Sunday, January 16, 2022
Home > গল্প > গোধূলিমায়া – শাহরিয়ার জামান তনয়

গোধূলিমায়া – শাহরিয়ার জামান তনয়

Spread the love
পড়ন্ত বিকেল। সোনারোদে সাগরে জল চিকচিক করছে। অদূরে পানিতে জলকেলিরত ছেলে -মেয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে মন ভরে কাশফির । নিজের স্বামী বন্ধুটিও সন্তানদের সঙ্গে। ওদের তিনজনের উচ্ছ্বলতার জীবনটা কেমন যেন পূর্ণ মনে হচ্ছে আজ। সুখের গভীর নি:শ্বাস আপনাতেই বেরিয়ে হৃদয়কে আরামপ্রদ শীতল করে তোলে কাশফির ।
 
সাগরের ঢেউয়ের ওপরে ঢেউ … স্রোতের টানে কখনো কাছে কখনো দূরে এভাবে নিরন্তর বয়ে চলে… জীবনের মতো? জীবনেও তো সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা হাত ধরে আসা যাওয়া করে। আজ দুই যুগেরও বেশী তুষার আর কাশফির সংসার জীবন। একই ছাদের নিচে কাটানো মুহূর্তগুলোর সবগুলোই কি আজকের মতো এমন নিরুদ্বেগ ছিলো? আক্ষেপ ও কি ছিলোনা?
 
আক্ষেপ ছিলো। তবে নিজেদের ভেতরে বোঝাপড়াটা এতটাই মজবুত ছিল যে, তুষারের সাথে জীবন পার করতে গিয়ে কোনো আক্ষেপ ও টের পাওয়া যায়নি ।নিজেরা এমনভাবে জীবনকে পার করেছেন, কখনো কারও কথায় কান দেননি, সকল পছন্দ-অপছন্দ নিজেদের ভেতর শেয়ার করেছেন।
সাগর থেকে ধেয়ে আসা লিলুয়া বাতাস কাশফির মাথার স্কার্ফকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়। সেটা ঠিক করতে করতেই পাশে তুষারকে অনুভব করে। আজ কীভাবে যেন না দেখেই এই মানুষটিকে অনুভব করে। কল্পনায়-শয়নে-জাগরণে অনুভবের তীব্রতর হ্রাস -বৃদ্ধিতে সব কিছু মিলিয়েই দু’জন নর-নারী বয়ে যাওয়া জীবনের স্রোতে বড্ড নিবিড়ভাবে শ্যাওলার মতো জোড় লেগে রয়েছে।
 
কাশফিকে দেখে তুষার হাসে। প্রতি উত্তরে সেও মৃদু হাসিতে ‘কাছে আছি_পাশাপাশি’ এইটাই বুঝায়।
তুষার বুঝে। নিরব থাকে। এক পড়ন্ত বিকেলে ইজি চেয়ারে শুয়ে থেকে কাশফি নামে এক পড়ন্ত বয়সী নারী ফেলে আসা পথের একবারে গোড়ায় চলে যায়…!
 
জীবনের শুরুটা তাদের অনেক ঝামেলার ভেতর দিয়ে হয়েছিলো.. কম আয় দিয়ে সংসার শুরু হয়েছিলো। কাছের মানুশদের গঞ্জনায় সময়গুলো ছিলো বড্ড দুঃসময়। কারণ তাদের ছিলো পছন্দের বিয়ে। পরিবারের কেউই মেনে নেয়নি। এরপর শুরু হলো জীবনের পথে পথে নিরন্তর ঠোকর খাওয়া। এই ঘাট থেকে ঐ ঘাটে যাওয়া। একটু সুস্থির হতে পারে নাই।
দু’জনেই পেশাগত জীবন গড়তে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছে…! ভালোভাবে সন্তানদের বড় করেছে..! আজ নিজের ছেলেমেয়ে দুটির দিকে তাকালে জীবনের সেই বিবর্ণ সময়ের জন্য একটুও আক্ষেপ হয় না।
কারো জীবনই টানা বিবর্ণ থাকে না। তাতে একসময় না একসময় রং আসেই। না হলে জীবন এতো বর্ণিল হতো না। গ্রষ্টা নিজেই আলো… বর্ণময়ের উৎস। তাই’যে জীবন সেই ‘তিনি’ই তৈরি করে দিয়েছেন যাপন করার জন্য। সেখানে কীভাবে টানা আঁধার থাকতে পারে?
 
সে কি সুখী? নিজেকে কাশফি প্রশ্ন করে। উত্তরও পেয়ে যায় সে। অবশ্য একেকজনের সুখ একেক রকম। যার যার অনুভবে এর তারতম্য রয়েছে। কেউ সাথের মানুশটির সময় পেলেই খুশি, আবার কারও সুখ নির্ভর করে দামি হোটেলে খাওয়া-থাকা কিংবা বিদেশে ঘোরা এসবের ভেতর। আসলে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে প্রত্যেকের তিনটা করে জীবন থাকে। একটা তাঁর নিজের জন্য, একটা তাঁর সঙ্গির জন্য, এবং আরেকটি উভয়ের জন্য। এখন এই তিনটা জীবনেই যারা সমানভাবে না হোক, একটু আধটু করে টাচ করে যেতে পারে. তারাই আসলে জীবনের আসল উদ্দেশ্যকে অনুধাবন করে জীবন চলার পথে সুখ নামক সোনার হরিণ দেখা পায়।
 
এদিকে চিন্তা করে এই মুহূর্তে কাশফির নিজেকে বড্ড সুখী মনে হয়।
 
হ্যা! সে সুখী। তবে এর জন্য তাকে এবং তাঁর সাথের মানুশটিকে অনেক সাধনা করতে হয়েছে।
 
অস্তগামী সূর্যের শেষ আভাটুকুও সাগরবক্ষে নিমজ্জনের সাথে সাথেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু এই দম্পতির পথ চলায় তাতে ছেদ পড়ে না। কিংবা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না আঁধার। তাদের পরস্পরের জন্য নিজ নিজ হৃদয়ের ভেতরের আস্তা ও বিশ্বাস ভালোবাসাকে এতোটাই গাঢ় করেছে যে, হৃদয়ের আলোয় তারা এখন পথ চলতে অক্ষম। দূর সাগরের নিকশ কালো আঁধারের মাঝে ফেলে আসা জীবনের সকল অপূর্ণতা ও আক্ষেপকে মূহুর্তে ছুঁড়ে দিয়ে সামনের দিকে আগায়।
 
জীবনের বাকি পথটুকু এই সামনেই!
Facebook Comments