Saturday, October 16, 2021
Home > গল্প > পতিতাবৃত্তি নিয়ে চিত্রগল্প “প্রতিমালিপি”

পতিতাবৃত্তি নিয়ে চিত্রগল্প “প্রতিমালিপি”

শ্রী শ্রী চন্ডী নামক ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়, দুর্গাদেবীর কাঠামো তৈরির সময় নয় রকমের মাটির প্রয়োজন হয়। সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা, অর্থাৎ সোজা কথায়, কোনো পতিতার ঘরের দুয়ারের মাটি।
কেন এমন হবে? কেন সমাজের অপবিত্রতম গোষ্ঠীর দুয়ারের মাটি দিয়ে নির্মিত হবেন পবিত্রতম দেবী? তাহলে দেবীর সাথে সেই অপাংক্তেয় নারীদের কি কোনো সম্পরক আছে? আছে হয়তবা!
কিন্তু বেশিরভাগ সময় সেটা আমাদের মনে থাকে না। আমরা মুখে বলি বটে, সব নারীই মায়ের প্রতিলিপি, কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, এই পতিতাদের ক্ষেত্রে সেই কথাটা খাটাতে আমরা নারাজ। আমরা দিনে তাদের দুয়ো দুয়ো করি, আবার রাতে তাদেরকেই সাবাশ সাবাশ বলি। কাজ শেষ, তো প্রশংসাও শেষ।
সব শ্রেনীর মানুষের এই ঘৃণাটুকু কেন একজন মেয়ে নিজের কাঁধে তুলে নেয়? কেন পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়? সেটাই বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে এই চিত্রগল্পে….


আমার গল্প হুনবি তুই? আমার গল্প তো শেষ অইয়া গেছে মায়ের পেট থাইকা বাইর অইয়াই। আন্ধাইর থাইকা বাইর হওয়ার পর গায়ে যেই আলো লাগছে সেইডা আমার সইহ্য হয় নাই, আইজগাও হইতাছেনা। এর লাইগাই আইজও হাঁটতাছি আন্ধাইর এক রাস্তায়। দেবীপক্ষে না, আমার আগমনীর গীতবাইদ্য বাজতেছিল কৃষ্ণপক্ষে। জন্মই খালি হইছিল ইস্টিশনে, আইজও হাঁটতাছি একখান রেললাইন দিয়া। মাঝে মাঝে নিজেরে মনে অয় রেলগাড়ি, প্রত্যেকদিন টিকেট কাইডা প্যাসেঞ্জার আসে, গাড়িতে চড়ে, আর তেল ফুরাইলে পেছনে না তাকাইয়াই চইলা যায়।


মায়ের বেলায় দেখছি আমার বাপে রোজ মায়েরে পিডাইত। আমার বাপে দুইবেলার খাওন দিত বইলা মায়েরে কী অত্যাচারডাই করতো। বাপে কোনোদিন মায়েরে ভালবাসা দেহায় নাই। আমার বেলায় কাহিনিডা পুরাই ভিন্ন। এইহানে সবাইরেই ভালবাসা দেহাইতে হয়। না দেহাইয়া উপায় আছে? এইহানে মরদের অভাব নাই। সবাই সুয়ামি, তয় কেউ পিডাইতে পারেনা। এইহানে আইসা বুঝলাম, রূপ থাকলে খাওনের পেলেট নিয়া দরজায় কতো মরদ দাঁড়াইয়া থাহে
এইহানে খাওন দিলে খাওন আছে, পেরেম দিলে পেরেমও আছে।

লেহাপড়া না কইরাই আমি গাড়ি চড়তেছি, খালি চাবিডা আমার হাতে নাই। আমার গাড়ির মালিক সময়ে সময়ে পাল্ডায়। আমার ঘোড়ায় সওয়ার হয় কতো সওদাগর। তাদের মইদ্যে অনেকেই তো লেহাপড়া কইরা আসছে, তাইলে কি ইস্কুলের দেয়ালে এই গাড়ি চড়ার কথা লেহা আছিলো?

সেইবারই নৌকার গলুইয়ে শুইয়া স্বপ্ন দেখছিলাম। পানিতে কুনু স্রোত আছিলোনা। তাই যেদিকে ইচ্ছা ভাইসা গেছি। এহন তো স্রোতের পানি ভাসাইয়া নিয়া যায়। আর এহন বৈঠা বাইয়া বিরাম লাইগা গেলে নৌকা থাইকা মাঝি পাড়ে নাইমা যায়।
সেইবারই মাঝির হাতে কাগজের নোট দিছিলাম, এহন সব মাঝিই আমার হাতে পয়সা গুইজা দে…

ফাঁড়ি রাস্তা দিয়া আইজগার শটকাট রাস্তায় আমি এমনে এমনেই আসিনাই। পেট বাঁচাইতে গিয়া কতো জায়গায় কাম নিছি। কিন্তু যেইহানেই গেছি, দেখছি আমারে কেউ কামলা খাডাইবার চায় না, উল্ডা আমার কাছেই কামলা খাডবার চায়। তাগোরে কামে নিবার লাইগা কন্ডেক্টারেরে পর্যন্ত হাত করে।


আমার শরীরে কুনু ব্যারাম আছিলোনা। এর পরেও এক অজানা ব্যারামের ওষুধ খাইতে অইত। পরে বুঝলাম এইডা সাহেবগো ব্যারাম। তাগোর কাছে দেখতে যে বড় তার ডিমান্ড বেশি, কারণ বেশি মাংসতে পুষ্টিও বেশি। মানে অইল তাগো পুষ্টির ব্যারাম আছে।


শালার খদ্দেরের নজরে পড়বার লাইগা কতো রঙঢঙ করতে অয়। প্যাহেট পছন্দ না অইলে তেনারা আবার খাবার হাতে নেয়না। কিন্তু খাবার একবার হাতে পাইয়া গেলে তাগো প্যাহেটের দরহারই নাই। তাগো খিদা মিইটা গেলে ওই ছিড়া প্যাহেটডা আবার জুড়া লাগাইতে অয়, রঙ দিবার অয়।


রাইতবেলা গাছে ফুল ধরলে মালীরে ডাইকা আনতে অয়না। রাইতবেলা ফুলের গন্দে মালী আহে। মালী আইসা গাছের নিচে পানি ঢালে, কতা কয়। তারপর সব ফুলের মাঝে যেইডা পছন্দ সেইডার লগে আলাপ করে। সকাল অইয়া গেলে মধুও ফুরাইয়া যায়, মালীও নিজের বাড়ির গাছের ছায়ায় চইলা যায়।


আমার কাছে সাহেবও ছোডোলোক, ছোডোলোকও সাহেব। যে আমারে পান-বাতাসা দিয়া হাত ধরব, তার লগেই আমার পিরিত। আমি রানিও অইতে পারি, দাসীও অইতে পারি। বাতি নিভাইয়া দিলে তো রাজা-বাদশা-সাধু-চোর সবই এক


ফলধরা গাছে যদি কহনো ফল মিষ্ট না অয় তাইলে গাছের মালিক কি আর বইসা থাকব?
গাছ যহন কাটবার পারবোনা, তহন তো অন্য কিছু করতে অইব। মালিক আইসা গাছের পাতা ছিঁড়ে, বাকল ছিঁড়ে, ডাল ভাঙে। আর বোবা গাছ চুপ থাইকা সব কষ্ট সইহ্য করে, আবার মিষ্ট ফল দিবার লাইগা তৈয়ার অয়। গাছের ডালপালার কুনু মূল্য নাই, সব মূল্য ফলের রসে।


সারা রাইতের পিরিত সকাল অইলেই শেষ অইয়া যায়। আর আমি আরেক রাইতের অপেক্ষায় সারাদিন বাঁসি ফুলের মতো পইড়া থাহি। আমার কাছে তহন কাঁটাতারের উপর দিয়া কেডা আইব? রাইতে যেই ফুলের ঘ্রানে ভ্রমর ছুইডা আসে, দিনেরবেলা সেই ফুলের উপর মাছি ভনভন করে।


আমিও দুনিয়াডারে দেহার লাইগা বাহির অই। কিন্তু যহন দরহার পড়েনা, তহন দুনিয়া আমারে দেইহা পালায়। আমার ছায়ায় লাইগা যাইব বইলা তারা পা-ও তুইলা নেয়। আমার লাইগা তহন সব দরজা বন্দ।


আসমানে মেঘ জমলে সকলে ছুইডা যায় ঘরের দিকে। তহন একলা রাস্তায় আমি একা দাঁড়াইয়া থাহি কহন মেঘ আইসা আমারে ধুইয়া দিব সেই অপেক্ষায়।


টেহাপয়সার হিসাব মিইলা গেলেও আমি এই জীবনের হিসাব মিলাইতে পারিনা। এই টেহারে তহন বড়ই বেদরকারি মনে অয়। আর মনে অয়, এই জমানো টেহা দিয়া যদি অনেকগুলা পুরুষরে কিনতে পারতাম, নিজের একটা ছোডো দুনিয়া কিনতে পারতাম, একটা জিন্দেগি কিনতে পারতাম…..
আইচ্ছা, কতো জন্মের টেহা জমাইলে একটা নয়া জন্ম পামু?


সারাজীবন এতো রোজগার কইরাও আইজকা জমার খাতায় কিছু নাই। আইজও আমি আন্ধাইর ঘরে একলা বইসা জীবনের হিসাব মিলাইতে পারিনা। এই দুনিয়া আমার কাছে আহে সুখ লেনদেন করতে। আমার গতর থাইকা সব সুখ উসুল কইরা ফেরত দেয় আমার একলার কষ্ট।


অবশেষে আমার লেনদেনের পাঠ শেষ করতাছি। যে সুখরে সারাজীবন খুঁইজা বেড়াইছি, সেই সুখ আইলো হাতের কাছে। এই আন্ধাইরের মরণকূপ পাড়ি দিয়া আমার যাইতে অইব সেইহানে, যেইহানে কুনু লেনদেন নাই। একঘটি জল আমারে দেহাইব এক নতুন রাস্তা, সুখের নরকরে পায়ে ঠেইলা আমি যাইতেছি এক নতুন জীবনে।


দুই চক্ষে দুনিয়াডারে দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। এইবার আমার তৃতীয় নয়নের আবির্ভাব হইল। আমার মুখে আমি দেখি এক প্রতীমা। এই মুখে কুনু পাপ নাই। এই চক্ষে কুনু আন্ধাইর নাইরে মরদ। সব পাপ তোগো চক্ষে, তোরাই দেবীরে তোগো প্রয়োজনে পূজা করস, আবার পূজা শেষ অইলে গলা চাইপা পানিতে চুবাস। তোদের মনের অসুররে বধ না করলে দুনিয়ার কুনু দেবীই তোদের ছোবল থাইকা রেহাই পাইবোনা।


প্রডাকশন : তিথিডোর
মেইন ফেস : Sharmin Farzana
Special appearance : এহসান শুভ, Maya Biswas, Anik Mithon
ক্যাপশন : অপরুপ দাস অয়ন

ফটোগ্রাফি : Sumit Biswas Ovi ও তনু দীপ


শেখ মাহমুদুল ইসলাম মিজু
সম্পাদক, অক্ষর বিডি

Facebook Comments