শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২২
Home > বিনোদন > মুভি রিভিউ : দেবী

মুভি রিভিউ : দেবী

Spread the love

আকাশ আব্দুল্লাহ : গ্রুপগুলোতে গতকাল রাত থেকেই দেবীর মিশ্র ফিডব্যাক দেখছি। কারো ভালো লেগেছে তো কেউ হতাশ হয়েছে। দেবী নিয়ে আমারও প্রথম থেকে উচ্চাশা ছিলোনা। কারন মিসির আলী সম্পূর্ন অন্য লেভেলের জিনিশ।
হুমায়ুনের সৃষ্টি করা অসাধারন চরিত্রের অভাব নেই। হিমু,মিসির আলী, শুভ্র, বাকের ভাই, বজলু ভাই, মুনা, লীলাবতী ইত্যাদি ইত্যাদি।
এতোসব চরিত্রের মাঝে মিসির আলীই আমার মতে হুমায়ুনের সেরা চরিত্র। এমনকি হিমুকেও মিসির আলীর অসাধারনত্বের কাছে ফিকে লাগে আমার। একজন পঞ্চাশোর্ধ্বো মানুষ যিনি একা থাকেন। রান্নাবান্নার জন্য কাজের ছেলে রাখেন। তিনি যত্ন নিয়ে তাদের লেখাপড়া শেখাতে চান কিন্তু কিছু কিছুদিন পরপরই প্রতিটা ছেলে বাসা থেকে টাকা চুরি করে ভাগে।
তার গালে কাচাপাকা খোচাখোচা দাড়ি। মারাত্মক চেইন স্মোকার, ঘন ঘন অসুখে ভোগেন,প্রায়ই হাসপাতালে পড়ে থাকেন। সারাক্ষন বইয়ে মুখ গুজে থাকেন,কিছুটা পাগলাটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির প্রফেসর। অব্যাখ্যায় ঘটনার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাড় করাতে পছন্দ করেন। অন্যের সাইকোলজিক্যাল সমস্যা সমাধান করা তার শখ,এজন্য তিনি পারিশ্রমিক নেন না।

উপরের চিত্রটাই মিসির আলীর প্রতিচ্ছবি নয়। হুমায়ুন তার বইগুলোতে মিসির আলীকে একটা ভিন্ন আবহ দিয়েছেন,যার জন্যই মিসির আলীর ব্যক্তিত্ব অসাধারণ।

বইয়ের এই মিসির আলীটা দেবী মুভিতে সম্পূর্ণ অনুপুস্থিত। চঞ্চল অসাধারণ অভনেতা সন্দেহ নেই। কিন্তু মিসির আলীর লুক বা ভয়েস কোনোভাবেই চঞ্চলের সাথে যায় না। পারফেক্টলি করতে পারেন নি। এদেশে মিসির আলীর লুক এলাইক একজন অভিনেতাই আছে,তিনি জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় মিসির আলী চরিত্র অভিনয় করেছিলেনও,বিটিভির একটা নাটকে। প্রায় ছয় বছর আগে দেখেছিলাম এবং আমার এখনো মনে আছে, মিসির আলী হিসেবে একশোতে একশো অভিনয় করেছিলেন ভদ্রলোক। (উল্লেখ্য,সে নাটকে হিমু চরিত্রে আনিসুর রাহমান মিলন এবং মাসুদ রানা চরিত্রে পল্লব ছিলো।ইন্টারেস্টিং, হ্যা?)
সে যাক গে, জয়ন্তের আলাপ পেড়ে লাভ নেই। চঞ্চল কতটুক কি করলো সেটা বলি।
সোজা কথায়-

প্রশ্নঃ চঞ্চলের অভিনয় কেমন ছিলো?
উত্তরঃ অসাধারণ
প্রশ্নঃ মিসির আলীর মতো হয়েছে?
উত্তরঃ না

এই ছবিটা যদি মিসির আলীর না হয়ে অন্য ছবির হতো আর চঞ্চল ঠিক এই অভিনয়টাই করতেন তাহলে আয়নাবাজির আয়নার থেকেও বেশি প্রসংসা জুটতো আমার বিশ্বাস। কিন্তু চরিত্রটা যখন মিসির আলির তখন বেচারা পাহাড়সম এক্সপেক্টেশনের ভারে চাপা পড়ে গেলো।

জয়া আহসানঃ অভিনয়ের দিক থেকে এই মুভির জ্বলজ্বলে তারাটা হচ্ছে জয়া। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এই মুহুর্তে নায়িকা নামের একগাদা ছাগলের পালের মাঝে জয়া বড্ড বেমানান। আমাদের বাংলা চলচিত্র ইতিহাসে সবচেয়ে ভার্সেটাইল এবং দক্ষ অভিনেতাদের মাঝে জয়া একজন। তার ঝুলিতে যতগুলো অসাধারন ছবি রয়েছে ততগুলো ভালো ছবি আমাদের দেশের নায়কদেরও দেখা যায়না। দেবীতে তার অভিনয়ে পারফেক্ট ছিলো। দশে দশ। তার ডায়লগ ডেলিভারি, আনমনে কথা বলা, আতঙ্কের মূহুর্তগুলোতে তার ত্রস্ততা, তার ভয় পাওয়া, কথা বলার সময় চেয়ারের হাতলে আনমনে নখ খোটা সবই অসাধারণ ছিলো। একবার ভাবেন তো এই দৃশ্যগুলায় নুসরাত ফারিয়া বা অপু বিশ্বাস কেমন করতো? যুগে যুগে আল্লাহ আমাদের এভাবেই বাচায়ে যায়।

এছাড়া অন্য চরিত্রগুলোতে শবনম ফারিয়া ভালো অভিনয় করেছে। আসলে বেশ ভালোই করেছে। তার অভিনয়ের রেটিং ৯/১০
ইরেশ যাকেরের মতো ঘাগু অভিনেতার অভিনয় খাপছাড়া কেন লাগলো বুঝলাম না। তাকে ৬/১০
অনিমেষ আইচ। ক্যামেরার পেছনের লোক। সে হিসেবে খারাপ করেন নাই। তবে তার জায়গায় অভিজ্ঞ কাউকে কাস্টিং করালে আরো ভালো ফলাফল আসতো। তাকে ৭.৫/১০

এই গেলো অভিনয়ের প্যাচাল।
এবার আসি আর সব বিষয়ে।
প্রথমেই, এই মুভির বেস্ট জিনিশটা হলো পরিচালক মুন্সিয়ানার সাথে হরর একটা আবহ তৈরী করতে পেরেছেন। জীবনে এই প্রথম বাংলা মুভিতে গোসবাম্প খেয়ে চমকে উঠেছি। একটা সিনে তো আৎকেই উঠেছিলাম। ভৌতিক দৃশ্যে ফুটিয়ে তুলতে পিলে চমকানো পারফেক্ট ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের বিকল্প নেই। এবং দেবী এখানে একশতভাগ সফল।বিশেষ করে মুভির শেষ ক্লাইম্যাক্সের দৃশ্যে যে সাসপেন্সফুল ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিলো অমন বিজিএম আগে কোনো বাংলা মুভিতে আপনি শোনেন নি,গ্যারান্টি দিচ্ছি। হলের বড় বড় বক্সের বিকট শব্দে আরো দারুন লেগেছে। এই মজাটা আপনি ল্যাপটপে,মোবাইলে দেখে পাবেন না।

সংলাপ কয়েকটা জায়গায় আমার কাছে বেশ দুর্বল লেগেছে। আরো ভালো হতে পারতো।
সিনেমাটোগ্রাফি ভালোই ছিলো। ডিরেকশন ভালো ছিলো,কালার গ্রেডিং ভালো ছিলো। অনুপমের গানটা ইউটিউব রিলিজের সময় ভালো লাগেনি। কিন্তু মুভিতে ভালোই লেগেছে।

অনেকে অভিযোগ করেছেন মুভি খুব স্লো। আমার তেমনটা মনে হয়নি। একদমই মনে হয়নি। মেদহীন একটা গল্পই ছিলো বলা যায়। কিছু জায়গায় কমেডি ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছে যেগুলো বইয়ে নেই। খারাপ লাগেনি। দুএকটা জায়গায় হলের সবাই হেসেছি।

মুভির শেষটা বেশ এবরাপ্টলি,একেবারে ধুম করে হয়ে গেছে। শেষ হবার পর দর্শকরা যেনো মানতে পারছিলো না এখানেই মুভি শেষ। আসলে এখানে পরিচালকের কিছুই করার নেই।
যারা বইটা পড়েছেন তারা জানেন দেবির গল্পটা এখানেই শেষ নয়। মিসির আলীর পরবর্তি বই নিশিথিনীতে দেবীর পরের ঘটনা থেকেই গল্প শুরু হয়েছে। তাই দেবির শেষ হলেও ‘শেষ হয় নি শেষ হয় নি’ লাগবে। নিশিথিনীতে এই গল্প শেষ হবে।

আরেকটু বলি। মিসির আলীর মোট বিশটা বই। প্রায় সবগুলো বইতেই মিসির আলী অব্যাখ্যায় ব্যাপারগুলোর যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেন। একমাত্র দেবী,নিশিথিনী আর ‘মিসির আলীর কয়েকটি অমিমাংশিত রহস্য’ বইয়ের গল্পগুলোতেই তিনি অতিপ্রাকৃত ব্যাওয়ারগুলোকে ‘প্রকৃতি কিছু সত্য নিজের কাছে আড়াল করে রাখতে পছন্দ করে’ বলে মেনে নিয়েছেন। তাই দেবীর শেষে যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাবেন এই আশা রাখবেন না,আশাহত হবেন। এতে মুভির দোষ নেই।

শেষ করি। একেবারে সংক্ষেপে—-

যা ভালো লাগে নি
– চঞ্চলকে ( আবারো বলি,অভিনয় অসাধারণ হয়েছে,তবে সেটা মিসির আলী হয়নি)
– শেষের দিকে তাড়াহুড়ো মনে হয়েছে।

যা ভালো লেগেছেঃ
-ডিরেকশন
– পারফেক্ট হরর এনভায়রনমেন্ট
-ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর
– অভিনয়
– আরো এই সেই ইত্যাদি টিত্যাদি….

চমকে যাবার মতো একটা মতামত দিয়ে শেষ করি। লাস্ট আয়নাবাজি বা ঢাকার এটাকের থেকে দেবি অধিকতর ওয়েল মেড মুভি।
এক্সপেকটেশন কম রেখে মুভিটা দেখবেন। আমার ভালো লেগেছে। আপনারও লাগতে পারে।

বি:দ্র: আমি যে হলে দেখেছি সেখানে জয়াসহ দেবী টিম আসার কথা ছিলো। অপেক্ষায় ছিলাম। আসেনি। হয়তো পরের শোতে এসেছিলো।

Facebook Comments