Monday, January 17, 2022
Home > গল্প > অসহায় বিবস্ত্র মেয়ে – আবুদ্দারদা আব্দুল্লাহ

অসহায় বিবস্ত্র মেয়ে – আবুদ্দারদা আব্দুল্লাহ

Spread the love
বিনুকে আমার কোনকালেই একজন সহজ স্বাভাবিক মেয়ে মনে হয়নি। জটিল এবং রহস্যময়ী মনে হয়েছে। ওর সাথে আমার বেড়ে উঠা রেলওয়ের সরকারী কলোনীতে। ওর বাবা ছিলেন রেল মন্ত্রনালয়ের একজন অফিসার। হাসিখুুশি ধরনের একজন মানুষ। নাম ছিলো মোমতাজুর রহমান। আমি ডাকতাম মমতাজ কাক্কা বলে। তিনি আমাদের ঘরে প্রায় আসতেন। ঘন্টার পর ঘন্টা বাবার সাথে মমতাজ কাক্কার রসালো আলাপ হতো, তবে সেভেন্টি ওয়ান বিষয়ক আলাপটা একটু বেশি হতো। এই আলাপে বিশেষ করে মমতাজ কাক্কার বড়ভাই লাড্ডু মিয়ার আলোচনা হতো। আসল নাম জিয়াউল করিম। মুক্তিযুদ্ধে তার বিরত্ব,শৌর্যবীর্যের আলোচনা মাঝেমধ্যে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতাম। মমতাজ কাক্কা বুক ফুলিয়ে ভাইয়ের কথা বলতেন, দেশ নিয়ে তার ভাইয়ের স্বপ্নের কথা বলতেন। আমি যে লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের কথা শুনছি সেটা মা পছন্দ করতেন না কারন তখনো বড়দের কথা বুঝার মত বয়স নাকি আমার হয়ে উঠেনি। প্রথম প্রথম মা আপত্তি করতেন না কিন্ত একদিন মমতাজ কাক্কা বাবাকে বলছিলেন, পাকিস্তান আর্মি কর্তৃক একজন নির্যাতিতা মেয়ের কথা। মেয়েটার বয়স ছিলো পনেরো বছর। চেহারা শ্যামলা হলেও ফেসকাটিং ছিলো চমৎকার। তারপর একদিন গভীর রাতে রাজাকারদের সহযোগীতায় পাকিস্তানি আর্মিরা মেয়েটিকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গনধর্ষন করে। ধর্ষনের শুরুটা হয়েছিলো ব্লাউজ টান দিয়ে ছেড়ার মধ্য দিয়ে। মেয়েটা হাত দিয়ে বুক ঢাকার জন্য বারবার চেষ্টা করেছিলো কিন্ত কোন কাজ হয়নি। একজন পাক আর্মি মেয়েটার দুইহাত পিছন দিক থেকে টানটান করে ধরে রেখেছিল। গলা ফাটিয়ে বোকার মত কয়েকজন আর্মি হাসছিলো। মেয়েটা হাত দিয়ে তাদের পা ধরতে না পারলেও মুখ দিয়ে বারবার বলেছিলো, স্যার, আপনাদের পায়ে ধরি। কিন্ত কে শোনে কার কথা? মেজর হায়দার নামের বয়স্ক অফিসারটা সবার সামনে আর্মি ইউনিফর্মের জিপার খুলে বেশরমের বাচ্চার মত লজ্জাস্হান বের করে ফেললো। পাগল ছাগলের মত হাসতে হাসতে বললো, কিউ চিল্লাতি হেঁ, ইয়ে লারকি চুপ যা চুপ যা। এ রাত মজাক করনে কে লিয়ে, হা হা হা।
বিকৃত মস্তিষ্ক আর বিকৃত মানসিকতার মেজর হায়দারের ইশারায় একজন সৈনিক দৌড়ে এসে টান দিয়ে মেয়েটার ছায়া খুলে বিবস্ত্র করে ফেললো। সাথে সাথে পুরোপুরি বিবস্ত্র একজন অসহায় মেয়ের সামনে পাকিস্তানি আর্মি টিমটা নোংরা আনন্দে হৈ হুল্লোর করে উঠলো। মেজর হায়দারের হৃদয়ে তখন বুদবুদ উঠেছে। আহ কি আনন্দ, যখন মেয়েটাকে মেজর হায়দার স্পর্শ করতে যাবে ঠিক সেই মুহুর্তে আসগর খান নামের একজন পাকিস্তানি সৈনিক বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো, স্যার, এরকম বয়সী আপনার ঘরে কি কোনো মেয়ে নেই?
আসগর খানের মুখে সাথেসাথে মেজর হায়দার কষিয়ে একটা চড় বসিয়ে দিলো। এরকম টান টান উত্তেজনাকর মুহুর্তে সমবয়সী মেয়ের তালিম মেজর হায়দারের কাছে মোটেও ভালো লাগেনি। শালা উল্লুক বলে মেজর হায়দার আসগর খানকে গালি দিয়ে যেই না মেয়েটার বিবস্ত্র বুকে থাবা দিতে যাবে ওমনি আসগর খান শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে মেজর হায়দারের ঘাড় বরাবর ধাম করে দিলো একটা ঘুষি। এক ঘুষিতেই মাথা চক্কর দিয়ে মেজর হায়দার ধপাস করে পড়ে গেলো। সাথে সাথে মেজর হায়দারের অনুগত নেসার গুল আসগর খানের দিকে বন্দুক তাক করতেই সেকেন্ড কমান্ডার মেজর রাহাত গুল হাত ইশারা করে বললেন, নেসার, স্টপ স্টপ। শক্র দেশে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ভালো না। শেষমেশ সফলতা আসবেনা, নিজেরা নিজেদেরকে শেষ করে খালি হাতে জিল্লতি নিয়ে ফিরতে হবে। যার পরিনতি হবে ভয়াবহ, বুঝলে?
নাসের গুল অস্ত্র নামিয়ে ফেললো। দশজন অসভ্য মানুষের মধ্যে একজন সভ্য মানুষ থাকাটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। দশজন অসভ্যের মধ্যে যারা সভ্য থাকে তাদের মধ্যে একজন হলেন, আসগর খান। পাকিস্তান আর্মিতে জয়েন করেছিলেন ১৯৫৫ সালের এক্কেবারে শুরুর দিকে।  সম্ভ্রান্ত পরিবারে আসগর খানের জন্ম। তার বাবা ছিলেন প্রচন্ড আত্নমর্যাদাবোধের অধিকারী একজন মানুষ। বাবার রক্ত যেহেতু আসগর খানের শরীরে প্রবাহমান তাই অন্যায় দেখলে আসগর খানের গা জ্বালা করে। গত সাত মাস ধরে পূর্ব পাকিস্তানে আসগর খান এসব শুধু দেখে আসছেন। জ্বালাও, পোড়াও, হত্যা, ধর্ষণ আর কত নিষ্ঠুরতা। কতবার ভেবেছেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে যাবেন নিজের জন্মভূমি বেলুচিস্তানে। নরাধম পশুদের সাথে আর এক মুহুর্তও নয় কিন্ত তিনি যেতে পারেন নি। অনেক ঝামেলা আছে। চোখের সামনে অপরাধ হচ্ছে কিন্ত তিনি কিছুই করতে পারছেন না। আসগর খানের নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। একদিন তিনি বিবেকের তাড়নায় দংশিত হয়ে ভাবলেন, এইসব নরাধম পশুদের সাথে না থেকে মজলুম বাঙালী মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহযোগীতা করবেন। সত্যি সত্যি তিনি সহযোগীতা করেছিলেন। মেজর হায়দার আর তার সহযোগী আর্মি সেনাদের উপর্যপুরি ধর্ষনে যেদিন মেয়েটা মারা যায় তার ঠিক পরের দিন গোপনে আসগর খান মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার লাড্ডু মিয়াকে পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্পের সব গোপন তথ্য দিয়ে আসলেন। আসগর খানের কথামতো পরেরদিন মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান ক্যাম্পে হঠাৎ আক্রমন করে তছনছ করে দেয়। যদিও পাকিস্তান আর্মি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো কিন্ত তার থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছিলো মুক্তিবাহিনীর কারন লাড্ডু মিয়ার মত নির্ভীক সাহসী একজন কমান্ডারকে তারা হারিয়েছিলো। অবসর সময়ে আপন ভাইয়ের সেই বিরত্বের কথাগুলোই মমতাজ কাক্কা বাবার কাছে শেয়ার করতেন। টান দিয়ে ব্লাউজ ছিড়ে ফেলা আর হঠাৎ দৌড়ে এসে ছায়া খুলে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে উপর্যপুরি গনধর্ষন করা যদিও নিষ্ঠুর মানুষের গল্প তারপরেও মা আমাকে শুনতে দিতেন না। মায়ের ভয় ছিলো, এইসব শুনে যদি আমার ভিতরে কোন নেগেটিভ চিন্তা ভাবনা কাজ করে? তবে সত্যি কথা বলতে কি, আমার ভিতরে কিন্ত নেগেটিভ কোন চিন্তা কাজ করতো না বরং আমার ভিতরে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতো। মমতাজ কাক্কার সামনে তো একদিন বলেই ফেলেছিলাম, কাক্কা, এই জানোয়ারের বাচ্চাগুলোকে আমি খুন করতে চাই, ওরা কোথায় থাকে বলেন?
মমতাজ কাক্কা আর বাবা সেদিন বিস্ফোরিত চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। এর ঠিক একমাস পরে মমতাজ কাক্কা রেলওয়ে কলোনি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন। কাক্কার পরিবারের সাথে আমাদের গলায় গলায় ভাব ছিলো বিশেষ করে বিনুর সাথে। আমরা প্রায় সমবয়সী ছিলাম। রেলওয়ে কলোনিতে সারাদিন হৈ হুল্লোর করে বেড়াতাম।
তারপর হঠাৎ একদিন বিনু কেমন যেনো চুপ হয়ে গেলো। ঠেকায় পড়ে বিনুর বিয়ে হয়েছে একটা গোমরামুখো ছেলের সাথে। ছেলেটা নামাজ পড়েনা, শুধু স্টেট কায়েমের কথা বলে। এই দেশকে বলে হিন্দু দেশ। যার কারনে বিনু এই বিয়েতে রাজি ছিলো না তারপরেও ঠেকা বলতে একটা কথা আছে না? বিনুর স্বামী প্রত্যেকদিন বিনুকে নিয়ম করে মারধোর করতো। প্রত্যেকদিন রাতের বেলা কোথা থেকে যেন এসে পাগলের মত বলে, এই দেশে আর থাকা যাবে না। হিজরত করতে হবে না হয় স্টেট কায়েম করতে হবে। বিনু স্টেট কায়েমের কিছুই বোঝেনা। বিনু একদিন শুধু বলেছিলো, আগে নামাজ তো পড়বেন তার পরে না আমিরের হুকুমে স্টেট কায়েম। এই কথা বলার পর থেকেই বিনুর উপরে অমানুষিক অত্যাচার শুধু। কি, আমিরের নামে টিটকারি?
একদিন নিউ মার্কেটে আমার স্বামীকে নিয়ে গিয়েছিলাম শপিং করতে তখন বিনুর সাথে দেখা হয়েছিলো। বিনুর মুখে নখের আচড়ের দাগ। জিগ্যেস করলাম, বিনু, কেমন আছিস তুই?
ও কানের কাছে এসে শুধু এইটুকু বলেছিলো, রাজাকার বংশের ছেলের সাথে সংসার তো, কেমন আর থাকি বল ? এরপর বিনু হনহন করে চলে গিয়েছিলো। মানুষ কপালের ঘাম যেমন ছুড়ে ফেলে তেমনি বিনুও চোখ থেকে পানি মুছে ছুড়ে ফেলেছিল। আমার স্বামী আমার চিবুক ধরে জিগ্যেস করেছিলো, মেয়েটা বড় অসুখী, তাই না?
Facebook Comments