Sunday, January 16, 2022
Home > গল্প > গোস্ত টুকানো ঈদ | মুন্না রহমান

গোস্ত টুকানো ঈদ | মুন্না রহমান

Spread the love
কলিম, শরাফত, হাশেম তিনজন ক্লোজফ্রেন্ড। একই বস্তিতে একটা খুপরি ঘরে মিলেমিশে থাকে এই তিনটি অসহায় কিশোর। ওরা টোকাই,তিনজনে একইসাথে কাজে বের হয়,আবার একসাথেই ফিরে আসে।
 
আজও সারাদিন খাটুনির পরে একত্রিত হয়েছে রুটিন মাফিক।
হাশেম বললো, এই দুস্ত কাইলকা তো বকরা ঈদ, তরা গোস্ত টুকানোর কোনো পেলান টেলান করছোস?
ওদের মধ্যে কলিম বলে উঠলো,
হ জানি তো কাইল কুরবানী ঈদ,
সাহেবরা গরু খাসি জবাই দিবো,আর আমরা সকাল সকাল গোস্ত টুকাইতে বাইর অইয়া যামু, এই তো পেলান।
শরাফত বললো,বেশি সকালে বাইর অওনের দরকার নাই। নামাজের পর কুরবানী অইব। গরু কাইট্যা ছুইল্যা হেরপর গোস্ত বানাইবো। ভাগ কইর‍্যা হেরপর গোস্ত বিলাইবো।
তাতে কি, আমরা ঘুইরা ঘুইরা কুরবানী করা দেখুম আর মজা পামু!
হ ঠিক আছে তাই অইবো।
তিনবন্ধু পরিকল্পনা করে একইসাথে গলা জড়িয়ে ধরে গান গাইতে গাইতে ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
 
আজ পবিত্র ঈদ উল আযহা।
মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে অন্যতম। অবস্থাপন্ন লোকেরা হালাল পশু কোরবানি করেন। কোরবানির মাংস তিন ভাগ করে তার একভাগ নিজের জন্য রেখে, একভাগ আত্মীয় স্বজনদের এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেন।
পূর্ব নির্ধারিত প্রোগ্রাম অনুযায়ী, ওরা সকাল সকাল উঠেই রেডি হলো সারাদিনের কাজের জন্য।
কাজ মানে গোস্ত টুকানো গত কোরবানি ঈদে যে মাংস পেয়েছিল তার প্রায় সবটাই, এই বস্তিরই চটপটি বিক্রেতা নুরু মিয়ার কাছে সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছিল।
নুরু মিয়া বেশ কমদামেই এই টুকানো মাংস কিনে ফ্রিজে রেখে দেয়,পরে কাবাব, চাপ চটপটির মধ্যে এই মাংস চালিয়ে দেয়, এতে ভালোই লাভ করে চতুর নুরু মিয়া।
 
 
শরাফত এবং কলিম হাশেমকে বললো, চল, কিছু খাইয়া লই।
ল, সামনে আবুল চাচার দোকানে যাইগা।
ল, যাই।
ওরা হেটে বস্তির মাথায় আবুল চাচার দোকানে চলে এলো।
এই আবুল চাচা এক অদ্ভুত মানুষ!
উনার ত্রিকুলে কেউ নাই,
কি রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উনি অনেক ভোরে দোকান খুলবেনই।
 
তিন বন্ধু দোকানে এসে বললো,
ঈদ মুবারক চাচা!
ঈদ মুবারক! তরা এত্ত বিহানে উইঠ্যা পরছোস?
হ চাচা, গোস্ত টুকাইতে যামু,
তাই আগেভাগেই উইঠা পড়লাম।
ভালোই করছোস,
কি খাইবি,চা দিমু?
হ দেও চাচা,লগে একখান কইরা বম্বে টোস দিও।
আচ্ছা।
 
তিনবন্ধু মজা করে চায়ে টোস্ট ভিজিয়ে খাচ্ছে আর পা দোলাচ্ছে।
বেশ সুখি মনে হচ্ছে ওদের।
আবুল চাচা তুমার চা তো জব্বর মজা অইছে!
কাচাপাত্তি মারছি তো তাই।
তাইলে পত্তিদিনই কাচাপাত্তি মাইরাই চা দিও।
হ, দিমুনে, অহন আরো এককাপ কইরা দিমু নাহি?
না চাচা টেহায় কুলাইবো না।
এই চায়ের দাম দেওন লাগবো না।
মাগনা খাওয়াইলে তুমার বিজনিস লাডে উঠবো চাচা।
আরে না, অই চিন্তা তোগো করন লাগবো না।
আইচ্ছা দেও তাইলে আরো এককাপ কইরা, কাচাপাত্তি মাইরা দিও।
কলিমের কথায় সকলে হেসে উঠলো!!
 
চা টোস্ট খেয়ে, বেশ অনেকটা সময় গল্প গুজব করে ওরা আবুল চাচার দোকান থেকে বের হলো।
ইতিমধ্যে ঈদের নামাজ পড়ে, সকলে কোরবানির প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে।
ওরা তিনজনে ঘুরে ঘুরে সব দেখছে।
খুবই ভালো লাগছে ওদের।
ওরা পরিকল্পনা করলো, কিভাবে গোস্ত টুকানো যায়।
কোন কোন বাড়িতে গেলে, বেশি করে গোস্ত পাওয়া যাবে?
 
দুপুরের পর থেকেই মাংস বিলি শুরু হলো। ওরা তিন বন্ধু পরিকল্পনা করে নেমেছে, তাই অন্য সব টোকাইদের থেকে ওরা বেশি গোস্ত টুকাতে পারলো।
সন্ধ্যার আগেই ওদের ব্যাগ ভরে গেল।
খুবই খুশি মনে বস্তির দিকে পা বাড়ালো তিনবন্ধু।
 
বস্তিতে ঢোকার মুখে আবুল চাচার দোকানে, নুরু মিয়ার সাথে দেখা হলো।
নুরু মিয়া ওদের ডাক দিলো,
ওই কলিম, শরাফত হাশেম?
শরাফত বললো,
কি নুরু ভাই, ডাকতাছো কেন?
ব্যাগ ভইরা গোস্ত লইয়া আইছো দেহা যায়।
হ,নুরু ভাই আইজকা ভালোই গোস্ত টুকাইছি।
বেচপি না?
হ বেচুম,তয় গতবারের মত ঠকাইতে পারবেন না,কইলাম।
কি কস তরা,ঠকামু ক্যান ল্যায্য দামই পাইবি।
অহন ক কেজি কত লইবি?
বাজারে তো সাড়ে পাচশো কইরা কিনো, আমাগো চাইরশো দিলে অইবো।
টোকাইন্যা গুস্ত চাইরশো টেহায় কেনা লস, দুইশো কইরা দিমুনে।
না, নুরু ভাই সাড়ে তিনশো।
নুরু মিয়া আর দরদাম করার সাহস পেলোনা, প্রতি কেজিতে দুইশো কইরা কম!
নুরু মিয়া বললো,
আইচ্ছা সাড়ে তিনশোই দিমু।
মাংস মেপে মোট বাইশ কেজি হলো,
নুরু মিয়া মাপে ও ফাকিবাজি করলো,
বল্লো বিশ কেজি, নিয়ে নিলো প্রায় একুশ কেজি। ওদের খাওয়ার জন্য এক কেজির মত দিলো। রাতে টোকানো মাংস রান্না করলো। সাথে সাদা ভাত।
ওদের বাবা মা গ্রামের বাড়িতে থাকেন,
কাল সকালে ওরা গ্রামে এ যাবে বাবা মায়ের কাছে। ওরা চার বছর আগে এসেছিল অভাবের কারণেই।
এই চার বছরে অনেক কিছু দেখেছে শিখেছে ও অনেক।
ঈদের দিনে বাবা মা ভাই বোন দের সাথে থাকতে না পারার বেদনা ওদের দগ্ধিভূত করে, কিন্তু জিবীকার টানে সব মায়ার ই কিভাবে যেন ক্ষয়ে যেতে থাকে।
ওরা, নিরবে চোখের জল ফেলছে,
শরাফত ওদের চেয়ে এক দুই বছরের বড় হবে, সেইজন্য কলিম এবং হাশেম ওকে বেশ মান্য করে।
শরাফত বললো, কান্দিচ না,আমগো ভাগ্যই এই রহমের।
ল,খাইতে বহি।
রাইত অনেক অইলো।
তিন বন্ধু একত্রে খেতে বসলো,সাদা ভাত আর টুকানো গোস্ত মজা করে খেলো ওরা।
শরীর বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, সারাদিন গোস্ত টুকিয়ে।
বিছানায় শোয়ার সাথে সাথেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো ওরা।
 
ভোরে উঠেই শরাফত, সমান তিনভাগে মাংস বিক্রীর টাকা ভাগ করলো।
বাইশ শো করে ভাগে পড়লো একেকজনের।
বাকি চারশো টাকা শরাফতের কাছে পথ খরচ হিসেবে রইলো।
ওরা ময়মনসিংহ যাবার জন্য তৈরি হয়ে নিলো।
মনটা ভালো তিন জনেরই,
অনেকটা দিন পর সবার সাথে দেখা হবে।
বস্তির খুপরি ঘর থেকে বের হয়ে ওরা হাটতে হাটতে আবুল চাচার দোকানে চলে এলো।
সেই কাকডাকা ভোরেই চাচা দোকান খুলে বসে আছে।
ওদের তিনবন্ধুকে দেখে,আবুল চাচা বললো,
এই বিহান বেলা কই যাইস তরা?
চাচা,গেরামে যাই।
মা বাবা ভাই বোনের লগে ঈদ করতে।
হগলেই ঈদের আগে যায়,আর আমরা যাই ঈদের পরে!
কলিমের উত্তরের মধ্যে একটা অব্যক্ত বেদনা লুকায়িত রয়েছে, সেটা আবুল চাচা বুঝতে পারে।
উনি আর কোন প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করে।
এই তিনটি কিশোরের ঈদের আনন্দ ঢাকা পড়ে গিয়েছি অভাব নামের দানবের সর্বগ্রাসী থাবায়!
 
আবুল চাচা কাচাপাত্তি মেরে তিন কাপ কনডেন্স মিল্ক এর চা ও তিন টা বোম্বে টোস্ট ওদের দিকে এগিয়ে দিলো।
খুব আয়েশ করে ওরা চা টোস্ট খেয়ে উঠে পড়ে।
চাচা কত বিল অইছে?
আইজকা বিল দেওন লাগবো না বাপু।
কেন চাচা? বউনির সময় বাকি রাখতে নাই।
বাকী না,আইজ তোগো ফাউ খাওয়াইলাম,তরা আমার পোলার লাহান,বলেই আবুল মিয়া ঢুকরে কেদে উঠলো। ওদের তিন জনেরই চোখ ভিজে উঠছে, আর বেশিক্ষন এখানে থাকা যাবেনা। ওরা আবুল চাচার কাছ থেকে দ্রুত বিদায় নিয়ে মহাখালী বাস স্ট্যান্ডে চলে এলো। ময়মনসিংহগামী বাসে উঠে পড়লো তিন জন কিশোর টোকাই।
এই টুকানো মাংস বিক্রির টাকায় পরিবারের দাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা করা কতটা আনন্দময় হয়ে ঊঠে সেটার খোজ আমরা কস্মিনকালেও রাখিনা। এরকম হাজারো হাশেম, কলিম, শরাফতদের প্রতিটি ঈদ কেটে যায় ফিকে হয়ে যাওয়া আনন্দে”।
গাড়ির ছুটে ছুটে চলা বেশ উপভোগ করছে ওরা। এই ছুটে চলার দাথে ওদের আনন্দ মিশে আছে। ওদের মন পরিবারের একান্ত সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে গিয়েছে। এই তো আর কিছুটা সময় পরই সকলের সাথে দেখা হবে
Facebook Comments