রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২
Home > গল্প > সাজু মাঝি ।। আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

সাজু মাঝি ।। আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

Spread the love

বাবা খেয়া ঘাটের মাঝি বলে সাজুর সাথে কেউ মিশতে চায়না। তাই কারও সাথেই তেমন
বন্ধুত্ব হয়ে ওঠেনি ওর। তবে একটি বন্ধু আছে সাজুর। যে আসলেই বন্ধু। সে হলো রাতুল।
রাতুল আর সাজু একই স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। রাতুলের বাবা একজন স্কুল
শিক্ষক। রাতুল তাঁরই আদর্শে গড়া। তাই তার মনের অভিধানে হিংসা নামের কোনো
শব্দের জায়গা হয়নি। স্কুলে যাওয়ার পথে রাতুল রোজই সাজুদের বাড়িতে আসে। সাজুর
‘মা’ ও রাতুলকে অনেক আদর করেন। চিড়ের মোয়া, মুড়ির মোয়া, ভাপা পিঠা, শামুক পিঠা আরও কতো কি খাওয়ান!
রাতুলও প্রায়’ই টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে এটা ওটা নিয়ে আসে সাজুর বাড়ীতে।
অভাবের সংসার হলেও সাজুর মা প্রথম প্রথম তা নিতে রাজি হতেন না।
কিন্তু রাতুলের পীড়াপীড়িতে শেষে তা নিতে বাধ্য হতেন। না হলে যে রাতুল অভিমান করে বসে।
আজ স্কুলে সাজুকে না দেখে রাতুলের মনটা মেঘলা আকাশের মতো কালো হয়ে যায়।
রাতুলের মাথায় দুঃশ্চিন্তাটা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে-
সাজু আজ আসেনি কেন? ওর কোনো সমস্যা হয়নিতো!
অস্থিরতার মধ্য দিয়ে রুটিনবাঁধা ক্লাশগুলো শেষ করে রাতুল ছুটে যায় সাজুদের
বাড়িতে। কিন্তু সাজুকে বাড়িতেও পাওয়া গেল না। রাতুল সাজুর মাকে জিজ্ঞেস করে-
চাচি! সাজু কোথায়?
সাজুর বাজানের শইলডা বালা না, তাই সাজুরে খেয়ায় পাডাইছি।
কী হয়েছে চাচার?
হাঁপানিডা বাইড়া গেছে!
ডাক্তার ডাকেননি?
ডাক্তার কী আর আমরার মতো গরীবের ঘরে আইবো?
কেন? গরীবরা কী মানুষ না?
রাতুল আর কথা বাড়ালো না। শুধু যাওয়ার সময় বলল-
আমি তাহলে একটু সাজুর কাছে যাই।
সাজুকে খেয়ায় বসে ঝিমুতে দেখে রাতুলের ‘গ্রীষ্মের দুপুরে’ ছড়াটি মনে পড়ে যায়।
কিন্তু এখনতো আর ছড়া পড়ার সময় না, তাই রাতুল ছড়ার চিন্তা বাদ দিয়ে সাজুকে ডাক দেয়।
এই সাজু,এই!
রাতুলের গলা শুনে সাজু চমকে উঠে পেছনের দিকে তাকায়।
কীরে, তুই কখন এলি?
এইতো,এখনি। চল ডাক্তারের কাছে যাবো। চাচার জন্য ঔষধ আনতে হবে।
সাজু একটা দীর্ঘশ্বাস বলল,সারাদিনে মাত্র ৬০ টাকা হইছে। এই টাকাতে কে ঔষধ দেবে?
আরে,আগেতো গিয়ে দেখি;ওঠ।
ঠিক আছে, চল।
সাজু খেয়ার রশিটা নদীর পাড়ে একটি পুরোনো খুটির সাথে বেঁধে রাতুলের সাথে ডাক্তার বাড়ির উদ্দেশ্যে
রওয়ানা হল।
গাঁয়ের একমাত্র পাস করা ডাক্তার পরিমল বোস বারান্দায় বসে কী একটা বই যেন পড়ছিলেন। সাজুদের দেখেই তিনি ওদের আগমণের হেতু বুঝে গেলেন। আসলে সাজুর মা’ও সকালে একবার এসেছিলেন বাকিতে ঔষধ নিতে। কিন্তু তিনি যে বাকিতে ঔষধ বেঁচেন না। তাই চোঁখ মুছতে মুছতে সাজুর মাকে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছিল!
ডাক্তার ধরেই নিয়েছিলেন সাজু বুঝি এখনও বাকিতে ঔষধ নিতে এসেছে।
তাই তিনি আগ থেকেই সাজুর উদ্দেশ্যে বললেন-
শুনো বাপু! আমি যে বাকিতে ঔষধ বেঁচি না, তাতো তোমার মাকে সেই সকালেই বলে দিয়েছি। তাহলে এখন কেন আবার বিরক্ত করতে এলে?
ডাক্তারের কথা শুনে সাজুর মনটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। রাতুল ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাজুকে শান্ত থাকার ইশারা করে। তারপর ডাক্তারকে বলল-
কাকাবাবু,আমরা টাকা নিয়েই এসেছি,এখন ঔষধ দিন।
ডাক্তারবাবুর প্রতি এতদিনের জমানো শ্রদ্ধা আজ হঠাৎ করেই ওর কাছে ফিকে হয়ে গেছে।একটা মানুষের জীবন যার কাছে সামান্য কয়েকটি টাকার জন্য তুচ্ছ হয়ে যায়,তার জন্য সমাজের প্রতিটি মানুষের চোঁখে তুচ্ছ হয়ে যাওয়াটাই নিয়তী!
তিনি কিছুটা থতমত খেয়ে বললেন,টাকা এনেছো?তা আগে বলবে না!
সেই সুযোগটা আপনিদিলেন কোথায়?
আসলে হয়েছে কি…
থাক, আর বলতে হবে না। আপনি বরং চাচাকে যা যা ঔষধ দেয়ার, তা দিয়ে দিন। আমার সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে ফিরতে হবে।
রোগের ধরণ শুনতে শুনতে পরিমল ডাক্তার সাজুর হাতে কিছু ঔষধ ধরিয়ে দেন। ঔষধ গুলো হাতে
নিয়ে সাজু জিজ্ঞেস করে-
কতো হয়েছে?
এক’শ বিশ টাকা।
সাজু রাতুলের দিকে তাকাতেই রাতুল পকেট থেকে এক’শ টাকার একটা নোট বের করে
ডাক্তারের হাতে দিয়ে বলে-
বাকিটা আগামীকাল দেব।
এক সপ্তাহ হয়ে গেছে অথচ সাজুর বাবার শ্বাসটানটা এখনো ভালো হয়নি। বরং দিন দিন
বেড়েই চলেছে। ডাক্তার বলেছেন এখানকার চিকিৎসায় তেমন কোনো কাজ হবে না। তাই
দ্রুত শহরে নিয়ে যাওয়া দরাকার। কিন্তু বললেইতো আর হবে না।শগরে নিতে হলে অনেক টাকার দরকার।
এতো টাকা সাজুর মা পাবেন কোথায়? সাজুর মা অবশ্য ঘরে বসে থাকেননি।
বিত্তশালীদের কাছে সাহায্যের জন্য ছুটাছুটি শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু কেউই তার সে হাতে দু’টি টাকা তুলে দিতে রাজি হলো না। রাতুল আর স্কুলের
ছাত্র-ছাত্রিরা মিলে সাজুর মাকে ২০০০ টাকা তুলে দেয়। এদিকে রাত দিন বাবার
ভাঙ্গা খেয়া বেয়ে সাজুও হাজারখানেক টাকা মায়ের হাতে তুলে দেয়। তিন হাজার টাকা
সম্বল করে সাজুর মা সাজুর বাবাকে নিয়ে সদর হাসপাতালে যান।কথায় আছে ‘ডাক্তারের অপর নাম
ডাকাত’ সাজুর মা এখানে এসে তা দ্বিতীয়বারের মতো বুঝলেন। টাকার জোর নেই বলে হাসপাতাল কতৃপক্ষ সাজুর বাবাকে সিটে না দিয়ে মেঝেতে ফেলে রেখেছে! হাসপাতালে তিনদিন থাকার পরও যখন অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না, তখন সাজুর বাবাকে
রিলিজ দিয়ে দেয়া হল।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গে রাতুলের। চিৎকারটা মনে হচ্ছে সাজুরই। তবে কি চাচা আর নেই!
রাতুল তার বাবাকে নিয়ে সাজুদের বাড়িতে এসে বুঝতে পারে, তার অনুমানই ঠিক। কী
বলে সান্তনা দেয়া যায় একজন বাবা হারা সন্তানকে রাতুলের তা জানা নেই। তবে
বন্ধুর কষ্টের অংশিদার হতে তাকে কেউ শেখাতে হয়নি। সাজুর মতো রাতুলের চোখেও
পানি দেখে সাজু রাতুলের গলায় জড়িয়ে জোরে জোরে কাঁদতে থাকে। দু’জনের চোখেই এখন
বাঁধ ভাঙ্গা ঢেউ।
বাদ জোহর অনুষ্ঠিত হয় সাজুর বাবার নামাজে জানাজা। জানাজাতে অনেক মানুষ আসেন।
মেম্বার সাহেবও আসেন। অথচ এই মানুষটির দ্বারেই সাজুর মা কতো যে মাথা
ঠুকিয়েছেন তার কোনো হিসেব নেই। কিন্তু তিনি তখন সাড়া দেননি। আর আজ এসেছেন
সামাজিকতা দেখাতে। মেম্বারের সাথে আরো দু’চারজন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গও
এসেছেন। সাজুর ইচ্ছে করে সব ক’টাকে গুলি করে মারতে। কিন্তু সে গুলি পাবে
কোথায়? তার ঘরে যে চালই নেই। চালের কথা স্মরণ হতেই সাজুর নজর পরে বাবার
খাটিয়ার পাশে রাখা চালভর্তি গামলাটার ওপর। চালের ওপর অনেকগুলো টাকাও রয়েছে।
সাজু বুঝতে পারে না, লাশের সাথে এগুলোর সম্পর্কটা কী! এগুলোতো তাদেরই
প্রয়োজন, যাদের প্রাণ আছে। আছে ক্ষুধা নামক দৈত্যের হুংকার। ঠিক যেমন প্রয়োজন
ছিল বেঁচে থাকতে তার বাবারও। এই টাকার অভাবেই না তার বাবাকে অচিকিৎসায় মরতে
হলো। আর এখন মরার পর সেই চাল আর টাকা রাখা হয়েছে তারই লাশের পাশে। এটা যে
লাশের সাথে চরম বেয়াদবি। সাজু মনে মনে বলে- তোদের সামাজিকতার কপালে ওয়াক থু।
সপ্তাহ খানেক পর সাজু তার মৃতবাবার খেয়াটাকে ধুয়ে মুছে সাফ করে নেয়। তার পর
বাবার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেয়। বাবার মতো সেও এখন খেয়াঘাটের মাঝি। এক
সন্ধ্যায় রাতুল সাজুর খেয়ায় বসে জিজ্ঞেস করে-
এই সাজু! আর পড়বি না?
সাজুও রাতুলকে পাল্টা প্রশ্ন করে-
মানুষ পড়ালেখা করে কেন রে?
রাতুল কিছুই বলে না। কারণ সে জানে এর উত্তর সাজুর কাছেই আছে। সাজু পূণরায় বলে-
বাবা এই খেয়াটাকে খুব ভালোবাসতেন। আজ বাবা নেই। কিন্তু বাবার স্মৃতি রয়ে
গেছে। তাই বাবার এই স্মৃতিকেই জীবনের লক্ষ্য করে নিলাম। মানে মাঝি হয়ে গেলাম।
সাজু মাঝি। হ্যাঁ, মানুষ মাঝি বলে ঘৃণা করবে। করলে করুক। তুইতো আর করবি না!
এই বলে সাজু গলায় সুর তোলে-
মন মাঝি তো বৈঠা নে রে.. আমি বাইতে পারলাম না…।

Facebook Comments