Saturday, January 22, 2022
Home > গল্প > নানাজানের কুরবানী | আহমাদ কাশফী

নানাজানের কুরবানী | আহমাদ কাশফী

Spread the love
আমার নানা বেশ সৌখিন মানুষ ছিলেন। সখ করে ফুলগাছ লাগানো, কবুতর পালা,বড়শি দিয়ে মাছধরা, ইত্যাদি ইত্যাদি সখ। গ্রামের মানুষ ব্যবসার উদ্দেশ্যে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি পালে। ঈদ আসলে মহানন্দে ধুমধাম করে বিক্রি করে ঈদের খরচ জোগায়। আমার নানাজান এক্ষেত্রেও ছিলেন সৌখিন। গরু,ছাগল,হাঁস মুরগি বেশ সখ করে পালতেন। নিদারুণ সখের বশে আবার ভালোবেসে ফেলতেন।ভালবাসাও আবার যেনতেন ভালোবাসা নয়। গভীর ভালবাসা। সে ভালোবাসার ফল হতো তেঁতো। মারাত্মক তেঁতো।
 
একবারের ঘটনা। কুরবানী ঈদের সময় হয়ে আসছে। মাত্র দুইদিন বাকী। ঘরে কিছুই কিনা হয়নি । নানার পাঞ্জাবি নানীর শাড়ি থেকে নিয়ে ঘরের মশলাদি কোনকিছুই কিনা হয়নি। কথা ছিলো গোয়ালের দুইটা গরু আছে একটা ঈদে জবাই করা হবে। আরেকটা বিক্রি করে ঈদের খরচাপাতি বহন করা হবে। কিন্তু, সৌখিন নানা কিছুতেই গরু বিক্রি করতে রাজী নন। এদিকে মেহমান এসে বাড়ী ভরে গেছে। খালা-খালু,মামা-মামি সবাই এসেছেন।
 
নাছোড়বান্দা নানা তবুও গরু বিক্রি করতে রাজী নন।তিনবছর ধরে অতি সখে যত্নসহকারে যে গরু পালছেন। তা বিক্রি করতে রাজি হবেন কোন যুক্তিতে। নানী তো বাড়ি বাড়ি বলে বেড়াচ্ছেন নানা কে ভূতে পেয়েছে। এত বকাঝকা করেও নানাকে রাজি করাতে ব্যর্থ তিনি।
 
গতকাল ঢাকা থেকে বড় মামা এসেছেন। নানীর মুখ থেকে সব শুনে নানাকে রাজি করানোর আশ্বাস দিয়েছেন। নানীও চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন নানা কে রাজী করাতে মামা ব্যর্থ হবেন। মায়ের দ্বারা যা অসম্ভব তা ছেলের দ্বারা কিভাবে সম্ভব হবে? তাই,নানী মামাকে পরামর্শ দিয়েছেন গভীর রাতে গরু বের করে হাটে নিয়ে বিক্রি করে ফেলতে।মামা কিছুতেই এমন কাজ করতে পারেন না। কেননা,তিনি মাওলানা সাব। আর, মাওলানা সাব কি না বলে বাবার গোয়াল থেকে গরু নিয়ে বিক্রি করে ফেলতেপারেন? তিনি তো জানেন পিতার অবাধ্যতার কি পরিণতি। আবার, গরু না বেচতে পারলেও মায়ের অসন্তুষ্টি। মহা টানাপোড়েনে আছেন মামা।
 
দুপুরের দিকে নানা যখন বাড়ির উঠানে জাম গাছতলায় হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছেন, মামা তখনি সুযোগ বুঝে নানার কাছে গিয়ে বসে কুরআন -হাদীসের বিভিন্ন ঘটনা শুনাতে লাগলেন। নানা খুব খুশি। নানার অনেক আশা তার ছেলেরা মাওলানা হবে। কাছে বসে বসে কুরআন -হাদীসের ঘটনা শুনাবে বক্তাদের মত। মামা কখনো এসবে আগ্রহ দেখাননি। মাওলানা হওয়ার পরেও না। নানা অনেক পীড়াপীড়ি করে শুনতেন। আজ মামা সাগ্রহে আসায় নানার অনেকদিনের আশা পূরন হলো। তিনি খুশি হয়েছেন। অনেক বেশী খুশি হয়েছেন। খুশির বসে বলে ফেলেছেন আজ মামা যা চাইবো তাই দিবেন। মামা কিচ্ছু চাইলেন না। তার আগেই বললেন আরেকটি ঘটনা শুনতে পরে চাইবেন। নানা আরো খুশি। মামা বলা শুরু করলেন ইবরাহীম (আঃ) এর কুরবানীর ঘটনা। আল্লাহর নির্দেশে পিতা পুত্রকে জবাই করার হৃদয় বিদারক ঘটনা। নানা শুনে কেদে ফেললেন। চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। এবার মামা আবদার পেশ করলেন। সেই আবদার যার জন্য নানীকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। নানাকে রাজী করানোর আবদার। নানা কে যখন গরু কুরবানীর কথা বললেন তিনি যেন কিছুটা হোঁচট খেলেন। তার পরেও রাজি হলেন কারন ইবরাহীম (আঃ) নিজের সন্তান কুরবানীর জন্য রাজী হয়ে যেতে পারলে তিনি কেন সাধারণ একটা গরু জবাই করতে পারবেন না? নানার বিবেক নড়ে উঠলো, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন গরু একটা বেচবেন একটা কুরবানী করবেন। কিন্তু, নিজে বেচতে যাবেন না। নিজ হাতে কুরবানীও করবেন না। কারন এত সখের জিনিস তিনি অন্য কারো হাতে তুলে দিতে পারবেননা। মামাকে দিয়েই বেচাবেন।
 
শেষপর্যন্ত মামা জয়ী হলেন। ঐ দিনই গরু বিক্রি করে ঈদের কেনাকাটা শেষ করলেন।
 
ঈদের দিন নানা নতুন পাঞ্জাবী পড়ে ঈদগাহে গেলেন। সবাই নতুন পাঞ্জাবী পড়ে খুশি হয়। নানা কিন্তু খুশি হননি। এটা নানার বহু কষ্টের কুরবানীর পাঞ্জাবী। শুধুমাত্র ইবরাহীম (আঃ) এর কুরবানীর ঘটনার প্রতিক্রিয়া ছিলো বিধায় পেরেছেন।কিন্তু, এই প্রতিক্রিয়া বেশীক্ষণ থাকলো না। যখন তার সামনে গরু জবায়ের জন্য বাধা হচ্ছিল তিনি কেঁদে ফেললেন। চিৎকার করে উঠলেন। এত সখের গরু তিনি জবাই করতে দিবেননা। বাড়ির সবাই মিলে নানাকে দরাদরি করে ঘরে নিয়ে গেলেন। বাইরে থেকে যখন মামার কণ্ঠে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার শুনলেন একেবারেই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
 
জ্ঞান ফিরে আসার পর কুরবানীর
পাঞ্জাবী দিয়ে চোখ মুছলেন।
Facebook Comments