Monday, January 17, 2022
Home > গল্প > বাঘ বিধবা – কিঙ্কর আহ্সান

বাঘ বিধবা – কিঙ্কর আহ্সান

Spread the love

আতংকে রাত কেটেছে সিংগীমারি গ্রামের লোকদের।
ফুলো ফুলো চোখ, চোখের কোনে অল্প পিচুটি মোর্শেদ আলির। দু-চারটা গেঞ্জির ওপরেও শাল জড়িয়েছে সে। পড়নে বাটিক লুঙ্গি। পায়ে লাল মোজা আর স্যান্ডেল।
সে’কি শীত! দুধ-সাদা কুয়াশায় এক হাত দূরের কিছুও দেখা যায়না। বরফের মতন হাওয়া হাত, পা, কানের খোলা জায়গায় এসে ঝাপটা মারে। মনে হয় ছুরি দিয়ে শরীর চিড়ছে কেউ। দাতে দাত লেগে যায়। কাঁপুনি ধরে।
তাছাড়া আলির শীত একটু বেশিই। নাক বন্ধ থাকে শীতের সময়। কফ জমে বুকে। সারাদিন খক খক কাঁশি আর কফ ফেলা। বেশির ভাগ সময়েই গিলে ফেলা হয় কফ। ঘর নোংরা করলে বউ রাগ দেখায়।
মোর্শেদ আলির গলা জ্বলে। কষ্ট হয়। কাঁশির দমকে কঠিন যন্ত্রনা। সে সেই যন্ত্রনা চেপে রাখতে চায়। পারেনা। কাশি তার কথা শোনেনা। বেয়ারা কাশি।
সকালের দিকে কাশিটা বাড়ে। কেন বাড়ে জানা নেই। কাশতে কাশতে বমি হয়ে যায়।
কিছুক্ষন আগেই সকাল হয়েছে। আলো কাটছে ধীরে ধীরে। রোদ আসতে সময় লাগবে। কুয়াশার জালে এখনও বন্দী রাতের অন্ধকার। এই অন্ধকারকে সরিয়ে সূর্যের দখল নিতে সময় লাগবে বোঝা যায়।
কাশি দিতে দিতে মোর্শেদ আলি চুলায় পাতিল বসায়। বউ আকলিমার ঘুম ভাঙাতে চায়না। নিজেই একটু পানি গরম করে। গরম পানিতে গলায় আরাম হয়। পানিতে একটু মধু মেশাতে হয়। সুন্দর বনের খাঁটি মধু। মধু কাশির জন্য ভালো।
আকলিমা ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে দুটো চালও বসিয়ে দেওয়া যায়। একটা আলু সিদ্ধ। ভর্তা, কাচামরিচ দিয়ে ভাত। স্বামীর কাজ দেখে আকলিমা খুশি হবে।
মোর্শেদ আলী ঠিক করেছে আকলিমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেবে। এই সোহাগ আকলিমার পছন্দ হবার কথা না। তাদের সম্পর্কের মিষ্টি রস ফুরিয়েছে অনেক আগেই। এখন শুধু তিক্ততা। একদম করলা তিতা।
বিষয়টা অস্বাভাবিক না। বিয়ের কিছুদিন পরেই সম্পর্ক শীতের মতন নির্জীব হয়ে যায়। দুটো শরীর প্রয়োজনের তাগিয়ে তখন মিশে যায় ঠিকই কিন্তু উত্তাপ ছড়ায় না। চুমোচুমি ঢের হয় তবু তাতে ভালোবাসার ঠাই হয়না।
এমন তার বাবা আর মায়ের ক্ষেত্রেও দেখেছে মোর্শেদ আলী। ছোটবেলা থেকেই তার কড়া চোখ। এড়ায় না কোনো কিছু। তীক্ষè নজর সবদিকে।
মায়ের চেয়ে সুন্দর বন বেশি পছন্দ ছিলো বাবাটার। পশুর নদীর গর্জন শুনলেই তার মাথা খারাপ হয়ে যেত। মোটা চালের ভাত আর কোন্দ আলুর ঝাল ঝাল বিদঘুটে একটা তরকারী খেয়ে রোজ দুপুরে সে বের হয়ে যেত নৌকাটা নিয়ে। পশুর আর সন্ধ্যা নদীর অলিগলি চষে বেড়ানো হয়েছে তার। বনের গভীরে, একদম গহীনে কাঠের জন্য যেত বাবা। সাথে থাকত মোর্শেদ আলী। তোবড়ানো একটা টিনের ডিব্বায় মা খাবার দিয়ে দিতো। ওটা থাকতো মোর্শেদ আলীর হাতে। এক হাতে বৈঠা আরেক হাতে ডিব্বা। বাবা কুড়াল পাশে রেখে নৌকার পাটাতনে কাত হয়ে শুয়ে গান ধরতো। ‘ওরে হৈ হৈ, জোয়ান মরদ বয়সের আগে হইলো বুড়া/ নাইরে বিবির সোহাগ/আনিতে রস ছোবল দিলো শঙ্খচূড়া…।’
একটা সময় নদী ছেড়ে নৌকা ঢুকতো খালে। নালার মতন ছোট্ট খাল। সে নালার শরীর চিড়ে ধীরে ধীরে নৌকা যেত গহীনে। এতটা গহীনে যেখানে বনকর্মীরা তো দূরের কথা, জলদস্যুরাও আসতো না। শুধু বাতাসের সো সো আওয়াজ। জলের ওপর বৈঠার ছলাৎ আঘাত। ভুতুড়ে পরিবেশ। মোর্শেদ আলীর ভয় ধরতো। বলতো,‘বাপজান, ডর লাগে। ফিরা যাই লন।’ তার বাবা হাসতো। বলতো, ‘পুরুষ মাইনষের কইলজা হইতে হইবো পাহাড়ের মতন। এক বিঘৎ হইলে চলবো?’ শুনে মোর্শেদ আলী চুপ যেত। ছোটবেলা থেকেই তার পৌরুষত্ব টনটনা। তবে এদিকে বাঘের ভয় আছে। শুনেছে অন্যদের কাছে। বাঘ জনবসতির কাছে এসে নিত্য টেনে নিয়ে যায় ছাগল, গরু। একটা বাঘ না, অনেকগুলো বাঘ। মোর্শেদ আলীর ভয় তাই কমতো না। ইচ্ছে না থাকার পরেও তাই থেকে থেকে বলতো, ‘ও বাপজান। ফিরা যাই না।’ বাবা হাসতো। ভয়ংকর রকমের ক্ষয়ে যাওয়া হলুদ দাত বের করে হাসতো। বেশি গহীনে ঢুকলে মোর্শেদ আলী বাবার বন্ধু হয়ে যেত। বাবার কথার আগল ছুটতো তখন। কতসব কথা। জীবন, চাওয়া, পাওয়া এই সব। মাকে নিয়েও বলতো এ সময়। বলতো,‘তোর মা’রে রাখা যাইবো না। নতুন মা আনুম তোর লাইগা। সোহাগ-আদরের কমতি হইবো না।’
এই এইভাবেই এক একটা দিন যেত। বাঘ আর ধরতো না। কাঠ নিয়ে ফেরা হতো বাড়ি। মোর্শেদ আলী হাঁফ ছেড়ে বাঁচতো। জীবন নিয়ে ফেরা।
বাবা একা গিয়েছিল একদিন। গোলপাতার ঝোপে কুড়াল দিয়ে কোপ দেবার সময়ে পেছন দিয়ে আঘাত করে বাঘ। গলা, কাঁধ, বুকে বাঘের থাবার আঘাত। রক্তে ভিজে একশেষ।
মোর্শেদ আলীর মা কেঁদে কেঁদে বনকর্মীকে বলছিলো, ‘আমারে কইলো কাপড়-চোপড় পরিষ্কার কইরি রাখতি। জঙ্গলে যাইবো। আমি জামা-কাপড় পরিষ্কার কইরে রাখলি দুপুরে গরম ভাত খাইয়া বাদায় (বনে) যায় লোকটা। বিকালেই জাইলেরা এসে খবর দেয়, মোর্শেদের বাপ বনে বাঘের খপ্পরে পইড়িছে। তারপর সব শেইষ। লোকটা বাঁইচলোনা।’
এই কান্না কাজে লাগে। বনকর্মীদের মন গলে। তারা মায়ের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে দেয়। সরকার বাঘ বিধবাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেছে। মোর্শেদের বাবার আর নতুন মা আনা হয়না। লোকটা এর আগেই হাওয়া হয়। মোর্শেদ পায়না নতুন মায়ের আদর-সোহাগ। অভিমান হয়। শুরুতে অভিমান, তারপর রাগ, কঠিন রাগ। বাঘের ওপর রাগ। বাঘের কারণে নতুন মা’টা আসতে পারলো না। বাঘের শাস্তি হওয়া দরকার। মোর্শেদ প্রতিশোধ নেবে। কঠিন প্রতিশোধ।

বাঘ বিধবা দ্বিতীয় পর্ব>

বাঘ বিধবা তৃতীয় পর্ব>

Facebook Comments