Wednesday, January 19, 2022
Home > গল্প > অরণ্য ভালোবাসা | মুন্না রহমান

অরণ্য ভালোবাসা | মুন্না রহমান

Spread the love

বাদলের গ্রামের বাড়িতে যাবো যাবো করে যাওয়াই হয়ে উঠেনা। স্নাতকোত্তর মানে এমএ পরীক্ষা শেষ করে একেবারে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। কাজ কাম কিছুই নেই। তিনবেলা আহারের সময় বাড়িতে পাওয়া যায় আমাকে। বাকি সময় আড্ডায় মেতে থাকি। হয় বন্ধুদের সাথে আড্ডা নয়তো অনামিকার হাত ধরে ফরেস্ট ঘাটে গোপন অভিসারে যাওয়া

বন্ধুরা প্রচন্ড ভালোবাসে আমায়। এটা আমার সৌভাগ্য। ছোটখাটো আড্ডা থেকে শুরু করে সমস্ত অনুষ্ঠানে আমাকে ওদের পাশে চাই-ই চাই। মাস্টার্স পরীক্ষার ফলাফল বের হলো। রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই হলো। মনটা বেশ ভাল, মানে বেশ ফুরফুরে। মনস্থির করলাম, বাদলের গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসার। সুন্দরী সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার প্রায় পুরোটাই সুন্দরবন। বাদলদের বাড়িও এই থানার এমন একটা গ্রামে। যার চারদিকে অরন্য। অরণ্যের মাঝে ওদের বসতি। আমি যথাসময়ে বাদলদের অরণ্য বসতিতে চলে এলাম। বাবা মা, এক ভাই ও এক বোনকে নিয়ে বাদলদের মোটামুটি সংসার। বাদল এ সংসারের বড় ছেলে স্বাভাবিকভাবে এ সংসারে বাদলের গুরুত্ব একটু বেশিই। পড়াশোনায় ভালো না হলেও কাজ কর্ম করে পুষিয়ে দেয়ার ক্ষমতা ওর আছে। বি এল কলেজের জাকির স্যার একবার ওকে বললো, বাদল, তোমার টিউটোরিয়াল পরীক্ষা ভাল হয়নি মোটেও পাশ করতে পারবা না। বাদল বললো, স্যার, অন্য কোন সুনাম দিয়ে এটা ঢেকে দেবো। আন্ত কলেজ অ্যাথলেটিক্সে এ অঞ্চলের বাঘা বাঘা সব অ্যাথলেটদের পিছনে ফেলে রেকর্ড সময় থেকে ১০০ মিটার দৌড়ে বাদলকে সবাই আগে দেখলো। প্রিন্সিপাল স্যার চেয়ার থেকে নেমে বাদলকে বাহবা জানালো। টিউটোরিয়াল প্রথম সারির মার্ক ঠিকই চলে আসলো। লোনা পানি আর উত্তাল বঙোপসাগরে দামাল হাওয়ায় বেড়ে উঠা পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি উচ্চতার কৃষ্ণকায় বাদলের গায়ে যেন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একশো জোয়ানের শক্তি। সাহসও অসীম। ভয়ডর শুন্য এই তরুণ আমার প্রিয় বন্ধুদের একজন। এম এ পাশ করে কোন চাকরি বাকরির চেষ্টা না করে বাড়িতে এসে বাবার কৃষি কাজে সাহায্য করতে লেগে গেছে। আর বাড়তি আয়ের উৎস অফুরান সম্পদের ভান্ডার সুন্দরবন তো আছেই জালের মতো অজস্র নদী আর খাল সুন্দরবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। আর এসব নদ নদী আর খালে সর্বক্ষণ জলের ধারা প্রবাহমান হচ্ছে বঙোপসাগরের লোনা জলে। প্রকৃতির এক অপরুপ দান এই সুন্দরবন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা টাইডাল ফরেস্ট। সমুদ্র প্রতিনিয়ত এর পা ধুয়ে দিচ্ছে। সুন্দরী গরাণ, গেওয়া, ধুন্দল কেওড়া গাছে চারিদিকে সুশোভিত অসংখ্য পাখপাখালির স্বর্গরাজ্য। বণ হরিণ, দাতাল, অজগর, বন বিড়াল, বাঘডাসা, বনমোরগ এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পদচারনায় দীপ্ত এই মহা অরন্য। মাছ মধু, কাঠ, গোলপাতা, এসব আহরণ করে অসংখ্য বাওয়ালি ও মৌয়াল  জোংড়ামুটা জেলেরা জীবিকা নির্বাহ করে। বাদল গভীর অরণ্যের প্রায় দুই বিঘা জমিতে একটি পুকুর কেটে রেখেছে। ওর ভাই এবং গ্রামের কিছু যুবক এ কাজে ওকে সাহায্য করেছে। জোয়ারের পানিতে যখন জঙ্গল ভরে যায় তখন অনেক মাছ চরের তুলনামূলক কম পানিতে আশ্রয় নেয়। যখন জোয়ারের পানি সরে যায় মাছগুলো নিরাপদ আশ্রয় ভেবে গভীর পানিতে থেকে যায়। বাদলের বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। সুন্দরবন থেকে আয়ের এই অভিনব উৎসের আবিষ্কারক হিসেবে প্রচুর সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ে ওর পুকুরে। বন বিভাগের কোন  ক্ষতি না করে বাদলের এই উপার্জন আমার খুব ভাল লাগলো। আর বাদল কষ্টও করতে পারে সীমাহীন। পুকুর থেকে আন্দাজ দশ এগারো গজ দূরত্বে একটি সুন্দর নয়নাভিরাম টং ঘর বানিয়েছে ও। স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। ফরেস্টের নানা উপকরণ দিয়ে সুন্দর করে একটি ঘর বানিয়েছে যার নির্মানশৈলী দেখার মতো। এই মহা অরণ্যের বিশালতার কাছে এই টং ঘর নিত্তান্তই ক্ষুদ্রাকার কিন্তু আমার হৃদয়ের কাব্যিক বর্ননায় বলবো, বাদলের এই টং ঘরটি যেন মহা অরণ্যের মাঝে এক অপরুপ সৌন্দর্য । এম এ পাশ করা এক যুবকের প্রানবন্ত এই তৎপরতা খুবই বিরল আর বাদলের মতো অকৃত্রিম বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমার আসা উপলক্ষে বাদলদের বাড়িতে যেনো উৎসবের একটা আমেজ তৈরি হলো। নানা আয়োজন, পিঠা পুলি গল্প সবই সমান তালে হতে লাগলো। আমার মন কিন্তু পড়ে রয়েছে সেই টং ঘরে। সেখানে না যাওয়া পর্যন্ত আমার কিছুই ভালো লাগছেনা। টংয়ে বসে পিপাসার্ত হরিনের পানি খাওয়া, নিঝুম রাতে চাঁদকে আড়াল করে নিশাচর পাখির উড়ে যাওয়া আর মহা অরণ্যের দুর্নিবার আকর্ষণ তো আছেই। বাদলকে বারবার বলছি, বাদল, চল, টং ঘরে যাই। কিন্তু বাড়ি থেকে কেউ ছাড়ছেনা কত প্রকার পিঠা পুলির যে আয়োজন করেছেন খালাম্মা অর্থাৎ বাদলের মা তার ইয়ত্তা নেই। পিঠা খেয়েই পেটের প্রায় সবটা ভরে ফেললাম। মজাদার সব পিঠা। আমার জানামতে, এ অঞ্চলের মানুষরা পিঠা বানাতে এতো সিদ্ধহস্ত না। খালাম্মা বোধহয় এ অঞ্চলের মেয়ে নয়। রাতের খাবারে সামুদ্রিক মাছ আর টাটকা হরিণের মাংস প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোজন করায় নড়াচড়া করতে পারছিনা। বাদল আমার থেকে ডাবল খেয়েছে অথচ ও বলছে এরকম আরো একবার খেতে পারবে। শুনে আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। বলে কি এ দানব? অবশ্য ওর শরীরের ক্ষিপ্রতা, শক্তি এবং ওর পরিশ্রম অনেক সুতরাং ওকে তো খেতেই হবে। অনেক রাত পর্যন্ত গল্প শেষে যে যার মতো চলে গেল। বাদলের সাথে আমার শোয়ার ব্যবস্থা।  শুয়ে শুয়ে ওকে বললাম, জানিস, আমার মন পড়ে আছে সেই গহীন অরণ্যের ছোট টং ঘরে। যেখানে এই অপূর্ব পুর্ণিমা রাতে কেউ নেই দখিনা বাতাস ঘুরে ফিরছে। দোলা দিয়ে যায় সারা শরীর। বাদল বললো, তাহলে চল এখন চলে যাই তোর স্বপ্নের ঠিকানায়। আমি তো যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্ত বাস্তবতা এখন ভিন্ন। গভীর রাত। নৌকায় করে সরু খালের ভিতর দিয়ে আমাদের যেতে হবে। এমন এমন খাল আছে যার দূরত্ব বাঘ মামা এক লাফে এপার থেকে ওপারে পার হয় । খালে অজস্র কুমির। কাটাযুক্ত লেজ দিয়ে বাড়ি মেরে পানিতে ফেলে দিতে পারে । পথ ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অজস্র খালের ভিতর দিয়ে যেতে হবে যদিও বাদলের উপর আমার শতভাগ আস্থা আছে। যতই বন্ধুর পথ হোক না কেন। যতই রাত আর বিরুপ পরিবেশ থাকুক না কেন এই পথ বাদলের হার্ড ডিস্কে এমনভাবে ডাউনলোড করা যে পথ ভুল হবার সম্ভাবনা নেই। তবে সবথেকে বড় ভয় হলো দূরন্ত ডাকাতদের। এই অরণ্যে কুমির এবং বাঘ থেকেও ভয়ংকর কিছু নরপশু আছে যারা হিংস্র থেকে হিংস্রতর। এতসব প্রতিকুলতার মধ্যে স্বপ্নটাকে আপাতত সমাহিত করে রাতটাকে পার করে দিলাম। ভোর হলেই রওনা দিবো আমাদের স্বপ্নের পৃথিবীতে। সুন্দর সুন্দর সব পরিকল্পনা করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম নির্ভেজাল ঘুমে একটা রজনী কেটে গেল। শত সহস্র পাখ পাখালির আওয়াজে ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো।  অাড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে  বসলাম। বাদলের বিছানা শূন্য। ও উঠে  গেছে  কারো অাগে। মামাকে ডাকেনি।অামি ও তড়িঘড়ি  করে উঠে পড়লাম, বাইরে বেরিয়ে দেখি বাদল জগিং করছে। ঘামে  ওপর সারা শরীর চকচক করছে। অামি ওর কাছে এসে বললাম, কিরে আমায় ডাকিসনি কেন?
বেশি রাত জেগে ঘুমিয়েছিস তাই তোকে  আর ডাকি নি। চল, দৌড়  দেই।


দু’জনে মিলে দৌড়  শুরু  করলাম। ঘন্টা খানিক দৌঁড়ানোর পরে আমি  হাফিয়ে উঠলাম কিন্তু বাদল সমানে দৌড়াতে লাগলো। আমার অনুরোধে ও দৌড় থামিয়ে দিয়ে চলে আসলো। দুজনে নদীর পানিতে ভালো করে গোসল সেরে বাড়িতে এসে দেখি ইতিমধ্যে খালাম্মা অনেক প্রকার নাশতার আয়োজন করে ফেলেছেন। খেলাম পেট ভরে, আমার পেট ভরে গেছে কিন্তু বাদলের পেট ভরে কিনা তা নিয়ে  আমার সন্দেহ আছে। কারণ আমার খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরে ও খেতেই থাকে। দু’জনে উঠে প্রস্ততি নিলাম টং এ যাওয়ার জন্য। আমার মনে হচ্ছে কখন যাবো, বাদল ও বুঝতে পারছে  আমার মনের অবস্থা। তাই বেশি দেরি নাম করে রওনা হলাম। ছইওয়ালা একটা ছোট্ট নৌকায় উঠেছি। বাদল নৌকা বাইছে, আর আমি গলুইয়ে বসে চারপাশের সৌন্দর্য  দেখছি। দুপাশে বন বনানী, মাঝখান দিয়ে ছোট বড় খাল,দুই একটা ছোট্ট নদী ও পার হচ্ছি। অজস্র পাখি গাছে গাছে, বানর ও আছে প্রচুর।বেশ অপুর্ব দৃশ্য। এই অরন্যে না আসলে এ-র সৌন্দর্য অনুধাবন করা দুঃসাধ্য। আমি বরাবরই একজন প্রকৃতিপ্রেমি, অরন্য আমায় টানে। অরন্যের কাছে আসলে আমি নিজেকে অন্য ভাবে আবিষ্কার করি। আজকের অনুভূতি অন্যরকম। বাদল আমাকে বোঝে তাই ও চুপ করে নৌকা বাইছে, আমায় ডাকছে  না। দুই একটা কুমির নাক উচু করে আবার ডুব দিচ্ছে। হরিণ গুলো উৎসুক দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে, আবার ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে গভীর বনে ঢুকে পড়ছে। এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য ক’জনার হয়? তাই বিমুগ্ধ নয়নে উপভোগ করছি সব কিছু। তার তার বেগে চলছে আমাদের নৌকা। বাদল আপন মনে বেয়ে চলেছে। আর আমি ও  দুচোখ ভরে দেখছি এ-ই নিঃসর্গ প্রকৃতি।আমাদের গনতব গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। মাঝে মাঝে দু’একটা নৌকা আমাদের আশ পাশ দিয়ে যাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই জেলে, বাওয়ালী দের নৌকা। একেবারে পরিচিত দু-এক জনের সাথে বাদলের কুশল বিনিময় হচ্ছে ।ওদিকে আমার অতটা খেয়াল নেই। আমার সমস্ত ভাবনা এবং মন পড়ে রয়েছে চারপাশের অপুর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য এর প্রতি।যেখানে যান্ত্রিকতার লেশ মাত্র নাই,আছে অবারিত সবুজএর সমারোহ। অফুরান সুন্দরের মাঝ দিয়ে ছুটে চলেছি আমরা। বাদল বললো , চলে এসেছি  তোর আপন ঠিকানায়। দূর থেকে টং ঘরের উপরের অংশটা দেখতে পেলাম। নৌকা তীরে ভেড়ানোর সাথে সাথেই এক ছুটে টং ঘরের কাছে চলে এলাম। কয়েকটি হরিণ পুকুরে পানি খেতে এসেছিল, লাফ দিয়ে ছুটে পালালো। বানরের দল হুড়মুড় করে এ গাছ থেকে ও গাছে লাফালাফি করছে। জংগলের এই  অপরুপ চেহারা দেখে যান্ত্রিকতাকে ভুলে যাওয়া যায়। নৌকাটাকে ঠিক ঠাক জায়গায় বেঁধে রেখে বাদল ও চলে আসলো। দু বন্ধুতে সিড়ি দিয়ে টং এ-র উপরে উঠে এলাম।
বেশ কিছুদিন বাদল এখানে আসেনি তাই সব কিছু এলোমেল পড়ে রয়েছে। দু’জনে মিলে সব কিছু গুছিয়ে ফেললাম।এবার দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। রান্নার সরঞ্জাম সবি আছে মাছ মাংস বাদে। বাদল বললো, চল মাছ ধরে আনি। ওর পুকুরে প্রচুর  মাছ আছে,কিন্তু আমরা খালে মাছ ধরবো। আমি ছিপ নিতে উদ্যত হলাম। বাদল বললো , আজ হাত দিয়ে মাছ ধরবো চল। আমি ভাল করে জানি সুন্দরবনের খালে কুমির থাকে। তারপরও উৎসাহ না হারিয়ে বললাম চল, যাওয়া যাক। টং ঘরে থেকে খাল বেশি দূরে নয়,দুজনে অল্প কিছু সময়ের মধ্যে খালের পাড়ে চলে এলাম। বাদল বললো , তুই উপরে  দাড়িয়ে থাক,আমি নামি। তুই মাছ খুটে পাত্রে রাখবি। বলেই বাদল পানিতে  নেমে পড়লো। এখানকার পানি বেশ পরিস্কার। নিচে পযন্ত দেখা যায়। কুমির থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বাদল এ অঞ্চলের মানুষ, অভিজ্ঞতা আছে ওর। ও বুঝে শুনে পানিতে নেমেছে।

হাতড়িয়ে ইতিমধ্যে বেশ কিছু মাছ ধরে ফেলেছে বাদল। ওগুলো ছুড়ে মারছে উপরে, আমি কুড়িয়ে পাত্রে রাখছি। সব সামুদ্রিক মাছ। এখন ও আমায় পানিতে নামতে বলছে,আমি একটু ভয় পাচ্ছি। বাদল আমাকে গোসল করার জন্য ডাকছে। চলে আয়, কোন ভয় নেই।  এখানে কুমির নেই। এত কাছে কুমির আসেনা। আরে, আমিতো আছি।
বাদলের অভয় বাণীতে কিছুটা সাহস পেলাম,কিন্তু ভয় পুরোপুরি কাটেনি। কোন রকমে দু তিনটি ডুব দিয়ে তাড়াতাড়ি উপরে উঠে এলাম। আমার কান্ড দেখে বাদল তো হেসেই খুন।

আরে সবখানে কুমির থাকে না। আচ্ছা, তুই দাঁড়া আমি আসছি। বাদল কিছুক্ষন পরে উপরে উঠে এলো। হাতে আরেকটা বিশাল সাইজের কাইন মাগুর মাছ ধরে এনেছে। দু বন্ধুতে মাছগুলো নিয়ে টং এ চলে এলাম। বাদল বটি দিয়ে মাছগুলো পাকা হাতে কুটে রান্না বসিয়ে দিলো। দুটি চুলোয়। একটাতে ভাত অন্যটাতে মাছ।ঘরে সবজি না থাকায়,শুধু মাছের ঝোল।আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ওর রান্না দেখছি। পাকা রাধুনির মতো সব গুছিয়ে করছে। আসলে  ও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সাদা আতপ চালের ভাত আর টাটকা সামুদ্রিক মাছ এর ঝোল,অপুর্ব হয়েছে খেতে। তৃপ্তি সহকারে খেলাম দুজনে।রাত্রের খাবার অবশিষ্টাংশ রেখে,দুজনেই শুয়ে পড়লাম বাদলের তৈরি খাটে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, তা ঠাহর করতে পারলাম না। অগনিত পাখির কলকাকলীতে ঘুম ভেঙে গেল। চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।  জনমানবহীন এ-ই মহারন্যের বুকে সন্ধ্যা নামা যে এত অপুর্ব সুন্দর হবে, তা আমার কল্পনায় ও ছিলনা। বাইরে বেরিয়ে এলাম।প্রাণ জুড়ানো শীতল হাওয়া। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। কিছু পাখি টং ঘরের আশেপাশের গাছ পালাগুলতে নেমে পড়ছে। এ দৃশ্য বাদল প্রতিনিয়ত দেখে বলেই ওর আগ্রহ নেই,কিন্তু আমি মুগ্ধ চোখে দেখছি। বানরগুলো প্রথমে কিছুক্ষন লাফালাফি করছিলো, এখন শান্ত হ’য়ে আছে। রাত নামছে মহাঅরন্যে।জানি  না আজ কোন তিথী? বাদলের কাছে শুনতে হবে। বাদল আর আমি দুজনে বেশ রাত পযন্ত’ রাতের এ-ই বনভুমির সৌন্দর্য অবলোকন করলাম। ইতিমধ্যে আকাশে চাঁদ উঠেছে। দীতিয়া তিথীর চন্দ্রালোকে সমস্ত বনভূমি যেন উদ্ভাসিত হয়ে গেছে। এই রোমান্টিক ক্ষনে একজনের কথা  বড্ড বেশি মনে পড়ছে। এমন নয়নাভিরাম চন্দ্রালোকিত  রাতে দীপান্নিতা যদি পাশে থাকতো আনন্দটা শতগুণে পরিপূর্ণতা পেত। এত সুন্দর রাত প্রিয়াহীন উপভোগের মধ্যে একটা অপূর্ণতা থেকেই যায়। দূরে কোথাও অচেনা এক রাত জাগা পাখি ডেকে উঠলো আপন সুরে,চিন্তার জাল ছিড়ে গেলো। বাদল বললো,  কি এতো ভাবছিস,অনামিকা না দীপান্নিতার কথা? আমি ওর প্রশ্নের জবাবে মাথা নাড়ালাম শুধু। জংগলের এই জ্যোৎস্নাময় রাত্রিতে টং ঘরের খোলা বারান্দায় বসে আছি আমরা। নাম না জানা নিশাচর পাখির কূজন, পশুর ডাক আর বয়ে যাওয়া শান্ত সমীরণ, অপূর্ব এ-ই দৃশ্য। এমন ক্ষন জীবনে বারবার আসেনা,তাই প্রান ভরে এ-ই অকৃত্তিম সৌনদয্য কে উপভোগ করতে লাগলাম অকৃপনভাবে। মনটা কেমন উদাস হয়ে গেলো । বাদলের বন্ধুত্ব আমি প্রাণ ভরে উপলব্ধি করি,কারণ ওর অপার সরলতা। এখনকার সময় এ সরল মানুষকে সবাই বোকা ভাবে। বাদল মোটেও বোকা নয়,বরঞ্চ অন্যান্য অনেকের চেয়ে বুদ্ধিমান ও বৈষয়িক।তা না হলে চাকরি বাকরির কথা বাদ দিয়ে,নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সুন্দরি সুন্দরবন হতে আয়ের এ-ই উপায় বের করা  দুঃসাধ্য।
আমরা টংঘরের বারান্দায় সটানভাবে শুয়েই আকাশের দিকে তাকিয়ে নিশাচর পাখি দের উড়ে যাওয়া দেখছি,হটাৎ গুরুগম্ভীর শব্দে  বনভুমি কেপে উঠলো। আমি বেশ ভয়েই আঁতকে উঠলাম, কিন্তু বাদল নির্বিকার।  এতো কাছ থেকে বড় মামার(রয়েল বেংগল টাইগার) ডাক,তা-ও উনার রাজ্যে,আতংকিত না হয়ে পারা যায়। বাদল বললো , ভয় পাইছিস দোস্তো? আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, না। হাজার হলেও আমি খুলনার ছেলে, কিন্তু বাদল স্বয়ং সুন্দরবন এর কোলের মধ্যে বেড়ে ওঠা মানুষ । ওর সাহস অপরিসীম।
হাত ঘড়িতে তাকাতেই ইচ্ছে হচ্ছেনা, কারণ এ রাতের প্রতিটা ক্ষন যেন  একান্তই নিজের। বাদল আমার ভেতরের ভাললাগা টাকে খুব ভালো করে বোঝে।  তাই ও আমাকে বেশি প্রশ্ন করছেনা। চাঁদের আলোয় অবগাহন করছে সারা বনভূমি রুপোলী জলে। তন্ময় হয়ে ছিলাম, হটাৎ বাদলের মৃদূ ধাক্কা অনুভব করলাম, ও আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল , পুকুরের দিকে তাকা।
পাশ ফিরে তাকাতেই এক অপুর্ব দৃশ্য চোখে পড়ল।এক পাল চিত্রা হরিণ পুকুরে পানি খেতে এসেছে। ওরা খুবই সাবধানে পানি খাচ্ছে। কিছু লক্ষন পর লাইন ধরে জংগলের মধ্যে ঢুকে গেল। বাদলকে বললাম,  বড়মামা মানে, বাঘ মামা পানি খেতে আসেনা?
ও বললো , বড় মামা খুবই সাবধানী,এবং ধূর্ত ওরা এরকম জলাশয় এড়িয়ে চলে।
সুন্দর বনে একসময় গন্ডার, বন্য কুকুর, চিতাবাঘ পাওয়া যেতো। সময়ের বিবর্তনে ওরা হারিয়ে গেছে। এখনো জীব বৈচিএ  যত টুকু আছে তার যত্ন না নিলে অচিরেই তাও বিলুপ্ত হয়ে যাবে এ-ই মহা অরন্যের বুক থেকে। তবে আশার কথা সরকার অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি যত্নশীল সাথে আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলোর তৎপরতা বেশ আশা জাগানিয়া। বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ইতিমধ্যেই আমাদের সুন্দরবন সেরা আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাণ ভরে তোমায় ভালোবাসি হে অরন্য্ রাজ। আবেগে নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে দু ফোটা অশ্রু ঝরে পড়লো অরন্যানির এ-ই বিশাল বক্ষে, সৃষ্টিকরতা ছাড়া কেউ তা দেখতে পেলনা।

বাদল কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত ও প্রায় শেষ। সারারাত জেগে এ-ই মহা অরন্যের যে অপুর্ব সুন্দর রুপ আমি দর্শন করলাম। তা সারাজীবন আমার মনের মনিকোঠায় জমা হয়ে থাকবে। পরদিন পুকুর থেকে দুজনেই অনেক মাছ ধরলাম। ওগুলো  নিয়ে চলে আসতে হবে। ইচ্ছে ছিল আরও একটা রাত টং এ থাকব,কিন্তু তাতে ক্ষতি হয়ে যাবে। মাছ গুলো পঁচে নস্ট হয়ে যাবে। দুপুরের পরেই আমরা রওনা দিলাম।কিন্তু মন পড়ে রইলো অরন্যের প্রতি। তবে হে আদিম অরন্য রাজ তোমায় কথা দিলাম, আবারও ফিরে আসবো তোমার ভালোবাসার টানে তোমার এ-ই বিশাল বক্ষে। বিদায় বন্ধু। তর তর করে চলছে আমাদের নৌকা। আমরা স্থানীয় বাজারে মাছগুলো বেশ ভালো দামে বিক্রি করেই সন্ধ্যা নাগাদ বাদলদের বাড়িতে চলে এলাম। রাত্রে গল্প আড্ডায় মেতে উঠলাম সবাইকে নিয়ে। ভুরিভোজন ও হলো সেই রকম। আমি বাদলকে বললাম কাল সকালে খুলনা যেতে হবে। এ কথা  শুনে ওর মুখ মলিন হয়ে গেল। খালাম্মা, খালু জান, ছোট ভাই বোনেরা অনুরোধ করল আরও কদিন থাকতে, বললাম সামনে এসে এক সপ্তাহ থেকে যাব,কথা দিলাম।
ভোর সাড়ে পাচটার লঞ্চে খুলনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। লঞ্চের ডেকে উঠে সকলের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বিদায় জানালাম।এত ভোরে সবাই আমাকে বিদায় জানাতে এসেছে। অন্তরের অন্তস্থল থেকে বিচ্ছেদের সুর অনুরনিত হতে থাকল। মনকে এই ভেবে প্রবোধ দিলাম,কিছু দিন বাদে তো আবার আসবো। দূঃখ কোরোনা বন্ধু, এই সাময়িক ছাড়াছাড়ি ভালবাসাটাকে আরও গভীর করে তুলবে।

Facebook Comments