শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২২
Home > গল্প > কবিতার অপেক্ষা – মার্যিউর রহমান চৌধুরী

কবিতার অপেক্ষা – মার্যিউর রহমান চৌধুরী

Spread the love
রবীন্দ্রনাথ-নজরুল যুগ পেরিয়ে যখন বাংলার কবিতা আধুনিক সভ্যতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে তখন এমন অবস্থা হয়েছে, চারপাশে কবি টিকটিকির লেজের মত গজায়। এই অবস্থার কারণে অনেকে বলে, দেশে কাউয়ার চেয়ে কবি বেশি। সে কালে যেমন, বিশ্বকবি, বিদ্রোহীকবি, চারণকবি ছিল, তেমনই একালে দেখা যায় চটিকবি, হাটিকবি, বাটিকবি। পাড়ার প্রেমিক থেকে বুড়ো ভাম, এমনকি গলির ভিখারি থেকে টং দোকানের চা বিক্রেতা সবাই নিজেকে কবি বলে দাবী করে। অধিকাংশ কবিদেরই দু’একজন পোষা পাঠক থাকে, যারা কবির পয়সায় চা-পানি খেয়ে জাবরকাটে একই সাথে কবিতা তৃপ্তির সাথে পাঠ করে। তাদের বেশিভাগ কবিতাই হয়, “জাড়ুল গাছে আম ধরেছে/সাবিনা তুমি কই?” টাইপ কবিতা। আমাদের গল্পের কবিও তার ব্যাতিক্রম নয়। সে একজন স্বঘোষিত বিখ্যাত কবি এবং তার স্বঘোষিত বিখ্যাত কবিতা, “ট্যাকা দেন, জাপান যাব।” তার একমাত্র ভক্ত, পাঠক, বন্ধু জামশেদ যখন কবিতাটি পাঠ করে এবং বাহবাহ দেয়, তখন ডালিম এক পৈশাচিক তৃপ্তি অনুভব করে। আজকালকার কবিদের মত ডালিমেরও বিশাল এক ব্যমো আছে, সেও পাঞ্জাবী পরে রাস্তায় নেমে নিজেকে কবি বলে জাহির করে। তবে তার পাঞ্জাবীটা অন্যান্য কবিদের থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। অন্যান্য কবিরা যখন ঝোল-তরকারি মাখা পুরাতন পাঞ্জাবী পরে নিজেকে বিশ্ব প্রেমিক ম্যাটারিয়াল দাবী করে তখন আমাদের কবি ডালিমের পাঞ্জাবীতে আছে ঝোলের দাগের বদলে দু’টো সিগারেট পোড়া ফুঁটো। তাও আবার পিছনে। পশ্চাৎদেশ বরাবর। ডালিমের আর জামশেদের সাহিত্য বিষয়ক প্রাত্যাহিক আলোচনা সভা যখন ডালিমের ছাদের উপর বসে, তখন নিয়ম করে জামশেদ ডালিমসৃষ্ট সব সাহিত্যের জ্ঞান নেয়, কিন্তু আজ ব্যাপারটা অন্যরকম। জামশেদের পেটে সমস্যা হয়েছে। সকাল থেকে ৫ বারের বেশি যেতে হয়েছে ত্যাগ করতে। মানে, যেটা আমরা ঘুম থেমে উঠার পরে ত্যাগ করি। ডালিমের সামনে হঠাৎ করে মিস্টার টুইস্ট চিপসের মত গা মুচড়িয়ে জামশেদ বলে,“দোস্ত, আমি শ্যাষ। সকাল থেকে পাঁচবার দোযখে গিয়েছি।” “কবি বলেছেন, পৃথিবীর মাঝেই স্বর্গ-নরক। এই কথা আসলে তোরা বিশ্বাস করতে চাস না। এইবার প্রমাণ তো পেয়েই গেলি।” ডালিম কিছুটা দার্শনিক ভাব নেয়। “পেট ব্যাথায় মরে গেলাম রে বাবা।” “আমি তোর বাবা নই। কোনও কবিই কারও বাবা নয়। তারা শুধুই কবি।” “রাখরে তোর কবিতার ভাষায় কথা বলা। আমি আবারও চাপে মরে গেলাম। তাড়াতাড়ি আমাকে যেতে দে, নয়তো আজ আমার প্যান্টটা………।” “কবি বলছেন দুনিয়াটাই হল কবিতার বাগান। এই যে তোর কাছ থেকে নতুন একটা কবিতা লেখার প্লট পেয়ে গেলাম। তুই এই কাজের জন্য পৃথিবীর মানুষের কাছে মহান হয়ে থাকবি রে।” “অ্যাঁ?” “ এই কবিতা একদিন মানুষের মুখে মুখে ঘুরবে দেখিস।” “আমাকে ছাড় ভাই। আমি গেলাম।” “ব্যাটা আগে কবিতাটা শুনে যা—” “প্রকৃতির বাধ্য কি হতেই হবে? বিসর্জন নয়, অর্জনেও সুখ আছে প্রকৃতি চাইলেই সব জায়গায় ডাকতে পারে ছোট্ট এক কামড়ায় ডাকা কি প্রয়োজন?” কবিতাটি পাঠ করার পর জামশেদ ছোট্ট কামড়ায় ঠিকমত যেতে পেরেছিল কিনা, নাকি তার আগেই……। সেই ব্যাপারটা না বলাই ভাল। দেশের অবস্থা তেমন ভাল নেই। প্রায় প্রতিদিনই হরতাল থাকে, পেট্রোলবোমায় পুড়ে মরার ভয়ে ঘর থেকে বের হওয়া যায় না। কয়েকদিন আগে একজন নারী সাংসদ অন্য একজন নারী সাংসদকে, তাদের দাবী-দাওয়া পূরণ না করলে কাপড় খুলে রাস্তায় নামানোর হুমকি দিয়েছে। এ নিয়ে দেশের মানুষ মাতাল-উত্তাল। ডালিম আর জামশেদের মাথায় এই সব রাজনীতির কিছু ঢোকে না। তাদেরই কাপড় অন্যরা খুলে নিয়ে গেল। ঢাকা শহরের ভণ্ডদের তালিকা করলে প্রথমেই আসবে ভিখারিদের নাম। তারপর পাওয়া যাবে প্রেমিক আর রাজনীতিবিদদের নাম। যেমন ভাবে এই ভণ্ড ভিখারিদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিখারি, প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেমিক তেমনই ভাবে শহরের বিভিন্ন মহল্লার আরেক ভণ্ড শ্রেণি পাতিকবিদের প্রতিদ্বন্দ্বী পাতিকবি। পাড়ায় নতুন এক পাতিকবির উত্থান হয়। সে ডালিমকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে। একই সাথে সে নিজেকে সেরা কবি দাবী করে ডালিমকে নানা হুমকি ধামকি দেয়। পাড়ার নতুন সেই পাতিকবির নাম মিজান। কিছু ছেলেপেলে তাকে ব্যাঙ্গ করে নাম দিয়েছে চটি মিজান। আজ হুমকিস্বরূপ সে তার বিখ্যাত দাবী করা একটি কবিতা ডালিমের কাছে পাঠিয়েছে। ৮ তলা বাড়ির ছাদে যখন জামশেদ ডালিমকে কবিতাটি পাঠ করে শুনায় তখন ডালিমের গায়ের চামড়া পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিচ্ছিরিভাব জ্বালাতন করে। যে জ্বালাতন হয়ত গুলিস্তান মোড়ে বিক্রি করা পাগলামলম দিনে তিনবার রুটিন করে ৩৭০বছর মালিশ করলেও মিটবে না। “সামনে যাইয়ো না শেফালী পাগলা কুকুর কামড়াইবে তোমারে। আমার জন্যে দুই মিনিট দাঁড়াইয়ো, আমার হুন্ডায় তেল ভরতে সময় লাগে।” এটা কবিতা, নাকি নিজের মোটরসাইকেল আছে সেটার বিজ্ঞাপণ ডালিম কিছুতেই বুঝতে পারে না। যদিও এটা কোনও কবিতার জাতের মধ্যে পড়ে না। এই কবিতাটা শুনে ডালিমের দিনটাই মাটি হয়ে যায়।। আজ আর সাহিত্য বিষয়ক আলোচনায় মন বসে না। তারা দু’জন উঠে পড়ে। সিঁড়ি ভেঙে নেমে যাওয়ার সময় ডালিম ভাবে, সেও নতুন পাতি কবির চাইতে ভাল কিছু না। তারা দু’জনেই একই শ্রেণির। যতই নিজেকে কবি দাবী করুক, সে আসলে দুইটাকার ভাল কবিতা লিখতে পারে না। হঠাৎ যেন নিজের ভেতর এক বিরাট অনুশোচনাবোধ কাজ করতে শুরু করে। ডালিম আর জামশেদ যখন ছ’তলার ল্যান্ডিং এ পা ফেলল তখনই এক আজব ঘটনা ঘটল। ডালিম কি চোখে ভুল দেখছে? নাকি এটা অলৌকিক কিছু? একটা মেয়ে! হ্যাঁ! অতীব সুন্দরী একটা মেয়ে। পটলচেড়া চোখ, তার উপর আবার ফ্রেঞ্চ ফ্রেমের চশমা, পরনে একটা কড়া রঙের সেলোয়ার-কামিজ, তার সাথে একটা লম্বা ওড়না। ল্যান্ডিং-এর জানালা দিয়ে আসা বাতাসে মেয়েটার চুল আর ওড়না যেন ফুলের পাপড়ির মত উড়ছে। ওড়নাটাকে বড় একটা প্রজাপতির মত লাগে । ডালিম বুঝতে পারে না সে কোথায় আছে! সে কল্পনায় এক অন্ধকার ঘরে হাজির হয়। চারপাশে কিছু দেখতে পায় না। শুধু দেখে মেয়েটা একা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে অনুভব করে পুরো ঘরটাতে প্রাচীন এক ফুলের সৌরভ প্রজাপতির মত উড়ে বেড়াচ্ছে। সে জামশেদের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তার চোখ ফিরতে চায় না। তখন হঠাৎ করে ডালিমের মাথায় বেজে উঠল তার এ পর্যন্ত লেখা জীবনের সেরা কবিতাটা। “তোমার মুখোমুখি হলে বুঝতে পারি না- স্বর্গ নাকি নরকের মাঝামাঝি। ছ’তলার ল্যান্ডিং যেন নাগরদোলা। দু’টো হৃদয় তবে চক্রাকারে ঘুরছে বলতে চাইছে ভালোবাসি।” ডালিমের মনটা সেদিন থেকে নাগরদোলার মত হয়ে গেল। সে সব সময় মেয়েটার কথা ভাবে এবং ভাবতেই থাকে। দিন আসে, রাত যায়, মানুষ জাগে শহর ঘুমায় এগুলোর কোনও কিছুই ডালিম অনুভব করতে পারে না। ডালিম বুঝতে পারে না সে বেঁচে আছে কি নেই, জেগে আছে নাকি ঘুমিয়ে আছে। সে কল্পনায় হাজার শব্দের মাঝে হারায় কিন্তু কোনো কবিতাই কাগজে লিখতে পারে না। সেদিন মেয়েটাকে দেখার পর সেদিনই শেষ কবিতা খাতায় ছুঁয়েছিল। এটা কি প্রেম নাকি অন্য কিছু! তবু ডালিম বুঝতে পারে, সে তার সেরা কবিতাটি লিখে ফেলেছে। যার জন্য এই কবিতা লেখা, তার হাতে এই কবিতা পোঁছাতে না পারলে হয়ত তার আর কবিতা লেখা হবে না। তার কবি প্রতিভা সেরা সময়টায় এসে নিভে যাবে! তার মাঝখানে ডালিম মেয়েটার নামটা জেনে নিল। নামটা খুবই সুন্দর। “পূর্বিতা!” ওরা ৭ তলার নতুন ভাড়াটিয়া। কাছেই একটা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছে। ডালিমের এক ব্যাচ জুনিয়র। খুবই শান্ত-শিষ্ট, ভিতু একটা মেয়ে। ডালিমের সাথে কয়েকবার দেখা হয়েছে। তার সঙ্গে দেখা হলেই মেয়েটার চোখে এক প্রকার আতঙ্ক ছেয়ে যায়, যেন ভূত দেখেছে! এরমাঝে এভাবেই চলে যায় অনেকটা সময়। ডালিম উঁকি দিতে পূর্বিতার কলেজে যাওয়া দেখে। কখনও পূর্বিতা দেখে ফেলবে বলে জানালার পর্দার পেছনে লুকায়। জামশেদটাও আজকাল কেমন যেন হয়ে গেছে। যদিও ডালিম তার কবিতার কথা জামশেদকে জানায় নি। সেটা পাঠ করার জন্য তার একমাত্র পাঠক তার কাছে আসে নি। তার মাঝখানে জামশদকে ডালিমের বাসার সামনে কয়েকবার দেখা গেছে। জামশেদকে হেসে হেসে পূর্বিতার সাথে কথা বলতে দেখে সে। ডালিম ভাবে, তাহলে কি জামশেদ পূর্বিতাকে বলে দিয়েছে, আমার কথা? সে কি বলেছে? আমি পূর্বিতাকে পছন্দ করি? কিন্তু জামশেদ এ কথা জানবে কী করে? ও তো এই কথা কাউকেই বলে নি। তার অনেকদিন পর ডালিমের একমাত্র পাঠক জামশেদ তার বাসায় এসে হাজির। “আমার…দোস্ত…! আমার…হয়ে গেছে!” জামশেদ এমনভাবে কথাটা বলল যেন বাংলা সিনেমার মত লজ্জাবতী নারী তার স্বামীকে পেটে বাচ্চা আসার কথা বলছে। “দোস্ত আমার না হয়ে গেছে…” “কী হয়ে গেছে? আবার কি পেটের অসুখ হল নাকি?” “তোকে কী করে বলি!! আমি……ইয়ে….না মানে।” “আমি এতদিন জানতাম তোর পেটে অসুখ আছে। আজ মনে হয় কষা আছে!” “দোস্ত, আমি পূর্বিতাকে পটিয়ে ফেলেছি।” ডালিম জামশেদের কথার মানে বুঝিতে পারে না। জামশেদ এই মাত্র কী কী বলল সে ডালিম জানতে চায়। জামশেদ আগের উত্তর দেয়। ডালিম খেই হারায়। সে বুঝতে পারে না এই কথার অর্থ কী। সে এও বুঝতে পারে না জামশেদের মুখে কথাটা শোনার পর তার দুঃখে পাথর হয়ে যাওয়া উচিৎ কিনা। সে চুপ হয়ে বসে থাকে। সেদিন রাতে জামশেদের সাথে পূর্বিতার ফোনে খুদে বার্তা আদান-প্রদান হয়, “বাবু, কেমন আছ?” “এই তো! তুমি? বাবু জানো, আমি না তোমাকে অনেক ভালোবাসি।” “হুম জানি। আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি।” “তোমার জন্য না আমি একটা কবিতা লিখেছি। পড়বে?” “বাহ্! তুমি কবিতা-টবিতা লেখ নাকি?” “তুমিই তো আমাকে বানালে কবি।” “ওরে আমার কবি রে…! কাল দেখা করতে পারব না। পরশু দিও।” এদিকে পূর্বিতা জামশেদকে খুব গভীরভাবেই ভালোবেসে ফেলে। সে এখন জামশেদকে ছাড়া আর কিছু বোঝে না। জামশেদকে ঘিরে সে তৈরি করে নিয়েছে আলাদা একটা কল্পনার জগৎ – যেখানে শুধু সে আর জামশেদ। অন্যদিকে ডালিম নিজের মাঝে নাই। যে মেয়ের প্রেমে পড়ে তার মাথার অর্ধেকটা খারাপ হয়ে গেছে। সে এখন তার বন্ধু জামশেদের প্রেমিকা। সে পূর্বিতাকে মাথা থেকে বাদ দিতে পারে না। কোনও ছেলেই কোনও মেয়ের প্রেমে পড়লে তাকে সহজে মাথা থেকে বাদ দিতে পারে না। দিন যায় রাত আসে ডালিম বাস্তবে, কল্পনায়, স্বপ্নে,হাঁটতে, বসতে চোখের সামনে শুধুই পূর্বিতাকে দেখে। হঠাৎ ডালিমের কাছে জামশেদ এসে হাজির হয়। “দোস্ত, আমাকে একটা হেল্প কর না!” “কী?” “আমি পূর্বিতাকে ভুল করে বলে ফেলেছি আমি ওর জন্য একটা কবিতা লিখেছি।” “ভালই তো। লিখেছিস যখন দিয়ে দে!” “আরে ব্যাটা! আমি কবিতা লিখতে পারি নাকি? কবি তো তুই। তুই আমাকে একটা রোম্যান্টিক কবিতা লিখে দে না!” ডালিমের মাথা কাজ করছে না। তার মনে পড়ে যায়, পূর্বিতার প্রেমে পড়ে সে একটা কবিতা লিখেছিল। সেদিনের পর থেকে তার হাতে আর কবিতা লেখার জন্য কলম ওঠে না। সে ভাবে, পূর্বিতার জন্যে লেখা কবিতাটা ওকে দেয়া না হলে ডালিম আর কবিতা লিখতে পারবে না। পূর্বিতাকে সেই কবিতাটি হয়ত কখনও দেয়া হবে না। কারণ, সে এখন জামশেদের প্রেমিকা। কিন্তু, ডালিমকে কবি হতেই হবে। সে এখন কবিতা লিখতে পারে না। তবে এবার একটা সমাধান মাথায় আসল। পূর্বিতাকে নিয়ে লেখা কবিতাটা সে জামশেদের হাতে দিয়ে দেবে। পূর্বিতা জানবে কবিতাটা জামশেদ লিখেছে। সে এই এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়,যাকে নিয়ে লেখা কবিতা তার কাছে সে কবিতা পৌঁছান অনেক বড় কিছু। তখন ডালিম জামশেদকে এক টুকরা কাগজে কবিতাটা লিখে দিল। “তুমি মুখোমুখি হলে বুঝতে পারি না স্বর্গ কি নরকের মাঝামাঝি ছ’তলার ল্যান্ডিংটা যেন নাগরদোলা দু’টো হৃদয় তবে চক্রাকারে ঘুরছে বলতে চাইছে ভালবাসি।” সেদিন সন্ধ্যাবেলা জামশেদ কবিতা লেখা কাগজটা শার্টের বুক পকেটে নিয়ে পাড়ার রাস্তা দিয়ে বাসায় দিকে হাঁটা শুরু করে। হঠাৎ, একটা কাল মাইক্রোবাস এসে তার পায়ের কাছে থামে। চারটা হাত বের হয়ে জামশেদকে টেনে-হিঁচড়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চলে যায়। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই জামশেদকে তুলে নেয়ার খবর সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ডালিম ছুটে যায় জামশেদের বাসায়। জামশেদের মা’র কান্না ডালিমের সহ্য হয় না। তার বুককের বামপাশটা ব্যথা করে উঠে। সে সেখান থেকে ফিরে আসে। সে বুঝতে পারছে না কী করবে ! ওর বুক ফেটে কান্না আসে। জামশেদ হারিয়ে গেছে সাথে ডালিমের একটা সম্পদ হারিয়ে গেছে। দিন যায়, মাস যায় জামশেদ ফিরে আসে না। জামশেদ ফিরে না আসলে কবি তার একমাত্র পাঠককে হারিয়ে ফেলবে, তার বন্ধুকে হারিয়ে ফেলবে। জামশেদ ফিরে না আসলে কবির কবিতাটা পূর্বিতার হাতে পৌঁছাবে না। এই কারণে হয়ত কবির আর কবিতা লেখা হবে না। জামশেদের ঘটনাটা তখনও পূর্বিতার কানে পৌঁছায় নি। পরদিন সে জামশেদের সাথে দেখা করার জন্য নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে অপেক্ষা করে। জামশেদ আসে না, তার জন্যে লেখাটা কবিতাটার অপেক্ষায় সে দাঁড়িয়ে থাকে। পূর্বিতা তখনও জামশেদের গুম হবার ব্যাপারে জানতে পারে না। সেদিন বিকেলে সে জানতে পারে সম্পূর্ণ ঘটনা। এরপর থেকে এখন প্রায় সময়ই একটা নির্দিষ্ট সময় সে ওই গলির মাথায় অপেক্ষা করে কাটায়। জামশেদ আসবে, তাকে নিয়ে লেখা কবিতাটা হাতে তুলে দেবে। কবিতাটা সে পড়বে। নাগরদোলা চরকির মত ঘোরে। তার সাথে ঘুরতে থাকে নাগরদোলার মানুষ বহন করার খাঁচাগুলো। তাদের দূরত্ব থাকে সমান। ঘুর্ণনরত নাগরদোলার আলাদা দুইটি খাঁচায় বসে দুইজন আলাদা মানুষ হাজার চেষ্টা করলেও কেউ কারও কাছে যেতে পারে না। এটাই হয়ত নিয়ম। ডালিম অপেক্ষায় থাকে তার লেখা কবিতা জামশেদ কখন পূর্বিতার হাতে দেবে। পূর্বিতা অপেক্ষায় থাকে জামশেদ ওর জন্য লেখা কবিতা ওকে পড়তে দেয়ার জন্য ফিরে আসবে। এখানে শুধু অপেক্ষাই থাকে। দু’পাশে দু’টি মানুষের অপেক্ষা শুধুই একটি কবিতাকে ঘিরে। কবিতার অপেক্ষা।
Facebook Comments