Sunday, January 16, 2022
Home > ফিচার > বইপোকাদের ভার্চুয়াল আড্ডাখানা ।। অক্ষর

বইপোকাদের ভার্চুয়াল আড্ডাখানা ।। অক্ষর

Spread the love

রকিব মুহাম্মাদ: আধুনিক সমাজে বই ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা-ই করা যায় না। কেননা, বই-ই মানুষের অন্তর্দৃষ্টি খোলে, জ্ঞান ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। মনের অন্ধকার ঘরে আলো জ্বেলে দেয়। সাথে সাথে মনুষ্যত্ব অর্জনেরও বড় পথ বইপাঠ।
আগেকার দিনে পুঁথি পাঠের রেওয়াজ ছিল ঘরে ঘরে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “যে ঘরে বইপাঠের আসর বসত, ওই ঘরের সদস্যদের আলাদা করে চেনা হত সমাজে।” অনেক রথীমহারথীর জীবনী ঘাটলে এটাই পাওয়া যাবে যে বইপাঠেই তাদের বারো আনা সময় কাটত। তাই তো তাদের আমরা আলাদা করেই চিনে থাকি আজ।

সময়ের সাথে সাথে বইপাঠ বিস্তৃতিলাভ করেছে। ঘরে ঘরে নয়, হাতে হাতে বই শোভা পায় এখন। তবে বইপাঠের পদ্ধতির পরিবর্তন বদলে দিতে পারেনি বইপড়ুয়াদের আগেকার দিনের সেই আড্ডাকে। বরং তার ব্যাপ্তি ঘটেছে সবজায়গা-সবখানে।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই আড্ডা এখন আর ১০ জনে সীমাবদ্ধ নেই, লক্ষ মানুষের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির বিস্তৃত অন্তর্জালে গড়ে উঠেছে বইপোকাদের নানা গ্রুপ। যেখানে নিয়মিত আড্ডা জমে, আসর বসে সাহিত্যের। এমন-ই এক গ্রুপ ‘বইপোকাদের আড্ডাখানা’। বই পড়ে অথচ বইপোকাদের আড্ডাখানার নাম জানেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর!
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বইপোকাদের জনপ্রিয় এই গ্রুপ ‘বইপোকাদের আড্ডাখানা‘ যাত্রা শুরু করেছিল ২০১৩ সালের ২৪ শে আগস্ট।

এ আড্ডার প্লানিংও হয়েছিল ফেসবুকেই। একজন স্বপ্নবাজ তরুণ এবং তার সাথে বইপড়ুয়া কয়েকজন বন্ধু গড়ে তুলেছে ‘বইপোকাদের আড্ডাখানা’।
গ্রুপের ক্রিয়েটর ওয়াহিদ অনঘের মুখ থেকেই শোনা যাক সে গল্প।

“সব রকম বই নিয়ে স্বাধীনভাবে আলোচনা করার একটা জায়গার জন্য সেদিন ফেসবুকে পরিচিত দুই বড় ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিলো।

তাদের পরামর্শ নিলাম। সম্মতি পেলাম সবার কাছ থেকে। তারপর, আমি ফেসবুকে ‘বইপোকাদের আড্ডাখানা’ গ্রুপটা খুলি।

প্রথমদিকে ফ্রেন্ডলিস্টের যারা বই পড়ে বলে মনে হয়েছিলো তাদের এড করলাম গ্রুপে। তারপর টুকটাক বই আর বেশী বেশী আড্ডা দিতে লাগলাম গ্রুপে। তখন সদস্য সংখ্যা খুবই কম ছিলো। হাতেগোনা কয়জন আমরা – তাই আমরা সবাই সবাইকে চিনতাম। একটা পরিবারের সদস্যরা যেভাবে আড্ডা দেয়, আমরাও সেভাবে-ই আড্ডা দিতে থাকি।

আস্তে আস্তে অপরিচিতরা নিজ থেকেই গ্রুপে যুক্ত হতে লাগলেন। এভাবে ধীরেধীরে মেম্বার বাড়তে থাকে।

প্রথম এক মাস মেম্বার সংখ্যা ছিলো তিনশ’র মতো। ছয় মাসে তা দেড় হাজার হয়ে গেল। এক বছরে চার হাজারের মতো। তারপর তা বছরে বছরে বেড়ে বারো হাজার চল্লিশ হাজার এক লাখ এবং তারপর এখন প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে।”
আজ বইপোকাদের আড্ডাখানায় বইপড়ুয়াদের নিয়মিত আড্ডা জমে। যে আসরে যুক্ত হয়েছে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে দাদার বয়সী অনেক বইপ্রিয়। নামীদামী অনেক লেখকরাও আছে এখানে।
শুধু অনলাইন নয়, অফলাইনেও বেশ সক্রিয় বইপোকার সদস্যরা।
২০১৪ সাল থেকে বছরে দুইবার বেশ ঘটা করে অফলাইনে বইপোকাদের মিলনমেলা আয়োজন করে আসছে গ্রুপটির এডমিন প্যানেল। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে বইমেলার সময় এবং গ্রুপটির জন্মদিন ২৪শে আগস্টে অফলাইনে বইপোকাদের জমজমাট আড্ডা জমে।

এছাড়াও সারাদেশে বিশে’র অধিক জেলায় বইপোকাদের একত্রিত করে অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে তারা। প্রতি শুক্রবার নিয়মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রংপুরে বইপোকাদের সাপ্তাহিক আড্ডা বসে।

শুধু তাই নয়, বইপোকা গ্রুপের সদস্যরা সময়-অসময় মানুষের বিপদ-আপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বইপোকাদের আড্ডাখানা গ্রুপটির পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন দুর্যোগে তারা ত্রাণ তহবিল গঠন করে সাহায্য করেছে অসহায় মানুষদের।
এইতো, সম্প্রতি লেখক এবং পাঠকদের একই সুতায় গাঁথার জন্য বইপোকা প্রকাশনা নামে একটি প্রকাশনা সংস্থাও গড়ে তুলেছে তারা। বেশ কিছু মানসম্মত বই ইতিমধ্যে প্রকাশ হয়েছে বইপোকা প্রকাশনীর ব্যানারে। বইপোকাদের ক্রিয়েটর ওয়াহিদ অনঘের ভাষায় গ্রুপটির সবচেয়ে বড় সফলতা ‘বইপোকা প্রকাশনী’।
বইপোকাদের আড্ডাখানা নিয়ে ওয়াহিদ অনঘের স্বপ্ন তুলে ধরেছেন তিনি। অক্ষরকে তিনি জানিয়েছেন
“বর্তমানে আমাদের যে সকল কার্যক্রম তা ভবিষ্যতেও সফলতার সাথে চালিয়ে নেওয়াই আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তবে, আমাদের প্রধান স্বপ্ন হলো দেশের প্রতিটা জেলায় বইপোকাদের পাঠাগার স্থাপন করা এবং সেই পাঠাগারকে কেন্দ্র করে দেশের শিল্প সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়া।”

ওয়াহিদ অনঘ তার এ স্বপ্ন বাস্তবয়নের সহযোগী এডমিন বন্ধুদের সম্পর্কে বলেন, “আমাদের নিবেদিত এডমিন প্যানেল সবসময় মেম্বারদের সাহায্য করার মানসিকতা নিয়ে কাজ করে। বিশেষ করে মাসুম আহমেদ আদি ভাইয়ের কথা বলতে হয়। তারা যেমন নিজেরা বড় বইপোকা, তেমনি অন্যদেরকেও বই পড়তে উত্‍সাহ দিয়ে এসেছেন বরাবর। আমরা পাশে পেয়েছি রকমারি ডট কমকে। তারা আমাদের গ্রুপের বিভিন্ন ইভেন্টে সহযোগিতা করেছে , আমাদের গ্রুপে মানসম্মত বই রিভিউ পাওয়ার জন্য তারা নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছে। তাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে আজকের অবস্থানে রয়েছি আমরা। পাঠক চাইলে অদূর ভবিষ্যৎে ভার্চুয়াল জগতে বইপোকাদের আড্ডাখানা শিল্প সাহিত্যে অনন্য ভূমিকা পালন করবে।”

Facebook Comments