Wednesday, January 19, 2022
Home > ইসলাম > চোখে দেখা হাশর ময়দান ।। নাসিম মুমতাজী

চোখে দেখা হাশর ময়দান ।। নাসিম মুমতাজী

Spread the love

(কল্পনাভিত্তিক রচনা) ছাতিফাটা রোদ্দুর ৷ সূর্য যেন আগুনের গোলা বর্ষণ করছে ৷ শরীরের প্রতিটি লোমকূপ থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরছে ৷ কপালের ঘাম গাল বেয়ে বেয়ে পরছে ৷ পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাষ্ঠপ্রায় ৷ তৃষ্ণায় জান বাহির হওয়ার উপক্রম৷ আশপাশে না আছে কোনও নদী-নালা, না আছে কোনও খাল-বিল আর না আছে কোনও পুকুর-ডোবা ৷ জনবসতির কোনও চিহ্ন দেখছি না ৷ আবাদি ভূমির সন্ধান পাচ্ছি না ৷ কোনও মানবের সাক্ষাতও মিলছে না ৷ কোনও পথিকের পদধূলিও ভাসছে না ৷ কোনও জীব-জন্তুর আওয়াজও আসছে না ৷ দৃষ্টিসীমায় ধরা পরছে না কোনও পশু-পাখি ৷ দিগন্তমাঝে গোচর হচ্ছে না কোনও জীবন্ত প্রাণী ৷ বন্ধুর পথ ৷ আঁকাবাঁকা গলি ৷ এবড়ো খেবড়ো রাস্তা ৷ গভীর খানা-খন্দক ৷ কণ্টকাকীর্ণ উপত্যকা ৷ দুর্গম পাথুরে ভূমি ৷ দিগন্ত বিস্তৃত মরু সাহারা ৷ এরই মাঝ দিয়ে আমার পথচলা ৷
সেই কাকডাকা ভোরে হাঁটা শুরু করেছি ৷ গন্তব্য বহুদূর ৷ পথ বাকী অনেক ৷ অথচ এখনই যে বেহাল দশা! সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে— এখনও পেটে না পড়েছে দানা, না গিয়েছে পানি ৷ সফরসঙ্গী হিসেবে শুরু থেকেই সঙ্গ দিচ্ছে জ্বলন্ত রোদের প্রখর উত্তাপ ৷ আপন করে নিয়েছে অসহনীয় গ্রীষ্মের তীব্র গরম ৷ সূর্যের অমিত তেজে উত্তপ্ত পথ যেন রুটি ভাজার গরম তাওয়া, খৈ ফোটা তপ্ত বালি, সীসা গলানো বহ্নিশিখা ৷ বলা যেতে পারে কামারের চুলার লাল টকটকে জ্বলন্ত অঙ্গার ৷ তুলনা করা যায় টগবগ করা ফুটন্ত তেলের সঙ্গে ৷ উপমা দেয়া যায় ইটভাটায় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের সাথে ৷ এ মুহূর্তে মোম থাকলে গলে যেত ৷ বরফ থাকলে নিঃশেষ হত ৷ কোনও গাছপালাও নেই, যার ছায়ায় বসা যায় ৷ কোনও তাঁবুও নেই, যার নিচে শোয়া যায় ৷ অন্ন মজুদ নেই, যদ্বারা উদরপূর্তি হয় ৷ পানি সংগ্রহ নেই, যার সাহায্যে তৃষ্ণা দূর হয় ৷ পুরো শরীর অবশ ৷ সাস্থ্য পূর্ণ দুর্বল ৷ পা দু’টি নিশ্চল ৷ চলৎশক্তি রহিত ৷ মনোবল ভাঙা ৷ সাহসহারা ৷ হতোদ্যম ৷ নিরাশ৷ নাহ! আর পারা যাচ্ছে না ৷ হতাশা ভর করেছে আমার ওপর ৷ নিরাশা বাসা বেঁধেছে মনের গহীনে ৷ দেহখানি বিছিয়ে দিলাম ৷ গা’টা এলিয়ে দিলাম ৷ সামনে শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা ৷ একসময় সব অন্ধকারে ছেয়ে গেল ৷ প্রকৃতি বুঝি গভীর সাগরে তলিয়ে গেল ৷ আর আমি যেন গাঢ় আঁধার কূপে পা পিছলে পড়ে গেলাম ৷
যখন সংজ্ঞা ফিরে এসেছে, বোধশক্তি লাভ করেছি— দেখতে পেলাম— কিছু লোক আমার খাটের পাশে সোফায় বসে আছে ৷ পরিচিত অপরিচিত মিলিয়েই ৷ ওপরে ছাদের সাথে লটকান ফ্যানের পাখা ঘুরছে ৷ এয়ারকন্ডিশনের ঝিরঝির বাতাসে হালকা হালকা শীত অনুভূত হচ্ছে ৷ একি! স্বপ্ন দেখছি নাকি আমি! দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে না তো! নাহ! গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম— জেগেই আছি ৷ শিয়রে উপবিষ্টা জনম দুঃখিনী মা জননী আমায় চোখ খুলতে দেখে যেন স্তম্ভিত ফিরে পেলেন ৷ বিবি সাহেবা মুচকি হাসি উপহার দিলেন ৷ পরিবারের সবাই স্বস্তি ফিরে পেল ৷ ছেলে-মেয়েরা বাবা, বাবা বলে খাটের পাশে এসে দাঁড়াল ৷ বাড়িতে খুশির বান ডেকে গেল ৷ আনন্দের ঢল নেমে এল ৷ যেন কোনও মৃত পুনরুজ্জীবিত হয়েছে ৷ পরে জানতে পারলাম, কে বা কারা যেন গাড়িতে করে আমায় পৌঁছে দিয়েছে বাড়ির দুয়ারে ৷ মায়ের উদরে ৷ পকেটে থাকা ম্যানিব্যাগ থেকে ঠিকানা পেয়েছে ৷
আমায় চোখ খুলতে দেখে মা তো আনন্দে কেঁদেই ফেললেন ৷ বাবা খাসি সদকা করলেন ৷ পাড়ায় বিতরণের জন্য মিষ্টি আনতে বড় ভাই বাজারে গেছেন ৷ গরিব মিসকিন অনাথ এতিম বিধবাদের খাওয়ানোর আয়োজন চলছে ৷ শাশুড়ি জায়নামাজে বসে চোখ মুছছেন ৷ গতকাল আমার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কেয়ামতের কথা স্মরণ হতেই শঙ্কিত হয়ে গেলাম ৷ দেহ কাঁপুনি দিয়ে ওঠল ৷ ক্ষাণিক পূর্বে কিছুটা শীত শীত লাগছিল, এখন কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে ৷ লাইটের আলোতে তা চকচক করছে ৷ দূর্বাঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু যেমন চমকায় ৷ এখন আর কিছুই ভালো লাগছে না ৷ অন্তরে দুনিয়ার মোহ নেই ৷ পৃথিবীর মায়া নেই ৷ সম্পদের লোভ নেই ৷ সংসারের আশা নেই ৷
চিন্তাশীল পাঠক— যারা অন্তর্চক্ষুতে দেখে দেখে পড়েছেন— নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, কী আমার পরিবর্তনের কারণ! কেনই বা আমি এমন হয়ে গেলাম! সংজ্ঞা ফিরে পাওয়ার পর যে চিন্তাটি সর্বপ্রথম মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তা হলো— আজ সবাই আমায় খুব আপন ভাবছে ৷ কাছের মনে করছে ৷ আমার সংজ্ঞা ফিরে আসায় আনন্দিত হয়েছে ৷ সুস্থ হওয়ায় প্রফুল্লিত হয়েছে ৷ কিন্তু যেদিন জমীন হবে তামার, সূর্য থাকবে মাথার অর্ধহাত ওপরে; যেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোথাও কোনও ছায়া থাকবে না, যেদিন পরিত্রাণের কোনও উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে না, সেদিন কি এরা আমার কোনও কাজে আসবে? আমার উপকারে অগ্রসর হবে? না আমায় চিনবে? না, চিনবে না! পরিচয় তুলে ধরলেও না! আমার জন্মদাতা পিতা— যিনি আমায় মানুষ করতে শরীরের রক্ত পানি করেছেন, গর্ভধারিণী মা— যিনি আমার জীবন রক্ষার্থে বুক নিঃসৃত রস পান করিয়েছেন, তারা কি আমায় চিনবে? শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, স্নেহের ছোট ভাই, দুঃখের ভাগী মিষ্টি বোন, প্রাণপ্রিয়া স্ত্রী, কলজে ছেঁড়া ধন, আদরের দুলালী, আড্ডার সঙ্গী, অবসরের সাথী, ক্লাসের সহপাঠী, খেলার প্রতিদ্বন্দ্বী, মহব্বতের বন্ধু বান্ধব— কেউই তো চিনবে না ৷ সেদিন না থাকবে রক্তের সম্পর্কের কোনও দাম আর না থাকবে আত্মীয়তার বন্ধনের কোনও মান ৷ সেদিন সবাই, একেবারে সবাই স্বার্থপর হয়ে যাবে ৷ ইয়া নাফসী, ইয়া নাফসী বলতে বলতে সবাই অপর থেকে পালাতে থাকবে ৷ ডাকলেও শুনবে না ৷ হাঁকলেও ফিরবে না ৷ এখন তো কয়েক আলোকবর্ষ দূর থেকে সূর্যের তাপ আসে, তবুও তার উত্তাপ সহ্য করা যায় না ৷ তাহলে সেদিনের অবস্থা কী হবে?!
প্রচণ্ড রোদের দিন ছাদে নগ্ন পা রাখা দুঃসাধ্য, টিনের চালে খালি পায়ে দাঁড়ান দুঃসহ, পিচঢালা পথে জুতোবিহান হাঁটা দুষ্কর, তাহলে সেদিন তাম্রনির্মিত জমিতে কীভাবে দাঁড়াব? সূর্যতাপে মগজ গলে গলে পড়বে, পা পুড়ে যাবে ৷ এ অবস্থায়ই কিন্তু আমায় সারাজীবনের হিসাব দিতে হবে ৷ পারব কি আমি?

Facebook Comments