Monday, January 17, 2022
Home > ফিচার > দেবীঃ একটি অপ্রয়োজনীয় সিনেমা

দেবীঃ একটি অপ্রয়োজনীয় সিনেমা

Spread the love

হাসনাত কাদীর : সিনেমা প্রধানত দুই প্রকার। প্রয়োজনীয় সিনেমা ও অপ্রয়োজনীয় সিনেমা। অপ্রয়োজনীয় সিনেমা আবার দুই ধরণের। ক্ষতিকর ও নির্মল। ‘দেবী’ একটি অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর সিনেমা। কিন্তু কেন? উত্তর দেয়ার আগে পরিষ্কার করে নেই প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় সিনেমা বলতে কী বোঝায়?

তার আগে সিনেমা রিভিউয়ের দু’চারটে ফর্মালিটিস সেরে নেইঃ
দেবীতে সবচে ভালো করেছে এর সাউন্ড আর মিউজিক ডিপার্টমেন্ট। সিনেমাটোগ্রাফি কামরুল হাসান খসরুর লেভেল অনুযায়ী এক্সট্রা অর্ডিনারী কিছু নয়। তবে গল্পের রূপ-রস-গন্ধ আর মনস্তত্ব যথার্থ ভাবে ফুটে উঠেছে। লাইট ও কালারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যেমনভাবে প্রযোজ্য অভিনয়ের ক্ষেত্রেও। জয়া, চঞ্চল বা অনিমেষ দেবীতে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কিছু না করলেও চরিত্রগুলিকে ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলেছেন। সম্পাদনা ঠিকঠাক আর ভিজুয়াল ট্রিটমেন্ট বেশ স্মার্ট ছিল। পরিচালক অনম বিশ্বাস তার দেবী ফিল্মেই নিজস্বতার ছাপ রেখে যথেষ্ট স্মার্ট ভাবে গল্পটি বয়ান করেছেন। তার জন্য শুভ কামনা। তবে তিনি সিনেমায় ব্যবহৃত গানটি হুট করে ঠেসে দিয়েছেন।

এতো গেলো কলকব্জা। কিন্তু সিনেমা তো শুধু কলকব্জার ব্যাপার না। সিনেমা তার অধিক কিছু। বলছিলাম প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় সিনেমা সম্পর্কে।

প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় সিনেমা বলতে কী বোঝায়ঃ

যে সিনেমা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে মানুষের উপকারে আসে তা-ই প্রয়োজনীয় সিনেমা। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সিনেমা হলো সেই সিনেমা যা মানুষকে সচেতন করে, কিংবা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে মানুষ হিসেবে আরও উন্নত করে তোলে। মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা ও মানবতার জয়ধ্বনি করে। জীবন, জগত ও মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় যে সিনেমা। উদাহরণ হিসেবে আমরা ”অজ্ঞাতনামা” এবং ”হেমলক সোস্যাইটি” সিনেমা দু’টির নাম বলতে পারি। ‘অজ্ঞাতনামা’ দেখার পরে অবৈধ ভাবে বিদেশ গমনেচ্ছুক ভাই বা বোনটি এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। আর ‘হেমলক সোস্যাইটি’ দেখে দর্শক জীবনের প্রতি ভালোবাসা ঝালিয়ে নেন।

অপ্রয়োজনীয় সিনেমা হল তা- যা হাওয়াই মিঠাইর মতো। শো শেষ, খেল খতম। আর যে অপ্রয়োজনীয় সিনেমার শো শেষেও রেশ রয়ে যায়- রেশ রয়ে যায় বাজে ভাবে- সেই সিনেমা ক্ষতিকর। এই শ্রেণীর সাম্প্রতিক সিনেমাটির নাম ”দেবী”। কিন্তু দেবী কেন ক্ষতিকর? এর উত্তর পেতে হলে জানতে হবে ‘দেবী’ আসলে কী বললো? আর আমাদের সামাজিক বাস্তবতা কী?

‘দেবী’ আমাদের যা বললোঃ

‘দেবী’তে মূল চরিত্র রানু (জয়া আহসান), মিসির আলী (চঞ্চল চৌধুরী) এবং রানুর স্বামী আনিস (অনিমেষ আইচ)। রানু একজন সুন্দরী তরুণী- যে এক ধরণের জটিল সাইকোলজিক্যাল ‘ডিজিজের’ ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সে হুটহাট নুপূরের শব্দ শুনতে পায়, অশরীরী কেউ তাঁর নাম ধরে ডাকে আর স্বপ্নে এসেও ঘুমন্ত রানুকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। রানু এমন একটি চরিত্র যে কি না বাংলার পীর ফকিরের মতই অলৌকিক ক্ষমতা বলে ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। শুধু তাই নয়- সে যা বলে তা-ই ফলে যায়।

আনিস তার স্ত্রী রানুকে এই ‘সাইকোলজিক্যাল ডিজিজ’ থেকে মুক্ত করতে একজন সাইকোলজিস্ট খুঁজে বের করে। সেই সাইকলজিস্টের নাম মিসির আলী। যিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। যিনি বিজ্ঞান ও যুক্তির স্পট লাইট ফেলে মানুষের মনের গভীরের অন্ধকারকে দূর করতে ভালোবাসেন।

আনিস রানুকে মিসির আলী সাহেবের কাছে নিয়ে এলে রানু মিসির আলীকে তার শৈশব কৈশোরের কথা খুলে বলে। তখন ধীরে ধীরে যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোতে আমরা রানুর মনের অন্ধকার কক্ষে উঁকি দিতে থাকি। এবং আমরা বুঝতে পারি তার সাইকোলজিক্যাল প্রব্লেমের শিকড় প্রোথিত আছে শৈশবের এক করুণ ও নির্মম দৃশ্যে। যে দৃশ্যে এই দেশের শত শত হতভাগী মেয়ের মতোই রানু যৌন নির্যাতনের শিকার। যে নির্যাতনের কথা সে কোন দিন কাউকে বলতে পারে না। ভাঙা মন্দিরের সেই দৃশ্যে রানু বেঁচে যায় অলৌকিক ভাবে। কোন এক অতিপ্রাকৃত শক্তি এসে ধর্ষকের ধর হতে মুন্ডু আলাদা করে দেয়। সেই থেকে রানু আর দশ জন সাধারণ মানুষের মতো নয়। সে ভবিষ্যৎ দেখতে পায় আর যা বলে তাই বাস্তবে ঘটে যায়।

মিসির আলী ফোনের দোকান থেকে ফোন করে রানুকে। তিনি জানান- রানুর সমস্যার শেকড় প্রোথিত আছে শৈশবের সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্টের ঘটনায়। তখন রানু ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ফোনের দোকানদারের লটারি প্রাপ্তির গোপন খবরটি বলে দিয়ে নিজের অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ রাখে। এবং রানুর এই অলৌকিক ক্ষমতার ব্যাপার-স্যাপার সিনেমার শেষ দৃশ্য পর্যন্ত ক্রমাগত দেখাতে থাকেন সিনেমাটির নির্মাতা অনম বিশ্বাস। তিনি দেখান, নীলুর (শবনম ফারিয়া) গোপন প্রেমের কথা অলৌকিক ভাবে বলে দিচ্ছে রানু। আর শেষ দৃশ্যে প্রেমিকের নির্জন বাড়িতে বন্দি হয়ে নীলু যখন খুন হতে বসেছে তখন তা অলৌকিক ক্ষমতা বলে বুঝতে পেরে রানু ছটফট করছে। তারপর আসে কফিনের শেষ পেরেকের মতো কুসংস্কারের বন্দনা মাল্যের শেষ মুক্ত দানা। সেই দানাদার দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই, অলৌকিক ক্ষমতা যেমন করে নীলুকে শৈশবে বাঁচিয়েছিল তেমনই অলৌকিক এক শক্তি এসে সাবেতের (ইরেশ) ভবলীলা সাঙ্গ করে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাচিয়ে দিলো নীলুকে। নীলু যখন বেঁচে গেলো তখন আর রানু জীবিত নাই। সে তার দেহ ছেড়ে স্থান নিয়েছে নীলুর সত্তায়।

যোগফল কি দাঁড়ালো তাহলে?

যোগফল বলছে, এই একবিংশ শতাব্দীতেও বঙ্গ দেশে এমন এক ভূত আছে যা যুগে যুগে অলৌকিক ভাবে নারীকে সুরক্ষা দিতে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এই আদিভৌতিক ব্যাপার স্যাপারকে সত্যায়িত করা হচ্ছে মিসির আলীর মতো একজন যুক্তিবাদী, বিজ্ঞান মনস্ক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মুখ দিয়ে। সত্যায়িত করতে মিসির আলীর মতো চরিত্র তখন বলছেন- এমন ব্যাখাতীত অনেক ঘটনাই ঘটে রহস্যময় এই দুনিয়ায়।

আমাদের সমাজ বাস্তবতাঃ

মিসির আলীর মতো চরিত্র তথা চঞ্চলের মতো জনপ্রিয় অভিনেতা যখন সার্টিফিকেট দেন যে, এই রকম অলৌকিক ঘটনা দুনিয়ায় ঘটে থাকে, তখন কী হয়? তখন আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাবাটি তার টাইফয়েড আক্রান্ত মেয়েটিকে হাসপাতালে না নিয়ে ছুটে যান তখাকথিত পীর মুর্শিদের কাছে। কারণ তারা তো বিশ্বাস করেন এই সব মুর্শিদেরা অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন। তারা ঘুমালেও থাকেন জাগ্রত। ‘দ্যাশে বইসা’ চোখ বুজলেই বৈদ্যাশের ছবি ঝকঝকা টিভির মতোন দেইখা নেয়ার মোজেজা রাখেন। এমন কি তারা একই সময়ে নানা স্থানে বিচরণ করার মতন ঐশ্বরিক ক্ষমতাও রাখেন। ফলে মুর্শিদের একটা ফুঁ’তে যাবতীয় বালা মুছিবত ঝড়ের গতিতে উড়ে চলে যায়। সেই অলৌকিক ফুঁয়ের জন্য মুর্খ বাবা যখন টাইফয়েড আক্রান্ত মেয়েকে মুর্শিদে পায়ে সপে দেন তখন ক্রমাগত ফুঁ’তেই মেয়ে উড়ে গিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করে।

এই যখন আমাদের সমাজ বাস্তবতা, যখন ক্রমবর্ধমান হারে পীর ফকিরের মুজেজা আর অলৌকিকতায় বিশ্বাসী বাড়ছে তখন ‘দেবী’ কেবল সেই অন্ধ বিশ্বাস আর কুসংস্কারের গোড়ায় জল সিঞ্চনই করবে না, তারে সার ওষুধ দিয়ে আরও বলবানও করবে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এদেশের কোন কুসংসারচ্ছন্ন বাবা যদি কন্যাহারা হন তখন ‘টিম দেবী’ কি নিজেকে দেবীই ভেবে চলবেন? যদি ভাবেন তাহলে এই নাটকের অসুরটা কে হবেন?

‘দেবী’ নিজের পক্ষে যে সাফাই গাইবেন এবং যে যুক্তি ধোপে টিকবে নাঃ

আমার উপরোক্ত প্রশ্নের আলোকে দেবীর যা বলার আছে তার অন্যতম হচ্ছে, সিনেমাহল কোন পাবলিক ক্লাসরুম নয়। আর সিনেমা নির্মাণ টিমও জাতীয় শিক্ষা দান কমিটির কোন স্বেচ্ছাসেবক দল নয়। সিনেমা নির্মল বিনোদন আর এইটা একটা গল্প বা শিল্প ছাড়া কিছুই নহে।

গুল্লি মারে জনতা আপনার এই শিল্পের! যে শিল্প মানুষকে অন্ধকার থেকে গহীন অন্ধকারে ঠেলে দেয়; কুসংস্কার, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, অন্ধ বিশ্বাসকে প্রকারন্তরে মোটাতাজাকরণ করে- সেই শিল্প লইয়া জনতা কী করিবে? যে শিল্পের পিছে এতো মানুষের শ্রম, ঘাম ঝরানো লক্ষ লক্ষ টাকার ট্যাক্স ব্যয় করা হয় (যেহেতু এই সিনেমা অনুদানের টাকা গ্রহন করেছে আর টিকিট কেটেই সিনেমা দেখতে হয়) আর প্রতিদানে পাওয়া যায় কুসংস্কারের বাহারি প্রচারণা তখন কোন আনন্দে সচেতন দর্শক ‘দেবী’কে প্রণাম দেবে?

এ হেন পরিস্থিতিতে লিও টলষ্টয়ের স্বরে প্রশ্ন থেকে যায়, যে শিল্পের জন্য এতো মূল্য দেয়া হচ্ছে তা কোন যুক্তিতে ক্ষমার্হ?

Facebook Comments