Saturday, October 16, 2021
Home > উপন্যাস > কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস “নৌকাডুবি” অবলম্বনে চিত্রগল্প

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস “নৌকাডুবি” অবলম্বনে চিত্রগল্প

আমি যদি কবি হইতাম, তবে কবিতা লিখিয়া প্রতিদান দিতাম, কিন্তু প্রতিভা হইতে আমি বঞ্চিত। ঈশ্বর আমাকে দিবার ক্ষমতা দেন নাই, কিন্তু লইবার ক্ষমতাও একটা ক্ষমতা। আশাতীত উপহার আমি যে কেমন করিয়া গ্রহণ করিয়া লইলাম, অন্তর্যামী ছাড়া তাহা আর কেহ জানিতে পারিবে না। দান চোখে দেখা যায়, কিন্তু আদান হৃদয়ের ভিতরে লুকানো।
ইতি, চিরঋণী।


অন্নদা বাবুর ছেলে যোগেন্দ্র রমেশ এর সহাধ্যায়ী।পাশের বাড়িতেই সে থাকে।তাহার ভগ্নি হেমনলীনি এইবার এফ.এ দিয়াছে।রমেশ তাহাদের বাড়িতে চা খাইতে এবং চা না খাইতেও প্রায়ই যাইত।বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, চায়ের চাইতে চায়ের প্রস্তুতকারিণীই রমেশের নিকট অধিক আগ্রহের বস্তু ছিলো।হেমনলীনির দিক হইতেও আগ্রহ খানা নিতান্তই ফেলনা ছিলো না।


রমেশ এবার আইন পরীক্ষায় যে পাশ হইবে সে সম্বন্ধে কাহারো কোন সন্দেহ ছিলো না।পরীক্ষা শেষ করিয়া এখন তাহার বাড়ি যাইবার কথা।কিন্তু এখনো তাহার তরঙ্গ সাজাইবার কোনো উৎসাহ দেখা যায় নাই।পিতা শীঘ্রই বাড়ি আসিবার জন্য পত্র লিখায়াছেন।রমেশ উত্তরে লিখায়াছে,পরীক্ষার ফল বাহির হইলেই সে বাড়ি যাইবে।উত্তরে আবার কাল বিলম্ব না করিয়া বাড়ি রওনা দিবার জন্য কঠোর ভাষায় পত্র আসিলো।রমেশ বিষণ্ণ চিত্তে সত্বর বাড়ি যাইবার আয়োজন করতে বসিলো।


রমেশের হঠাৎ এরূপ অন্তর্ধানে হেমনলীনির জগত সংসার কেমন যেন বর্ণহীন হইয়া আসিলো। সবকিছু যেন অবিরত বউ কথা কও পাখির ন্যায় কুহুডাকে ফিসফিস করিয়া হেমনলিনীর কানের কাছে বলিয়া যাইতে লাগিলো, “কি যেন নাই! ওগো, কে যেন নাই।” মনঃকষ্টে দগ্ধ হইতে হইতে হেমনলীনি সব ছাড়িলো, পূর্বের মত চিলেকোঠার ঘরখানিতে তানপুরা লইয়া দিবারাত্রি বাজাইয়াও তাহার আর শান্তি হয় না, তানপুরার গম্ভীর সুরের সাথে তাহার কিন্নরকন্ঠী সপ্তসুরের মূর্ছনা মিশিয়া গিয়া রমেশের বিরহের আগুনে যেন ক্রমশ ঘৃতাহুতি দিতে শুরু করে। এ যেন এক বিষম যন্ত্রণা, ইহা হইতে পলানোও যায় না, আবার ইহাকে ছাড়িয়া বাঁচিয়া থাকাও সম্ভবপর নহে…


বাড়ি গিয়া রমেশ খবর পাইলো তাহার বিবাহের পাত্রী ও দিন স্থির হইয়াছে।রমেশের পিতার অকালে স্বর্গত বন্ধুর একমাত্র কন্যাটি বিবাহযোগ্যা হইয়াছে।যদিও তাহারা অত্যন্ত দরীদ্র তবুও রমেশের পিতা তাহাকেই নিজের হবু পুত্রবধু হিসেবে ধার্য করিয়াছে।এই সম্পর্কে যথেষ্ট বাদানুবাদ করিয়াও রমেশ তাহার পিতার সিদ্ধান্ত এক চুলও টলাইতে পারিলো না।বাধ্য হইয়া রমেশকে রাজি হইতে হইলো।বিবাহকালে রমেশ ঠিক মতো মত্র আবৃতি করিলো না,শুভ দৃষ্টির সময় চোখ বুজিয়া রহিলো।বাসর ঘরের হাস্যোৎপাত নিরবে নতমুখে সহ্য করিলো।রাতে সয্যা প্রান্তে পাশ ফিরিয়া রহিলো,প্রতুষ্যে বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়া বাহিরে চলিয়া গেলো।


বিবাহ সম্পন্ন হইলে মেয়েরা এক নৌকায়,বৃদ্ধেরা এক নৌকায়,বর ও বয়স্যগণ আর এক নৌকায় যাত্রা করিলো।এমন সময় আকাশে মেঘ নাই কিছু নাই অথচ কোথা হইতে একটা গর্জণ ধ্বণি শোনা গেলো।পশ্চাৎ দিগন্তের দিকে চাহিয়া দেখা গেলো একটা প্রকান্ড অদৃশ্য সম্মার্জনী ভাঙা ডালপালা,খড়খোটা,ধুলাবালি আকাশে উড়াইয়া প্রচন্ড বেগে ছুটিয়া আসিতেছে।”রাখ রাখ,সামাল সামাল,হায় হায়” করিতে করিতে মূহুর্তকাল পরে কি হইলো কেহই বলিতে পারিলো না।একটা ঘূর্ণা হাওয়া একটি সংকীর্ণ পথমামাত্র আশ্রয় করিয়া প্রবল বেগে সমস্ত উন্মুলিত বিপর্যস্ত করিয়া দিয়া নৌকা কয়টাকে কোথায় কি করিলো তাহার কোনো উদ্দেশে পাওয়া গেলো না।


সংজ্ঞা লাভ করিয়া রমেশ দেখিলো সে বালির তটে পড়িয়া আছে।কি ঘটিয়াছিলো তাহা মনে করিতে তাহার কিছুক্ষণ সময় গেলো,তাহার পরে দুঃস্বপ্নের মতো সমস্ত ঘটনা তাহার মনে জাগিয়া উঠিলো।চারিদিকে চাহিয়া দেখিলো কোথাও কাহারো চিহ্ন নাই।নদের তীর বাহিয়া সে খুঁজিতে খু্ঁজিতে চলিলো


হঠাৎ কিছু দূূরে একটা লাল কাপড়ের মতো কিছু দেখা গেলো।দ্রুতপদে কাছে আসিয়া রমেশ দেখিলো লাল চেলি পড়া নব বধুটি প্রাণহীন ভাবে পরিয়া আছে।জলমগ্ন মুমূর্ষু শ্বাসক্রিয়া কিরুপ কৃএিম উপায়ে ফিরাইয়া আনিতে হয় রমেশ তাহা জানিতো।কিছুক্ষণ সেই রুপ করার পর ক্রমে ক্রমে বধুর নিঃশ্বাস বহিলো এবং সে চক্ষু মেলিলো।


জ্ঞান লাভ করিয়া বধূ উঠিয়া বসিয়া শিথিল বস্ত্র সারিয়া লইয়া মাথায় ঘোমটা তুলিয়া দিল। প্রত্যুষের শুকতারা যখন অস্ত যায় পূর্ব দিকের নীল নদীর রেখার উপরে প্রথমে আকাশ যখন পান্ডুবর্ণ ও ক্রমশ রক্তিম হইয়া উঠিল তখন দেখা গেল রমেশ ও কমলা শ্রান্ত পায়ে লোকসন্ধানে চলিতেছে। বিবাহ অনুষ্ঠানে বাঁধিয়া দেয়া বরের সাদা চাদরখানি তখনো নববধূর আঁচল হইতে ঝুলিতেছিল। উহার একপ্রান্ত রমেশের হাতে অর্পন করিয়া তাহাকেই একমাত্র অবলম্বনের মত আঁকড়াইয়া ধরিয়া বধূ ভগ্ন পদের ন্যায় খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে রমেশের পেছন পেছন হাঁটিয়া চলিল।


সেই দুর্ঘটনার পরে আরো মাস দুয়েক অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। নৌকাডুবিতে যাহারা নিঁখোজ হইয়াছিল তাহাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নাই। ইতোমধ্যে তাহাদের শ্রাদ্ধ শান্তি করিয়া রমেশ ও তাহার নববধূ কলিকাতায় আসিয়া বাসা বাঁধিয়াছে৷ এরই মধ্যে রমেশের মনে ধীরে ধীরে এক ফালি সন্দেহের কালো মেঘ ঘনাইয়া আসিতেছিলো৷ রমেশ জানিত তাহার নববধূর নাম সুশীলা। কিন্তু নববধূ নিজেকে কমলা বলিয়া দাবী করে৷ যাহা হউক, রমেশ একপ্রকার জোর করিয়াই মনের সন্দেহ দূরে ঠেলিয়া দূর হইতে হাসি মুখে এই অনাথা বালিকার কর্ত্রী সাজিয়া সংসার সংসার খেলাটি অবলোকন করিয়া যাইতেছিল।


রমেশের নিত্য কর্মের মধ্যে একটি দাঁড়াইয়াছিল নিরক্ষরা কমলাকে অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। তেমনি একদিন অবসর বেলায় রমেশ কমলার অক্ষরজ্ঞানের পরীক্ষা নিতেছিল এবং বলাই বাহুল্য কমলা একের পর এক পরীক্ষা উতরাইয়া যাইতেছিল। কিছুতেই তাহাকে আটকাইতে না পারিয়া রমেশ অবশেষে তাহার নিজের নাম কাগজে বানান করিয়া কমলাকে লিখিয়া দেখাইতে বলিল। রমেশ আশ্চর্য হইয়া দেখিল কমলা তাহার পতি হিসাবে যাহার নাম লিখিয়াছে সেই নামটি তাহার নয়, জনৈক নলিনাক্ষ চট্টোপাধ্যায়ের। এতোদিন যে সন্দেহের মেঘকে রমেশ জোর করিয়া সরাইয়া রাখিয়াছিল হঠাৎ করিয়া তাহা তীব্র হলাহলের মত একটি মাত্র বিষ নিশ্বাসে তাহার অন্তর বিষাক্ত করিয়া তুলিল।


কমলা সম্পর্কে নির্মম সত্যিখানা জানিবার পরে তাহার আসল স্বামীকে খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য রমেশ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দিতে কলিকাতায় আসিল। সেই ঝামেলা শেষ করিবার পর সর্বাগ্রে তাহার হেমনলিনীর কথা মনে পড়িল। নিশির ডাকে লোকে যেমন সম্মোহিতের মত ছুটিয়া যায় রমেশও তেমন উন্মত্তের মত হেমনলিনীর নিকট ছুটিয়া গেল। হেমনলিনীকে দেখিয়াই তাহার পুরাতন আবেগ বাহির হইতে আর পথ পাইলো না। কিছুক্ষন উশখুশ ও দ্বীধাদ্বন্দের পরে হঠাৎ করিয়া রমেশ হেমনলিনীকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়া ফেলিল। লজ্জায় রক্তবর্ণ হইয়া হেমনলিনী আপনার ঘরে দ্বার রুদ্ধ করিয়া মুখ ঢাকিয়া দরজায় পিঠ ঠেকাইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। আর রমেশ বোকার মত জানালা দিয়া উৎসুক দৃষ্টিতে হেমনলিনীর চিহ্ন খুঁজিতে লাগিল।


লজ্জিত হেমনলিনীর কাছে বিশেষ সুবিধা না পাইয়া রমেশ হেমনলিনীর পিতার কাছে গিয়া বিবাহের প্রস্তাব পাড়িল। যেহেতু রমেশের পিতা ইতোমধ্যেই নৌকাডুবিতে মারা গিয়াছেন এবং নিজ ভিন্ন তাহার আর কোনো অভিভাবক নাই, উপরন্তু পূর্ব হইতেই রমেশ হেমনিলিনীর পিতার অধিক পছন্দের পাত্র ছিল, কাজেই হেমনলিনীর পিতা রমেশের প্রস্তাবে সন্মত হইলেন। বিবাহের প্রস্তুতি শুরু হইলো। ইহারই মধ্যে একদিন রমেশের পাদুকা প্রস্তুত করিবার নিমিত্তে হেমনলিনী একটি সাদা কাগজে তাহার পায়ের মাপ আনিতে গেল। সাদা কাগজের উপর রমেশের ফর্সা চরণখানি স্থাপনা করিয়া কমলা পায়ের মাপ আঁকিতে আঁকিতে আনমনে ভাবিল এতোদিনে সে নিজের স্বর্গ খুঁজিয়া পাইয়াছে।


প্রত্যহ সকালে পিয়ন আসিয়া রমেশের ঘরে পত্রিকা বিলি করিয়া যাইতো। কমলার প্রাত কর্মের একটি অংশ ছিল সকাল বেলা মেঝেতে পা ছড়াইয়া বসিয়া খুটিয়া খুটিয়া বানান করিয়া খবরের কাগজ পড়া। সেদিনও কমলা ঠিক তাহাই করিতেছিল। হঠাৎ করিয়া তাহার চোখে একটি বিজ্ঞাপন পড়িল। তাহাতে লিখা জনৈক রমেশ চন্দ্র চৌধুরী, জনৈক নলিনাক্ষ চট্টোপাধ্যায়কে অনুরোধ করিয়াছেন তাহার স্ত্রী কে রমেশের হেপাজত হইতে লইয়া যাইতে। বিজ্ঞাপনখানি দেখিয়া হঠাৎ করিয়া যেন কমলার পৃথিবী টলিয়া উঠিলো। যাহাকে সে এতোদিন স্বামী বলিয়া ভাবিয়াছে তাহার প্রতারণা হঠাৎ করিয়া যেন কমলার সামনে এক নিষ্ঠুর পৃথিবীর দরজা খুলিয়া দিল। তবে কি এই সংসারে তাহার কেউ নাই? এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে এক বস্ত্রে ভগ্ন হৃদয়ে নগ্ন পদে কমলা ঘরের দ্বার যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকেই রওনা হইলো


এরই মধ্যে দৈবক্রমে হেমনলীনি জানিতে পারিলো, সেই যে রমেশ কাহাকেও কিছু না বলিয়া বাড়ি চলিয়া গিয়াছিলো, সেই অবসরে তাহার আরও একখানি বিবাহ হইয়াছে, সেই পক্ষের স্ত্রী এখনও বর্তমান। হেমনলিনী প্রথমে কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারিলো না, কিন্তু জিজ্ঞাসা করিবার পরে রমেশের মৌনতা তাহার অবিশ্বাসের অগ্নিকে যেন এক ফুৎকারে নিভাইয়া দিলো। প্রিয়জনের বিশ্বাসঘাতকতা যে তাহার বিরহ হইতেও ভয়ানক, এই নির্মম সত্যি যেন হঠাৎ করিয়া আসিয়াই হেমনলিনীর চক্ষু খুলিয়া দিলো। না, এই পৃথিবীতে সে আর কাহাকেও বিশ্বাস করে না, সকল মানুষই ধিক, সকল মানুষই নীচ, বিশ্বাসঘাতক। পূর্বে রমেশের লেখা যে পত্রগুলি হেমনলিনী সযতনে নিজের কাছে গোপন করিয়া রাখিয়াছিলো, সেইসব পত্রের একেকটি অক্ষর যেন বিষাক্ত বিচ্ছু হইয়া হেমনলিনীর এক একটি অঙ্গে নিষ্ঠুরভাবে দংশন করিতে লাগিলো। হেমনলিনী জোর করিয়া মন হইতে রমেশকে বিতাড়িত করিতে চায়, কিন্তু পরক্ষণেই অমোঘ দৈববাণীর ন্যায় রমেশের চিন্তা আসিয়া তাহার চিত্ত দুর্বল করিয়া দেয়। দেখিয়া বোধ হয়, ঈশ্বর তাহাকে কোনো একখানি দোলনার ওপর বসাইয়া দিয়াছেন, সে দোল খাইয়া যতই আগাইবার চেষ্টা করিতেছে রমেশ নিষ্ঠুরের মত ততই তাহাকে পেছনে টানিয়া ধরিতেছে, হায়রে নিয়তি!


এরূপ বিষণ্ণতার মাঝে কালোত্তীর্ণ করিতে করিতে হেমনলিনীর শারীরিক অবস্থা ক্রমশই খারাপের দিকে যাইতে লাগিলো। কাজেই ডাক্তারের নির্দেশে এবং পিতার জোরাজুরিতে হেমনলিনী হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে কাশীতে বেড়াইতে আসিলো।
কাশীতে হেমনলিনীর শরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে খেয়াল রাখিবার জন্য স্থানীয় একজন ডাক্তারকে নিযুক্ত করা হইয়াছিলো, তিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ, তাহার নাম নলিনাক্ষ চট্টোপাধ্যায়। রোজ সকালে তিনি নিয়ম করিয়া আসিয়া হেমনলিনীর কুশলাদি সম্পর্কে অবগত হইয়া যাইতেন, সাথে প্রায়ই প্রাতঃকালীন চা এবং হেমনলিনীর সঙ্গ উপভোগ করিতেন। কি বুঝিয়া কে জানে, এই সহজ-সরল চিকিৎসকের সঙ্গ হেমনলিনীও বেশ উপভোগই করিত, এবং রোজ সকালে নানা উদ্ভট বিষয় টানিয়া তর্কে বিতর্কে তাহাকে অতিষ্ঠ করিয়া আমোদ পাওয়া তাহার নেশায় দাঁড়াইয়াছিল।
হেমনলিনীর পিতা কন্যার এই সহাস্যমুখ দেখিয়া যারপরনাই খুশি হইতেন। কাজেই তিনি ভাবিলেন, রমেশ তো গেলো, এখন এই নলিনাক্ষ ছেলেটির সাথে বিবাহ দিলে হেম যদি সুখী হয়, তাহা হইলে আর কিছুই প্রয়োজন হয় না। তাই তিনি স্থির করিলেন, অতি শীঘ্রই নলিনাক্ষের বাড়িতে গিয়া তাহার বিধবা মায়ের নিকট হেমনলিনী ও নলিনাক্ষের বিবাহের প্রস্তাব করিবেন…


হেমনলিনীকে প্রথমবার দেখিয়া নলিনাক্ষের মায়ের বেশ ভালো লাগিলো। যদিও তাহার পুত্রের পূর্বেও আরো একবার বিবাহ হইয়াছিলো, কিন্তু সেই স্ত্রী বিবাহের পরের দিনই গত হইয়াছিলেন। আর গত স্ত্রীর স্মৃতি আঁকড়াইয়া রাখিয়া নলিনাক্ষের বাকি জীবন অকৃতদার হইয়া কাটাইবার ইচ্ছা তাহার বিশেষ পছন্দ হইতেছিলো না। কিন্তু তেমন পছন্দসই কন্যাও পাওয়া যাইতেছিলো না, তাই হেমনলিনীকে পাইয়া নলিনাক্ষের মা বিশেষ প্রীত হইলেন। কথাবার্তা একপ্রকার পাকা হইয়াই রহিলো, মায়ের উৎসাহ দেখিয়া নলিনাক্ষও আর না বলিতে পারিলো না।
ইহার পর হইতে হেমনলিনী প্রায়শই নলিনাক্ষের বাসায় আসিতে লাগিলো। বিবাহে যে তার খুব মত ছিলো তাহা নহে, কিন্তু কিসের জন্য নলিনাক্ষের প্রতি তাহার অদ্ভুত একটা আকর্ষণ জন্মাইয়াছিলো। অতিসত্বরই নলিনাক্ষের বাসার প্রত্যেকের সাথে তাহার অদ্ভুত একটা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সৃষ্টি হইলো। ইহাদের মধ্যে যাহার সাথে হেমনলিনীর সবচেয়ে বেশি সখ্যতা হইয়াছিলো, তার নাম কমলা, সেই কমলা। সে দৈবক্রমে দিন কয়েক আগে মাত্র চাকরির সন্ধান করিতে করিতে এই গৃহে আসিয়া রাঁধুনির পদ পাইয়াছে।
হেমনলিনী নিজের কনিষ্ঠ ভগ্নীর মত কমলাকে স্নেহ করিত, কমলাও হেমনলিনীকে সেইমত মানিয়া চলিতো। হেমনলিনীর ধীর,স্থির, গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যেন কমলাকে চুম্বকের মত টানিতো। অচিরেই ইহাদের সম্পর্ক সহজ হইতে সহজতর হইতে লাগিলো।


নলিনাক্ষের গৃহেই রাঁধুনির কাজ করিলেও কমলা নলিনাক্ষের পরিচয় সম্পর্কে আগাগোড়া অবগত ছিলো না। অদৃষ্টক্রমে যখন অবগত হইলো, তখন আর তাহার কোনো সন্দেহ রহিলো না, যে, ইনিই তিনি, ইনিই তাহার স্বামী নলিনাক্ষ চট্টোপাধ্যায়, বিবাহের পর যাহার সাথে আর কখনওই তার দেখা হয় নাই। কিন্তু এই কথা সে কেমন করিয়া নলিনাক্ষকে জানাইবে! তাহার আর জানাইতে হইলো না, লোকমুখে নলিনাক্ষের সন্ধান পাইয়া তাহাকে খুঁজিতে খুঁজিতে রমেশও কাশীতে আসিয়া পৌছাইলো। নলিনাক্ষের বাড়ির ঠিকানা জানিবার পর কালবিলম্ব না করিয়া রমেশ নলিনাক্ষের সাথে দেখা করিয়া তাহাকে সমস্ত বিবরণ জানাইলো। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার পর হইতে কমলা যে নিরুদ্দেশ হইয়াছে, সেই কথাও জানাইলো। সবশেষে অদৃষ্টের নির্মম ক্রীড়ার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করিয়া রমেশ নলিনাক্ষের নিকট হইতে বিদায় লইলো।


ততক্ষণে নলিনাক্ষের মনে একটা বিষম খটকা জাগিয়াছে। ঠান্ডা মাথায় ভাবিয়া ভাবিয়া দুয়ে দুয়ে চার মিলাইতে ইহা বুঝিতে তাহার বিলম্ব হইলো না, যে তাহার বাড়ির রাঁধুনি কমলাই হইতেছে তাহার স্ত্রী কমলা।
নলিনাক্ষ আর অপেক্ষা করিলো না। তাড়াতাড়ি কমলার নিকটে গিয়া নিজের ধারণার সত্যতা সম্পর্কে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলো। নিজের ভাগ্যের এরূপ উপহারে কমলা যেন নির্বাক হইয়া গিয়াছিলো। তাহার নীরবতা হইতেই নলিনাক্ষ কাঙ্ক্ষিত উত্তর খুঁজিয়া লইল।
নলিনাক্ষ কমলার হস্ত দুইখানা নিজের হস্তে তুলিয়া লইয়া একদৃষ্টে তাহার অশ্রুসিক্ত চেহারার পানে চাহিয়া ভাবিতে লাগিলো, “আহা! না জানি ইহার কত কষ্ট হইয়াছে এতদিন… ইহাকে আমি আর কখনও কষ্ট পাইতে দিবো না, কখনওই নহে!”


আবারও হেমনলিনীর ঘর বাঁধিতে না বাঁধিতেই ভাঙিয়া গেলো। এইবার কেন জানিনা, বোধ করি তাহার খুব একটা কষ্ট হইলো না। একবার ভালোবাসিয়া যাহারা কষ্ট পাইয়াছে, তাহারা হয়ত আর কোনোকিছুতেই কষ্ট পায় না। শুধু বুকের মধ্যে কেমন জানি একটা শূণ্যতাবোধ নিয়ত বিরাজ করিতে লাগিলো। কিভাবে এই শূন্যতাবোধ হইতে নিস্তার পাওয়া যাইবে, কিসে এর উপশম, হেমনলিনী তাহা জানে না। সে শুধু জানে, এই শূন্যতাবোধ তাহাকে বুকে বহিয়া বেড়াইতে হইবে, ইহাই তাহার নিয়তি, ইহাই তাহার অদৃষ্ট… ইহা হইতে কিছুতেই ছাড়া পাওয়া যাইবে না…


আর রমেশ? সে মরিলো না, বাঁচিয়া রহিলো, কিন্তু তাহার আত্মা মরিয়া গেলো, যাহা অবশিষ্ট রহিলো তাহা শুধু তাহার দেহখানি, আর আত্মার কঙ্কাল হইয়া ভালোবাসিবার স্মৃতিগুলা পড়িয়া রহিলো। ভালোবাসিবার অধিকার লইয়া হেমনলিনীর নিকটে যাইবার সাহস আর সে করিতে পারে নাই। হয়ত সে হেমনলিনীকে ভালোবাসিত, হয়ত কমলাকে, কিংবা হয়ত উভয়কেই, কিন্তু হায়! সেই ভালোবাসা তাহার ভাগ্যে সহিলো না, ভালোবাসার কাঙাল হইয়াই তাহাকে বাঁচিয়া থাকিতে হইলো। পৃথিবীতে তাহার আর কেহ নাই, সে নিতান্তই অনাবশ্যক। রমেশের এখন আবশ্যকতা কেবল নিজের জীবনটুকু লইয়া, তাহাকেই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করিয়া সে এক্ষণে পৃথিবীর পথে বাহির হইলো, তাহার আর পিছনে ফিরিয়া তাকাইবার প্রয়োজন নাই..

শেখ মাহমুদুল ইসলাম মিজু
সম্পাদক, অক্ষর বিডি

Facebook Comments