Saturday, January 22, 2022
Home > লেখক পরিচিতি > বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৬ষ্ট মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৬ষ্ট মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Spread the love
বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৬ষ্ট মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১২ সালের এইদিনের কথা অনেকেরই মনে থাকবে। বিভিন্ন ঘটনা ছাপিয়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুশ তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বহু মানুশ উদ্বিগ্ন একজন ক্যান্সার আক্রান্ত লেখকের জন্য। প্রভুর কাছে সবারই আকুতি ছিলো, তিনি যেনো সেরে ওঠেন, লিখতে পারেন আমদের জন্য সেসব শব্দ, যা আমাদেস ভাসায় আনন্দে, দুঃখে, উদাসীনতায়। তার জন্য প্রার্থনা করেছিল লাখো কোটি মানুশ। কিন্তু সব প্রার্থনা তো কবুল হয় না। বিশ্বের ইতিহাসে খুব কম লেখক মানুশের এমন ভালোবাসা পেয়েছিলেন।
 
মলাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১২ সালের এইদিনে (১৯ জুলাই-এ) স্থানীয় সময় ১১:২০ মিনিটে নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হসপিটালে এই নন্দিত লেখক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ‘নুহাশ পল্লীতে’ দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে সারা বাংলাদেশে সকল শ্রেণীর মানুশের মধ্যে অভূতপূর্ব আহাজারির সৃষ্টি হয়। তাঁর মৃত্যুর ফলে বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
 
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোণা মহুকুমার কেন্দুয়ার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ হুমায়ূন আহমেদ। তার পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। তার অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের একজন বিজ্ঞান শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক। হুমায়ূন আহমেদের সর্বকনিষ্ঠ ভাই আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট। তাঁর তিন বোন হলেন সুফিয়া হায়দার, মমতাজ শহিদ, ও রোকসানা আহমেদ।
 
তাঁর রচিত আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় যে ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান; ডাকনাম কাজল। তাঁর পিতা (ফয়জুর রহমান) নিজের নামের সাথে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীতে আবার তিনি নিজেই ছেলের নাম পরিবর্তন করে ‌হুমায়ূন আহমেদরাখেন। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, তাঁর পিতা ছেলে-মেয়েদের নাম পরিবর্তন করতে পসন্দ করতেন। তাঁর ছোট ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবালের নাম আগে ছিল বাবুল এবং ছোটবোন সুফিয়ার নাম ছিল শেফালি। ১৯৬২-৬৪ সালে চট্টগ্রামে থাকাকালে হুমায়ুন আহমেদের নাম ছিল বাচ্চু।(উইকি) এরপর বিভিন্ন প্রেক্ষিতে নাম পাল্টায়৷
 
হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়েছে, আর বৃষ্টি কিংবা জোছনার জন্য মন কেমন করে নি কিংবা একবারও হিমুর মতো পাগলামি অথবা মিসির আলীর মতো রহস্যভেদ করতে ইচ্ছা করেনি, এমন পাঠক বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। হুমায়ূন আহমেদ শুধু মানুশের মনই জয় করেননি, গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে জীবনকে উপভোগ করার মন্ত্র শিখিয়ে গেছেন। তাই তো বর্ষায় আমাদের কদমফুলের কথা মনে পড়ে। তাঁর লেখা প্রথম বই পড়েছিলাম আমার ৯/১০ বছর বয়সে৷ বইটা ছিলো কৃষ্ণপক্ষ৷ বইটার এন্ডিংয়ে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে গেছিলাম৷ এটাই ছিলো আমার ফার্স্ট কোনো বই পড়ে এমনকিছু হওয়া৷ কৃষ্ণপক্ষটা কিছুদিন আগেও রিপিট করেছিলাম৷ আমার এই একটা অভ্যাস আছে৷ একেকটা বই দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বারও পড়া হয়৷ কিছু কিছু বই তো আছে প্রয়োজনের খাতিরে বারবার রিপিট করতে হয়, আইমিন গ্রামার বইগুলো৷ কিন্তু এসব মৌলিক উপন্যাস তো একবার সর্বোচ্চ দুবার পড়লেই পুরো গল্প মাথায় চলে আসে, তবুও পড়ি৷ একটা গল্প দ্বিতীয়বার পড়তে ভালো লাগে না, কজ টুইস্টগুলো মাথায় থাকে৷ হুমায়ূন আহমেদের কয়েকটা বইয়ের ক্ষেত্রে আমার এমনটা হয় নি৷ এটা লেখকের একটা ক্রেডিট৷ প্রতিটা লেখকের এমন কিছু একটা করা আবশ্যক৷ অনেকে পেরেছেন৷
 
 
স্যারের কিছু উক্তি ও তাঁর কয়েকটা মজার বাক্যালাপ:
 
কল্পনা শক্তি আছে বলেই
সে মিথ্যা বলতে পারে ।
যে মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না,
সে সৃষ্টিশীল মানুষ না, রোবট টাইপ মানুষ ।
-হুমায়ূন আহমেদ
 
মানব জাতির স্বভাব হচ্ছে
সে সত্যের চেয়ে মিথ্যার
আশ্রয় নিরাপদ মনে করা..
-হুমায়ূন আহমেদ ( দেয়াল )
 
“মেয়েদের আমি কখনও খুশি হলে
সেই খুশি প্রকাশ করতে দেখি নি।
একবার একটা মেয়ের
সাথে সঙ্গে কথা হয়েছিল।
সে ইন্টারমিডিয়েটে ছেলে-মেয়ে
সবার মধ্যে ফার্স্ট হয়েছে।
আমি বললাম, কি খুশি তো?
সে ঠোঁট উল্টে বলল,
“উঁহু বাংলা সেকেন্ড পেপারে
যা পুওর নাম্বার পেয়েছি।
জানেন, মার্কশিট দেখে কেঁদেছি।”
—-হুমায়ূন আহমেদ
 
“ক্রিকেট নিয়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশের খেলার সময় হুমায়ূন আহমেদের প্রবল উৎসাহ দেখে এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ ক্রিকেট বিষয়ে বিজ্ঞ নন দেখে সাংবাদিক হতাশ হয়ে বললেন, ‘আপনি যে ক্রিকেট বোঝেন না, এটা কি লিখতে পারি?’
 
 
 
-অবশ্যই লিখতে পারো।
-কিছু না বুঝেও ক্রিকেট কেন পছন্দ করেন-একটু ব্যাখ্যা করবেন?
-কারণ আমি গল্পকার।
-স্যার, একটু বুঝিয়ে বলুন।
-ক্রিকেটে এক ওভারে ছয়টি বল করা হয়। বল করা মাত্র গল্প শুরু হয়। নানান সম্ভাবনার গল্প। ব্যাটসম্যানকে আউট করার সম্ভাবনা, ছক্কা মারার সম্ভাবনা ইত্যাদি। ছয়টা বল হলো সম্ভাবনা-গল্পের সংকলন। এবার বুঝেছো?”
 
“হুমায়ূন আহমেদ পিএইচডি করে আমেরিকা থেকে ফিরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের চাকরিতে ঢুকেছেন। হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব। তিনি খুবই সিরিয়াস টাইপের মানুষ। ইংরেজি সাহিত্যের এক সেমিনারে নিয়ে গেছেন হুমায়ূন আহমেদকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তিতুল্য ইংরেজির অধ্যাপক বক্তৃতা দিচ্ছেন। হুমায়ূন আহমেদ ভদ্রলোককে চেনেন এবং তাঁর সম্পর্কে জানেন সবই। তবু তাঁর বক্তৃতা শুনে একটু মজা করতে চাইলেন। ভদ্রলোক বক্তৃতা শেষ করে স্টেজ থেকে নেমে আসার পর হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হাসিমুখে বললেন, ‘স্যার, আপনার চিবিয়ে চিবিয়ে বলা ইংরেজি আমার ভালো লেগেছে।’ সেই ভদ্রলোক ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে এতই পশ, জীবনে এ ধরণের কথা বোধহয় শোনেনই নি। হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আপনি একটা কাজ করুন, আমার বক্তৃতার দু-একটি বাক্য না চিবিয়ে উচ্চারণ করুন তো।’ হুমায়ুন আজাদ গিয়েছিলেন ওয়াশরুমে। সেখান থেকে এসে পরিস্থিতি সামাল দিলেন। ইংরেজির অধ্যাপককে বললেন, ‘স্যার, ও তো আমাদের হুমায়ূন আহমেদ।’ ভদ্রলোক হুমায়ূন আহমেদকে চিনতে পারেননি। নাম শুনে রাগ-বিরক্তি ভুলে গেলেন। হাসিমুখে বললেন, ‘আরে, আমি তো আপনার লেখার ভক্ত।’”
 
“হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকের দাম ছিল সাড়ে তিন টাকা। তখন বিশ-ত্রিশ হাজার টাকা হলে বাংলাবাজার এলাকার কোনো গলির ভেতর একটা রুম ভাড়া নিয়ে ‘কম্পোজ সেকশন’ করা যেত। সিসা দিয়ে তৈরি টাইপ সাজানো থাকে এক ধরনের কাঠের ছোট ছোট খোপওয়ালা পাত্রে। সামনে টুল নিয়ে বসে একটা একটা করে টাইপ তুলে পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী লাইনগুলো তৈরি করে কম্পোজিটর, পৃষ্ঠা তৈরি করে। একেক খোপে একেক অক্ষরের টাইপ। ১৬ পৃষ্ঠা তৈরি হলে এক ফর্মা। ভারী একটা তক্তার ওপর ওই টাইপের দুটো করে পৃষ্ঠা। মোট আটটি ওরকম কাঠের তক্তা চলে যায় মেশিনে। অর্থাৎ একটা ফর্মা।
 
এভাবে ছাপা হয় বই। যারা বই ছাপার কাজ করে, ওরকম প্রেসগুলোরও অনেকেরই থাকে ‘কম্পোজ সেকশন’। ওসব ক্ষেত্রে ইনভেস্টমেন্টটা বেশি। আর মেশিন ছাড়া শুধু ‘কম্পোজ সেকশন’ ছোটখাটোভাবে করেও অল্প পুঁজিতে ব্যবসা করে কেউ কেউ। ওরকম কম্পোজ সেকশনের একটা সমস্যা হলো, কম্পোজিটররা অনেকেই সিসায় তৈরি টাইপ চুরি করে নিয়ে সের দরে বিক্রি করে ফেলে। পার্টনারশিপে যারা ‘কম্পোজ সেকশন’ করে তারা নিজেরাও এক পার্টনার আরেক পার্টনারের অজান্তে টাইপ চুরি করে। বিক্রি করলেই তো ক্যাশ টাকা।
 
একদিন রিকশায় বসে ইমদাদুল হক মিলন হুমায়ূন আহমেদকে বললেন, ‘হুমায়ূন ভাই, চলেন আমরা দুজন একটা বিজনেস করি।’
হুমায়ূন আহমেদ সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, ‘কী বিজনেস?’
‘একটা কম্পোজ সেকশন করি।’
‘হ্যাঁ, করা যায়। ভালো আইডিয়া। কত টাকা লাগবে?’
‘একেকজনে দশ-পনেরো হাজার করে দিলে হয়ে যাবে।’
‘সেটা দেওয়া যাবে।’
‘তাহলে চলেন শুরু করি।’
‘তোমার টাকা রেডি আছে?
‘আরে না। দশ টাকাও নেই।’
‘তাহলে?’
‘ধার করতে হবে।’
‘সেটা না হয় করলে, তবে আমার একটা শর্ত আছে।’
‘কী শর্ত?’
হুমায়ূন আহমেদ ইমদাদুল হক মিলনের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন ‘চুরি করে টাইপ বিক্রির অধিকার সমান থাকতে হবে।’
এরপর দুজনই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন।”
স্যার ওপারে ভালো আছেন৷ আমরা এমনটা আশা করি৷
আপনার প্রতিটা মৃত্যুদিবস আপনাকে ছাড়া পালন করাটা ভাবতে পারি না৷ তবুও জীবন থেমে থাকে না, আপনি যেখানে আছেন ভাল থাকবেন স্যার।
নুহাশপল্লীর যে লিচুতলায় আপনাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়, ভক্তদের ফুলে ফুলে ভরে উঠুক সে জায়গাটি৷
 
লেখক: নকীব মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ
তরুণ লেখক ও কথাসাহিত্যিক৷

 

Facebook Comments