Wednesday, January 19, 2022
Home > প্রবন্ধ/নিবন্ধ > লেখালেখিও একধরণের গভীর প্রেম

লেখালেখিও একধরণের গভীর প্রেম

Spread the love
আলমগীর শাহরিয়ার : আমাদের প্রকাশকদের প্রায়ই বলতে শুনি তারা মানসম্পন্ন পাণ্ডুলিপি সংকটে ভুগছেন। প্রযুক্তি আগ্রাসনের যুগে দেশ-বিদেশে সিরিয়াস পাঠকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমছে। পাঠক সংখ্যা কমলেও লেখকের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজ ভাষা বা বিশ্বসাহিত্যে আগ্রহ নেই, পড়াশোনা নেই-এমন অনেকেই আজকাল নাম লেখাচ্ছেন লেখকের খাতায়। অক্লান্ত লিখে যাচ্ছেন কোনো ধরনের পড়াশোনা ও নতুন কিছু জানাশোনার কৌতুহল ছাড়াই। বইমেলা আসলেই বই প্রকাশের হিড়িক পড়ে যায়। এদেশে অনেক নবীণ লেখকরা বইমেলাকে গ্রামের ঘোড়দৌড় বা বাচ্চাদের খেলনা বিক্রির রঙিন মেলা ভাবেন। হারাধনের দশটি ছেলের মত তারা সেই মেলাময় ঘুরে বেড়ান। আর একটা সময় টুপ করে হারিয়ে যান। তারা নিশ্চয়ই ভুলে যান আবর্জনা যতই নতুন মোড়কে সাময়িক সুগন্ধ ছড়াক শিগগিরই ভাগাড়েই তার স্থান হয়।
একজন লেখকের লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য পড়াশোনা ও প্রস্তুতিকাল থাকা দরকার। কিন্তু এদেশে এখন সেই প্রস্তুতি নিতে কেউ প্রস্তুত নন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাড়-বাড়ন্তকাল ও নার্সিসিস্ট যুগে বিকাশের চেয়ে আমাদের প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা প্রবল। ২০১২ সালে একজন রিপোর্টার হিসেবে বইমেলা নিয়ে পুরো মাসজুড়ে একটি জাতীয় দৈনিকে রিপোর্ট করার সময় জেনেছিলাম প্রায় তিন হাজার নতুন বই প্রতিবছর মেলায় প্রকাশ হয়। কিন্তু কি দুঃখজনক অভিজ্ঞতা পরেরবার সেই তিন হাজার বই থেকে আমরা তিনটা বইয়ের নামও স্মরণে রাখতে পারি না। আমাদের কোন কাজেই লাগে না। সৃষ্টি সময়কে আলোড়িত করে না।
অনেকদিন ধরে ভাবছি এই যে প্রতিবছর মেলায় হাজার হাজার বই বের হয় পরের বার আমরা কেন চার পাঁচটা বইয়ের নাম বলতে পারি না যা সারাদেশের পাঠককে আন্দোলিত করেছিল, ভাবিয়েছিল, আমাদের সাহিত্যে নতুন সংযোজন বলে সবাই উদ্দীপ্ত ও উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। তবে একি কেবলই কাগজের অপচয় আর কিছু প্রকাশকের নিছক ব্যবসা! প্রকাশনা শিল্পে আমাদের এই দৈনদশা থেকে সহসা মুক্তির কোন পথ দেখি না যতক্ষণ না একজন লেখক বই নিয়ে আত্মপ্রকাশের আগে সিরিয়াস পাঠক হিসেবে নিজেকে নিবেদন করেন।
 
বাংলা একাডেমির এক তথ্যে জানা যায়, মেলা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত প্রায় সাড়ে চার হাজার বইয়ের মধ্যে চারশ’র মত বই মোটামুটি মানসম্পন্ন। যদিও এতো দ্রুত মানসম্পন্ন বই বাচাইয়ের কাজটি প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে করে তা নিয়ে অনেক বোদ্ধা লেখকই সন্দিগ্ধ। কেউ কেউ এ নিয়ে উপহাস করতেও কসুর করেননি। বাকি চার হাজার বই জাতির সম্পদের এক বিরাট অপচয় বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। তবে এসব বই বাছাই বা পর্যবেক্ষণ কমিটি থেকে শতহাত দূরত্বে থেকেও সংখ্যাটা যে আরো অনেক কম এ কথা অনুমান করা যায়। এক মেলায় চারশ মানসম্পন্ন বই বের হলে জাতি হিসেবে আমরা উতরে যেতাম।
 
নতুনরা কী আসলেই ভালো কিছু লিখছেন না?
প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণ তরুণীরা যা লিখছেন, আড়ষ্ট কুমারীর ন্যায় তুমুল উৎসাহ উত্তেজনা নিয়ে যা প্রসব বা প্রকাশ করছেন সব আবর্জনা! অন্তত, অনেক প্রতিষ্ঠিত কবি ও লেখককে উষ্মা প্রকাশ করতে দেখেছি এই বলে, নতুন লেখকদের জন্য প্রতি বছর বইমেলায় হাটা যায় না। পাঠকের চেয়ে মেলায় এখন লেখকের সংখ্যাই বেশি। কিছু নমস্য ব্যতিক্রম বাদে চিরনবীণ বা অর্বাচীনদের চিন্তাজগতের মাঠদখল, সংযোজন, বিয়োজনের এ খেলা নিয়ে প্রাচীনদের মনে অপ্রকাশ্য বা গোপন একটা ঈর্ষা কাজ করে, প্রশংসাসূচক সমালোচনার বদলে যা নিন্দার তীর হয়ে তুণ থেকে বেরিয়ে পড়ে। একজন মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত লেখককে বলতে শুনেছিলাম, মেলা থেকে ফেরার পথে শুভেচ্ছা হিসেবে পাওয়া অনেক বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা ছিড়ে পথেই ফেলে আসতে হয়। কারণ এসব আবর্জনা রাখার মত জায়গা তাঁর বাসায় নেই। শুনে অনেক নতুন লেখক হয়ত আহত হবেন। যারা বিনে পয়সায় গদগদ হয়ে জ্যেষ্ঠের শুভাশীশের আশায় বইটাতে ‘শ্রদ্ধাভাজনেষু’ বা ‘পূজনীয়’ কিছু লিখে হাতে তুলে দিয়ে এসেছিলান। কিন্তু সত্যটা এমনই কঠিন। তবে নবীণ লেখক নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন যাতে পুজনীয়জন নিজে কৌতুহলী হয়ে আপনার বইয়ের খোঁজ করেন, কিনে পড়েন।
আমি অন্তত দুজন লেখককে বিশেষ ধন্যবাদ দিতে চাই। গতবছর যাদের পাণ্ডুলিপি দেখে সামান্য কাণ্ডজ্ঞান থেকে পরামর্শ দিয়েছিলাম আরেকটু সময় নিন। লেখিকা তার গল্পের বই, কবি তার পাণ্ডুলিপি যেনতেনভাবে প্রকাশ করেননি। মানসম্পন্ন কিছু করার জন্য সময় ও শ্রম দেবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। তাদের সাধুবাদ জানাই। আসল কথা হলো, লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে সিরিয়াস পাঠক হওয়াটা খুব জরুরী। আমাদের সে চর্চা এখন বাকির খাতায় শূন্য পড়ে থাকার মত দশা।
কথা হলো নতুনরা যা লিখছেন সবই কি আবর্জনা! বঙ্কিম, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতি, জসীম উদদীন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ-এরাও তো সকলে একদিন নবীণ ছিলেন। ধীরে ধীরে সাহিত্যাকাশে উজ্জ্বল তারা হয়েছেন। আজকের অনেক নতুনেরাও আগামী দিনে এমন উজ্জ্বল হবেন। হয়ত কেউ এদের ছাড়িয়েও যাবেন। আবর্জনা হলে নাকে কালের দুর্গন্ধ নিয়ে ভাগাড়ে, আস্তাকুড়ে নিজের সৃষ্টিকে একলা খুঁজে ফিরবেন।
 
কাসেম বিন আবুবকর নামে সস্তা জনপ্রিয় একজন লেখককে নিয়ে হঠাৎ বিদেশী এক পত্রিকায় আলোচনার পর হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল! আহা “ফুটন্ত গোলাপ”-এর সে লেখককে বইমেলায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি পাঠকদের লেখকের কোনো বই কেনার জন্য লাইন দিতে। যেমনটা আমরা হুমায়ূন আহমেদের বেলায় দেখেছি। সময় যে কারো কাজের নির্মোহ মূল্যায়ন করে।
কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের রমরমা সময় ও আত্মপ্রচারের ঢোল পেটানোর সহজ যুগে শত বাঁধা ঠেলে পড়ার টেবিলে বসাটা খুব কঠিন হয়ে গেছে। অনেকে হয়তো পারছেন। বেণিয়া স্পিরিটে নয়, তারা আপন সৃজনশক্তিতে জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় বারুদবুকে ধ্যানী যোগির মতো বসে থাকেন তপস্যায়। নিউরনে নতুন স্বপ্ন ও উদ্যম তাদের নিয়ত সৃষ্টিমুখর পথে তেজস্বী ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হওয়া সহিসের মত তাড়িয়ে বেড়ায়। তারাই কবন্ধ সময়ে ভালো কিছু লিখছেন। কেননা লেখালেখিও একধরণের গভীর প্রেম। আমি রোজ এর প্রেমে পড়ি, স্বপ্ন দেখি। আমাদের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক তো আরেকধাপ এগিয়ে বলেছেন, “লেখা আমার কাছে প্রেমে পড়বার চেয়েও অনেক বেশি উত্তেজক ও ব্যক্তিগত, দূরাভিলাষী ও উড্ডয়নশীল।”
Facebook Comments