বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > অন্যান্য > অনুভূতি | সাদিয়া ইসলাম নিধি

অনুভূতি | সাদিয়া ইসলাম নিধি

Spread the love

ডিসেম্বরের এক শীতের সন্ধ্যা। হঠাৎ করেই আজ যেন বেশি ঠান্ডা পড়েছে। হিম কুয়াশাটাও জাঁকিয়ে বসেছে ভালোমতো। সন্ধ্যে লাগতেই একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, রোজকার অভ্যেস। বাসার দুই ব্লক পরেই পার্ক। বিকেল বেলায় অনেকেই বের হয়। ছোট বাচ্চাদের চেঁচামেচিতে পার্কটা সরব হয়ে ওঠে। আমার বেশ লাগে। আমার ব্যস্ত জীবনে এদের দেখে যেন প্রাণশক্তি ফিরে পাই!
মোটামুটি চার কোণাকৃতির পার্কটার চারধারের ওয়াকওয়ে ধরে জগিং করতে থাকি। ফটোগ্রাফ কিংবা দ্য সায়েন্টিস্ট শুনতে শুনতে দৌড়াই, সাথে হয়তো পাশের ব্লকের এলিজা আন্টি থাকেন কখনও। চার আর ছয় বছরের দুই নাতিকে নিয়ে আসেন তিনি। ষাটোর্ধ্ব বয়স হলেও ভদ্রমহিলা এখনও ভালোই শক্তিশালী।
পার্কের দু’পাশ জুড়ে ছোট ক্যানোপির মত ছেয়ে থাকা গাছ। ক্লান্ত হয়ে পশ্চিম পাশের বেঞ্চটায় বসি কখনও। আসলে ক্লান্ত হই না অতটা, এলিজা আন্টির সাথে গল্প করার জন্যই হয়তো বসি। সারাদিনের ব্যস্ততায় এখন এতটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি যে, অযথা বসে থাকতেই বরং খারাপ লাগে। আমার ব্যস্ত জীবনের একমাত্র সঙ্গী ইয়েলো, হ্যাঁ আমার বিড়াল ইয়েলো। এলিজা আন্টির দুই নাতি আবার ইয়েলোকে খুব পছন্দ করে। ইয়েলোকে তাদের সঙ্গে খেলতে ছেড়ে দিয়ে আমি আর আন্টি বেঞ্চিতে বসি।
দুজন দু’টা কফি খেতে খেতে কথার স্রোতে হারিয়ে যাই যেন। বয়স ষাটের উপর হলে কি হবে, হাল আমলের কোনদিক সম্বন্ধে উনার জ্ঞান ইয়াং ছেলেপেলেদের চেয়ে কম নয়। সারাদিন দুই নাতি সামলানোর পাশাপাশি ভদ্রমহিলা বেশ পড়াশুনাও করেন। মূলত উনার বাসার লাইব্রেরি ঘরটার প্রতিই আমার মূল আকর্ষণ ছিল একসময়। উনার মেয়ে মানে নীনা আপু চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বেশি, বইয়ের প্রতি আকর্ষণ নেই অতটা। তাই হয়তো তিনি আমার সাথে কথা বলেই আনন্দ পান কিছুটা। রাজনীতি থেকে শুরু করে মিথোলজী, কোনদিকেই জ্ঞান কম নেই তার৷ উনার হাজব্যান্ড জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন, বিশাল মনের লোকের সাথে থেকে তিনিও বিশাল মনের মানুষ হিসেবেই গড়ে তুলেছেন নিজেকে, এটা বেশ বোঝা যায়। বড় মনের মানুষদের সাথে থেকে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করি মাঝেসাঝে। আন্টির সাথে কথা বলতে বলতে আম্মুর কথা মনে পড়ে যায়, কতদিন বাসায় যাওয়া হয় না!
আমাদের হসপিটালে আন্টি প্রায়ই চেকাপ করাতে আসেন, ডায়াবেটিস, মেলাইটাস আর স্টেইজ ওয়ান হাইপারটেনশন এর পেশেন্ট উনি। আম্মুর স্যুগার টাও কিছুদিন ধরে ৯ এর উপর। আব্বুর তো ১২ প্রায়। একসময় টেনশন হত খুব। এখন আর ভয়-টয় লাগে না তেমন। শুধু অভয় দিয়ে যাই তাদের, আরে কিছুই হবে না। একটু কন্ট্রোল করে চললেই সব ঠিক।
আন্টির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নেই একসময়। উনিও চলে যাবেন। সন্ধ্যে হয়ে এল বলে। ইয়েলোকে জোর করে বাচ্চাদের কাছ থেকে টেনে নিয়ে আসি।



নাইট ডিউটি শুরু হয় হিম কুয়াশা আর শীতের চাদর গায়ে জড়িয়ে। এক কাপ কফি নিয়ে বসি ইন্টার্ণ রুমে। দু’একজন আসেনি এখনও। ব্যাচমেটদের সাথে গল্প জুড়ে দেয়ার চেষ্টা করি। হঠাৎ রফিক ভাই এসে জানান, এক পেশেন্টকে ডিল করতে আর্জেন্টলি যেতে হবে উনাকে। আপাতত ইমার্জেন্সি রুমে আমাকে বসতে হবে। মন খারাপ হয়ে যায়, একাকী ইমার্জেন্সি রুমে বসতে হবে। সবার সাথে বসে আড্ডাটা আর হলো না। ইমার্জেন্সি রুমের দিকে যেতে থাকি। আমাদের হসপিটালে আবার পাশের বিল্ডিঙে ইমার্জেন্সি করিডোর। করিডোরের সামনে একপাশে দেখি এক বাচ্চা ছেলে এই হিম কুয়াশায় আকাশের দিকে মুখ করে ধোঁয়া বের করার চেষ্টা করছে। দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় আমরাও কত করেছি এরকম! কিন্তু এত রাতে এই বাচ্চাটা বাইরে কেন? ভাবতে ভাবতেই দেখলাম বাচ্চাটার মা এসে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভেতরে। কার সাথে এসেছে এরা? এসব ভাবতে ভাবতে রুমে ঢুকলাম। চেয়ারে বসতে না বসতেই নীনা আপুর ফোন! এত রাতে কী হল? ফোন ধরতেই হন্তদন্ত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘মা হঠাৎ করেই কেমন যেন করছে, প্রচুর ঘেমে যাচ্ছে, অনেক অস্বস্তি লাগছে, মাথায় পানি ঢাললাম, কোন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। তোমাদের মেডিকেলে নিয়ে আসছি, তুমি একটু হেল্প করো প্লিজ!’আমি দ্রুত ইমার্জেন্সি থেকে বের হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম হতভম্বের মত। আজ বিকালেই এত কথা হল সুস্থ সবল মানুষটার সাথে।
আন্টিকে ভর্তি করা হল ইমার্জেন্সীতে। রাত ২ টার দিকে রাজীব ভাই ফিরে এলেন, আমাকে ইন্টার্ন রুমে যেতে হবে আবার।
ভাইয়াকে বলে গেলাম আন্টিকে একটু স্পেশালি দেখতে। উনার প্রেশার বেড়েছে হঠাৎ।
সকাল হতেই নিচে নেমে আসলাম। আন্টিকে দেখতে যাওয়া দরকার৷ ইমার্জেন্সিতে গিয়ে আপু ভাইয়া সবাইকে পেলাম। রিলিজ দিয়েছে আন্টিকে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। রাতে নীনা আপুর ফোন পেয়ে প্রথমে কি ভয়টাই না পেয়েছিলাম! তাদেরকে বিদায় দিতে বাইরে এলাম। চলে গেলেন সবাই।
প্রিয়জনদের অসুস্থতার খবরে কতটা অসহায়ই না লাগে!
এসব ভাবতে ভাবতে সামনে এগুতেই দেখি স্ট্রেচারের উপর রাখা ছোট্ট একটা লাশ! আশপাশের মানুষজনের কাছ শুনলাম, গতকাল বিকেলে খেলতে খেলতে পানির ট্যাংকের ভেতর পড়ে গেছিল বাচ্চাটা! রাতে লাশ খুঁজে পেয়ে হসপিটালে নিয়ে আসে। এখনও ছোট দুইটা হাতে মেহেদী দেওয়া৷ ছোট মেয়েটা কত শখ করেই না জানি দিয়েছিল!
আশেপাশে মেয়েটার মাকে দেখতে পেলাম না। মেয়ের দুঃখে কিভাবে বেঁচে আছে মহিলা কে জানে!
একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম বাচ্চাটির দিকে। কেমন যেন অনুভূতি শূন্য লাগছে নিজেকে৷ খেয়াল করলাম চোখের কোণে একটু জল জমেছে। হঠাৎ দেখলাম আমার ব্যাচমেট নোভা, সাথীরা আসছে। তাড়াতাড়ি চোখ মুছলাম। ওরা দেখলে কী বলবে? ডাক্তারদের এসব অনুভুতি থাকতে নেই যে!

Facebook Comments