Friday, January 28, 2022
Home > Uncategorized > যুগ যুগান্তর – পূর্ণোপমা দাস

যুগ যুগান্তর – পূর্ণোপমা দাস

Spread the love

“সেদিন বলেছিলে ভালোবাসা এমনই হয়। তোমার কথাটা বুঝিনি। তবে আজ বুঝি। তোমায় বলেছিলাম ভালোবাসি না। আর তুমি হাসি মুখে ফিরে গেলে। তারজন্যই তো আজও আমি বেশ ভালো আছি। জানো খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। ভালোবাসি না বলেই কি চলে যাবে তুমি? বুঝবে না কেনো বলেছি সেই কথা! না বুঝে হেসে চলে গেলে। অদ্ভুত মানুষ বটে তুমি একটা। আচ্ছা তোমার কি মনে আছে সেই দিনের কথা যেদিন আমি প্রথম তোমায় বলেছিলাম ভালোবাসি! ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। সবাই শুনেছিলো। পুরো ডিপার্টমেন্ট রটে গিয়েছিলো যে তোমাকে কেউ প্রপোজ করেছে। তাও আবার কে?! আমি, আমি নীলারন্দা গোস্বামী। ডিপার্টমেন্ট তো বটেই, পুরো ভার্সিটির এক জলন্ত নারী আমি। যার কাজ সারাদিন মারপিট, হুড়োহুড়ির ভেতরে বাস করা। আর সুযোগ মিললেই কিছু বড়লোক ছেলে মেয়েদের অপদস্থ করা। সেই আমি কিনা প্রেমে পড়লাম! তাও আবার তোমার। তুমি, সপ্তক রায়। যে স্বীকার করেছিলে ভালোবাসো। এতটাই আস্তে ছিলো তোমার বলা ভালোবাসা। হয়তো একটা পিঁপড়েও শুনতে পায়নি। কিন্তু আমি ঠিকই শুনেছিলাম। তোমার চলে যাওয়াটা সবার চোখে পরেছিলো। ভেবেছিলো তুমি আমায় প্রত্যাখান করলে। প্রত্যাখান হবার জ্বালা সহ্য করার মেয়ে যে আমি নই তা সবাই জানে। সবাই ভেবেছিলো ছুটে গিয়ে তোমার পাঞ্জাবির কলার ধরবো। ধরে সেখানেই তোমাকে শেষ করে পুঁতে ফেলবো। কিন্তু তা করিনি। করতে পারিনি। আমি যদি আগুণ হয়ে থাকি তাহলে তুমি ছিলে জল। আমি যদি মাটি ফাঁটা রোদ হয়ে থাকি তুমি ছিলে কোমল পরশ। আমি যদি ঝড়, তুফান হয়ে থাকি তুমি ছিলে ছন্দময়, ভালোবাসার বৃষ্টি। তোমার সাথে চলা এতোগুলো বছর আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তুমি আমাকে নিয়ে ডুবে যেতে চাইতে না। আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইতে না। আমি যতোই এক অস্থির নাবিকের মতো ঘোরাফেরা করতে চাই। তুমি ততোই আমাকে একটা মাটিতে বেঁধে রাখতে চাইতে। কি করোনি তুমি আমাকে শান্ত করতে! আমাকে তোমার বউ হিসেবে মানানোর জন্য! যখন দেখলে আমি বদলাবো না। বদলাবার নই, তুমিই বদলে গেলে। যে তুমি কবিতা ভালোবাসতে, সেই তুমি গল্প ভালোবাসতে শিখলে। যেই তুমি একটা বাটপারের দুঃখে কষ্ট পেতে, সেই তুমি ভালো মানুষের মৃত্যুতে আনন্দ পেতে। অথচ সেই তখন থেকে তোমাকে আমি সহ্য করতে পারি না। তুমিও যে আমারই মতোন হবার চেষ্টা করছো! প্রতিযোগিতা মেনে নিতে পারিনি। তাই বলে ফেলেছিলাম ভালোবাসি না। ভালোবাসি না। তবে ভালোবাসির মতো জোরে নয়৷ কোনো জোর ছিলো না আমার এই ভালোবাসি না বলাটায়। শুধু জোর ছিলো এটা শুনে তোমার মুখের হাসিটায়। সেদিন মনে হয়েছিলো তোমার ঐ হাসির জন্য আমি সহস্রাধিকবার মরিতে পারি। কিন্তু তুমি চলে গেলে। আর আমি হয়ে গেলাম একা। সম্পূর্ণ একা। কিন্তু তুমি খুব ভালো। জানো কেনো? যেই আমি বিয়ে বিয়ে করে তোমাকে পাগল করে তুলেছিলাম। সেই আমিই বিয়েতে বেঁকে বসলাম। হ্যাঁ তোমার আর আমার বিয়েতে। কিন্তু তুমি বিয়েটা করালেই। তোমার হাসি দিয়েই করালে। আজ পঞ্চাশ বছর পর মনে হচ্ছে কাজটা তুমি একদম ঠিক করেছিলে। তা না হলে আমি তো কবেই ভেসে যেতাম সমুদ্রের টানে। কিন্তু বিয়ের পরে আমাকে বদলাতে চাও নি তুমি। কেনো চাও নি? আমাকে আমার মতো ভালোবাসো বলে। নাকি অন্য কিছুর জন্য? কিন্তু এই জবাবটা তুমি আমাকে কোনোদিন দাও নি। আর আজ তো দেবার প্রশ্নই উঠে না। তোমার ঠিকানাটা আজ বড্ড দূর। সেখানে পৌঁছাবার ক্ষমতা কোনো ফোন কোম্পানির এখনও হয়নি। আর হবেও না। যাও আর বিরক্ত করবো না তোমায়। বেশী বিরক্ত করলে আবার হাসি দিয়ে তুমি আমায় পাগল করে ফেলবে।” আপন মনে বক বক করতে থাকা বৃদ্ধাটি তার নাতনির দিকে তাকিয়ে বলে, “কিরে ভালোবাসা কেমন লাগে তোর?” নাতনি মুচকি হেসে বলে, “ঠিক যেমন তেমনই লাগে। টক, ঝাল, মিষ্টি আর তেতো।” নাতনির হাসির দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধা আবার ডুবে যায় তার ফেলে আসা দিনগুলিতে। যেখানে শুধু নীলারন্দা আর সপ্তকের ভালোবাসাটাই আসল ছিলো। আর বাকি দুনিয়ার সবটুকু শুধুই ছলনা ছিলো, মিথ্যে ছিলো।

Facebook Comments