Wednesday, January 19, 2022
Home > গল্প > এইসব রাতদিন ।। সাদ মুস্তাফিজ

এইসব রাতদিন ।। সাদ মুস্তাফিজ

Spread the love

 

শেষ টান দিয়ে অ্যাশট্রেতে সিগারেট গুঁজলেন জাকির ভাই। তারপর আমার দিকে ফিরে গলগল করে মুখের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, বুঝেছো শিমুল, আজকাল কিছুই লিখতে পারি না। গল্প, উপন্যাস – কিচ্ছু না। কিছু লিখতে নিলেই মরা বউয়ের মুখ ভেসে উঠে। কিছুই ভাল লাগে না তখন। একটার পর একটা সিগারেট শেষ করি শুধু।
জাকির ভাই থামলেন। আমার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কিছু বলব কি না – হয়তবা ভাবছেন। জাকির ভাইয়ের এসব পুরনো গল্পে এখন আর চোখ ভেজে না আমার। তিন বছর হল তো এই একই গল্প শুনছি! কোন নতুনত্ব নেই, নেই কোন দাড়ি কমার হেরফের।

“স্ত্রীর ক্যান্সার হল, টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারলেন না। বিনা চিকিৎসায় পনেরো বছরের একটা মেয়ে রেখে স্ত্রী মারা গেল। তার এক বছর পর তিনি ঢাকায় এসে একটা প্রকাশনীতে প্রুফ দেখার কাজ নিলেন” – এই সামান্য গল্পটুকু জাকির ভাই অনেকক্ষণ লাগিয়ে, অনেক শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে করেন।
প্রথম প্রথম কাঁদতাম আমি। তারপর চোখের কোণা ভিজেছে। এখন কিছুই হয় না। বরং অসময়ে এই কথা পাড়লে ইদানিং বিরক্ত হই।
জাকির ভাই এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। খাতা পত্র নিয়ে হিসেব মেলানোয় ব্যস্ত আমি। জাকির ভাইয়ের সাথে কথা বলতে ভাল লাগছে না।


ফকিরাপুলের এক অন্ধকার গলিতে আমরা দু’জন থাকি। ছোট্ট একটা রুমের অর্ধেক আমার, অর্ধেক জাকির ভাইয়ের। এখানের এক খাবার হোটেলের ম্যানেজার আমি। জাকির ভাই একটা প্রকাশনীতে প্রুফ দেখেন।
এই প্রায়ান্ধকার ছোট্ট রুম আর হোটেলটাই আমার পৃথিবী। জাকির ভাই মাঝেমাঝে গ্রামের বাড়ি যান। মেয়ে আর মা’কে দেখে আসেন। আমার যাওয়া হয় না কোথাও।

লোডশেডিংয়ের এক ঘন অন্ধকার সন্ধ্যায় জাকির ভাই চার্জার লাইট জ্বালিয়ে প্রুফ দেখছিলেন। আমি বরাবরের মত খাতা পত্র দেখে দেখে হিসেব মিলাচ্ছিলাম। জাকির ভাই প্রুফ দেখা বাদ দিয়ে মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে ডাকলেন – শিমুল!

– বলেন

– একটা কথা ছিল…

– বলে ফেলেন

– আসলে হয়েছে কি, ঈদে বাড়ি যাবার কথা ছিল। বস ছুটি দেন নাই। পাঁচটা নতুন বই বের হবে, অনেক কাজ। ঈদে বাড়ি যাওয়া হবে না শুনে মেয়েটা বলছিল ও এখানে আসবে। আমি না করেছি। তবুও শোনে না। এখন ও যদি সত্যিই এসে পড়ে, তাহলে….
জাকির ভাই কথা বন্ধ করে একটা সিগারেট জ্বালালেন। বুঝেছি ব্যাপারটা। আগেও কয়েকবার হয়েছে এমন।

– ঠিক আছে। অনিন্দিতা আসলে আমি কয়টা দিন হোটেলেই থাকব। ওকে আসতে বলুন – বললাম আমি।
জাকির ভাইয়ের মুখ দিয়ে কেমন একটা শব্দ বের হল। ধন্যবাদ জাতীয় কিছু বলতে নিয়ে হয়তবা চুপ হয়ে গেলেন। এমন কাজে আসলে ধন্যবাদ দেয়াটা বেমানান লাগে।


বৃষ্টি হচ্ছে তিনদিন হল। ঋতুর পরিবর্তন। একদিন হোটেল থেকে ফিরতে বৃষ্টিতে পড়েছিলাম। জ্বরটা বেঁধেছে তখনই। অসহায়ের মত রুমে পড়ে আছি। জাকির ভাই নেই। কাজের চাপ বেড়ে গেছে তার। দু’দিন হল প্রকাশনীতেই রাত কাটান। মাঝেমাঝে ফোন করে আমার অবস্থা জানেন।

শুয়ে আছি। দরজায় নক করল কেউ। উঠে গিয়ে দরজা খুলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কোন ছোকরা হয়তবা। কিংবা ভুল ঠিকানায় নক করা কোন আগন্তুক। এক দু’বার নক করে এমনিই চলে যাবে।
নক করার শব্দ হল আবারো এবং মেয়েলি কণ্ঠের শব্দ শোনা গেল। উঠে দরজা খুললাম। অনিন্দিতা দাঁড়িয়ে আছে বাইরে।

– শিমুল ভাই, জ্বর নেমেছে আপনার?

– আমার জ্বরের কথা কে বলল তোমাকে? – খানিকটা আশ্চর্য হয়ে বললাম।

– বাবা বলেছিল।

– ও। কমেছে কিছুটা। ভিতরে এসে বসো।

অনিন্দিতা ওর বাবার বিছানায় বসল। আমি দড়ি থেকে কাপড় নামিয়ে ব্যাগে ভরতে নিলাম। অনিন্দিতা এসেছে, আর তো থাকা যায় না! কোথাও যেতে হবে এখন। অসুখ নিয়ে হোটেলে যাবার ইচ্ছে নেই। জিগাতলায় এক বন্ধুর মেসে উঠতে পারি।

অনিন্দিতা বলল – কোথায় যান?

– এই তো পাশেই।

– আমি আসলে আপনি সবসময় চলে যান কেন?

– এই চাবিটা রাখো। তোমার বাবা আসলে তাকে দিবে – রুমের চাবি অনিন্দিতাকে দিয়ে বললাম।

– বিছানায় যান। আপনার জ্বর বেশি। মাথায় পানি ঢালতে হবে।

– দরকার নেই – বলে বের হতে নিচ্ছিলাম। পেছন থেকে অনিন্দিতা এসে হাত ধরল।

– বললাম না বিছানায় যেতে? তারপরো কোথায় যান?
কেউ এমন করে বলার পর সেটা অগ্রাহ্য করে কারো বাইরে যাবার মত শক্তি থাকে কি না, আমার জানা নেই।

অনিন্দিতা মাথায় পানি ঢালছে। আমার চিন্তার ঠিক নেই এখন। কি কি সব ভাবছি। এই শ্যামা মেয়েটির সাথে পুরো জীবন কাটাতে পারব আমি? জাকির ভাই রাজি হবে? কথাটাই বা তুলব কিভাবে?

বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি। জ্বরটা মনে হয় আরো বেড়েছে আমার। চোখ বন্ধ ছিল। চোখ খুলে দেখি, জাকির ভাই মোটা চশমার উপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। অনিন্দিতা মাথায় জলপটি দিচ্ছে। বাইরে তখনো বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না আমার। আমি আবারো চোখ বন্ধ করে ফেললাম…।

Facebook Comments