Wednesday, January 19, 2022
Home > গল্প > আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার ভাই | আদিল মাহমুদ

আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার ভাই | আদিল মাহমুদ

Spread the love

এক

সংসারে আর্থিক অভাব-অনটন ও টানাপোড়া লেগেই আছে। বাবার বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে এখন বাবা আর সংসারের হাল ধরতে পারছিলেন না। কিন্তু আমার বড় ভাই নাবিলের এই নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই। কদিন পর বাবা-মা, ভাই-বোনকে যে না খেয়ে মরতে হবে এদিকে তার কোন মনোযোগই ছিল না। আমি ছোট হওয়ার কারণে বাবা আমাকে কিচ্ছু বলতো না। তখন আমার বয়স ছিল ৮/৯ বছর। তবে বড় ভাইকে বাবা সবসময় বকাবকি করে বলতো, ‘তোকে কি ইন্টারমেডিয়েট পাশ করিয়েছি ক্রিকেট খেলে এলাকার মাঠগুলো দাপিয়ে বেড়ানোর জন্য। আমার তো বয়স হয়েছে। তুই পরিবারের বড় ছেলে, এখন সংসার হাল তোকেই ধরতে হবে। তুই চাকুরিবাকুরি কিছু একটা করা শুরু কর, না হলে তো সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে।’ ভাই শুধু চুপ করে শুনতো, কখনো কিছু বলতো না।

১৯৭০ এর শেষ দিকে দেশের পরিস্থিতি তেমন সুবিধাজনক না। চারিদিকে উৎকণ্ঠা এমন সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান নেভিতে চাকুরি হয় ভাইয়ের। সংসারে অভাব-অনটন, টাকার প্রয়োজন তাই বাবা ভাইকে চাকুরিতে জয়েন্ট করা কথা বলে, কিন্তু মা ভাইকে কোন ভাবেই পশ্চিম পাকিস্তান যেতে দিবে না। মাথায় হাত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করালো ভাইকে, যেন পশ্চিম পাকিস্তানে চাকুরি করতে না যায়। এতে ভাই খুশিই হলো, মায়ের কথাও রাখা হলো, ভাইয়ের আর চাকুরিতে জয়েন্ট করা হলো না।


দুই

আমার বড় ভাই নাবিলের হৃদয় ও সাহস ছিল তার বয়সের চেয়ে বড়। দেশের জন্য, মায়ের জন্য ছিল তার অফুরান্ত ভালোবাসা। ১৯৭১ এর মার্চের শেষ দিকে যখন বাতাসে বারুদের গন্ধ আর চতুর্দিকে দিকে শুধু লাশের খবর, তখন ভাই প্রায়ই বলতো- ‘এভাবে বেঁচে থেকে লাভ কি? এভাবে বাঁচবো কেন? বাইরে ঘরে যেখানেই থাকি মৃত্যু তো আর এড়াতে পারব না। তার চেয়ে যুদ্ধ করি, দেশ স্বাধীন হলে সবাই বলবে তুমি মুক্তিযোদ্ধার বাবা, তুমি মুক্তিযোদ্ধার মা, তোমরা মুক্তিযোদ্ধার ভাই-বোন। আর মরে গেলে শহীদের বাবা-মা, ভাই-বোন।’

নাবিল ভাইয়ের এসব কথা শুনে ঘরের সবাই সবসময় আতঙ্কে থাকতো। কখন ভাই যুদ্ধে চলে যায়। নাবিল ভাই প্রায় সময় আমাকে বলতো- ‘পাকিস্তানী হানাদাররা কি মানুষ না? ওরা এতো পাষাণ কেন? কোন বর্বরতাই তো ওরা বাদ দিচ্ছে না। ওরা কেবল যোদ্ধাদের মারছে না, নারী, শিশু বৃদ্ধদেরকেও মারছে। মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে খেলছে। চল, বাবা-মা’কে না জানিয়ে তুই আর আমি যুদ্ধে চলে যাই।’

১৯৭১ এর এপ্রিলের শেষ দিকে একদিন রাতে আমাদের পাশের বাড়ির সালিম ভাই আমাদের ঘরে আসলো। সালিম ভাই আমার ভাই নাবিলের বন্ধু। একই কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে দু’জনে একসাথে। আমার বাবা সালিম ভাইকে জিজ্ঞেস করলো, তুই এতো রাতে এখানে কেন? সালিম ভাই বললো, ক্ষুধা লাগছে ভাত খেতে এসেছি। আমার সাথে আরো লোক জন আছে, ওরা মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের সবাইকে কি তুমি খাওয়াতে পারবে। বাবা বললো, তুই ওদের সবাইকে ঘরে নিয়ে আয়। আমি তোর চাচীকে বলে খাওয়ার ব্যবস্থা করছি। মা সালিম ভাই, ও তার বন্ধুদের জন্যে রান্না করা শুরু করলো, আর আমার ভাই নাবিল ওদের সাথে যুদ্ধ নিয়ে কথা বলছিল। বারবার বারবার বলছিল, ‘বন্ধু, আমাকে তাদের সাথে নিয়ে যা। আমি যুদ্ধ করবো।’ রান্না শেষ হলে ওরা সবাই একসাথে বসে খানা খেয়ে চলে গেলো। যাবার আগে বলে গেলো- ‘চাচা-চাচী, আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি, আমার দেশেকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধি করবো। দুআ করবে আমরা যেন পাকিস্তানী হানাদারদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারি। স্বাধীন করতে পারি।’


তিন

সালিম ভাই ও তার বন্ধুরা চলে যাবার পর আমার ভাই নাবিল মা’কে বললো, ’মা, আমিও যুদ্ধে যাই। দেশের জন্যে যুদ্ধে করতে আমার খুব ইচ্ছে করছে। তুমি বাবা’কে বলো, আমাকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিতে।’

ভাইয়ের একথা শুনে মা ভাইকে বকা দিয়ে বললো, ‘চুপ থাক। বাড়ির বাইরে কোথাও তুই যাবি না। তোর যুদ্ধে যেতে হবে না। দেশের জন্যে তোর যুদ্ধ করা লাগবে না।’

আম্মুর এসব একথা শুনে ভাই আর কিচ্ছু বললো না, সোজা তার ঘরে চলে গেলো। ওইদিন রাতেই কাউকে কিছু না বলে ছোট্ট একটা চিরকুটে কিছু কথা লেখে ভাই রাতের আধারে বাড়ি থেকে পালিয়ে যুদ্ধে চলে গেলো।

পরেদিন সকাল আম্মু ভাইয়ের রুমে গেলে এই চিরকুট পেলো। চিরকুটে লেখা ছিল- ‘বাবা-মা, আমি যুদ্ধে চলে যাচ্ছি। তোমাদেরকে বলার পরেও তোমার যুদ্ধে যেতে দিলে না, তাই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছি। আমাকে মাফ করে দিও। আর কয়দিন পর দেশ স্বাধীন করে আমি আবার বাড়ি ফিরে আসবো। আমার জন্য দুআ করবে।’

ভাই চলে যাবার পর থেকে মা প্রতিদিন অপেক্ষা করতো, কবে দেশ স্বাধীন হবে? নাবিল ভাই বাড়িতে ফিরে আসবে? অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলো। অফুরান্ত আত্মত্যাগ এবং রক্তের বিনিময়ে একটি স্বাধীন পতাকার জন্ম হলো। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড হলো। কিন্তু নাবিলের ভাইয়ের আর বাড়ি ফেরা হলো না।

Facebook Comments