Saturday, October 16, 2021
Home > গল্প > সুইসাইড নোট | সৌমাভা পাল

সুইসাইড নোট | সৌমাভা পাল

সুইসাইড নোট


শ্রীময়ীর বাবার এই সম্বন্ধটাই শেষ আশা। পাত্র পক্ষকে যে করেই হোক রাজি করাতে হবে বিয়ের জন্য। সে তা যত টাকাই যৌতুক লাগুক না কেন! আত্মিয়দের টোন টিটকারি সহ্যের সিমান্ত অতিক্রম করছে। বড় মেয়ে শ্রীময়ীর বিয়েটা হয়ে গেলে, বাকি কন্যাদায়গ্রস্ত বাবাদের মতন ঋষিকেশ বাবুও যেন একটু হাফ ছেড়ে বাঁচেন। কিন্তু অন্যবারের মতন যদি এবারও সম্বন্ধটা ভেস্তে যায়? তাহলে? তাহলে, কি আর গলায় দড়ি দেয়া থেকে বড় মেয়েকে আটকাতে পারবেন না, ঋষিকেশ বণিক? তাহলে কি শেষ বয়সে সন্তানের মৃতদেহ কাঁধে নিতে হবে? তাহলে কি আর মেয়েটাকে বাঁচানো যাবে না? মা মরা শ্যামবর্ণা মেয়েটার কি আর কোথাও ঠাই হবেনা এই দুনিয়ায় ওই চিতা ছাড়া?
চিন্তায় অঝরে কেঁদে ফেললেন বছর ৬৮ এর বড় ফ্রেমের চশমা পরা লম্বা দোহারা চেহারা বৃদ্ধ ঋষিকেশ বণিক। কাঁদলেন কিন্তু নিঃশব্দে। দরজার আড়াল থেকে শ্রী সবটাই দেখছিল, কিন্তু বাবার এভাবে অঝোরে কেঁদে ফেলায় নিজেকে আর আটকাতে পারলো না, ছুটে চলে গেল নিজের ঘরে। ধরাম করে দরজা দিয়ে দিল! আচমলা শব্দে আর শব্দের কারণ বুঝে ঋষিকেশ বাবুর সংবিত ফিরলো।

শ্রী দরজা বন্ধ করে নিজেকে দাঁড় কোরালো আয়নার সামনে। পরিচিত প্রশ্নবানে আবার বিদ্ধ করলো নিজেকে।
কেন?
কেন এমন গায়ের রং?
কেন এমন রোগা চেহারা?
কেন এমন বাচ্চাদের মতন উচ্চতা?
কেন? কেন? কেন?
আর কুয়ালিফিকেশন? মাত্র বাংলায় অনার্স!
কে বিয়ে করবে আমায়?
আচ্ছা? আচ্ছা, সবই কি মেলানিনের আর মারক্সের পার্থক্য দিয়েই হয়? দুনিয়াতে কি এইসবেরই রাজ? আচ্ছা চামড়ার তলায় যে রক্ত মাংসের একটা হৃদয় থাকে , তার কি কোনোই দাম নেই?
কেন বারংবার আমায় মুখে গায়ে ফেয়ার্নেসওয়ালা পাউডার দিয়ে বেরোতে হয়?
কেন আমায় হিল জুতো পরতে হয়? আমার পায়ের ব্যাথার কি কোনো দাম নেই?
সেই রাত পূর্ণিমার হলেও বণিক বাড়ির দোতলায় নেমে এলো ভরা বর্ষা। বর্ষা নামলো শ্রীর চোখে।
পরেরদিন সকাল বেলা যথারীতি সেজেগুজে তৈরি শ্রীময়ী। পাত্রপক্ষ এসে গেছে। নিয়ম মাফিক শ্রী সবাইকে মিষ্টি দিয়েছে। ছেলের বাবা ওকে বসতে বলেছে। ও বসেওছে, মাথা নিচু করে, ঠিক যেন অপরাধী। কিন্তু শ্রীর মনমরা ভাবটা যেন মেকাপের ওপর দিয়ে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। শ্রীর মনে কোথাও একটা দৃঢ় বিশ্বাস শিকড় গজিয়ে বসেছিল যে, আর কোনো আশা নেই, বহুদিনের লিখে রাখা সুইসাইড নোটটা বোধয় এইবারে কাজে আসবে।
– চলো তাহলে?……..শ্রী ! চলো তাহলে?
হঠ্যাৎ যেন খেয়ালের দুনিয়া থেকে ফিরলো শ্রী।
– ঋষিকেশবাবু বললেন, ‘যা মা কথা বলে আয় অরিনের সাথে।’
বাবার মুখটা উজ্জ্বল দেখে শ্রী বুঝতে পারলো ছেলে এবার একা কথা বলতে চায়। মানে আবার সেই প্রশ্ন করতে চায়। আবার!
সবথেকে জঘন্য লাগে সেই ভার্জিন হওয়ার প্রশ্নটা! আগের দেখতে আসা ছেলেগুলো এমন ভাবে কথাটা জিজ্ঞাসা করেছিল যেন বেশ্যার সতীত্ব যাচাই করতে এসেছে। এবারও কি তবে….
শ্রীর মুখে চিন্তার ছাপ দেখে আনার ডাকলো অরিন।
– শ্রী! এসো!
– হ্যাঁ চলুন।


আরও পড়ুন : শারীরিক ভালোবাসার তৎকালীন সংঘর্ষ | সৌমাভা পাল


ওদের চলে যাওয়াতে নিজের অজান্তেই ঋষিকেশবাবুর হাত দুটো করজোড়ে পরিণত হলো। মনে মনে ঠাকুরকে ডাকতে লাগলো। মোড়ের মাথার কালি মন্দিরে মানতও করে ফেলল।
এদিকে অরিন শ্রীর ঘরে ঢুকে শ্রীকে প্রশ্ন করায় খুব অবাক হলো ও। অরিনের ওর আঁকা ছবির উপর হাত বোলাতে দেখে প্রথমটা ভীষণ লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলো শ্রী।
– তুমি তো ভীষণ সুন্দর ছবি আঁকো! জানো আমি ছোটবেলায় ২বছর আঁকা শিখেও এখন অব্দি পেন্সিলের একটা দাগই সোজা করে দিতে পারিনা, কিন্তু আমার না আঁকার খুব ইচ্ছা!
অনভ্যস্ত এই কথাগুলোয় শ্রী কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না। অরিনকে বাকি সব ছেলেদের থেকে অনেকটা আলাদা লাগছিল ওর।
– আচ্ছা? লতার গান শুনতে ভালোবাসো না আশার?  আচ্ছা তোমার বোমকেশ ভালো লাগে না বঙ্কিমচন্দ্র?
শ্রীর কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর ছিল না, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া  ওর কাছে কোনো উপায় নেই।
– কি গো বলোনা, তোমার চিকেন বিরিয়ানি ভালো লাগে না মটন বিরিয়ানি?
– আ আ আপনি সেই প্রশ্নটা করবেন না আমায়?
-কোন প্রশ্নের কথা বলছো শ্রী?
– ওই যে, আমার সতীত্ব আছে নাকি? আমি ভার্জিন নাকি? অন্যরা তো জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি করবেন না অরিনবাবু?
– এসব, এসব কি বলছো? আমি এসব কেন জিজ্ঞাসা করবো?
– আপনার কোনই চাহিদা নেই? কোনই ডিমান্ড নেই আপনার? আগেরবার যারা এসেছিলো তারা তো ডিমান্ড করেছিল যে তাদের ইংলিশ বলা বউ চাই। আপনার নেই কোনোরকম ডিমান্ড?
– আমার কেন ডিমান্ড থাকবে? আমি ডিমান্ড করার কে? তুমি যখন কিছু ডিমান্ড করোনি, তখন আমি কিভাবে কিছু ডিমান্ড করি? আমি সামান্য বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করি।
– নেই? সত্যি কোনো চাহিদা নেই আপনার?
– না শ্রী ! বিশ্বাস করো কোনই চাহিদা নেই আমার। … তবে হ্যাঁ একটা চাহিদা আছে, পূরণ করতে পারবে?
শ্রী যেন একটু ভয় পেলে, এ আবার কোন চাহিদার কথা বলেরে বাবা! এমন চাহিদার কথা যদি বলে যেটা আমি মেটাতে পারবো না? তাহলে? তাহলে তো বিয়েটা ভেঙে যাবে। তাহলে তো সেই সুইসাইড! সুইসাইড নোটটা কাজে লাগবে নাকি এবার?
– কি গো? পারবে পূরণ করতে ?
– হ হ্যাঁ , হ্যাঁ চেষ্টা করবো আমি।
মুচকি হেসে অরিন বলল, বিয়ের পর কিন্তু রোজ ঘুমানোর আগে দু’এক ঘন্টা গল্প করতে হবে আমার সাথে, একদম মৃত্যুর আগব্দী। কেমন তো? এই আবদারটা প্লিজ রেখো! এইটাই আমার একমাত্র চাহিদা।
শ্রী কি বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না, এইটা কারোর চাহিদাও হতে পারে? একটা ছেলের চাহিদা এটা হতে পারে? নয়নের কানকে যেন বিশ্বাস করাতে পারছিল না ও। কোনো ভাবেই বিশ্বাস হচ্ছিল না ওর । কাঁপা কাঁপা গলায় শ্রী উত্তর দিল, হ্যাঁ! পূরণ করতে পারবো আমি।
– ইয়েস! তাহলেই হবে। আর তুমি বললে না তো তোমার কার গান শুনতে ভালো লাগে, লতা না আশা?
– লতা।
-ওহহ! তাহলে বাড়ি ফিরে আমি লতার গান সব ডাউনলোড করবো। আমাদের বিয়েতে শুধু লতার গান বাজবে কেমন তো?
লজ্জা লাগছিল শ্রীময়ীর, আনন্দ চেপে না রাখতে পারে ঠোঁট টিপে হেসেও ফেলেছিল।

অরিন শ্রীময়ীর হাতদুটো ধরে বলল, ‘এই টোল পড়া হাসি যেন সারাটাজীবন একইরকম থাকে, কি থাকবে তো লতা মঙ্গেশকর?’

সামনের মাসের ২১ তারিখে বিয়ে ঠিক হলো অরিন আর শ্রীময়ীর। অরিনের পরিবার কোনোরকম পন বা যৌতুক নিতে রাজি হলো না।
শ্রীময়ীর বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় অরিন বলল, চলি গিন্নি, ওহ সরি! লতা মঙ্গেশকর চলি এবার, সুন্দর করে ছবি আঁকতে হবে। আমি এসে দেখবো কিন্তু!

শ্রীময়ী বুঝলো লিখে রাখা সুইসাইড নোটটা আর কাজে লাগবে না, আর কোনোদিন লাগবে না কাজে, আর কোনো দিনও নয়।

Facebook Comments