Sunday, January 16, 2022
Home > ফিচার > যানজট ও বাংলাদেশ

যানজট ও বাংলাদেশ

Spread the love

যানজট ও বাংলাদেশ


বাবলু দাস : শনিবার, মিরপুর থেকে নীলক্ষেতের উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠলাম। মিরপুর থেকে নীলক্ষেতের দূরত্ব ৯-১০ কি.মি হবে। স্বাভাবিকভাবে বাসে গেলে ৪৫-৫০ মিনিট লাগার কথা। কিন্তু যানজটের কারণে সময় লাগলো ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট বা আরও বেশি।
 
এটা শুধু মিরপুর থেকে নীলক্ষেতের রাস্তার চিত্র নয়, প্রায় সমস্ত ঢাকা শহরের চিত্র বলাই চলে। এই তীব্র যানজটের কারণে আমাদের আর্থিক, মানসিক, সমাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে যানজট একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বাংলাদেশের কথা বাদ দিয়ে শুধু ঢাকা শহরের উদাহরণ-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট। ঢাকা যানজটের প্রধান নগরী। এই যানজটের কারণে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা থেকে আমাদের মুক্তি বড় প্রয়োজন। ঢাকা শহর রাজধানী হওয়ার কারণে মানুষের সংখ্যা যেমন বেশি তেমনি যানবাহনের সংখ্যাও বেশি।
 
রাজধানী ঢাকায় যানজটের অন্যতম কারণ হলো, অতিরিক্ত প্রাইভেটকার ও রিক্সা। রাস্তায় যানবাহনের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রাইভেটকার। কোন কোন পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্যের একেকটা প্রাইভেটকার আছে। কোন কোন সময় দেখা যায় কার ড্রাইভার ও একজন যাত্রী। স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি-র হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় কম-বেশি ১৫ ভাগ যাত্রী প্রাইভেট গাড়িতে যাতায়াত করেন৷ এইপ্রাইভেট কারের দখলে থাকে ৭০ ভাগের ও বেশি রাস্তা। এই ব্যক্তিগত গাড়গুলো বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী।
 
সর্বশেষ খবর হলো নাম্বিও নামের একটি গ্লোবাল ডেটাবেসের সমীক্ষায় ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্বের সর্বাধিক যানজটের শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর আগের দুই বছর ঢাকার স্থান ছিল দ্বিতীয়, ২০১৬ সালে তৃতীয়। এই সমীক্ষা আমাদের বলে দিচ্ছে যে, ঢাকা শহরে যানজট অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বেড়ে চলছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)হিসাব অনুযায়ী গত বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৬০ এর মধ্যে মোটরসাইকেলর সংখ্যাই প্রায় অর্ধেক। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৪। বাস ৩৯ হাজার ৭৮২টি। গত কয়েক মাসে যানবাহনের সংখ্যা আরো বেড়েছে।কারণ হিসাবে বলা যায়, প্রতি মাসে প্রায় দেড়হাজার ব্যক্তিগত গাড়িই শুধু নিবন্ধিত হচ্ছে। এ কারণে প্রতিদিন প্রায় ঢাকা শহরেই ৫০ লাখ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে।যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।যানজট যেভাবে বেড়ে চলছে তাতে মনে হয় আর্থিক ক্ষতির পরিমান আরো বাড়বে।

ঢাকা শহরে যানজটের আরেকটি অন্যতম প্রধান কারণ হল ফুটপাত দখল। দেখা যায় রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক হকারদের দখলে। তারা ফুটপাত দখল থেকে শুরু করে ফুটওভারব্রিজগুলিও দখল করে নিয়েছে। ফলে সাধারণ পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেনা এবং বাধ্য হয়েই তাদেরকে রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হয়। প্রতিদিন ঘটছে দূর্ঘটনা। বাংলাদেশ ছিন্নমূল হকার সমিতির তথ্য অনুসারে বর্তমানে ঢাকা শহরে ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি হকার রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ হাজার স্থায়ী এবং ৬০ হাজার অস্থায়ী।
 
ঢাকা মহানগরী তথা বাংলাদেশের বর্তমান ও আগামী কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যানজট নিরসন করা। যানজটের কারণে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আমাদের স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যানজট মানসিক স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব পড়ছে বলে একাদিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এসব গবেষণায় বলা হয়, যানজট ৯ ধরনের মানবিক আচরণকে প্রভাবিত করছে। দূর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব থেকে শুরু করে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মতো বিষয়গুলো যানজটে প্রভাবিত হচ্ছে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পূর্ণবাসন কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ সিরাজউল ইসলাম বলেন, যানজটে বসে থাকলে মানসিক চাপ তৈরি হয়। নানান রকম দুশ্চিন্তা ভরকরে। এ মানসিক চাপ সব ধরনের রোগের উৎস। চাপের ফলে নাগরিকদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং যুদ্ধংদেহী মনোভাব চলে আসে।
 
যানজট শুধু যে আমাদের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা তৈরি করে তা নয়। যানজট আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিকসহ আরো কয়েক রকমের ক্ষতি করে থাকে। এই যানজটের অসহনীয় দুর্ভোগ থেকে বের হতে হলে সরকারকে এ অধিক মনোযোগী হতে হবে। প্রথমত, যানবাহন চলাচলে অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। প্রাইভেটকারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন ও নতুন বাস চলাচলের ক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর হতে হবে। বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ কত সংখ্যক যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করতে পারে তা বিবেচনায় না নিয়ে নিয়ন্ত্রনহীনভাবে যানবাহন নিবন্ধন করা হচ্ছে। বছরের পর বছর যা সরকারের কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে আটকানো যেতে পারে।
 
ফুটপাত দখল মুক্ত করার ক্ষেত্রে আরো একটি কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেখতে হবে যে ফুটপাত দখল করার ক্ষেত্রে কে বা কারা জড়িত। কে বা কারা ফুটপাত দখল করার ক্ষেত্রে হকারদের সহযোগিতা করে আসছে। সরকারকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনের আওতায় এসব ব্যক্তিদের নিয়ে আসতে হবে। যদি ঢাকা শহরের রাস্তাগুলো হকার মুক্ত করা যায় তাহলে যানজট ৫ শতাংশ থেকে আরো বেশি কমে আসতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
 
তাছাড়া সরকারকে রাস্তাঘাট মেরামত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। দেখা যায়, ঢাকা শহরের অধিকাংশ রাস্তা এবং রাস্তার পাশের নর্দমা বছরের বিভিন্ন সময়ে একই কাজ বার বার করা হয়। ফলে রাস্তাঘাটে যানজট সৃষ্টি হয়। সুতরাং সরকার এবং আমাদের দ্বায়িত্বশীল আচরণই পারে ঢাকা শহর তথা বাংলাদেশের যানজট নিরসন করতে।
 
শিক্ষার্থী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook Comments