Sunday, January 16, 2022
Home > বই আলোচনা > আরশিনগর -সাদাত হোসাইন

আরশিনগর -সাদাত হোসাইন

Spread the love
  • 1
    Share
বইয়ের নাম: আরশিনগর
লেখক: সাদাত হোসাইন(Sadat Hossain)
ঘরানা: উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ: ২০১৫
প্রকাশনী: ভাষাচিত্র
ব্যক্তিগত রেটিং: ৮/১০

“জগতের সবকিছুর ঋণ চোখের কাছে আর চোখের ঋণ আয়নার কাছে। জীবন ও জগতের সবটা দেখা এই চোখ শুধু আয়নাতেই তার নিজেকে দেখতে পায়। কি অদ্ভুত হিসাব! এই ঋণ তাই এই জগতেরও। আমি এই জগতের নাম দিয়েছি আরশিনগর। যে নগরে হেঁটে যাই আমি ও আমার মতোন ঘোরগ্রস্ত তাবৎ নাগরিক” এ লেখাটা পড়ে এতো অসাধারন লাগছে যে বারবার পড়েই যাচ্ছিলাম।

এক জোড়া ভবঘুরে নদী; বহু পথ ঘুরে এসে যদি; লুটায় তোমার চোখে, হাহাকার ভেসে যাওয়া শোকে, তুমি তাকে অশ্রু না ডেকে, ভালোবাসা ডেকো। খুঁজে দেখ কোনো এক পলাতক মন, ডুবেছে তোমার ওই নেশাঘোর চোখে। নেশায় ডুবে যাক শহর, গলির শিস কাটা লাল চোখ বৃদ্ধ কিংবা যুবক। ডুবে যাক শ্মশান কিংবা গোরস্তান। বুঁদ হয়ে থাক উদ্ভ্রান্ত বুক। নেশায় ডুবে থাকা মানুষ, চুমুকে চুমুকে সব দুঃখ শুষুক। মাতাল মাদকে কাটুক জমে থাকা পুরাতন শোক, আজ চারদিক নেশাদের বান ডেকে যাক তোমার অমন মাদক চোখ। ‘শোন কাজল চোখের মেয়ে; আমার দিবস কাটে, বিবশ হয়ে, তোমার চোখে চেয়ে’।

                 “আরশিনগর”

মায়াময় পরিষ্কার দুটো চোখে চোখ পড়লে যেন আয়নার কথা মনে হয়। তাই মৃত্যুর আগে নিজের সদ্যজাত কন্যার নাম আরশি রাখলো তার ভাগ্যহতা মা। বাবা মজিবর মিয়া আর দাদি আম্বরি বেগম তাকে গড়ে তুলতে লাগলো আগলে রাখা সমস্ত স্নেহ ও ভালোবাসার সবটুকু দিয়ে। তারপরো, মাতৃহীন আরশি তার পুরোটা জুড়ে আসন পেতে বসা মায়ের অভাব বারবার অনুভব করলো। আরশির বেড়ে ওঠা শুরু হলো শান্ত-নিস্তব্ধ যযাতিপুর গ্রামে। পরিশ্রমী ও আত্মপ্রত্যয়ী মজিবর মিয়া নিজ চেষ্টায় পৌঁছানোর চেষ্টা করলো উন্নতির শিখরে। কিন্তু তথাকথিত বাঙালি সমাজে সাধারণত যা হয়, তা আর আটকাতে পারলোনা। চক্ষুশূলে পরিণত হলো যযাতিপুর গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি কুচক্রী লতু হাওলাদারের। নিজের ঠুনকো আভিজাত্য ও বংশপরিচয়ের নেশায় বুঁদ এই মানুষটা যেকোন মূল্যে মজিবর মিয়াকে থামানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখলো। এদিকে অস্থির এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পুরো দেশ। শ্রেণীশত্রু খতমের নামে চরমপন্থিরা নৃশংসতার চরমপন্থার সীমাও যেন অতিক্রম করে চলেছে প্রতিনিয়ত। আলাদা আলাদা গ্রুপে ভাগ হয়ে একে অপরকে ধ্বংস করার জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তারা। আর স্বাভাবিক ভাবেই, চরমপন্থিদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। আগুন সবকিছুকেই পোড়ায়। আর এই ভয়াবহ আগুন একটা পর্যায়ে স্পর্শ করলো যযাতিপুরের মাটি। শান্ত গ্রামটা অশান্ত হয়ে উঠলো ক্রমেই।

ঢাকায় বসবাসরত আশিষ ও মিলির জীবনটাও কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেলো। সন্তানহারা এক মায়ের হাহাকারে মুহুর্মুহু কম্পিত হতে লাগলো আকাশ বাতাস। পুত্র আর পুত্রবধুর জীবনের সাথে জড়িয়ে গেলেন গ্রাম্য ডাক্তার শুকরঞ্জন বাবু ও তাঁর স্ত্রী সুজাতা রাণী। ‘জলে ভাসা পদ্ম’ কথাটা যে কতোটা সত্য, তা হয়তো আরশিকে নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। সাজানো গোছানো সংসারও যেকোন সময় তাসের ঘর হয়ে উঠতে পারে, এটাও তাকে বোঝানোর কিছু নেই। ঘাতপ্রতিঘাতে জর্জরিত হতে লাগলো মেয়েটা। যেখানে প্রতি পলে সুখ আর দুঃখের যুগপৎ আসাযাওয়া অব্যাহত রইলো। প্রায় সব হারিয়েও আরশি কিন্তু ভেঙে পড়লোনা। সর্বংসহা হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো শেষটা দেখার জন্য। আর আরশির এই ঘটনাবহুল জীবনকে নানান অভিজ্ঞতার প্রলেপে অর্থবহ করলো ডা. রুবিনা, ইমাম সাহেব ও তাঁর স্ত্রী, লাইলি সহ আরো অনেকে। সারাটা জীবন ভালোবাসা নামক মরীচিকার পেছনে ছুটে চলা আরশির জীবনেও কি ভালোবাসা এসেছিলো? বুকের ভেতরের আজন্মলালিত দীর্ঘশ্বাস কি একটা বারের জন্যও বের করতে পেরেছিলো সে? আরশিনগরের পথে পথে হাঁটা কি কখনো এক টুকরো স্বস্তির সন্ধান দিয়েছিলো তাকে? অনেক প্রশ্ন। সবগুলোর উত্তরও  আছে আরশিনগর নামের উল্টোজগতের ভেতরে।

উপন্যাস জুড়েই সাদাত হোসাইন শোনাতে চেয়েছেন বিভিন্ন মানসিকতার মানুষের ছোট ছোট গল্প,জীবনের গল্প,সুখের গল্প ও শোকের গল্প। দিনশেষে কোন না কোন ভাবে তাদের সবার গল্পটাই বাঁধা পড়েছে একটি সুতোয়।

উপন্যাসের এক পর্যায়ে আম্বরি বেগমের সংলাপের মাধ্যমে ঔপন্যাসিক পাঠকদের উপলব্ধি করিয়েছেন জীবনের নিগূড় এক সত্যকে-মানবজীবন আসলে আয়নার এর মত উলটো এক জগত। এই জগতে আমরা জীবনটাকে যেমন ভাবে কাটাতে চাই তার ঠিক বিপরীত ঘটনা ক্রমাগত ঘটতে থাকে জীবনে।

এই উপন্যাসটি আপনাকে একবার হলেও ভাবাবে জীবনের মানে !একবার হলেও উপলব্ধি করাবে প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতর পুষে রাখা দুঃখকে।যে উপলব্ধি আপনাকে বিনয়ী করবে, করবে সহনশীল।

Facebook Comments