Friday, January 28, 2022
Home > গল্প > চিরকুট – জারীর আরমান

চিরকুট – জারীর আরমান

Spread the love
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালবাসে
এই মুহুর্তে আমি বসে আছি জয়পুর শহরের একটা হোটেল রুমে। আমার সামনে টেবিলের উপর রাখা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের বিখ্যাত উপন্যাস “লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা”। আর হাতে একটা চিরকুট। নীল রঙের কালিতে গোটাগোটা হস্তাক্ষরে লেখা
 
“do you still have feeling for me?”
 
চিরকুটটা বইয়ের মধ্যেই ছিল। বইটা আমাকে উপহার দিয়েছে ঈশিকা। ঈশিকাকে জানতে হলে আমাদের একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে হবে।
 
বাতসের মতন অবাধ
বয়েছে জীবন
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ঈশিকাকে আমি প্রথম দেখি যখন ও ক্লাস সেভেনে পড়ে। তখন আমিও চোদ্দ বছরের কিশোর। তাই প্রেম বা এর কাছাকাছি কোন শব্দের সাথে আমার তখনো জানাশোনা ছিলো না, থাকার কথাও না। সিথানে তখনো তিন গোয়েন্দা গড়াগড়ি খায়। তবে প্রথম দেখাতেই প্রেম বলে যে বহুলপ্রচলিত বাক্যটা আছে, আমার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছিলো। তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছিলাম। আমি অতটা ডানপিটে বা চঞ্চল ছিলাম না যে সেই একদিনের ভাল লাগায় ওর জন্য দিওয়ানা হয়ে পড়বো। কিন্তু বন্ধু নামের আজব প্রাণীরা তো আছেই। যতটা আমি চেয়েছিলাম তার থেকে বেশি ওরাই প্রচার করে দিলো ঘটনাটা। দশ কান হয়ে কথাটা এইভাবেই ঈশিকার কাছে পৌছেছিলো। এইটুকুই শেষ। আমি ঠিকই চেয়েছিলাম যে আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক হোক, সেটা প্রেম বা যাই বলি। কিন্তু তার জন্য বিভিন্ন কারনে খুব বেশি উদগ্রীবও ছিলাম না আমি। তো খুব গাঢ় না, আবার একদম ফিঁকেও না, মাঝামাঝি একটা রেখা দিয়ে স্কুল লাইফটা পাড় করলাম।
এরপর তো স্কুল শেষ করে ঢাকায় পাড়ি জমালাম। সে আরেক জীবন। চারপাশে এত গতি, এত বেগ,এর মধ্যে আবেগের জায়গা কোথায়। আছে, আবেগের জায়গা আছে। মাঝরাতে কফির মগটা নিয়ে ছাদে গিয়ে যখন দাঁড়াতাম। ফ্লাইওভারের নরম আলোতে পুরো শহরটা রহস্যময় লাগতো।
তখন ভাবতাম জীবনের নানা দিক। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির নাম তো জীবন না। তবুও যেহেতু মানুষ, তাই ভাবতে হতো। কৈশোর, পরিবার, গ্রাম, বন্ধু, পিতা। জীবনের উপাদান তো এসব ই। এসব ই তবে এর সাথে ছোট করে হলেও টের পেতাম আরেকটা নাম। ঈশিকা। হবে না হবে না করে কিছুই হয়নি, শুধু নামটাই বেঁচেছিলো খুব গোপনে।
গ্রাম ছাড়লেও মাঝেসাঝে ওর কথা কানে আসতো। কী পরিক্ষা দিলো, রেজাল্ট কী হলো এসব। আগেই বললাম বন্ধুদের কথা, ওদের কল্যাণেই। আমার তখনো পড়ালেখা শেষ হয়নি। এসবের দিকে তাকানোর সময় কোথায়। হঠাৎ একদিন শুনলাম ওরা স্বপরিবারে কানাডা চলে যাচ্ছে। ঈশিকার বড় ভাই ছিলো কানাডা প্রবাসী, উনার কাছে। ওর থেকে আমার তো কিছুই পাওয়ার ছিলো না আর, কিন্তু কেন জানি প্রচণ্ড মন খারাপ হয়েছিলো শুনে। তবুও জীবন থামেনি, থামবেও না। সে ঘটনার পর কয় বছর কেটে গেছে সেটা গুণে দেখতে হবে।
 
বারবার আসি আমরা দুজন
বারবার ফিরে যাই
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
এত বছর পর ঈশিকার সাথে এখানে এসে দেখা। আমি জয়পুর এসেছি অফিসের কাজে। আমার অভ্যাস যেখানেই যাই আগে বইয়ের দোকান ঘুরে দেখি। আহমদ ছফার “যদ্যপি আমার গুরু” তে প্রফেসর রাজ্জাকের এই কথাটা পাওয়া যায়। পণ্ডিত রাজ্জাকের উপদেশের কারনে আমি বইয়ের বাজারে যাই এমন না। বই দেখতে ভাল লাগে তাই যাই। অনেক বই দেশে পাওয়াও যায় না, বাইরে গেলে খুঁজে খুঁজে কেনার চেষ্টা করি। তো জয়পুরে বইয়ের যে বড় মার্কেটটা, সেখানে গিয়েছি একদিন সন্ধায়। নাম না জানা কত লেখকের বই। চেতন ভগত, অরুন্ধতী রায়দের অবস্থান চোখে পড়ার মত। মজার ব্যাপার হলো অরুন্ধতী রায়ের বই ই কিন্তু একটা। “দ্য গড অব স্মল থিং”। ম্যান বুকার জয় হয়তো বইটার
বিক্রির বাজার ধরে রেখেছে । আর চেতন তো এই সময়ে ভারতের বেস্টসেলার লেখক। তার বই স্বাভাবিক ভাবেই থাকবে। মার্কেটের পরিবেশটা বেশ মনোরম। খুব বেশি লোকজন নেই, খণ্ড খণ্ড মেঘের মত মানুষজন ঘুরে বেরাচ্ছে। এই পাতলা ভিড়ের মধ্যে আমি দূর থেকে একটা মেয়েকে লক্ষ করলাম। লক্ষ করার কারন দূর থেকে দেখতে মেয়েটাকে ঈশিকার মত দেখাচ্ছিল। ছিপছিপে গড়ন, ধবধবে ফর্সা। ঈশিকার চেহারাটা মানসপটে ভেসে উঠলে একটা কবিতার লাইন মনে পড়ে আমার।
 
“সাদা বকের ডানার মত তুমি”।
 
ওটা যে ঈশিকা না সেটা আমি জেনেই বার বার তাকাচ্ছিলাম। এমন আমার অনেকবার হয়েছে। একবার তো ফার্মগেটে একজনকে দেখে বাস থেকে নেমে পড়েছিলাম। আরেকবার নিউ মার্কেটে একটা মেয়েকে ঈশিকা ভেবে লজ্জায় পড়তে হয়েছিলো। এসব অভিজ্ঞতা থেকে কাউকে দেখে সন্দেহ হলেও আর এগিয়ে যাই না। কিন্তু বুকশপের মেয়েটাকে দেখে আমার মনে হলো এ মেয়ে ঈষিকা না হয়ে যায় না। অবশ্য নিশ্চিত হওয়াটা কঠিন ছিলো, কারন প্রথমত ওকে শেষ কবে দেখেছি মনে নেই, দ্বিতীয়ত ওর থাকার কথা আমেরিকা বা কানাডায়। তার উপর এই ভয় তো ছিলই যে যদি এড়িয়ে যায়। অবশ্য বিদেশের মাটিতে প্রাণঘাতী শত্রুকেও বন্ধু বলে মনে হয়। তো সাহস করে এগিয়ে গেলাম। চোখেচোখ পড়তেই ওর মুখটা একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তখন পুরো নিশ্চিত হলাম যে এটা ঈশিকাই। কথা হলো। আমাদের মধ্যকার একশো কোটি বছরের নীরবতার ইতি ঘটলো। আমি কোত্থেকে আসলাম, ওই বা এখানে কেন। জানলাম, জানালাম। পড়ালেখার সুবাদে ও দুই বছর হলো ইন্ডিয়াতে আছে। কি একটা বিষয়ে রিচার্স করছে। বাবা মা আর ছোটবোন ঈশিতা কানাডা চলে গিয়েছে,ও যায়নি। ঢাকায় এক মামার বাসায় থেকে গিয়েছিল। এই ফাঁকে আমরা পাশের একটা কফিশপে চলে এসেছিলাম। কথা বলতে গিয়ে আমি ঈশিকার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। সেই কৈশোরকাল মনে পড়ে যাচ্ছিলো। এই সেই চোখ, পিঙ্গলবর্ণ চোখ। একদিন খুন হয়েছিলাম এই চাহনিতে। টুকটাক কিছু কথার পর সেদিনের মত আমরা উঠলাম। আমি যে হোটেলে উঠেছি তার থেকে বিপরীত দিকে ওর বাসা। তো স্বাভাবিক ভাবেই দুজনের দুদিকে চলে যেতে হলো। তবে কথা হলো আবার দেখা হবে। আগামীকাল সন্ধায়, এখানেই।
পরদিন যথারীতি দেখা করলাম। আশেপাশে ঘুরলাম। কিছু কেনাকাটা করলাম। কোথাও গেলে ছোট বোনের জন্য গিফট আমার কিনতেই হয়। ওকে সাথে নিয়েই কিনলাম। আমার সাথে ওর ইজি হওয়ার ব্যাপারটা খুব ভাল লাগছিলো। একারনে না যে একদা ওর প্রতি আমার একটা বিশেষ অনুভূতি ছিলো, বরং এই কারনে যে এসব ক্ষেত্রে মেয়েরা ওই পুরুষটাকে আর স্বাভাবিক ভাবে নেয় না কোনদিন। অথচ ইশিকা আমার সাথে খুব ফ্রেন্ডলি বিহ্যাভ করছিলো। সেদিনো আমি চলে আসলাম। পরের যে কয়েকদিন ছিলাম আরো কয়েকবার মিট করলাম । মাঝে একদিন ছুটির দিন ছিলো। সেদিন জয়পুর ঘুরে দেখালো ইশিকা। জলমহল, অম্বর প্যালেস, মিউজিয়াম এসবের কথা বইয়ে পড়েছিলাম শুধু। এমনিতেই জয়পুর ইণ্ডিয়ার পর্যটন কেন্দ্রগুলির একটা। তো এখানে আসা মানে এসব না দেখে ফেরা না। কিন্তু ঈশিকাকে সাথে নিয়ে দেখা মানে আরো কিছু। এইভাবে দিন ফুরোলো। পরদিন ভোরে কলকাতার ফ্লাইট। সন্ধায় একটা রেস্তোরাঁয় বসলাম আমরা। অন্যদিনের তুলনায় ওকে একটু অনমনা দেখাচ্ছিলো। আগেই বলেছি ঈশিকার ব্যাপারে আমার আর কিছু পাওয়ার ছিলো না। তাই এটাকে বিচ্ছিন্ন কিছুই ধরে নিলাম। গল্পের ফাঁকে ঈশিকা ওর ব্যাগ থেকে গিফট পেপারে মোড়ানো বইটা বের করে দিলো। বললো “আপনার জন্য”। মৃদু হেসে সৌজন্যতামূলক থ্যাংকস বললাম। আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিলো ডিনার করবো। ডিনার সেরে আরো কিছুক্ষণ গল্প করলাম। এবার যাওয়ার সময় হলো। হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে হোটেলে ফিরলাম। যেভাবে বললাম ব্যাপারটা এত সহজও ছিলো না।
হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে এই এখন বসে আছি চিরকুট হাতে। আমার জন্য রাস্তা এখন দুইটা। সুন্দর একটা ঘুম দেয়া। ঘুম থেকে উঠে ফ্লাইট ধরা। অথবা একটা গোলাপের তোড়া হাতে ঈশিকার বাসার সামনে গিয়ে ওকে চমকে দেয়া।
 
শেষচিত্র
 
নতজানু হয়ে ছিলাম তখনো
এখনো যেমন আছি
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পরদিন সকালে কলকাতাগামী ফ্লাইট ঠিকই ফিরলো। কিন্তু একটা সিট খালি নিয়ে। বিমানের সেই যাত্রীকে দেখা গেল পিঙ্ক সিটি জয়পুরের রাস্তায় গোলাপের তোড়া হাতে।
Facebook Comments