Monday, January 17, 2022
Home > গল্প > বাঘ বিধবা-৩ – কিঙ্কর আহ্সান

বাঘ বিধবা-৩ – কিঙ্কর আহ্সান

Spread the love

বাইরে তুমুল শীত। কুয়াশার শরীর টিকে থাকার চেষ্টা করে সূর্যের সাথে লড়াই করে। আকলিমা রান্নাঘরের টিনের ফুটো দিয়ে বাইরের যতটুকুন দেখা যায় দেখে নেয়। কেউ নেই। সব ঘরে লুকিয়ে। বের হয়নি বাঘের ভয়ে।
আকলিমার তোজাম্মেলের কথা মনে পড়ে। এলাকার সর্দার। ডাকাতের মতন চেহারা। শরীরে তাকতের কমতি নেই। মেয়ে মানুষ গিলে খেয়ে ফ্যালে। এক হাত লম্বা জিহ্বা মনে হয় লোকটার। এই লোকের ফাঁদেই পড়েছে আকলিমা। ইচ্ছে করেই পড়েছে। মরদ দরকার তার। মোর্শেদ আলীর মতন ঢিলেঢালা লোক তার পোষায় না। ভালো লাগে তোজাম্মেলকে। ভালোবাসে সে।
তোজাম্মেল এখন বনে। এই সময়ে নিজের দল নিয়ে জঙ্গলে যায় সে কাঠ আর মধু আনতে। বনে গেলে আলগা মাথায় চলাফেরা বারণ স্ত্রীদের। রান্নার জন্য মরিচ পোড়ানো নিষেধ। যাবেনা শরীরে সাবান ঘষা। সব ধরনের ভাজা পোড়া বন্ধ একদম। এসব মানতে হয়। নাহলে অমঙ্গল।
তোজাম্মেলের স্ত্রী নেই। মরেছে নিউমোনিয়া হয়ে। তোজাম্মেলের হয়ে এসব রীতিনীতি পালন করছে আকলিমাই। বিয়ে কিন্তু তাদের হয়েছে। গত অগ্রহায়নে। মোর্শেদ আলী বাড়ি থেকে এক সপ্তাহ ধরে নাই হয়ে গেল। আকলিমা তখন মুক্ত বিহঙ্গ। তোজাম্মেলের সাথে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা। উদ্দাম জীবন। দুটো শরীর একে অপরের ভাষা বোঝে। সাড়া দেয় দারুণভাবে। এই তো ভালোবাসা। স্পর্শ যার আরেক নাম। সেবারই গোপনে বিয়েটা সেরে নেয়। তবে কথাটা গোপন থাকেনি। গ্রামের লোকজন কিছুটা বুঝেছে। বুঝেছে তাদের মেলামেশার বিষয়টা। বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়েছে সেটা আঁচ করেনি। আর অতটা ভাবাও নিষেধ। এই সমাজে এটা কঠিন পাপ। সর্দার হলেও তোজাম্মেল অন্যের বউকে নিজের করতে পারেনা। মোর্শেদ মরলেই তখন আকলিমাকে নিজের ঘরে আনার বিধান আছে। মোর্শেদ মরবে কবে?
গ্রামের লোকজন মোর্শেদকে আকলিমার ব্যাপারটা বলতে চায়। কিন্তু মোর্শেদের মতন গাবড়কে বলে কি লাভ? সংসারের প্রতি খেয়াল নাই এই ছাওয়ালের। মা মারা যাবার পর এই সংসারটা দেখার কেউ নেই। মোর্শেদ তো শুধু বাঘ, বাঘ করেই কাটায়। দাদা, বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ। অবুঝ, মূর্খ লোক বটে! তাই আকলিমা আর তোজাম্মেলের অবাধ মেলামেশা চলতে থাকে।
আকলিমা তোজাম্মেলকে আরো কাছে চায়। এমন বুনো লোককে বেঁধে ফেলার মধ্যে আনন্দ আছে। মেয়েদের এই যেন অর্জন। এই পালিয়ে পালিয়ে আর কতদিন? তোজাম্মেলের সাথে সংসার গোছাতে হবে। সন্তান সন্ততিতে ভরে ফেলতে হবে ঘর। শেকড় গড়তে হবে। এইতো শান্তি!
মোর্শেদই প্রধান বাঁধা। মোর্শেদকে আজকাল আর একদমই ভালো লাগেনা আকলিমার। তাছাড়া তোজাম্মেল কাছে নেই বলে মনও বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। অবশ্য আকলিমা চেয়েছিলো এটাই হোক। বনে থাকলে ফায়দা। কেউ সন্দেহ করবেনা।
আকলিমা খাবার নিয়ে আসে। মোর্শেদের ক্ষিধে পেয়েছে। সে আকলিমাকে সাথে খেতে বলে। আকলিমা খায়না। সে তোজাম্মেলের জন্য স্ত্রীর নিয়ম কানুন মেনে চলছে। সে এড়িয়ে যায়। মোর্শেদ জোরাজুরি করেনা। এসব তার ধাতে নেই। সে খেয়ে নেয়। আকলিমার রান্না ভালো হয়েছে। মৃত্যুর আগে ভালো রেধেছে তার বউ। সে খাওয়ায় মনযোগ দেয়। খেয়েই পুতাটা বের করে আঘাতটা করতে হবে।
আকলিমা মোর্শেদ আলীর খাওয়া দ্যাখে। ক্যামন হাভাতের মতন খাচ্ছে লোকটা। কোনোদিকে কোনো খেয়াল নেই। এটাই তো চায় আকলিমা। সে উঠে যায় রান্নাঘরের দিকে। ফিরে আসে অল্পসময়ের ভেতরেই। হাতে বটি। মোর্শেদ আলী মাত্র ভাত চিবোতে চিবোতে গেলার জন্য যখন একটু পানি খেতে যাবে ঠিক তখনই গলায় একটা কোপ বসিয়ে দেয় আকলিমা। যুতসই কোপ।
মোর্শেদ আলীর শরীর দুর্বল। এক কোপেই ঘায়েল। কোনো ঝামেলা করেনা। লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। হালকা শরীরের লাশটা ধরে দরজার একটু দূরে বাইরে ফেলে রেখে আসে আকলিমা সহজেই। কোনো লোকজন নেই আশেপাশে। করুণাময় আজ তার সাথেই আছেন।
ঘরে ঢুকে খিল আটকায় সে। তারপর নিপুণহাতে রক্তটা পরিস্কার করে। ধোয়া মোছার কাজে সে ভালোই তাছাড়া মোর্শেদের শরীরে রক্ত কম মনে হয়। তেমন রক্ত তো ছড়ায়নি।
এরপর আকলিমা অপেক্ষা। এই সময়ইটা কষ্টের। করুণাময়কে সাথে থাকতে হবে। সাথে থাকতে হবে বাঘদেবতাকে। বাঘ আসুক। ছিড়ে-খুবলে খাক মোর্শেদের শরীর। তবেই বেঁচে যাওয়া। তবেই স্বপ্ন পূরণ। তবেই তোজাম্মেলের সাথে থাকার সুযোগ।
মোর্শেদ বাঘের হাতেই মরবে এতো জানা কথা। সারাজীবনই প্রতিশোধ আর বাঘ, বাঘ করে কাটলো। এমনই হবার কথা মোর্শেদের সাথে। কেউ সন্দেহ করবেনা।
বাঘ আসতে হবে। এসে এমন ভাবে খুবলে খাক মোর্শেদকে যাতে গলার কোপটা খুঁজে না পাওয়া যায়। একদমই ঠাওর করা না যায় যে এটা মোর্শেদ ছিলো।
প্রার্থনায় বসে আকলিমা। তার ভালোবাসা যেন জয়ী হয় এই চাওয়া। সে তেমন কিছু তো চায়নি কখনও প্রভুর কাছে। শুধু তোজাম্মেলের সাথে ঘর বাঁধতে চেয়েছে। আর এটার জন্য মোর্শেদের সাথে এমন করা ছাড়া উপায় ছিলো না। করুনাময় তার প্রার্থনা শুনুক। সে অপেক্ষা করতে থাকে। সদ্য বিধবা হওয়া বাঘবিধবা আকলিমার চোখ ভেজে জলে। ‘ও খোদা, ও বাঘদেবতা নিরাশ কইরো না।” এই তার প্রার্থনা। বাঘ আসবে। আর তখন শুরু করতে হবে বিলাপ। স্বামী হারানোর বিলাপ। সব সাজিয়ে রেখেছে ঠিকঠাক। শুধু বাঘটা আসুক। ভালোবাসার জয় হোক। পৃথিবীতে ভালোবাসারই জয় হয়েছে বরাবর। আজও হবে।
অপেক্ষায় সময় যায় আকলিমার। ভালোবাসা মেশানো করুণ, কঠিন অপেক্ষা।
করুণাময় তার ডাকে সাড়া দিক। আমরা যারা ভালোবাসার সাথে আছি তারা চাই চলুন, প্রভু যেন আকলিমার সাথে থাকে। আর মোর্শেদ? ও নিয়ে ভাবার কি আছে? যে যাবার সে তো যাবেই।
পৃথিবী অযথা, দুর্বল লোক পছন্দ করে না। সেসব তার ধাতে নেই।
ধাতে থাকার কথাও না। কথা কি?

<- বাঘ বিধবা প্রথম পর্ব

<- বাঘ বিধবা দ্বিতীয় পর্ব

Facebook Comments