Saturday, January 22, 2022
Home > বই আলোচনা > বুক রিভিউ : এক ব্যতিক্রমী গোয়েন্দা উপাখ্যান (কাশ্মীর) “দ্যা স্পাই ক্রনিক্যাল : রাও ,আই এস আই অ্যান্ড দ্যা ইল্যুশন অফ পিস”

বুক রিভিউ : এক ব্যতিক্রমী গোয়েন্দা উপাখ্যান (কাশ্মীর) “দ্যা স্পাই ক্রনিক্যাল : রাও ,আই এস আই অ্যান্ড দ্যা ইল্যুশন অফ পিস”

Spread the love

নিয়াজ মাহমুদ :

প্রকাশকালঃ ২০১৮

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানঃ হারপার কলিন্স প্রকাশনা , ভারত।

গোয়েন্দা  উপাখ্যানঃ ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সি রাও,  পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই এবং শান্তির বিভ্রম,এই নামেই এই বইয়ের বাংলা  অনুবাদ এতদিনে বাংলাদেশ আর কলকাতার বাজারে সয়লাব হয়ে উঠতে পারতো।তেমন কি কিছু হয়েছে? কলকাতায় ঠিকই হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে আসলে লেখক এ এস দুলাত, আদিত্য সিনহা এবং আসাদ দুররানি কে খুব কম সংখ্যক মানুষই চেনে। হ্যাঁ এই বইটা  তিনজন লেখকের যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। এবং এই লেখকদের কেউই সাধারণ কোন মানুষ নন। আর এই রিভিঊটা বিংশ শতাব্দীর বিশেষ মানুষগুলোর সাথেই শুধু পরিচয় করিয়ে দেবেনা, লেখক, বই, কাশ্মীর,  বিশ্বের দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের শান্তি রক্ষায় যে পদক্ষেপ  এবং তাদের কূটনীতি সে সবকিছুর বর্ণনাই পাবেন। আর রিভিউ পড়ে মনে হবে আপনি পুরো বইটাই পড়ে ফেলেছেন সংক্ষিপ্ত আকারে, হয়তো বইটি কিনেও ফেলবেন অতি দ্রুতই।

এই বইয়ের মূল লেখক অমরজিত সিং দুলাত, প্রধানমন্ত্রী এ বি বাজপায়ী এর অধীনে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার রিসার্চ এন্ড অ্যানালাইসিস উইং এর প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন বেশ কয়েক বছর। আর এর পর তিনি বাজপায়ীর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় (পি এম ও ) তে যোগদান করেন যেখানে তার প্রধান কাজই ছিল কাশ্মীরের শান্তি রক্ষায় ভারতীয় সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছিল তার দেখভাল করা।পড়াশুনা শেষে যোগ দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান পুলিশ সারভিস (আই পি এস) এ ১৯৬৫ সালে। সেই থেকেই শুরু, আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।ইনি এক ব্যতিক্রমী গোয়েন্দাই ছিলেন বটে, চাকরি রত অবস্থাতেই কাশ্মীরিদের সঙ্গে মিলে সুবিশাল রাস্তা তৈরী করেছিলেন। বেশ ভালোভাবেই সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনে দক্ষ হওয়ায় সংলাপে বিশ্বাসী এই লোকটি কাশ্মিরের জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথেও নিজের ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।অবসর গ্রহণের এক দশক পরেও স্ত্রী পারান কে নিয়ে দিল্লীর একটা বাংলোতে থাকতেন তিনি,হয়তো জীবনের গল্প গুলো বলার জন্যই আর পরামর্শ দেবার জন্য এখনো বেচে আছেন। এই কারনেই ওনাকে ব্যতিক্রমী বলা হচ্ছে যে বিখ্যাত উপন্যাস চরিত্র শারলক হোমস এর মতো সাইকোপ্যথিক ডিজঅরডার ওনার ছিলনা! মাসুদ রানা সিরিজ, সাইমুম সিরিজ এরকম অনেক গোয়েন্দা সিরিজ আছে, ওগুলো উপন্যাসের চরিত্র , আর এই মানুষগুলো সত্যিকার উপন্যাস।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আসাদ দুররানি , তিন তারা প্রাপ্ত জেনারেল ছিলেন উনি। ইন্টার সারভিস ইন্টেলিজেন্স এর প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন, পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন অনেক বছর। এবং ২০১৫ সালে বিস্ফোরক এক মন্তব্য করেছিলেন উনি,”পাকিস্তান সরকার ওসামা বিন লাদেনের লোকেশন জানে এবং হয়তো সঠিক সময়েই সবকিছু বের হয়ে আসবে।“ আর পরবর্তীতে উনি যখন এই বই লেখেন, তখন এই বই অরজিত এর সাথে একসাথেই ভারতে ২০১৮ সালে প্রকাশিত হবার কথা ছিল।কিন্তু ভারত সরকার তার ভিসা পারমিট এর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এবং এই বইয়ের জন্যই জেনারেল হেডকোয়ার্টার এর সামনে থেকেই তার উপর সমন জারির কথা শুনতে হয়েছিল তাকে।

এবং তার নাম এক্সিট কন্ট্রোল লিস্টে দিয়ে দেয়া হয়েছিল শুধুমাত্র এই বইয়ের জন্য, সত্য বলতে এই বইয়ের মধ্যে কথোপকথন, স্মৃতিকথা, কিছু কার্যকলাপের বিবরণী আর কিছু উত্তেজনাকর পরিস্থিতির নিখুঁত বিবরণ আছে। তেমন আহামরি কিছু না!! তবে আহামরি কিছু যদি নাই হয়ে থাকে তাহলে বাস্তব উপন্যাসের রচনা যারা করেছিলেন, তাদের এতকিছু সহ্য কেন করতে হলো!!! সাদাত হোসেন মান্টো,এই বই নিয়ে একটা কথা বলেছিলেন “ আমি দিগন্তের (সমুদ্র ও আকাশ যেথা একসাথে এসে মিলিয়ে যায়) পানে ইঙ্গিত করেই বলছি ,এটা শুধুই একটা বিভ্রম মাত্র, কারন আসলে এমন কিছু (পাকিস্তান এবং ভারতীয় সেনাপ্রধান এক টেবিলে বসে চা খাওয়া, আলোচনা করা) কল্পনা ব্যতীত বাস্তবে সত্য হওয়া কোনো দিন সম্ভব নয়,কিন্তু আসলে এমন কিছু কি সুন্দর না,বলুন!! এই যে অবাস্তব একতা”। তার এই কথা কিন্তু ভুল প্রমাণ করেছিলেন বিশ্বের দুর্ধর্ষ এই দুই গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানেরা, টান টান উত্তেজনা থাকবেই পুরো বই জুড়ে, মোদ্দাকথা এক বার শুরু করলে শেষ না করে উঠতে পারবেন না।

২০১৬ এর দিকে যখন কাশ্মীর ইস্যুতে দ্বন্দ্ব ছিল তুঙ্গে , ঠিক সে সময়েই সংলাপ না হলে যুদ্ধ লেগে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছুই ছিলনা। তবে কেউ প্রতিপক্ষের মাটিতে নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারেনি। এবং সংলাপের জায়গা ঠিক করতে গিয়েও কয়েক দফা নিউরনের সাথে যুদ্ধে যেতে হয়েছিল তাদের। আর এত বড় দুই  পরাশক্তি দেশের সংলাপ তো  আর কারো  ঘরের মধ্যে  বসে করা সম্ভব না। তাই ইস্তাম্বুল, ব্যাংকক অ্যাঁর কাঠমান্ডুর মতো শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির প্রায় সবগুল বিষয়ই ওরা আলোচনা করেছিল হয়তো।তবে এতটুকু নিশ্চিত যে , টেবিলে চায়ের কাপে ঝড় না তুলে এই দুই দেশের দুই মহারথী উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক সিন্ধুর একদম গভীরে অনুপ্রবেশ করেছিলেন এবং ওই সময়কার নানা চড়াই উতড়াই এর কথা ভাবছিলেন। এই দুই স্পাই মাস্টারের চোখে সেদিন ধরা পড়েছিল সব। বাস্তব নিদাঘ ! নির্মম বাস্তবতা। আর এই দুই স্পাই মাস্টার এর কথায় সেদিন উঠে এসেছিল, কাশ্মীর , শান্তির দূত হয়েও অপরচুনিটি মিসিং, হাফিজ সাইদ, ২৬/১১, কুল্ভুষাণ যাদভ, সারজিক্যাল স্ট্রাইক, ওসাবা বিন লাদেন কে নিয়ে কি করা যায়,  ভারত বা পাকিস্তান এর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকা রাশিয়া কি ভাবছে, কিভাবে  সন্ত্রাসীরা দুদেশে প্রভাব বিস্তার করে আছে, এবং এদের দমনে কি কি করনীয়। আর এই আলোচনা করার কথা যখন  প্রথম প্রথম সবাই ভাবছিলেন , তখন দুররানি নিজেই হাসছিলেন যে, এগুলো কল্পকথা হলেও কেউ বিশ্বাস করবেনা। দুজন সাবেক চিফ অফ স্পাই, দুই প্রতিপক্ষ পরাশক্তি রাষ্ট্রের  অকল্পনীয় এক সংলাপ যা পুরোটাই বাস্তব কোনো রূপকথা নয়, আপনাকে অনেক কিছুর উত্তর ই দিয়ে দেবে।বইয়ের উদ্দেশ্য শেষ প্রান্তে পরিষ্কার করা হয়েছে: “ইয়ে হ্যায় দেবীনগি কবিতা?” ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার উন্মাদনা কখন শেষ হবে? এ বি বি। বাজপেয়ী জিজ্ঞেস করেছিলেন। ওই দিন নওয়াজ শরীফের ও ভূমিকা ছিল। লেখকরা এক  একটা কমন গ্রাঊন্ড খুজে বের করে তার উপর ভিত্তি করে লেখাটা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। যাতে দুই অঞ্চলই সহযোগিতা সহমর্মিতার ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে চলতে  পারে। ফলসবরূপ এই বই, অপর্যাপ্ত হলেও সাথে সাথে ফ্লরিশ করে।তবে ২৬/১১ এর ফ্ল্যাশ পয়েন্ট নিয়ে অনেকের মধ্যেই মতবিরোধ দেখা যায়। বইটি আক্ষরিক ভাবে পড়তে গেলে আপনার ভালো না ও লাগতে পারে। তাই একটু গভীর চিন্তাচেতনাকে বন্ধু বানিয়ে নিন। নিহিত অর্থ বের করুন, লেখকেরা আসলেই কি বলতে চাইছেন। আর একজন আই এস আই এবং রাও এর প্রধান যে তাদের পুরোটাই একটি বইয়ের ভেতরে ঢেলে দিবে, এমন কিছু ভাবাটাও কিন্তু অস্বাভাবিক। তাদের সংলাপে মধ্যস্থতাকারী সাংবাদিক সিনহাও কিন্তু প্রশ্ন করেছিলেন যে, যদি বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময় হতে পারে তবে কেন সন্ত্রাসবাদ থামাতে পারবেন না? এভাবেই ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকে সংলাপ ।প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে, মহাকালীন শান্তির নিমিত্তে।ওদের আলোচনায়, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান , চীনের ,মোদ্দা  কথা সামগ্রিক ভূরাজনীতির বিষয়গুল যথাযথভাবে গুরুত্ব পেয়েছিল।তবে বইয়ের সমস্যা একটাই, এই উপাখ্যান অস্থির নদীর মতো বয়ে চলা কথোপকথন কিংবা ধারা বিবরণী। আর সকল উপাখ্যান ই যে মসৃণ হবে , এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কণ্টকাকীর্ণ কিছু বাস্তব উপাখ্যান ও থেকে যায়।

হ্যাপি রিডিং! পাঠক !

Facebook Comments