Wednesday, January 19, 2022
Home > গল্প > সে দিন ঘোলাটে অন্ধকার ছিল ।। তামিম আব্দুল্লাহ

সে দিন ঘোলাটে অন্ধকার ছিল ।। তামিম আব্দুল্লাহ

Spread the love
চামারের বাচ্চা,যত বড় মুখ না তত বড় কথা! বের হ এখান থেকে! বিশ্রী গালাগাল দিয়ে বের করে দিল জাফর মিয়াকে। মাথা নিচু করে চলে এল জাফর মিয়া। নিজের চিন্তা হলে কখনওই জাফর মিয়া টাকা চাইতে আসত না।
জাফর মিয়ার ছেলে রনি। এবার ক্লাস এইটে পড়ে। তার স্কুলের দু মাসের বেতন বাকী। কন্সট্রাকশনের কাজটার শ্রমিকদের প্রধান জাফর মিয়া। সবাই কন্টাক্টর সাব বলে ডাকে। ২০০ শ্রমিক টানা দু’মাস কাজ করার পর এখন বেতন দিন প্রতি ৫০০ টাকার পরিবর্তে বেতন দিচ্ছে দিন প্রতি ৩০০ টাকা। তাই হিমশিম খাচ্ছে জাফর মিয়া। এত বড় দায়িত্বের ভার তিনি নিতে পারছেন না।
চলতি পথে মাস্টার সাহেবের সাথে দেখা।
– কী খবর? জাফর মিয়া!
– মাস্টার সাব! আছি আল্লাহ রাখছে ভাল।
– দেইখা তো মনে হয় না ভাল আছ।
-না না মাষ্টার সাব,তেমন কিছু না।
-না হইলেই ভাল। তয় তোমার পোলার স্কুলের বেতন তো বাকী আছে সেটা না দিলে তো পোলার পরীক্ষা আটকায় যায় জাফর মিয়া।
-না না মাষ্টার সাব! আমি দিয়া দিমু স্কুল বেতন কিন্তু আমার পোলার পরীক্ষা বাদ দিয়েন না। আমি মূর্খ মানুষ দিন আইনা দিন খাই। তার মধ্যে আবার টানাটানি চলতাছে।
– পোলাডারে ভালো মানুষ বানাইতে না পারলে আমার জীবনটা শেষ হইয়া যাইব। দয়া কইরা ওর পরীক্ষা বাদ দিয়েন না।
– হুম…সবই বুঝলাম জাফর মিয়া। আমরা তো আর আশ্রম খুইলা বসি নাই।।টাকার জোরেই আমরা তোমাগো পোলাপান পড়াই। যদি একটা ব্যবস্থা না করতে পারো তাহলে তো আমাগো কিছুই করার থাকব না, যাই। আবার পরে দেখা হইব।
এমনিতেই একটা টেনশন জাফর মিয়ার মাথা খারাপ কইরা রাখছে আবার আরেকটা টেনশন মাথার ভেতর ঠাঁই পেল।
রাত করে বাড়ি ফিরলো জাফর মিয়া। রাজ্যের হাজার চিন্তা তার মাথায়। কী রেখে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। এই মুহুর্তে তার কী করা উচিৎ? তা বলে দেয়ার মত কোনও মানুষও নেই।
খাবার খাওয়ার সময়ে জাফর মিয়ার স্ত্রী নিলুফা বানু বলে উঠল, ‘এই যে, শুনছেন! ঘরে চাল ডাল তো সব শেষ। কিছু বাজার সদাই তো করা দরকার। নাইলে তো না খাইয়া থাকা লাগব।’
এত প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে পারল না জাফর মিয়া। চুপচাপ শুধু শুনে গেল। রাতের বেলায় শোবার সময় শুধু বেলাল নামের একজনকে ফোন করে কী যেন বলল। কী বলল তা বেলাল ও জাফর মিয়া ছাড়া আর কেউ জানে না।
পরদিন সকালে জাফর মিয়া একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠল। উঠে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বের হল।
ততক্ষণে সবাই ক খ কন্সট্রাকশনের মালিকের বাড়ির সামনে উপস্থিত। জাফর মিয়া ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এবং বেলালের হাত থেকে মাইক নিয়ে দীপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আজ আমার ভাই, আমার ছেলে,আমার বোন,আমার মেয়ে না খেয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। আজ আমাদের মত শ্রমিকদের চামার বলা হয়, আমাদের মত শ্রমিকদের টাকাওয়ালাদের পায়ের নিচে মাথা রেখে বাচঁতে হয়। অথচ আমাদের কারণেই আজ তারা ১০ তলা বাড়ির ছাদ দেখে। আজ আমাদের কারণেই তারা তাদের রঙিন স্বপ্নের বাস্তবতা দেখে। কিন্তু আমরা আমাদের স্বপ্ন তো দূরের কথা আমাদের বাস্তবতাকে ঠেলে সামনে চলার পথই বন্ধ করে দেয় এ সমস্ত টাকাওয়ালারা। এখনই আমাদের বদলা নেবার পালা। আমাদের পাওনা সঠিকভাবে আদায় করে নেয়ার সময়। আজ তারা আমাদের মাথায় উঠে বসেছে কিন্তু তারা কাল আর বসে থাকবে না। সাথে একটা ছুরি আমাদের গলায় ঝুলিয়ে দিবে।
আমার ভাইরা! আপনারা আমার কথার জবাব দিন। আপনারা জবাব দিন।’
তখন সবাই অগ্নিশর্মা হয়ে জাফর মিয়ার সাথে গলা মিলালো। সবাই একত্র হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু জাফর মিয়ার পরিকল্পনা বেশীক্ষণ ধোপে টিকল না। কারণ, ক খ কন্সট্রাকশনের মালিক হানিফ সরকার এ রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার বিষয়টা আঁচ করতে পেরেছে।
তাই কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে পুলিশকে নিজের কাজে ব্যবহার করলেন। তখন পিছু পা হতে বাধ্য হল জাফর মিয়া। সেদিন সন্ধ্যার সময় জাফর মিয়াকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তবে কিছুদিন পর জাফর মিয়ার লাশ ভেসে উঠে ঝিলের মধ্য থেকে। থানায় অভিযোগ করলে বলা হয়, থানা থেকে জাফর মিয়াকে সেদিন রাতে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
কে বা কারা ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে এ বিষয়টা কেউই জানত না পারলেও সবাই ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিল এই ঘোলাটে অন্ধারের কথা রনি আজ অবধি ভু্লতে পারে নি। রনি আজ তার বাবার মত দাঁড়িয়ে। হাজারও মানুষের মাঝে যারা হবে আগামীর কর্ণধার,তারা হবে প্রতিটা শ্রমিকের ভাই। শ্রমিকের ঘামের মূল্যধারী।
Facebook Comments