রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২
Home > প্রবন্ধ/নিবন্ধ > গল্প লেখার পেছনের গল্প | ইবরাহীম ওবায়েদ

গল্প লেখার পেছনের গল্প | ইবরাহীম ওবায়েদ

Spread the love
আমার লেখালেখির ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। আমি কখনো গল্পের প্লট মাথায় নিয়ে লিখতে বসি না। হঠাৎ কোনো একটা লাইন মাথায় আসে অথবা হঠাৎ কল্পনায় কোনো একটা দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমি লিখতে বসে যাই। তারপর কিভাবে যে একের পর এক লাইন লিখি এবং কিভাবে যে একের পর এক গল্পের চরিত্র সৃষ্টি হয় তা আমি নিজেও জানি না। লেখা চলতে থাকে। একসময় গল্পের চরিত্ররা রক্তমাংসের মানুষের মতো বাস্তব হয়ে ওঠে। একেকটা অধ্যায় লিখি আর তুমুল আগ্রহ নিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ের জন্যে অপেক্ষা করি। কারণ পরের অধ্যায়ে কী ঘটবে তা আমি নিজেও জানি না। পাঠকেরা যেমন উপন্যাস পড়ার সময় পরবর্তী অধ্যায়ের জন্যে কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করেন তেমনি আমিও লেখার সময় পরবর্তী অধ্যায়ের জন্যে কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করি। স্বর্গের নর্তকী উপন্যাস লেখার গল্পটা বলি। একটা উপন্যাস লেখা শেষ করে দুইদিন ধরে কিছুই না লিখে শুয়ে বসে সময় কাটাচ্ছিলাম। রাতে আমার ঘুম হয় না। কাজেই প্রায় রাতেই বারান্দায় বসে থাকি। একরাতে বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। রাতের পরিচ্ছন্ন আকাশ। একফোঁটা মেঘ নেই। অসংখ্য তারা ঝিকমিক করছে। আকাশের এক কোনায় কাস্তের মতো বাঁকা চাঁদ ঝুলে আছে। আমি মুগ্ধচোখে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ আমার কী যেন হয়ে গেলো। হৃদয়ের গভীরে প্রচণ্ড একটা চাপ অনুভব করলাম। এই চাপ কোনো জাগতিক চাপ না। এই চাপের জন্ম অন্যকোনো ভুবনে। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম আকাশের দৃশ্য বদলে গেছে। এখন আর রাতের অন্ধকার আকাশ নেই। অদৃশ্য কেউ একজন এক টানে আকাশের বুক থেকে কালো চাদর সরিয়ে ফেলেছে। আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ধীরে ধীরে মেঘ জমতে শুরু করেছে এবং বুড়িগঙ্গার তীরে একটা জীর্ণ পুরাতন বাড়িতে বসে একজন মধ্যবয়স্ক লোক আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার স্ত্রী রান্নাঘরে বসে মাছ কুটছেন। বলাই বাহুল্য এটা আমার কল্পনার দৃশ্য। কিন্তু যখন কল্পনায় দৃশ্যটা ভেসে উঠেছে তখন সেটা পুরোপুরি বাস্তব মনে হয়েছে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বারান্দা থেকে উঠে এসে লেখার টেবিলে বসে লিখতে শুরু করে দিলাম—
‘ফয়েজ সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আকাশের দক্ষিণ পূর্ব কোণে ধীরে ধীরে মেঘ জমতে শুরু করেছে। একটু পরেই বৃষ্টি হবে। আষাঢ় মাসের শেষাশেষির এই সময়টা বড় অদ্ভুত। সারাদিনের মধ্যে কখন রোদ থাকবে আর কখন বৃষ্টি হবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। এই রোদ, এই বৃষ্টি। কোনো কোনোদিন আবার সারাদিনে একবারের জন্যেও এক ঝলক রোদের দেখা পাওয়া যায় না। সারাটা দিন আকাশে গুমোট মেঘ আনাগোনা করে। ঘরবাড়ি স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যায়। ছাদের উপর শুকাতে দেওয়া কাপড়গুলি কিছুতেই শুকাতে চায় না। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে পড়ে। অর্ধেক শুকানো কাপড়গুলি আবার ভিজে জবজবা হয়ে যায়। ফয়েজ সাহেব গলা উঁচিয়ে ডাকলেন, মুর্শিদা, ও মুর্শিদা! মুর্শিদা রান্নাঘরে বসে মাছ কুটছিলেন। স্বামীর ডাক শুনেও কোনো সাড়া দিলেন না। কাজের মাঝখানে কেউ ডাকাডাকি করলে তার খুব বিরক্ত লাগে।’
গল্প তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চললো। একের পর এক চরিত্রের জন্ম হতে লাগলো। প্রতিদিন আমি লিখতে বসি এবং যতোক্ষণ ভালো লাগে ততোক্ষণ লিখি। লিখতে বসার আগে গল্প কিংবা গল্পের চরিত্র নিয়ে একেবারেই ভাবি না। লেখা শেষ করে ওঠার পরেও গল্প নিয়ে কোনো চিন্তা করি না। গল্পটা যে কবে কোথায় গিয়ে শেষ হবে তাও জানি না। একদিন লিখতে বসে ঘণ্টাখানেক লেখার পর হঠাৎ মনে হলো গল্প শেষ হয়ে গেছে। আমার বুকটা কেমন যেন হাল্কা হয়ে গেলো। আমি কিবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে নিলাম। গল্প যে আজকে শেষ হবে এবং এখানেই শেষ হবে তা আমি নিজেও জানতাম না। আমার অজান্তে গল্প শুরু হয়েছিলো এবং আমার অজান্তেই গল্প শেষ হয়ে গেলো। সবটাই প্রাকৃতিক একটা ব্যাপার এবং তা অদৃশ্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ২০১৮ সালের অমর একুশে বইমেলায় আমার এই উপন্যাস ‘অনন্যা’ থেকে প্রকাশ হয়েছে। আমার সব লেখাই এইরকম অদৃশ্যভাবে শুরু হয় এবং অদৃশ্যভাবে শেষ হয়। এখন ১৫ নম্বর উপন্যাস লিখছি। নাম চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে উপন্যাসের নামটা গোপন রাখলাম। এই লেখাটাও এক মধ্যরাতে শুরু হয়েছে এবং এখনো চলছে। আজকে হঠাৎ মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই লেখাটা শেষ হয়ে যাবে। সমস্যা হচ্ছে এই গল্পের আমার খুব প্রিয় একটা চরিত্র হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। বেচারা হঠাৎ মরে যাবে কিনা বুঝতে পারছি না। মরে গেলে সেটা আমার জন্যে খুব কষ্টের একটা ব্যাপার হবে। অনেকে বলতে পারেন, গল্পটা যেহেতু আমি লিখছি কাজেই গল্পের চরিত্রের জন্ম এবং মৃত্যু আমার হাতে। আসলে ব্যাপারটা এরকম না। মানুষের জন্মমৃত্যু যেমন মানুষের হাতে না তেমনি গল্পের কোনো চরিত্রের জন্মমৃত্যুও হয়তো মানুষের হাতে না। অবশ্য লেখক হিসাবে গল্পের শেষটা আমার জানা উচিত; কিন্তু আমি জানি না। কেন জানি না এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, আমি এটা জানি যে, আমি আসলে কিছুই জানি না।
Facebook Comments