Saturday, January 22, 2022
Home > দেশ > বই নিয়ে প্রশ্ন “বই কেন পড়তেই হবে?”

বই নিয়ে প্রশ্ন “বই কেন পড়তেই হবে?”

Spread the love
সম্পাদক অক্ষর বিডি
আজকের সাক্ষাৎকারের বিষয় ‘বই পড়া’। কিছুটা ছন্নছাড়াভাবেই শুরু করছি। আমার দুই ধরণের বন্ধু আছে। এক শ্রেণির বন্ধুরা অনেক বই পড়ে, আর অন্য শ্রেণির বন্ধুরা একদমই উল্টো।
বেশ অনেকদিন ধরেই আমাকে “বই কেন পড়তেই হবে?” চিরায়ত এই প্রশ্নটির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মূল প্রশ্নটিকে সঙ্গ দিচ্ছে কিছু সহপ্রশ্ন। যেমন, ‘সবাই এত বই কেন পড়ে? বই পড়ে লাভ কী?’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বহুবার দিয়েছি, কিন্তু প্রশ্নকর্তার কৌতুহল মেটানোর জন্য তা পর্যাপ্ত ছিল না বলে আমার বিশ্বাস। নিজের উত্তর তো নিজের কাছে আছেই। মনে হল কেন না অারও কিছু বইপ্রেমীর শরণাপন্ন হই! তাই আমি এরকম একটা সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন অনুভব করলাম। এখানে বই পড়তে ভালবাসে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর তেমন কিছু মানুষের কাছে আমি সেই একই প্রশ্ন করেছি, “বই কেনও পড়তেই হবে?” এই প্রশ্ন করা হয়েছে, একজন প্রকাশক, একজন ঔপন্যাসিক ও নির্মাতার, একজন সম্পাদক, একজন কথাসাহিত্যিকের, একজন কবি গল্পকার ও আরজে, একজন প্রাবন্ধিক গবেষক ও অধ্যক্ষ, এবং একজন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা যে কিনা সবাইকে বই পড়ানোর জন্য মানুষের দ্বারে দ্বার যাচ্ছে, এমন সাত জন মানুষের কাছে।
আজ তাদের মুখ থেকেই শুনব এই প্রশ্নের উত্তর।
উত্তরকারীরা যেভাবে বলেছেন আমি অক্ষর বিডিতে ঠিক সেভাবেই উপস্থাপন করলাম।
সাদাত হোসাইন, কথাসাহিত্যিক ‍ও নির্মাতা
সাদাত হোসাইন : আমার মনে হয় বই পড়া অবশ্যই জরুরী। তবে তারচেয়েও বেশি জরুরী জীবন পড়া, জীবন পাঠ করতে পারা। অর্থাৎ আমাদের যাপিত জীবন, রোজকার জীবনের গল্প, চারপাশের মানুষ, জগতটাকে অনুভব করতে পারা। অনুভূতিগুলোকে উপলদ্ধি করতে পারা। এগুলো বই পড়ার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই সংবেদনশীল অনুভূতি যদি আমাদের ভেতর না থাকে, তাহলে শত বই পড়েও লাভ নেই। তবে হ্যাঁ, বই এই অনুভূতিগুলো, ভাবনাগুলোকে উন্মুক্ত করে দিতে পারে। সংবেদনশীলতাকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কিন্তু জীবনকে অনুভব করার, পড়তে পারার ইচ্ছেটা থাকতে হবে সবার আগে। কারণ বই থেকে জীবন হয় নি, জীবন থেকে বই হয়েছে। সুতরাং সবার আগে পাঠ করতে পারতে হবে, জানতে হবে জীবন। জীবনের গল্প, গল্পের জীবন…
রাজীব চৌধুরী, প্রকাশক, চৈতন্য প্রকাশনী
রাজীব চৌধুরী : সভ্যতার বিনির্মাণে মানুষের চিন্তার জগত ক্রমশও প্রসারিত হয়ে আসছে । বই তার অন্যতম নিয়ামক। শিশুবেলা থেকে যার বইপড়ার অভ্যাস এরপর পরিপূর্ণ বয়সে এবং সেই মৃত্যু অবধি চর্চাটা থাকে, সেটা শুধু ব্যক্তি নয় জ্ঞানের আলোটা সমাজের উপর গিয়ে পড়ে। পারিপার্শ্বিক এই জ্ঞানের আলোকে ধরে রাখতে বইয়ের বিকল্প নেই। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠুক পাঠাগার। বই, বই আর বই। বই চিরযৌবনা।
কাজী লীনা, সম্পাদক, ফানুস
কাজী লীনা : বই কেন পড়বেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে পাল্টা প্রশ্ন করতে হয়, বই কেন পড়বেন না? বই পড়তে হবে অজানাকে জানার জন্য, উন্নত হওয়ার জন্য। বই পড়ার আগের আর পরের মানুষটির মধ্যে দুস্তর প্রভেদ। বই আত্মাকে সুন্দর করে, পাপ মোচন করে এক বৃহত্তর পবিত্রতার দিকে নিয়ে যায়। একেকটা বই একেকটা পৃথিবী। এক জীবনে আপনি অসংখ্য জীবনের স্বাদ পেতে পারেন কেবল বই পড়ার মাধ্যমে। বই আপনাকে সচেতন করে তুলবে, আপনি বুঝতে পারবেন আপনার সাথে কী কী অন্যায় করা হচ্ছে। এটি আপনাকে প্রতিবাদী হতে সাহায্য করবে। সমস্ত সম্ভাবনাকে অকৃপণ ভাবে প্রকাশ করতে সাহায্য করবে। বই হল একই সাথে বন্ধু এবং শিক্ষক। মন খারাপের সময়গুলোতে সে আপনাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরবে, শুষে নেবে কষ্টের জল। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে সে বিজ্ঞের মত পরামর্শ দেবে।
আমি বই পড়ি, কারণ বই আমার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু, যার কাছ থেকে কোনও রকম ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যে কোনও বিনিময় চায় না, সম্পর্ক ভেঙে যাবে বলে চোখও রাঙায় না। আমি সবসময় একে কাছে পাই নিজের মত করে। আমার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না প্রতিটা ঘটনায় বই পড়ার অনাবিল অনুভব মিশে থাকে সঙ্গোপনে। আমি আমৃত্যু এই সম্পর্কের পরিচর্যা করতে চাই!
তকিব তৌফিক, কথাসাহিত্যিক
তকিব তৌফিক :বই কেন পড়তেই হবে?” এই প্রশ্নের মুখোমুখি যখন আমার হতে হয় তখন আমি সহজভাবে একটি উত্তরই দেই, ‘বই পড়ুন, বই পাঠ শেষে বুঝতে পারবেন কেন বই পড়তেই হবে।’
তবে অক্ষর বিডির ক্ষেত্রে আমি উত্তরটি দেব কিছুটা বিস্তৃতভাবে। চলতি পথে প্রশ্নের উত্তর আর একটি পোর্টালের জানতে চাওয়ার মধ্যে তফাৎ আছে। অক্ষর.বিডির সম্পাদক শেখ মাহমুদুল ইসলাম মিজু যখন জানতে চায় “বই কেন পড়তেই হবে?” তখন তার এই প্রশ্ন শুনে আমি তাৎক্ষণিক উত্তর দেই নি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তার এই প্রশ্নের উত্তর জানার উদ্দেশ্য মহৎ। সে অনেককেই জানাতে চায় বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা কী, এবং কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই উত্তরটি সোজাসুজিভাবে না দিয়ে কিছু কথা বাড়তিভাবে বলে উত্তরটি উপস্থাপন করছি।
কাউকে যখন বলা হয় বই পড়ুন। রোজ কয়েক পাতা হলেও পড়ুন।
এই পরামর্শ দেয়ার পর তাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেন এত জোর দিয়ে বই পড়তে বলা হয়? এতে কি উপকারিতাই বা আছে? কেন বই পড়তেই হবে?
তাদের উদ্দেশ্যে বলব-
নতুন কিছু জানার জন্য অন্তত বই পড়ুন। বই পাঠের মাধ্যমে আপনি অজানা অনেক বিষয় সম্পর্কে অবগত হবেন।
সংশোধনের জন্য বই পড়ুন-
হয়ত আপনি এতদিন কোনও একটি বিষয় ভুল জেনে এসেছেন। কিন্তু একটি বই পড়ে, তার মধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা দেখলেন অন্যরকম। এবং যুক্তিসংগত রেফারেন্সও আছে। তখন আপনার জানার ভুলটি সংশোধন হয়ে যায়।
স্ব-ভাবনার উন্নতি ঘটাতে-
বই পাঠ এমন একটি ক্ষমতা যা পাঠকের মধ্যে নতুন এক সত্তার সৃষ্টি করে। জানার প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে আপনি জানতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন অজানা হাজারও রহস্য। গভীর থেকে গভীরে ভাববার ক্ষমতাধর হয়ে উঠতে পারেন এবং প্রয়োজনে যুক্তি দাঁড় করবার ক্ষমতা রাখেন।
আয়ত্তের ক্ষমতা বৃদ্ধি-
যেকোনও বিষয় নিজের ভাবনার আয়ত্তে নিয়ে আসবার ক্ষমতা রাখে বই পাঠ। বোঝার ক্ষমতা বাড়ায় আর যে বিষয় জানলেন তা সম্পর্কে চারপাশ আয়ত্তের ক্ষমতা রাখেন।
এছাড়াও, বিনোদন, অবসরের বন্ধু, ভবিষ্যৎ কাজের প্রস্তুতি, কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি, লেখার হাত সৃষ্টি ইত্যাদির ক্ষেত্রে বই পাঠের অবদান স্বীকার করতেই হবে।
তাই আমিও বলব, “বই পড়ুন, বেশি বেশি বই পড়ুন। বিভিন্ন বিষয়ের বই পাঠের মাধ্যমে অজানাকে জানতে হলেও বই পড়ুন।”
নাঈম ইসলাম, লেখক, গবেষক ও প্রিন্সিপাল
নাঈম ইসলাম : মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার জন্যই মূলত বই পড়তে হয়। কারণ,সৃষ্টিকর্তা মানবজাতির শুরু থেকেই মানুষের মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ এই বইয়ের মাধ্যমেই দিয়েছেন। এমনকি কুরআনেরও প্রথম আয়াত হল, ‘পড়!’ সেখানে নির্দিষ্ট করে বলা নেই যে শুধু ধর্ম গ্রন্থই পড়, আর পৃথিবীর শুরু থেকেই মানুষ পড়ে আসছে, কখনও পাথরে, কখনও গাছের পাতায়, কখনও বা চামড়ায় মানুষ লিখে তা পড়ে আসছে পরবর্তীতে যা কাগজে লিপিবদ্ধ করে বই নাম দেওয়া হয়েছে। আসলে মূল বিষয় হচ্ছে পড়া, সৃষ্টিকর্তা এই পড়াকে মানুষের স্বভাবজাত বানিয়ে দিয়েছেন যে মানুষ যদি প্রকৃত সভ্য হতে চায় তাহলে তাকে পড়তে হবে আর একমাত্র পড়লেই সে জানতে পারবে কী করে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়, কী করে অজানা জিনিস জানা যায়, কী করে বিশ্বকে জয় করতে হয়। সুতরাং অন্য কোনও কারণে নয় মানুষকে বই পড়তে হবে মানুষ হওয়ার জন্যেই।
মিঞা শোভন, সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা, মিশোপা
মিঞা শোভন : বই কেন পড়তে হবে এই প্রশ্নের উত্তরের আগে আমাদের জানা উচিৎ বই না পড়ে আর কী কাজ করা উচিৎ?
যে সময়টা আমরা বই পড়ার কাজে ব্যয় করি সেই সময়টা আর কোনও কাজে ব্যয় করলে বই পড়ার চেয়ে আরও বেশি উপকার পাওয়া যাবে?
বই পড়ার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ও বিশ্বকে জানতে পারি, আমাদের চিন্তা ও মননশীলতার বিকাশ হয়, আমরা নতুন করে আবিষ্কার করি নিজেকে, নতুনভাবে দেখি মানুষ, সমাজ, দেশ, রাজনীতি, বিশ্ব এবং সমগ্র জগতকে।
এই যে একান্তই নিজস্ব জগত যা আমাদের পরিচিত জগতকে জানতে বুঝতে এবং পরিবর্তন করতে সহায়তা করে সেই জগত সৃষ্টিতে ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘমেয়াদে বই পড়ার সাধনার অন্য কোনও বিকল্প নেই।
তাই বই আমাদের পড়তেই হবে।
কাউসার মাহমুদ, কবি, গল্পকার, আরজে ও সাংবাদিক
কাউসার মাহমুদবই কেন পড়তে হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে কী বলা যায়, ব্যক্তিগতভাবে এখানে আমি প্রচণ্ড ভাবনার ভেতর ডুবে আছি। আমি বিশ্বাস করি, বই পড়ার বিকল্প পৃথিবীতে কিছুই নেই। জ্ঞানার্জনে একজন মানুষ ঋদ্ধ হয়। পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। বই মানুষের বিবেকের জানালা খুলে দেয়। আমার কাছে মনে হয় একজন মানুষ যখন জ্ঞান পীড়ায় আক্রান্ত হয়। তার জানার আগ্রহ ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হয়। এটা তার জন্য কল্যাণকর। অতৃপ্ত হওয়া শোভন একমাত্র জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানান্বষেণই। তেমনিভাবে বই পড়ে ব্যক্তির ভাবনার দুয়ার খুলে। সেই দরজা দিয়ে তার ভেতর প্রবেশ করে শুদ্ধতা। ব্যক্তি আলোকিত হয় এবং আলোড়িত করে তার চারপাশ। তবে এ ক্ষেত্রে একটা বিষয় বলে রাখা বোধ করি প্রয়োজন। বই পড়া যেন হয় আত্মোন্নতির জন্য। তাই বই নির্বাচনেও আমাদের সতর্ক হওয়া উচিৎ। পৃথিবীতে বই নামে কতক মলাটবদ্ধ অশ্লীল লেখা-জোখাও কম নেই।
কবি ওমর খৈয়াম যথার্থ বলেছেন, ‘রুটি- মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে; কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা, যদি তেমন হয় বই।’
ভিনসেন্ট স্টারেট বলেন, ‘মানুষের আনন্দ লাভের পথ বহু বিচিত্র।’ বইপাঠে আনন্দ লাভের পথ শ্রেষ্ঠ।
আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন! ফেসবুক পেইজে
Facebook Comments