। নয়ন পারুলের সাথে নানান কথা বলার মাঝে বলছিলো পারুল তার বোন। কিন্তু এ কি করে সম্ভব? পারুল তো তার বাবার একমাত্র মেয়ে, তাহলে নয়ন যে বলছে পারুল নয়নের বোন?

এদিকে আব্দুল ফকির মানুষ টা যেমনই হোক না কেন, সে তার মেয়ে পারুল কে ভীষণ ভালোবাসে। পারুলও তার বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে। গ্রামের মানুষের মুখে পারুল বাবা সম্পর্কে নানান মন্দ কথা শুনে থাকে প্রায়ই। কিন্তু সে এসব কথায় কান দেয় না। কিন্তু এক সময় এক চরম সত্যের মুখোমুখি হয় পারুল। পারুলেরই সবচেয়ে কাছের বান্ধবী লতা তার বাবার লালসার শিকার হয়। এই চরম সত্যটা জানার পর কি করবে পারুল??
সে কি এই সত্য জানার পরও সবটা চুপ করে মেনে নিবে? নাকি সে এর শেষ দেখে ছাড়বে?

কে জানে, এই মানবজনম আসলে কি। হয়তো বিভ্রম আর অপেক্ষার নামই মানবজনম।

ভালবাসা ছাড়া মানবজনম বৃথা। তাই লেখক বেঁচে থাকুক পাঠকের ভালবাসা নিয়ে। ছোট্ট এই রিভিউতে এই বইয়ের কথা লিখে আমি শেষ করতে পারবোনা।

Salman Farsi

সালমান ফারসী লেখক: সুফলতলা গোরস্থান (থ্রিলার গোয়েন্দা উপন্যাস) বিভাগীয় সম্পাদক: অক্ষর বিডি ডট কম বিনোদন প্রতিবেদক: দৈনিক চতুর্দিক ডট কম মডেল: দৈনিক কালের কন্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধি: ব্লাড কানেকশন চেয়ারম্যান: পুস্তক বিডি ডট কম সহকারি সম্পাদক: তানভীর স্টুডিও থিয়েটার পরিচালক: তাক্বওয়া শিল্পীগোষ্ঠী পড়াশোনা: একাদশ শ্রেণী, ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ