Sunday, January 16, 2022
Home > ফিচার > খাসোগিনামা (১৯৫৮-২০১৮ ইং)

খাসোগিনামা (১৯৫৮-২০১৮ ইং)

Spread the love

জামাল খাসোগি বর্তমান বিশ্বের এক আলোচিত নাম। গত ২ অক্টোবর তুরস্কে নিহত এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসিত সাবেক সৌদি নাগরিক। নিজের বিবাহ বিচ্ছেদ ও নতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কাগজ পত্র সংগ্রহ করতে ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেট জেনারেল ভবনে প্রবেশ করেন। তুর্কি নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্যমতে, আর বাইরে বেরিয়ে আসেন নি। এদিকে তুর্কি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে,তাঁকে ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে এবং লাশ গুম করা হয়েছে। অপরদিকে সৌদি কর্তপক্ষ এতদিন অস্বীকার করলেও, ১৮ দিন পর নাটকিয়ভাবে তার নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করে। এক সময়ের সৌদি রাজপরিবারের শুভাকাঙ্খি থেকে আস্থা অনুগ্রহ হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসন এবং তুরস্কে নিহত হওয়ার মাধ্যমে যবনিকাপাত ঘটে ৫৯ বছরের জীবন তরীর। কে এই খাসোগি? উত্থান-পতন মৃত্যু? বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যত গতিধারা-


জন্ম: জামাল খাসোগি ১৩ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে তৎকালীন মদিনা মুনাওয়ারাতে জন্ম গ্রহণ করেন। সৌদি আরবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন।


আক্বিদা: বংশগত ভাবেই জামাল খাসোগি ‘সালাফী আক্বিদায় বিশ্বাসী ছিলেন।


পেশা: খাসোগি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন ‘তিহামা বুকস্টোর’ এর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক হিসেবে। পরবর্তিতে তিনি ‘সৌদি গেজেট’ পত্রিকার প্রতিনিধি এবং ‘ওকাজ’পত্রিকার সহকারী ব্যবস্থাপক পদে যোগ দেন। এছাড়া ‘আশরাক আল আওসাত্ব, আল মাজাল্লা এবং আল মুসলিমুন’ সহ বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। খাসোগি ১৯৯১ সালে ‘আল মদিনা’ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, পরবর্তিতে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন। ২০১২ সালে ‘আরব নিউজ’ পত্রিকার উপ প্রধান সম্পাদক পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
বিখ্যাত হওয়ার কারণ: আঞ্চলিক একটি সংবাদ পত্রের হয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত অভিযান কাভার করেন। এসময় তিনি আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেন এবং তাঁর কয়েকটি সাক্ষাতকার গ্রহণ ও প্রচার করে বিশ্বজোড়ে খ্যাতি অর্জন করেন।
সৌদ পরিবারের সাথে সম্পর্ক: সৌদ পরিবার তথা সৌদি রাজবংশের সাথে তাঁর নাড়ীর সম্পর্ক রয়েছে। তুর্কি বংশোদ্ভূত তাঁর দাদা আরব নারীকে বিবাহ করেন। তিনি সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। সেই সুবাদে সৌদ পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। খাসোগি ওয়াশিংটনে সৌদি রাষ্ট্রদূত প্রিন্স তুর্কি বিন ফয়সালের মিডিয়া উপদেষ্টাও ছিলেন।
সখ্যতা থেকে শত্রুতা: বলা হয়ে থাকে রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলতে কিছু নেই। আজ যে বন্ধু কাল সে শত্রু। খাসোগির ক্ষেত্রেও তাই। ২০১৫ সালে মোহাম্মদ বিন সালমান- সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী- ক্ষমতায় আসার পর থেকেই খাসোগির ভাগ্য পরিবর্তন হতে থাকে। তিনি এমবিএসের বিতর্কিত কর্মকা-ের ব্যাপক সমালোচনা করেন। নারীর ক্ষমতায়নের প্রেক্ষিতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “সৌদি আরবের উচিৎ ১৯৭৯ সালের পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়া।” যুবরাজের বাক স্বাধীণতা হরণের প্রতিবাদ করা ও বিরোধীদের বক্তব্য সম্প্রচার করায় তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতে পরিণত হন তিনি। যুবরাজের কাতার অবরোধ, কানাডার সাথে কূটনৈতিক বিরোধ, লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, ইয়েমেনে ভয়াবহ যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করতেন। তিনি যুবরাজের ইসরাইলি সখ্যতারও বিরূপ সমালোচনা করেন। তিনি ২০১৫ সালে ‘আল আরব’ নামে বাহরাইনে একটি সংবাদ ভিত্তিক টেলিভিশন চালু করেন। পরে এটা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্লুমবার্গ টেলিভিশনের’ সহযোগী হয়।
নিখোঁজ রহস্য: খাসোগি ২০১৭ সালের জুন মাস থেকে যুক্তরাষ্টের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান। সেখান থেকে তারঁ বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজপত্র উত্তোলন করতে ইস্তাম্বুলে অবস্তিত সৌদি কনস্যুলেটে যান। কনস্যুালেট ভবনে প্রবেশের পূর্বে তিনি তাঁর নব বাগদত্তাকে বাইরে রেখে যান এবং বলে যান যদি তাঁর বেরিয়ে আসতে দেরি হয় তাহলে যেন তুর্কি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেন! তুর্কি কর্তৃপক্ষ দাবী করে খাসোগিকে কনস্যুলেট ভবনে হত্যা করা হয়েছে। আর সৌদি সরকার প্রথমদিকে দাবী করত, খাসোগি কনস্যুলেট ভবন থেকে পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে গেছেন! বাইরে অপেক্ষমাণ স্ত্রী বাগদত্তা বলেন, আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও তাঁকে বেরিয়ে যেতে দেখি নি!। কে সত্য?
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: খাসোগির নিখোঁজ- এটা প্রকাশ পাওয়ার পর সারাবিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়। বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংস্থা তীব্র প্রতিবাদ ও রহস্য উদঘাটনের দাবি জানায়। বিশ্ব সৌদি আরবের উপর নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন শাস্তি প্রদানের আহ্বান জানাচ্ছে আমেরিকাকে। ওদিকে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানও এর শেষ দেখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সৌদি কড়া শাস্তি প্রদানের হুমকি দিয়েছেন। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল, অস্ত্র চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানাচ্ছেন। যুবরাজের ক্ষমতা থেকে অপসারণের গুঞ্জনও শুরু হইছে। আইসিসিতে বিচারের ধারণাও পাওয়া যাচ্ছে। ইদানিং জাতিসংঘও উচ্চবাচ্য শুরু করছে। ট্রাম্প সৌদিকে শাস্তির হুমকি দিলে সৌদি আরবও পাল্টা হুমকি দেয়। বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়। রাশিয়াকে দাম্মামে সেনাঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেয়ারও হুমকি দেয়। তাতে অবশ্য ট্রাম্পের সুর নরম হয়। অপরদিকে ট্রাম্পও তড়িঘড়ি মত বদলান এবং ঘোষণা করেন, সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া আমরা বিন সালমানকে দোষারোপ করতে পারি না। আবার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিনীত স্বীকারোক্তি খাসোগি হত্যা ভয়ানক খারাপ কাজ! ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটারও অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন!
কিছু রহস্য; যার উত্তর এখনো অজানা: জামাল খাসোগি কনস্যুলেট ভবনে প্রবেশের সময় তাঁর বাগদত্তাকে বলে গেলেন, যদি আমার বের হতে দেরিহ য় তাহলে বিষয়টি তুর্কি কর্তৃপক্ষকে জানাতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খাসোগি নিজের জীবনের এত ঝুঁকি নিয়েও কেন ঐদিনই ভবনে প্রবেশ করলেন? আর তিনি নিজেই বা কেন জিডি করেন নি? যুবরাজ খাসোগিকে কেন তুর্কিতেই হত্যার সিদ্ধান্ত নিলেন? মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমবিএসের এত দহরম-মহরম থাকা সত্বেও খাসোগিকে ফেরত চান নি? অথচ ট্রাম্প নিজেও প্রচ- সাংবাদিক বিরোধী। তুর্কি প্রেসিডেন্টই বা কেন সব তথ্য একসাথে প্রকাশ করছেন না? সৌদি আরব কেনইবা প্রথমে অস্বীকার করল? আর কেনইবা পরবর্তীতে আসাড়ে গল্প সাজিয়ে স্বীকার করল? নাকি ইয়েমেনের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন চাপা দিতেই খাসোগি নাটকের পর্দা উন্মোচন? সব বিষয়ে ইদানিং মাথা ঘামানো নতুন মোড়ল রাশিয়াই বা নিশ্চুপ কেন? কেনইবা খাসোগি নিখোঁজের মাত্র ক’দিন পরেই সৌদি আরব আমেরিকাকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করল? নাকি এমবিএসের ‘ভিশন-২০৩০’ কে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এমন নাটক? যার ফলে বিশ্বের নামি দামী কোম্পানী আর হেভিয়েট দেশগুলা মরুভূমির দাভোস সম্মেলন বয়কট করছে। ইত্যাদি হাজারো প্রশ্নের উত্তর এখনো বাকী। যেদিন এসব প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে, সে দিনই নাটকের রহস্য উন্মোচিত হবে।


উপসংহার: জামাল খাসোগি রহস্য বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁকে কেন্দ্র করে হাজারো প্রশ্ন উকি দিচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের নেতৃস্থানীয় সৌদি আরব ও তুরস্ককে স্পষ্ট বিভক্ত করে দিয়েছে। আন্ত:রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সারাবিশ্ব মুসলিমদের এ নাটক দেখছে আর বিদ্রুপভাবে উপভোগ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, এরদোগান আর বিন সালমানের ক্ষমতার খেলায় খাসোগি নতুন বলি হলেন। যুগে যুগে খাসোগিরা জীবন দিবে, কিন্তু ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার দাপট শেষ হবে না।


লেখকঃ মাহবুব রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

Facebook Comments