বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > গল্প > বৈষম্য – আবদুল্লাহ কাফি

বৈষম্য – আবদুল্লাহ কাফি

Spread the love
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সুযোগ হয়েছে আমার৷ অথচ, আমি খুশি না হয়ে কান্না করছি৷ বাবা মার হাত-পায়ে পড়ছি৷ আকুতি-মিনতি করছি, ‘আমায় যেতে দাও৷ পড়তে দাও৷ আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব৷’ না, তারা সে সুযোগ দেবেন না আমায়৷ কোনমতেই আমায় পাঠাবেন না রাজশাহী৷ আমায় ঢাকায়ই থাকতে হবে৷ ঢাকার ভেতর কোথাও পড়তে হবে৷ সে যেকোনও প্রতিষ্ঠান হোক, আমাকে ঢাকাতেই পড়াশুনা করতে হবে।
 
আমার রেজাল্ট ভাল৷ চান্স হল ঢাকার নামীদামী এক প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে৷ এবার বড় ভাইয়ার বারণ৷ সাথে বাবারও৷ ওখানে পড়া যাবে না, প্রচুর খরচ। খুব করে বললাম৷ তাদের মতের দ্বিমত হল না৷ তাদের সিদ্ধান্ত যা, তাই হবে। ছেড়ে দিলাম হাল৷ চুপসে গেলাম৷ ফুলের মত, ন্যাশনালে ভর্তি হলাম৷
 
তিনটা টিউশনি করাই প্রতিদিন৷ বিকাল থেকে রাত৷ রান্না করি বাসায় ফিরে৷ ঘর দোর গুছাই সকালে৷ খাইয়ে বিদায় করি বাবাকে৷ বড় ভাইয়ার কাপড় কাচি৷ দুপুরে রান্না করি৷ আম্মু সাহায্য করেন৷ দম ফেলবার সময় নেই৷ দু’ মুঠো খেয়ে দৌড়াই৷ টিউশনিতে৷ আমার জীবন এটাই৷ এই বৃত্তের ভেতরই কাটে দিন, কাটে রাত৷ এর বাইরে কিছু নেই৷ বাইরের জগতের সাথে পরিচয় নেই৷ ইউনিভার্সিটিতে যাই না৷ বন্ধু- বান্ধব নেই,প্রেমিক নেই৷ সময় কোথায় প্রেম করবার?
 
খুব সুন্দর ছিলাম ছোটবেলায়৷ কোলে নিত সবাই৷ টিপে দিত গাল৷ বাবা আমাকে সাথে সাথে রাখতেন৷ কারও কোলে খুব সহজে দিতে চাইতেন না৷ চাইতেন না কেন জানি না এখনও৷ পৃথিবীর কত রহস্যই তো জানে না মানুষ৷ এটাও একটা রহস্য, বাবা কেন্দ্রিক রহস্য।
 
দিন দিন কেমন হয়ে গেলাম৷ অবহেলার পাত্রী৷ আমার মূল্যায়ন কমতে থাকল৷ কমে গেল আদর, ভালোবাসা৷ বেড়ে গেল শাসন৷ এইট-নাইনে একা হলাম৷ স্নেহ খোয়ালাম পুরোপুরি৷ কোনও কারণ ছাড়াই৷ প্রকৃতির মত৷ যেমন বড় হই আমরা৷ মরে যাই৷ কাছে ডাকত না কেউ৷ বলত না কথা৷ খেতে বলত না৷ অফিস করতেন বাবা-মা৷ বাসায় রেখে যেতেন আমায় একা৷ রুমে আটকে রাখতেন৷ দরজার বাইরে তালা দিতেন৷ আনন্দ, ভয়, একাকিত্বে কেটেছে আমার দিন৷ আমি একাকীত্বকে সাথী করে নিঃসঙ্গতাকে আগলে বড় থেকে আরও বড় হতে লাগলাম।
 
বয়সের সাথে সাথে বাড়ল কাজ৷ কাজের লোক হলাম আমি৷ বুয়া৷ বাসায় খাটাত খুব৷ বলার জায়গা নেই৷ রাজ্যের কাজ করতে হয় আমার৷ সারাদিন ‘খিটখিট’ করে দাদী৷ ফুফুরা করে ‘গ্যাজগ্যাজ’৷ আমায় সহ্য হয় না তাদের৷ আমার সব কাজ ভুল৷ সব কিছুতেই তাদের ‘বা হাত’৷ ‘এটা এমন কেন? ওটা ওমন কেন?’ দুনিয়া জোড়া নালিশ তাদের৷ বাবার কাছে৷ মার কাছে৷ শান্তি নেই বেড়াতে গেলেও৷ কাজ আর কাজ৷ দুনিয়ার সব কাজ করতে হবে আমায়৷ আমি ছাড়া যেন কেউ নেই৷ সবচেয়ে বেশি করাতেন ফুফুরা৷ মানসিক এক অসহ্য যন্ত্রণাকে সয়ে আমি বয়ে বেড়াতাম।
 
আমার সাড়া গায়ে এলার্জি৷ অনেক আগে থেকেই৷ এখন ভয়াবহ৷ ওষুধ খেতে হয় সারা মাস৷ সমস্যা আরেকটা হয়েছে এখন৷ হাত পা ব্যাথা করে৷ সোজা করতে পারি না কোমর৷ ব্যাথায় মরে যাই৷ হাঁটতে পারি না৷ ডাক্তার বলেছে, প্যারালাইসিস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল৷ চিকিৎসা হচ্ছে না আমার৷ টাকা পয়সার খুব টান৷ টিউশনি করাতে পারি না৷ ইউনিভার্সিটি আর হাত খরচটা পাওয়া যেত৷ তাও নেই৷ বাবার কাছে চাইতেও ইচ্ছে করে না৷ চেয়েই বা কী লাভ?
 
ডাক্তারের আশঙ্কাই সত্য ফলেছে৷ প্যারালাইসিস হয়েছে আমার৷ অবশ হচ্ছে হাত-পা৷ ওষুধ পাচ্ছি না আমি৷ সেবা পাচ্ছি না৷ পাচ্ছি না স্নেহের হাত৷ অবহেলা, অনাদরে কাটছে আমার দিন৷
 
বাসায় পড়ে থাকি দিন রাত৷ মাথায় উঁকিঝু্কি দেয় ছেলেবেলা, শৈশব৷ আমি খুঁজে ফিরি সেই সব দিন৷ সেই সুন্দর আমি৷ সবাই কোলে নিচ্ছে৷ টিপে দিচ্ছে গাল৷ আহা! ভাবনা আরেকটু এগুলেই খারাপ লাগে৷ বিষাদে ভরে যায় মন৷ একটা বাচ্চা মেয়েকে ঘরে আটকে রাখা৷ এত এত কাজ৷ সবার বকাঝকা৷ বাবা মার অবহেলা৷ উফ্! ভাবতে পারি না৷
 
একাকীত্ব গ্রাস করে আমায়৷ বিরক্ত হয়ে যাই৷ হাজার রকম চিন্তা আসে মাথায়৷ এই জীবন কী দিয়েছে আমায়? এই ফ্যামিলি? আত্মীয়-স্বজন? অবহেলা, অনাদরে বেঁচে থেকে কী লাভ? স্বপ্নহীন ঘুরে? যে জীবনে স্বপ্ন নেই, নেই ভালোবাসা, সেটা জীবন? ইচ্ছা করে, চলে যাই সব ছেড়ে৷ দূরে৷ বহুদুরে, একা৷
 
রাজশাহী আমার বাবার বাড়ি৷ মা-বাবা ঢাকা এসেছেন, ঘুরতে৷ খুব ছোট আমি৷ বাবা মারা যান রোড এক্সিডেন্টে৷ মাও৷ সেই যে একা হলাম, এখনও একাই৷ এত এত মানুষের ভেতরও আমি একা৷ বাবা-মা, ভাই, ফুফু, দাদি কেউ আপন না৷ আমি কারও আপন না৷ কুড়িয়ে পাওয়া মানুষ কারও আপন হয় না৷
Facebook Comments