বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > লেখক পরিচিতি > একজন হুমায়ূন আহমেদ এবং কিছু কথা

একজন হুমায়ূন আহমেদ এবং কিছু কথা

Spread the love

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

হুমায়ূন আহমেদ মানুষটাকে সামনাসামনি কখনো দেখা হয়নি আমার। তার সাথে আমার পরিচয় বইয়ের পাতায়। উনি মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন সেটা কয়েকজনের কাছে শুনেছি শুধু ( তারা এই লেখকের খুব কাছের মানুষ ছিলেন)। কোন মানুষ মারা গেলে নাকি তার সম্পর্কে খারাপ বলতে নেই। তবু অনেককে শুনেছি মৃত মানুষ সম্পর্কে বাজে কথা বলতে। হুমায়ূন আহমেদ মানুষ হিসেবে ভাগ্যবান ছিলেন। তার কাছের মানুষ যারা ছিলেন, তাদের কেউ আমাকে একটুখানি নেতিবাচক কথা বলেছেন তাকে নিয়ে এমন হয়নি। কারণটা নিশ্চয় খালি ওই যে ‘মৃত মানুষের নামে খারাপ বলতে নেই’ এই সূত্র না। মানুষটা ভালো ছিলেন। হয়তো আমাদের মতোই ছিলেন। তার লেখনী তাকে অনেক উচ্চ স্থানে নিয়ে গিয়েছে আমাদের মনে। তাই তার যেকোন ব্যাপারে আমরা একটু বেশিই নাক গলাই, নেতিবাচক কথা বলি মন খারাপ করে, অভিমান করে। এই যে একটা মানুষ, তাকে হিংসে করা যায়। আমি স্কুলে পড়তাম তখন। হুমায়ূন আহমেদ মানুষ হিসেবে কেমন সেটা জানতাম না। তবু তার কোন একটা কাজে অভিমান করেছি ( সেটা যুক্তিযুক্ত হোক বা না হোক)। এই অভিমানটুকুর দাম অনেক।
আমার সামনে একজন মানুষ বসেছিলেন। তাকে হুমায়ূন আহমেদ মোবাইলে ক্ষুদেবার্তা পাঠাতেন। তিনি আমাকে দেখাচ্ছিলেন- “দেখো মিস রেইন, আমি কিচ্ছু ডিলিট করিনি। এই যে উনি আমাকে ওনার বাসায় ডেকেছেন”। ভালোমানুষ কথা বলছিলেন। কথার এই পর্যন্ত এসে মোবাইলটা চোখের সামনে নিয়ে চুপ হয়ে গেলেন তিনি। তারপর হঠাৎ কী হল, তার চোখ ছলছল করতে লাগ্লো আর একটা টান মেরে মোবাইলটা বিছানার অন্যপাশে ছুড়ে ফেললেন তিনি। কেন চলে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ? সামনের মানুষটার চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমান। আমি ভাবছিলাম তার এতো সাধের ক্ষুদেবার্তাগুলো মোবাইল ভেঙ্গে গেলে তো নেই হয়ে যাবে। বলতে চাচ্ছিলাম- “দাদা, আসতে ফেলেন মোবাইলটা”। কিন্তু, সেই যে অভিমান! অন্যরকম একটা সুন্দর ব্যাপার। সামনের মানুষটার চেহারার উপর থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। কতটা ভালোবাসা পেলে কেউ একজন এতটা অভিমান জয় করে নিতে পারে?
আমার বাবা বই পড়েন হাস্যকরভাবে। প্রথম পৃষ্ঠা পড়েন, আবার গিয়ে শেষ পৃষ্ঠা পড়েন। হুমায়ূন আহমেদের বই হাতে নিয়ে বলে- “এইটা আবার কোন বই হলো? এইটা তো আমিও লিখতে পারি”। কিন্তু আর কোন বই না পড়তে পারলেও, হুমায়ূন আহমেদের বই একটা পৃষ্ঠাও বাদ না দিয়ে শেষ করেন আব্বু। তাকে ধরে রাখে কিছু একটা, তার ভালো লাগে। বই পড়া শেষ করে তিনি বলেন- “নাহ! কিছু তো আছে। নাহলে এতো মানুষ কেন পড়বে?” হুমায়ূন আহমেদকে যারা ভালোবাসেন, যারা নিন্দে করেন- সবাই, সবাইকে বলছি। এতো ভালোবাসা, এতো অভিমান, এতো মায়া হুমায়ূন আহমেদ দূর থেকে তৈরি করেছিলেন আমাদের মধ্যে। তাকে সামনাসামনি না দেখেও তাকে নিয়ে এতো কথা বলছেন। নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কখনো এতো কথা বলেছেন? এটা শুধু অর্জন করে নেওয়া যায় না, এটা জয় করতে হয়!

Facebook Comments