Friday, January 28, 2022
Home > পাঠকীয় > এক নতুন সানাইয়ের সুর

এক নতুন সানাইয়ের সুর

Spread the love

আলমগীর শাহরিয়ার

কবি ও সমাজ গবেষক



সানাই এদেশে কোনও আলোচিত মডেলের নাম আমি জানতাম না। সানাই বলতেই আমার যার নাম মনে পড়ে তিনি ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। পয়গম্বর খান ও মিঠান দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। ভারতের উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতে এক কিংবদন্তির নাম। ভারতরত্ন পদকসহ যিনি ভারতের চারটি সর্বোচ্চ বেসামরিক পদকে সম্মানিত হয়েছেন। সপ্তাহখানেক আগে হঠাৎ এক বন্ধু কথা প্রসঙ্গে সানাই নামের উঠতি এক মডেলের কথা বলল। এখনও সুপ্রভা মাহবুব বিনতে সানাই-এর নাম শুনিনি জেনে বন্ধুটি বেশ অবাক হল। তার কাছ থেকে বিস্তারিত শুনলাম। মেয়েটি আলোচনায় এসেছে কৃত্রিমভাবে তার স্তন স্ফীত করে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেরর উন্নতিতে ‘ব্রেস্ট ইমপ্লান্ট’ বা ‘সার্জারি’ করে এটা করা যায়। শোনা যায়, বলিউড তারকা শিল্পা শেঠি, শ্রী দেবী, মল্লিকা শেরওয়াত, বিপাশা বসু প্রমুখ এর আগে ব্রেস্ট ইমপ্লান্ট করেছেন।

সানাই সম্পর্কে শুনে সহজাত কৌতুহল থেকে নেটে সার্চ করলাম। দেখলাম আমারই পরিচিত এক তরুণী সানাইয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সে ভিডিও ক্লিপ ইউটিউবে আছে। লক্ষাধিক ভিউ। সেখানে মেয়েটি সাবলীলভাবে তার স্তনের আকার প্রকার সম্পর্কে বলেছে। যেসব সুহৃদ নিয়মিত আমার লেখায় চোখ রাখেন সানাই সম্পর্কে এতোটুকু পড়ে আমাকে এমন সোশ্যাল ট্যাবুর ব্রাকেটে পড়া, অগুরুত্বপূর্ণ, নিষিদ্ধপ্রায় একটি বিষয়ে লিখতে দেখে দু’কথা শুনিয়ে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আন্দাজ করতে পারছি। তাদের কেউ প্রথমত বলতে পারেন এখনও যারা সানাইকে চিনেন না তাদেরকে কেন পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। সানাইয়ে আগ্রহী করে তুলছি এসব।

আসলে এমন বিষয়ে লেখার ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন আগ্রহ ছিল না। লিখতামও না। লিখতে বাধ্য হলাম হঠাৎ এক ভিডিওতে জনৈক মাওলানার বয়ান শুনে। তিনি এক মাহফিলের ওয়াজে উপস্থিত হাজারে হাজারে হাজিরানে নিরীহ মজলিসকে সানাইয়ের ব্রেস্ট ইমপ্লান্ট সম্পর্কে বেশ রসিয়ে শুনাচ্ছিলেন বা চেনাচ্ছিলেন। সহজলভ্য প্রযুক্তির প্রভাব বা ঢেউ আজ সর্বত্র। হুজুরের বয়ানের ভিডিওটি বেশ আগের। লাখ লাখ ভিউ। ততদিন পর্যন্ত আমি সানাইয়ের নাম শুনিনি, চিনতে পারিনি। নিয়মিত হাই-স্পিড নেট ব্যবহার করি। অথচ পরিচিত দুনিয়ার আলোচিত একটি বিষয়ে আমি নালায়েক বান্দা ওয়াকিবহাল না, সম্পূর্ণ উম্মি বা অজ্ঞ। ভাববার কোন কারণ নাই আমি এক নিষ্পাপ নেটিজেন। মাছুম হিসেবে নিজেকে প্রমাণে মরিয়া। সকলের মত এসব ব্যাপারে আমারও মানবীয় কৌতুহল আছে। দেখেছিও। তবে তা কখনোই কৌতুহলের বাইরে নিয়ন্ত্রণ বা শৃঙ্খল ভেঙ্গে আসক্তির পর্যায়ে যায়নি। মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের মেমোরিতে এসব আবর্জনা বোঝাই করার কথা কোনদিন ভাবিনি। রাখিনি। কথা হলো-সানাইয়ের মত কে তার শরীর কিভাবে দেখতে চাইবে, শেপ দিবে বা আকর্ষণীয় করে তুলবে এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেটা নিয়ে শীত রাতে জমিয়ে উষ্ণ রসালাপ করার কিছু নাই। যিনি তার বর্তমান স্তনের আকারে অসন্তুষ্ট হয়ে আরও স্ফীত করেছেন সেটাও ভিডিও বিজ্ঞাপনে দুনিয়াকে জানানোর কিছু ছিল না—এ কথাই সবাই বলবে। কিন্তু তিনি সে গল্প চাউর করেছেন কারণ তার জনপ্রিয় ব্যবসায়িক বুদ্ধিসুদ্ধি বা টার্গেট থেকে।

বেশ আগে কৌশিক গাঙ্গুলির ‘শূন্য এ বুকে’ নামে চমৎকার একটা মুভি দেখেছিলাম। রূপা গাঙ্গুলি ও চূর্ণি গাঙ্গুলি সেখানে অভিনয় করেন। চূর্ণি এক অভিজাত পরিবারের মেয়ে। তাঁর মায়াময় সুন্দর রূপ দেখে আর্ট কলেজের সবচেয়ে মেধাবী হাবাগোবা ছেলেটি চূর্ণির প্রেমে পড়ে যায়। মেয়েটির পারিবারিক অনাগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু বাসর রাতে ঘটে এক কাণ্ড। ছেলেটি আবিষ্কার করে চূর্ণির স্তন বলতে কিছু নেই। মেয়েটির শরীর বা মাংসের প্রতি তার অপার মোহ বা স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। তারপর তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। অনেক বছর পর কাকতালীয়ভাবে তাদের দেখা হয় এক সমুদ্র সৈকতে। তারা ঘুরতে গেছে। চূর্ণির সঙ্গে তাঁর নতুন বর ও ছোট্ট একটি ছেলে। আকস্মিক দেখা হয়ে যাওয়ার পর সব নীরবতা ভেঙ্গে এক সময় চূর্ণি তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক ও স্বামীকে জানায় সে এখন সুখী বিবাহিত জীবন যাপন করছে। তাঁর ছোট্ট ছেলেটি মায়ের স্তনদুগ্ধ খেয়েই বড় হচ্ছে। হরমোনাল ইমব্যালেন্সের কারণে সে সময় তাঁর স্তন স্বাভাবিক না হওয়ায় বিদেশে যেয়ে সার্জারির মাধ্যমে সব ঠিক করে নিয়েছে। এবং এখন স্বাভাবিক সুন্দর এক জীবন সে যাপন করছে। চূর্ণির আর সানাইয়ের সাবজেক্ট এক। কিন্তু উদ্দেশ্য ও বিধেয় সম্পূর্ণ আলাদা।

লেখার প্রথমাংশ পড়ে কেউ যদি আমার বিরুদ্ধে কিছু লেখার প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন সবটুকু লেখা পড়ে তারা নিশ্চয়ই এতক্ষণে রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। মানব শরীররের বা জীবনের যেকোন গোপন বিষয় নিয়ে স্বাভাবিক আলোচনা একে আর অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রাখে না। স্বাভাবিক করে তুলে। স্বাভাবিক না হলেই নিষিদ্ধ মনে হয়। নিষিদ্ধে মানুষের কৌতুহল বাড়ে। তাই দেখি বাংলাদেশ থেকে গুগল সার্চে শীর্ষে থাকেন পর্ণ তারকা সানি লিওন, মিয়া খলিফা, নায়লা নাঈম প্রমুখ। শহরে পাড়ার মোড়ে মোড়ে বা গ্রাম গঞ্জের কম্পিউটার ও সিডির দোকান থেকে আজকাল উঠতি তরুণদের সহজলভ্য ফোনের মেমোরি কার্ড ভরে পর্ন ভিডিও নিতে দেখা যায়। বিকৃত যৌনাচার দেখে এদেরও অস্বাভাবিক যৌনাচারণের জন্য আমরা কী কিছু ভাবছি? সমাজে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে তা রোধে আমাদের প্রস্তুতি কী? নাকি প্রযুক্তি প্রভাবিত দুনিয়ায় এরকম নানা নিষিদ্ধে তাদের সহি বা অসহি তরীকায় শুধু উসকে দিচ্ছি?

Facebook Comments