Saturday, October 16, 2021
Home > গল্প > সে রাতে জোৎস্না ছিল | আহমাদ রফিক

সে রাতে জোৎস্না ছিল | আহমাদ রফিক

দুবছর আগের কথা । হুমায়ূন আহমেদ স্যারের লেখা তখন প্রচুর পড়ছি। মাঝে মাঝে হিমু হবার স্বপ্নও ভাসছে দুচোখে। আর স্বপ্নটা ছুঁতে গিয়ে করছি উদ্ভট সব কাণ্ড।
একদিনকার কথা। আমার মতো দুই হিমু প্রেমিক আরিফ আর ফাহিম।তিনজন মিলে প্ল্যান করলাম – আজ রাতে জোৎস্না খেতে যাবো! খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরে মেইন রোড ধরে হেঁটে বেড়াবো সারা রাত।
 
ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা ছুঁই ছুঁই করছে। আমাদের হোস্টেলের সাথে তাল মিলিয়ে ঘুমিয়ে আছে পুরো সাভার উপজেলা। আমরা তিনজন হোস্টেলের ছাদে দাড়িয়ে আছি। অনেক চেষ্টা করেও মেইনগেটের চাবি জোগাড় করতে পারিনি। তাই সবাই মিলে ভাবছি অন্য কোনো উপায় বের করা যায় কিনা। এমন সময় আরিফ বলল ‘চল,পানির পাইপ বেয়ে নীচে নামি!’ আমি সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু ঝামেলা হলো ফাহিমকে নিয়ে। সে কোনোভাবেই এভাবে নামতে রাজি না। ভয়েই নাকি তার হাত-পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। তবে অনেক্ষন ধরে বাবা শোনা বলে বোঝাবার পর ওকেও রাজি করানো গেলো। দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে প্রায় কোন ঝামেলা ছাড়াই আমরা নীচে নামলাম। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটলো নীচে নামার পর। এলাকার নেড়ি কুকুরগুলো আমাদের ওভাবে নামতে দেখে এমন ঘেউঘেউ শুরু করলো যে ভয়েই আমাদের আত্নারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার যোগাড়। তিনজনে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচলাম।
 
আকাশে বেশ বড়ো একটা চাঁদ উঠেছে। মিষ্টি জোৎস্নায় অবগাহন করছে প্রকৃতি। প্রায় ফাঁকা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে হাঁটছি আমরা তিনজন। মাঝে মাঝে সাঁইসাঁই করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে একটা দুটো নাইট কোচ। দু’চারটা ট্রাক। আমাদের কারো পায়ে জুতো নেই। রুপালী জোৎস্না আর প্রকৃতির আলো আঁধারির মাঝে আমরা এতই ডুবে আছি যে, হাঁটতে হাঁটতে কোথায় চলে এসেছি সেই খেয়ালও নেই। হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেলাম পাহারাদার পুলিশের তীক্ষ্ম হুইসেল শুনে। আমাদেরকে এতো রাতে উদ্ভ্রান্তের মতো হাইওয়েতে ঘুর ঘুর করতে দেখে পুলিশের সন্দেহ হলো। লিকলিকে চেহারার চারজন আর ষন্ডামার্কা একজন পুলিশ মিলে আমাদেরকে প্রায় চ্যাংদোলা করে গাড়িতে ওঠালো। এরপরে তিন ভবঘুরেকে নিয়ে শুরু হলো তাদের প্রশ্ন প্রশ্ন খেলা! আমরা কারা? কোন দলের সদস্য? কোত্থেকে এসেছি? কোথায় যাবো? আমাদের পায়ে জুতো কই? ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা যতোই বলি – চাঁদের আলোয় আমরা ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়েছি ততোই তাদের মেজায বিগড়াচ্ছে। রসকষহীন পুলিশগুলো কোনক্রমেই আমাদের কথা বিশ্বাস করল না। শেষ পর্যন্ত আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো সাভার হাইওয়ে থানায়। ওসি সাহেব – তিনি সম্ভবত সাহিত্যানুরাগী ছিলেন – আমাদের করুন চেহারা দেখে আর কথা বার্তা শুনে বেশ কিছুক্ষণ হাসলেন। এরপর আরিফকে প্রশ্ন করলেন – তোমরা তাহলে সাহিত্য চর্চা করো? আরিফ বলল- টুকটাক কিছু লেখার চেষ্টা করি আরকি। এবার ওসি সাহেব ফাহিমকে একটি কবিতা শোনাতে বললেন। চিরকালের ভিতু ফাহিম তোতলাতে তোতলাতে শুরু করলো- “বলো বীর,বলো উন্নত মম শির।শির নেহারি আমারি নত ওই শিখর হিমাদ্রির”। ওসি সাহেবের মনোভাব বোঝা গেলনা। তবে ঠোঁটের কাছে ঝুলতে থাকা রেডিমেড হাসিটা দেখে মনে হলো আর যাই হোক, ফাহিমের অদ্ভুত আবৃত্তি শুনে তিনি রাগ হননি। এরপর আমাকে বললেন- তোমার লেখা একটি কবিতা শোনাও। ভাগ্যিস! সেদিন বিকেলেই একটা কবিতা লিখেছিলাম। আমি শুরু করলাম –
“যদি কেহ তোমারে বিশ্বাস করে
শতগুণ দিও ফিরায়ে তাহারে।
যদি দাও অবিশ্বাসের ফুলঝুরি,
তবে জেনো, তোমারও সময় আসিবে ফিরি……….।”
ভাগ্য হয়তো সেদিন সুপ্রসন্ন ছিল। ওসি সাহেব মোটামুটি প্রশংসাই করলেন। এরপর বললেন – সাহিত্যিক হতে চাও ভালো কথা, কিন্তু সাহিত্যিক হতে হলে খালি পায়ে হাইওয়েতে ঘোরাঘুরি করা লাগেনা। সাহিত্যিক হতে হলে নির্জনে বসে চিন্তা ভাবনা করতে হয়। আর কখনও রাতে বাইরে ঘোরাঘুরি করবে না। এরপর একজন কন্সটেবলের সাথে পুলিশের গাড়িতে করে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিলেন আমাদের।
এরপর আর কখনও রাতে বাইরে ঘোরাঘুরি করেছি বলে মনে পড়েনা।
ছবি : ফুয়াদ শেখ
Facebook Comments