Sunday, January 16, 2022
Home > গল্প > সুমির সৎ মা || মাহদী হাসান ফরাজী

সুমির সৎ মা || মাহদী হাসান ফরাজী

Spread the love

মাহদী হাসান ফরাজী : ফুটফুটে একটি মেয়ে সুমি। এক ভাই ও তিন বোনের মাঝে সে সবার ছোট।মা-বাবার আদরের দুলালী।সুমি ছোট হলে কি হবে! সুমির আবদার উপেক্ষা করবে? এমন সাহস দূ:সাহস কারো নেই। সুমির উষ্ঠ কাঁপন পালনে সকলে বাধ্য। সুমির অভিমানকে সবাই ভয় পায়। ফলে সুমি যা চায় তাই পায়।

একবার রাত বারটায় ঘুম ভাঙ্গে সুমির।আদরের রাজকন্যা গভীর নিশিতে কলা খাওয়ার বায়না ধরে। রাতের নির্জন প্রহরে অবলা মা বেরিয়ে পড়েন কলার খোঁজে। ফিরে আসেন কলা হাতে। কলা পেয়ে সুমি তো আহ্লাদে আটখানা।

মা-বাবার স্নেহ-মমতা আর ভাই-বোনের আদর-সোহাগে বয়ে যাচ্ছিল সুমির সুখের জীবন। কিন্তু বেশি দিন তার ভাগ্য সহায় হল না। অবুঝ সুমির বুঝ হওয়ার পূর্বেই সুখতারা অন্তপথে। হঠাৎ পরম মায়ের মমতার বিচ্ছেদ ঘটল। সুমিকে ফেলে পরপারের অতিথিয়েতা বরণ করল। থমকে গেল সুমির জীবনতরী। ছিটকে পড়ল সুখতরী থেকে। সুমির জীবন হয়ে উঠল মেহেদি পাতার ন্যায়, যার উপরে সবুজ সজীব হলেও ভেতরটা রক্ত লাল। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ যেন বাইরের সজীবতাকে ছাপিয়ে যেতে চায়। সুমির ভাগ্যাকাশে শুরু হল তুমুল মরুঝড়। ভেঙ্গে গেল অবুঝ মনের স্বপ্নপ্রাসাদ।

সুমির জীবনের মোড় ঘুরে গেল। শহর ছেড়ে গ্রামের পথে সুমি। গ্রামে পেল নতুন আবহাওয়া, নতুন মা। কিন্তু প্রতিকুলতা অনূকুলতাকে ঢেকে নিল। পেল না মায়ের সেই মায়া মমতা। ছোট্ট সুমির জীবন প্রারম্ভেই শত্রু-মিত্রের খেলা। প্রতিপক্ষের ভূমিকায় সৎমা। ঘুমানোর সময় যে সুমির প্রহর গুণত সুস্বাদু খাবার, সে সুমিকে দু’বেলা ভাতের জন্য শুনতে হয় হাজারও বকুনি। সৎমার কারণে বাবাও আর মন ভরে আদর করতে পারে না সুমিকে। ছোট্ট সুমি বুঝে উঠতে পারে না, কেন এমন হচ্ছে? কি তার অপরাধ?

সুমি এখন একটু বড় হয়েছে। একটু একটু বুঝতে শিখেছে। সৎমায়ের অসৎ আচরণের হেতু কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে। এখন সৎমায়ের আচরণ সুমিকে আরো বেশি পীড়া দেয়। মাঝে মাঝেই আনমনা হয়ে যায় সুমি। হারিয়ে যায় মায়ের মমতা বিজরিত স্মৃতির পাতায়। কোমল উষ্ঠে বিড়বিড়িয়ে বলতে থাকে,”মা! ওমা!!একবার এসে দেখে যাওনা মা, তোমার আদরের সুমি ক-ত কষ্টে আছে। একবার স্বপ্নে দেখা দাও মা!” সে রাতেই সুমি স্বপ্ন দেখে, কলা হাতে দাঁড়িয়ে মা। পরম মমতায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে সুমিকে। সুমি দিকশূন্য হয়ে পাগলের মত দৌড়াচ্ছে মায়ের দিকে। সুমি নিজেকে সামলাতে না পেরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। অমনি ঘুম ভেঙ্গে গেল সুমির। ঘড়ির কাটা তখন বারটার ঘরে। সুমির স্মৃতির ক্যানভাসে ভীড় করল মমতাময়ী মায়ে প্রীতি। সে রাতের ঘটনা আয়নার ন্যায় ঝলঝলিয়ে উঠল। এক নিশীথে মায়ের কাছে কলা খাওয়ার বায়না ধরেছিল বাস্তব জগতে।আরেক নিশীথে মা কলা নিয়ে হাজির স্বপ্ন জগতে। কিন্তু সুমির অদৃষ্ট লিখন বড়ই করুণ! মায়ের কৃত্রিম মিলন ছোঁয়ার পূর্বেই বিচ্ছেদ পীড়া। মায়ের স্মরণে গভীর রাতে বালিশে মুখ গোজে ফোঁপিয়ে কাঁদতে থাকে সুমি। কান্নার ক্ষিণ আওয়াজে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে একাকার। গাছ থেকে টিনের চালে টপ টপ পানি ঝরে সমবেদনা জানায় সুমিকে।

সৎমার আচরণে প্রতিবেশিরাও হতবাগ! সৎমার কাল্পনিক চরিত্র আজ বাস্তব উপলব্ধি করছে বিস্ময়ে আঁখি। সুমির কানে ব্যথা। সুমির জন্য ডাক্তারখানা বিরল! ব্যথায় কাতরাচ্ছে সুমি। দেখছে গগন ও জমিনবাসী। শুধু সৎমা ব্যতিত। এক কোমল হৃদয় প্রতিবেশী এগিয়ে আসল। সৎমাকে হাদীসের মর্মবাণী শুনালো যে,”মুসলমানদের ঐ ঘর সবচেয়ে নিকৃষ্ট যে ঘরে এতিমের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়”। অজ্ঞ মূর্খতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত সৎমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল হাদীসের মর্ম শ্রবনে।তৎক্ষণাত সুমির জন্য ডাক্তারখানা উন্মুক্ত হল। অত:পর সুমির লেখা-পড়া বিষয়ে সুপরামর্শ দিলে, সুমির ভাগ্যাকাশে নতুন রবির উদয় হয় শান্তির বার্তা নিয়ে। সুমিকে মাদরাসায় ভর্তি করানো হল। সুমির জীবন কাননে নতুন করে ফোটতে লাগল পুষ্পকলি। আসতে লাগল ঝাঁকে ঝাঁকে সুখ পাখির দল। সরব কল্লোলে গেয়ে চলল মুক্তির গান।সুমি ফিরে পেল সোনালী দিন। আবার সুখ সাগরে ভাসতে লাগল সুমির জীবনতরী।

Facebook Comments