Saturday, October 16, 2021
Home > গল্প > হাসান সাহেবের দুশ্চিন্তা | সালমান ফারসী

হাসান সাহেবের দুশ্চিন্তা | সালমান ফারসী

সালমান ফারসী : প্রকৃতি রহস্যে ঘেরা। ইতিহাসের বইয়ের থেকে নিজের চোখ বেশী রহস্যের সন্ধান দিতে পারে। দিন দিন এই সমাজে বসবাসকারী সবার বুদ্ধি বিলুপ্ত হচ্ছে। বুদ্ধিহীনতায় ভুগছে সবাই। ডাইনোসরের মতো বুদ্ধিও হয়তো পরবর্তী যুগে ডিএনএ পরীক্ষণের মাধ্যমে বের করতে হবে। সাধারণ জীবন ভঙ্গির কোকড়নো আত্না নেই এজগতে। সবারই অতি আধুনিক জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখছে।

বিষাদময় নগরী। হাসান সাহেব এই লোনা নগরীর বাসিন্দা। রোজ বিভিন্ন ঝামেলা এড়াতে হয় তাকে। আজও বাসায় ফিরছেন প্রতিদিনের মতো। পিপড়ার মতো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যান তিনি। মানব রচিত কর্মকান্ড উপভোগ করেন। হঠাৎ পা পিছলে গিয়েছে হাসান সাহেবের। পড়তে গিয়েও পড়েননি। কলার চামড়াটা সরিয়ে রাখা যাক। চার পা এগুলেই ডাস্টবিন। একটুকু কষ্ট করার শক্তি মানুষের নেই। হাসান সাহেবের হাত থেকে কলার চামড়া ডাস্টবিনে পড়া মাত্রই আশ্চর্য মূলক আবহ বার্তা ভেসে আসলো। ‘লোকটা পাগল নাকি? এসব কাজ করার জন্যতো সিটি কর্পোরেশন আছেই। যত্তসব।’

বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয় হাসান সাহেবের। কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ চিৎকার করতে থাকে। প্রতিরাতে এভাবেই হাসান সাহেবকে তারা বরণ করে। হাসান সাহেবের খুবই ভক্ত কুকুরগুলো। কুকুরের গুনাবলী মানুষের ভেতর পাওয়া খুবই মুশকিল। স্ত্রী সন্তান নিয়ে সংসার হাসান সাহেবের। তিনি অবাক হন। পূর্ববর্তী প্রজন্ম নিয়ে মাথা ঘামান। এমনতো কখনো ছিলোনা। বাবা মাইনে পেত চৌত্রিশ টাকা। এতেই মাস পেরিয়ে পরবর্তী মাসের সপ্তাহ খানেক চলে যেত। গমের রুটি খেতে পারলেই উচ্চবিত্তদের স্থানে গণনা করা হতো সে সময়ের মানুষদের। সামান্য অন্নের খোজ পেলেই নিম্নবিত্তরা স্রষ্টার প্রভি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতো। মধ্যবিত্তরা উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্তদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতো তখন। হাসান সাহেবের মনে আছে। দিনে তিনবেলা গমের রুটি, হারিকেনে তেল আর প্রতি ঈদে পরার মতো পোশাকেই তার মন সন্তুষ্ট হয়ে যেত। স্কুলের টিফিন থেকে জমানো টাকা দিয়ে একগাদা বই কিনেছিলো তিনি। সবই বাল্যকালে রয়ে গেছে। বইতেই প্রশান্তি খুজে বেড়াতেন। এই সমাজ নিয়ে হাসান সাহেবের শত চিন্তা বই এনে দিয়েছে। এর প্রতিকারও অবশ্য দিয়েছে। কিন্তু মানুষ তা মানছেনা। বইয়ের রীতি-নীতি মানা যায়না। নিজেদের রচিত নীতির উপর চলতে হবে।

এই সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে খুবই চিন্তিত হাসান সাহেব। এসমাজের মানুষ দিনে দিনে অর্থের নিগড়ে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। এর ভেতর বই থেকে জ্ঞান নেয়ার বিষয়টা কারো মাথায় নেই। জ্ঞানার্জন না করে জীবনকে উন্নীত করার মানুষ সমাজে কম নেই। খবরের কাগজের প্রতিদিনের পরিচিত শিরোনাম পড়ে হাসান সাহেব ঘুমিয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে একি বাক্যগুচ্ছ বারংবার দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। শিশু ধর্ষন, নারী নির্যাতন, পরকীয়া ইত্যাদি খবরের কাগজের বেশী অংশ দখলে নিয়ে নেয়। হাসান সাহেবের মতো অন্যরাও ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।

সাত সকাল। চিল্লা-চিল্লি শোনা যাচ্ছে পাশের বাসা থেকে। কান্নার আওয়াজও আসছে। মহিলার কন্ঠ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। বাচ্চা একটা মেয়ে এসে কোনো পুরুষকে জোর করে ধরে বলছে,
‘বাবা প্লীজ! মাকে আর মেরোনা। মা ব্যাথা পাবেতো।’

বাচ্চাটার কথার কোনো দাম রইলোনা। এতো পুরুষ নয় শুধু! পুরুষের পূর্বে ‘কা’ যুক্ত হয়ে ‘কাপুরুষ’ হয়েছে। তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে পাশের বাসায়। কৌতুহলি দৃষ্টিতে হাসান সাহেব বিষয়টা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ফলাফল পেয়ে প্রতিদিনের মতো ‘আফসোস!’ শব্দটা বের করা ছাড়া উপায় ছিলোনা। এতো মানুষেরই আত্না। সাত সকালে স্ত্রীর উপর অত্যাচার না করলে এসব মানুষের চলেইনা। সারাদিন এদের মনে রাগ লেগে থাকে। কে জানে রাতের বেলায় নেশা করে নিষিদ্ধ পল্লীতে পড়ে থাকে কী না?

আজকে খবরের কাগজ ছুঁয়ে দেখা শেষ। পুরোনো সব শিরোনাম। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলেন হাসান সাহেব। চায়ের কাপ থেকে জলীয় বাষ্প নির্গমনের বিষয়টা দেখা যাচ্ছেনা। রাস্তার ধারে অটো দাঁড় করিয়ে কোনো ভদ্র মহিলা ব্যাগপত্র তুলছিলেন। পেছন বাঁশির শীষ বাজাতে বাজাতে কিছু বেকার ছোকরার দল হেঁটে যাচ্ছে। জঘণ্য অর্থবোধক কতক বাক্য ভেসে আসছে ওদিক থেকে।
‘কি মালরে মাইরি। এনিয়ে পাঁচজনের হয়ে যাবেনা?’

‘না না! পাঁচজনের হয়ে আরো থেকে যাবে।’ আরো কত বাক্য বের হলো। আঁড় চোখে মহিলার দিকে ভালো করে নজর দিয়ে চলে গেছে ছোকড়ার দল। মহিলার কিছু বলার সাহস ছিলোনা। কিন্তু এক্ষেত্রে মহিলা কোনো দিক থেকে কম? এসব নারীরা নিজেদের কারণে আরো বেশী উত্তক্ত হচ্ছে। মেপে মেপে পোষাক পরলেতো আর চলেনা। আজীবন শুনে এসেছি কম টাকায় কম জিনিষ পাওয়া যায়। আর বেশী টাকায় বেশী জিনিষ। এখন দেখছি তার উল্টো। বেশী টাকায় কম জিনিষ পাওয়া যায়। তবে কিছু ছোকরা কালো বোরকার ভেতর থেকেও মানহানি তুলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

দেশটা উন্নত হচ্ছে। দেশের মানুষ সুবিধা পাচ্ছে ধীরে ধীরে। মানুষ এখন নিজেদেরকে ভাগ করে ফেলেছে। অর্থ দিয়ে ব্যক্তিত্ব বিচার হচ্ছে। এনিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কামরুল ছেলেটাকে দেখলাম কত কিছু করেছে। মেধা দিয়ে ছেলেটা দেশের উন্নয়নের একাংশ গড়তে পেরেছে। চলা-ফেরায় আধুণিকতা নেই বলে পাড়ার ছেলেরা তার নাম দিয়েছে ‘বোকা ম্যান’। মানুষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে গিয়েও মাতৃভাষা ভুলে যাচ্ছে মানুষ। আধুণিক ‘বাংলিশ’র প্রবর্তক এসময়ে বাঙালিরা।

বাসা থেকে বেরিয়ে টং দোকানে প্রবেশ করেছেন হাসান সাহেব। দোকানীর নিকট চা চাইলেন তিনি।
অন্য দিনের মতো আজও একই ব্যাপার নিয়ে আলোচনা চলছে খদ্দেরদের ভেতর। রাস্তা পারাপারের সময় দুই পথচারীর মৃত্যু। দুজনই স্পট ডেড। এগুলা এখনো হাসান সাহেবকে ভাবায়। কত দূর্ভাগ্য জনক কাহিনি। নিজের বিপদ নিজের মাধ্যমে চলে আসে। মাথার ওপর ফুট ওভারব্রীজ। কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই এব্যাপার নিয়ে। পরিদর্শনের জন্যই সম্ভবত এসব ব্রীজ বানানো হয়। দেশ পরিচালনাকারীগণ কত মহিয়ান। খুব সহজে আধুনিক বিজ্ঞানেরর এরকম আকষ্মিক আবিষ্কার সাধারণ মানুষকে পরিদর্শন করাতে সক্ষম হয়েছেন। কেউ কষ্ট করে ব্রীজ ব্যবহার করতে যাননা। যদি না বিজ্ঞানের অসম্মান হয়? শরীরের প্রতি বেশ যত্নবান সবাই। এভাবে মরে যাওয়া মানুষদের জন্য হাসান সাহেবে আফসোস হয়। মৃত্যুর পূর্বেও লোকগুলো বুদ্ধিহীনতায় ভুগছিলো।

অফিস যাচ্ছে হাসান সাহেব। প্রতিদিন ফার্মগেট থেকে মিরপুর-১০ নাম্বারে এসে অফিস করেন। জ্যামের কারণে হেঁটে যেতেই হয় কিছু পথ। ট্রাফিক আইন না মানার কারণে এসব জ্যাম মানুষকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে। ড্রাইভারে ড্রাইভারে পাল্লা চলে। যাত্রী মরে যাক। এনিয়ে আমাদের কিসের এত চিন্তা?
ফুটপাথ পার করতেও কম সময় লাগেনা হাসান সাহেবের। ফুটপাথের বড় একটা অংশ দখল করে নিয়েছে মোটর সাইকেল। গাড়ি পার্কিং করার জন্য সম্ভবত এজায়গাটা আদর্শ জায়গা। এটা হাসান সাহেবের জানা ছিলোনা। এই দূর্গম পথ পাড়ি দেয়া পাহাড় জয় করার সমান। এর ভেতর আবার নাক সিটকাতে হয়। কি দুরগন্ধ! মানুষ কিভাবে পারে এত নোংরা কাজগুলো করতে? প্রশ্রাব করারও আদর্শ স্থান ফুটপাথের পাশের ড্রেন? চারিদিক থেকে ছন্দ ভেসে আসে। ছন্দের অভাব নেই। নতুন-পুরাতন অনেক বাক্য তৈরী হচ্ছে।

‘একদাম একশো। দেইখ্খা লন একশো। বাইচ্ছা লন একশো। এই ভাই দেইখা যাননা। পছন্দ হলে নিয়েন। আরে দেখতে সমস্যা নেইতো।’

ফুটপাথ মার্কেটেও এমন পদ্ধতি আছে? পেছনে ফিরলেইতো মানুষের ঢল। এর ভেতর অতি আধুনিক এই সহজতম পদ্ধতির প্রভাব প্রসার করার চিন্তা ভাবনা সমাজের মানুষের।

পরিশিষ্টঃ- হাসান সাহেব এখন মৃত্যু শয্যায়। ওপারে যেতে তার বেশী সময় নেই। হাসান সাহেবের মুখে সর্বদা একটা শব্দ উচ্চারণ হচ্ছে। আফশোস! আফসোস! আফসোস! কালিমা পড়ার পূর্ব পর্যন্ত এশব্দটাই বলে গেছেন তিনি। বুদ্ধি বিলুপ্তির প্রতিকার নিয়ে কোনো সংজ্ঞা তিনি আবিষ্কার করে যেতে পারেননি। অন্য কেউ পারবে বলে মনে হয়না।

Facebook Comments