বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > গল্প > কচু অথবা কচুরিপানা | আহমাদ কাশফী

কচু অথবা কচুরিপানা | আহমাদ কাশফী

Spread the love

শেষ বেঞ্চের ছাত্র ফিরোজ।  হাজিরা খাতায়ও তার নামটা সবার শেষে।পরীক্ষায় সিরিয়ালের শেষ দিকের প্রথম স্থানটি সবসময় তারই দখলে থাকে। ক্লাসের পড়া কোনদিন ফুলফিল করতে পেরেছে কিনা সে নিজেও হয়তো জানেনা। একেবারে দুর্বল একটা ছাত্র। কিন্তু, অত্যান্ত সুবোধ এবং ভাবুক টাইপের ছেলে। কোন এক কারণবশত: ক্লাসের সবাই তাকে ‘কচু’ বলে ডাকে। মনে মনে প্রচণ্ড ক্ষুদ্ধ হয় ফিরোজ। কিন্তু, মনের কষ্ট মনেই চাপা পড়ে থাকে।

সেদিন বাংলা স্যার সবাইকে কচুর রচনা লিখতে দেন। পরদিন সবাই ঝকঝকে অক্ষরে দুর্বোধ্য সব বাক্য প্রয়োগ করে চমকপ্রদ সব রচনা দেখিয়ে স্যারের প্রশংসা কুড়োয়। কিন্তু, হিবিজিবি অক্ষরে আবোলতাবোল কি সব লিখে আনায় ফিরোজের দিকে ফিরে স্যার তার উঁচু উঁচু দাতগুলো কেলিয়ে বিদ্রুপাত্নক হাসি দিলেন। সাথে সাথে হেসে উঠলো পুরো ক্লাসরুম।
স্যার বলে উঠলেন, তোরাই বল এই নির্বোধটাকে আজ কি শাস্তি দিবো?
সামনের বেঞ্চের দুরন্তবালক রাকিব দাঁড়িয়ে বললো, স্যার কান ধরিয়ে বেঞ্চের নিচে মাথা দিয়ে পুরোক্লাস দাঁড়িয়ে থাকলে ওর শাস্তি হয়ে যাবে।

‘স্যার ওরে দশটা বেত লাগালেই হয়’ বললো মাঝ বেঞ্চের আরেক ছাত্র জাকির।

মেয়েদের মধ্যে তানিয়া বলে উঠল, স্যার ওরে কচুর রচনা লিখতে দিন। সাথে সাথে আবারো পুরো ক্লাস হাসিতে ফেটে উঠলো।
তৃতীয় রায়টি গ্রহণ করে স্যার সিদ্ধান্ত দিলেন, আগামীকাল ফিরোজকে কচুর রচনা লিখতে হবে। না পারলে আগের দুই রায় কার্যকর করা হবে।

ফিরোজ বাড়ি ফিরে সিদ্ধান্ত নিলো তাকে আজ কচুর রচনা লিখতেই হবে। সিদ্ধান্ত মাফেক কবিদের মতো হাতে একটি আর কলম নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু, বেশিদূর যেতে হলো না। খালের পাড়ে যেতেই ফিরোজের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ‘নাহ! কচু নয় কচুরিপানা। কচুরিপানা নিয়ে লিখবো।’ সে কচুরিপানা নিয়েই লিখতে লাগলো। কচুরিপানার বিবরণ, আকার-আকৃতি, প্রকার, ধরণ ইত্যাদি সব লিখে প্রায় দুই পৃষ্ঠা ভরে ফেললো। পরদিন দুই পৃষ্ঠার “কচুরিপানা” বিষয়ক রচনা নিয়ে সে ক্লাসে উপস্থিত হলো। এদিকে ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে রাজীব মনে মনে ফন্দি আঁটতে লাগলো, যে করেই হোক ফিরোজকে মার খাওয়াতে হবে। টিফিনের সময় যখন ফিরোজ ক্লাসের বাহিরে গেলো, রাজীব তখন লুকিয়ে ফিরোজের খাতা থেকে তার দু’পৃষ্ঠার রচনাটি ছিঁড়ে বারান্দায় ফেলে দিলো। বাংলা স্যার যখন ক্লাসে এসে রচনা দেখতে চাইলো ফিরোজ তখন ছেঁড়া পৃষ্ঠার চিহ্ন দেখালো। স্যার সাফ জানিয়ে দিলেন, কোনো কৈফিয়ত শুনা হবে না। ফলে আগের দুই রায়ই কার্যকর করা হলো।

এদিকে স্কুলের একজন স্যার কচুরিপানা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি তার চিরাচরিত অভ্যাসমত মাথা চুলকাতে চুলকাতে বারান্দায় ঘুরাফেরা করছিলেন। হঠাৎ কি ভেবে যেন মেঝে থেকে একটা কাগজ হাতে তুলে নিলেন।

তাতে লেখা:
প্রবন্ধরচনা
বিষয়:কচুরিপানা
ফিরোজ আহমেদ
পঞ্চম শ্রেণী
গবেষক স্যার পড়তে লাগলেন। তাঁর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। যেন গবেষণার এক নতুন সূত্র খুঁজে পেয়েছেন।

ছুটির সময় যখন সবশিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বের হচ্ছিলো, গবেষক স্যার তখন ফিরোজকে ডেকে নিয়ে পুরস্কৃত করলেন। এবং বললেন, ফিরোজ আজ থেকে তুমি আমার এসিস্ট্যান্ট।

সেদিন থেকে ফিরোজের সামনে উন্মোচিত হলো উদ্ভিদ গবেষণার এক নতুন জগত। ধীরে ধীরে ফিরোজ হয়ে উঠে বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানী ডক্টর ফিরোজ আহমেদ। দেশ-বিদেশে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। অথচ, রাকিব, জাকির, তানিয়া, রাজিবদের আজ কেউ চেনে না। হয়তো চেনার প্রয়োজনও বোধ করে না।

ঘটনার ২৩ বছর পর একবার স্কুলের এক অনুষ্ঠানে সেই উদ্ভিদবিজ্ঞান স্যার ফিরোজকে দেখিয়ে বললেন, একাডেমিক বিষয়ে ক্লাসের সবচেয়ে অমেধাবী ছাত্রটিও কখনো কখনো ভিন্ন কোন বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে। তাই, কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা বিদ্রুপাত্নক নামে ডাকা সমীচীন নয়।

Facebook Comments