Sunday, January 16, 2022
Home > গল্প > সহোদরা ।। জোহান কুতুবী

সহোদরা ।। জোহান কুতুবী

Spread the love

আজকের পত্রিকায় বড় করে হেড লাইনে লেখা-
‘ব্ল্যাকমেইলের পর মন্ত্রীর খুন; বিক্ষোভ মিছিলে উত্তপ্ত জনতা।’
এতটুকু পড়ে লোকটি পত্রিকা ভাঁজ করে টেবিলের দিকে ছুঁড়ে মারল। আর মুখে বলল- ‘বাল!’
বাংলা মদের বোতল হাতে নিয়ে লোকটি একটা গ্লাসে ঢালল। সকালে মদ পান করা তার একটা নিত্য অভ্যেস। আজ মনও প্রসন্ন। প্রসন্নতার পেছনে কারণ আছে- অবশ্যই। যদিও অধিকাংশ মানুষ কারণ ব্যতিত খুশি থাকে।

আজ ইভার ‘ল’ ফাইনাল এক্সাম। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার ইভার বিয়েটা দিয়ে ফেলা দরকার। তারপর ওর একটা চেম্বার হয়ে গেলেই হল। লোকটি বিরাট একটা বোঝা কাঁধ থেকে নামাতে যাচ্ছে।

তারপর ধুম্ করে কোনো একদিন মারা গেলেই হল। মদ খেয়ে খেয়ে এমনিতে লিভার পচে গেছে। এখন কিছুদিন খেয়েদেয়ে শান্তিতে মরতে পারলে সে খুশি। তবে মরার আগে শেষ ইচ্ছা- ইভার ঘরভর্তি একদঙ্গল ছেলেমেয়ে সে দেখে মরতে চায়।
সে কবেই তার বাবা মা মারা যাবার পর এত বড় একটা দায়িত্বের বোঝা বহন করে চলছে সে। সে এখন খুব ক্লান্ত।
গ্লাসে চুমুক দিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল লোকটি।

যেদিন তার বাবা মোজাম্মেল সাহেব মারা যান। তারও একবছর আগে মা ক্যান্সারে মরেন।
বাবার মৃত্যুর দিন ঝড়োহাওয়া হচ্ছিল, তবে ঝড় হচ্ছিল না। বিজলীবাতিও ক্যামরার ফোকাসের মত জ্বলছিল। ‘তবু ক্যানো ঝড় হচ্ছে না’- এ চিন্তায় তার ছোট বোন ঈভা অস্থির- জানালার শিক ধরে দাড়িয়ে।

কিন্তু লোকটি ভাবছে, বৃষ্টির নামার আগেই যদি কাজ সম্পূর্ণ করা না হয়, তাহলে বিপদে পড়বে। তাই সে মৌলানা ডাকা থেকে শুরু করে লাশ ধোয়ান পর্যন্ত সব কাজ একা করছিল। তার বাবা এমন মৃত্যু পেল, কান্নাকাটি করার জন্যও কাউকে পাশে পেল না।
বাবার লাশ ধোয়ানো হল। কাফনও পড়ানো হল। লাশ কে ঘিরে কয়েক মৌলানা কোরান পড়ছিল। সুরমা আতরে পুরা ঘর ম্ ম্ করছিল। ঠিক তখুনি বোধয় আকাশে কাঁপন দিয়ে বৃষ্টি এল। সে রাতে আর লাশ দাফন করা হল না।
পরদিন জানাজা ও লাশ দাফন হল- মসজিদের পাশের কবরে।

বাবার মৃত্যুর পর তার ছোট বোন ঈভার দায়িত্বটা, তার মাথায় এসে পড়ে। অবশ্য সে বড়ভাই, তার উপর এসে পড়বেই। তার আর অন্যকোনো আত্মীয় নেই যে, তাদের উপর এই ভার দেয়া যায়। এমন কি পাড়ার অন্তত ডাকা মামা- খালা- চাচা- ফুফু- বলতেও কেউ নেই।

লোকটি তার বোন কে নিয়ে গভীর জলে পড়ল। এর বাইরে তার না আছে শিক্ষা, না জানে কোনো কাজকর্ম। সে আসলে গভীর জলেই পড়ল।

 

দুই
বাবার মৃত্যুর দিন চারেক পরের সন্ধ্যায় খালি পকেটে শহরের দামী মদের বারে গিয়ে ঢুকল।
.
এরও আগে সে মদ খেতে এখানে বেশ কবার এসেছিল। আজ বারটাকে অপরিচিত লাগছে খুব। মৃত্যুর দুদিন আগেও সে মাকে মাথা ছুঁয়ে ওয়াদা দিয়েছিল- ‘আর কখনো মদের আশেপাশেও যাবেনা।’
কিন্তু একইভাবে মায়ের মৃত্যুর দিন চারেক পর থেকে গিলেই গেল- ননস্টপ।
বহুদিন পর আবার প্রচুর মদ খেল। একদম বাবার মৃত্যুর শোক মিটিয়ে নিয়ে খেল। পকেটে একটা পয়সাও নেই- এটা ভাবতেই তার মন ভারী হয়ে উঠল।

প্রচন্ড পান করার পর টলেটলে সে চেয়ার ছেড়ে উঠল।
কাউন্টারে বিল পে না করেই বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন বেয়ারা এসে দাঁড়াল- ‘পয়সা কই?’
সে তাকে কেয়ার না করে বলল- ‘যা সর্ পয়সা দিব না।’
– ‘তুই না, তোর বাপে…’
বেয়ারার কথা শেষ হবার আগেই মুখে ঘম্ ঘম্ করে এলোপাতাড়ি কয়েকটা ঘুষি দিয়ে দিল সে। বেয়ারার পুরা মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেল। ব্যস্ বারে ততক্ষণে শুরু হয়ে গেল হাঙ্গামা। বেয়ারার পক্ষে আরো কজন বেয়ারা এসে দাড়াল। কিন্তু তার পক্ষে কেবল সে ছাড়া আর কেউ নাই- একা।
মারামারি হল প্রচন্ড। বোতলও ভাঙ্গল কয়েকটা। এর ভেতর কয়েকজন খদ্দের বিল না দিয়ে ছুটে পালাল। এটাই উত্তম- গোলেমালে হরিবোল বলা।
ঘন্টা তিনেক এই বারের পুরা একটা টুল্ দখল করে বসে ছিলেন, তৃতীয় লোক।
তিনজন বেয়ারার সাথে যুবকটি একাই ফাইট করে যাচ্ছে- দম্ ফেলছেনা। বাহ্ খুব ধারালো চোকরা ত- মনেমনে এ কথা বলে, বসা থেকে উঠে হট্টগোলের দিকে এগিয়ে গেলেন লোকটি- ‘এই ছেলে থামো! কিহ্? হয়েছে কি? শান্তি মত মদও খেতে দিবেনা দেখছি, এ্যাঁ?’
বেয়ারা তিনজন তাকে ছেড়ে দিল। সে তখনো একজনের কলার চেপে ধরে আছে।
লোকটি তার দিকে চেয়ে বলল- ‘ছাড়ো, ও কে?’
– ‘না ও আমার বাপ তুলে…’
– ‘হ্যাঁ বলতে হবেনা, জানি। তুমি ও কে ছেড়ে দাও!’
সে তার কলার ছেড়ে দিল। এবার লোকটি তার কাঁধে হাত দিয়ে ধরে এনে পাশের একটা টুলে বসিয়ে দিলেন। বেয়ারাদের দিকে তাকালেন- ‘কত বিল ওর?’
– ‘না স্যার, আপনার থেকে বিল নিতে নিষেধ করেছে বড় ভাই।’
– ‘আমি আমার টা নয়, ওরটা দিব- বল কত?’
– ‘ইয়ে স্যার আটশো টাকা।’
লোকটি পকেট থেকে তেজপাতার মত একতাড়া নোট বের করে একটা হাজারি নোট ধরিয়ে দিলেন, বেয়ারার হাতে- ‘রেখে দাও, পুরোটা!’
বেয়ারাগুলো চলে গেল।
তাকে আস্তে ধীরে দাঁড় করালেন লোকটি। তার একটা হাত নিজ কাঁধে নিয়ে, জড়িয়ে নিয়ে বার থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

তিন. 
মদের গন্ধ পুরো ঘর ভক্ ভক্ করছে। ঈভা নাক চেপে রুমে ঢুকল। রুমের একপাশে চেয়ারে হেলান দিয়ে তার ভাই ঘুমুচ্ছে। হাতে বোতল। গন্ধটা ওখান থেকে আসছে। ঈভার যদিও মন খারাপ হল। আজ তার পরিক্ষা- অন্তত ভায়ের কাছে আজ হলেও একটু পরিবর্তন আশা করেছিল। তবুও নিত্যদিনের ব্যাপার এসব- তার সয়ে গেছে।
‘ভাইয়া!’- ঈভা ডাকল- ‘এই ভাইয়া উঠো! আমি
পরিক্ষা দিতে যাচ্ছিগা- এ ভাইয়া!’
– ‘এ্যাঁ এ্যাঁ কি? কি হল?’
– ‘আমি যাচ্ছি। পরিক্ষা।’ ঈভা লোকটির পা ছোঁয়ে সালাম করল।
– ‘আচ্ছা যা!’
– ‘খাবার রাখা আছে টেবিলে খেয়ে নিও- ক্যামন?’
– ‘হুঁম’- বলেই লোকটি আবার ঘুমিয়ে পড়ার ভান করল। ঈভার এবার প্রচণ্ড ভাবে মন ভাঙল। তার কান্না পাচ্ছিল। সে না কেঁদেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একজন পাড় মাতালের কাছে সে বোধয় আরো বেশকিছু আশা করেছিল।

ঈভা চলে যাবার পর লোকটি চোখ মেলল। এই মেয়ে কীভাবে যে উকিলাতি করবে সে ভেবেই কূল পাচ্ছেনা। এমন আবেগ থাকলে কি কেউ উকিল হতে পারে? উকিল মানে ডাহামিথ্যে বলা- আদালতে চোখেচোখ রেখে মিথ্যা বলতে পারা। উকিলাতি একট আর্ট। য্যানো জজসাহেবও মিথ্যা শুনে মনেমনে বলে উঠে- ‘ওমাই গড়! এত বড় জানোয়ার! এরম মিথ্যা?’

চার.
বিকেল দুটা বাজে।
ঈভা এখনও বাসায় ফিরেনি। লোকটি বিষণ্ন মনে বারান্দার টি টেবিলে এলিয়ে পড়ে আছে। হাতে দামি ফেন্সি মদ। টেবিলে মদের গ্লাস। মন খারাপ তার। কি সব দুঃখ তার ভেতর একটা দেয়াল বয়ে বেড়ায়।

এরম একসময় মদ খেয়ে সে ঘরে ফিরত। ইভা তখন ক্লাস এইটে পড়ে। সারাদিন স্কুলশেষে ঘরে ফিরে সে একা পড়ে থাকে।
ঘরে ফিরতেই তাকে বেত নিয়ে শাসন করত ঈভা- ‘তুমি মদ খেয়ে ঘরে এসেছ? মাতাল একটা। লজ্জা করেনা তোমার?’
তখন সে বেহেয়া অবস্থায় মাথা নাড়ে- ‘বেশী খাইনি ত, এই একটু খেয়েছি মাত্র।’
ইভা রেগে যায়- ‘মুখেমুখে তর্ক করা এখনো যায়নি না তোমার?’

য্যানো মা তার বড় ছেলে কে শাসন করছে। ব্যাপারটা সে খুব ফিল করে। ইভাও হয়ত বুঝে নিয়েছিল তখন, মায়ের আসন দখল করতে হবে তাকে। এই যখন ঘটনা, তখনো বড়ভাই হিসেবে নিজেকে সে কখনো বাবা ভাবতে পারেনি। মা বাবার পর ইভা-ই তার একমাত্র শাসনকর্তা। বাবা মা বেঁচে থাকাকালীন সে অনেকবার, পাড় মাতাল হয়ে ঘরে ফিরেছে। রাতে অবশ্য মা ঠিক ইভার মতই বকত। ইভা বোধয় এসব ওখান থেকে শিখেছে। মা তাকে বেত দিয়ে শাসাত, কিন্তু মারত না। ইভাও তেমন শাসাত, মারত না মোটেও।
‘ভাইয়া- তুমি কি একটুও ভালো হবে না?’- একথা ইভা বলত তখন। মা যেমনটা বলত,- ‘তুই কি একটুও ভালো হবিনা, বাবা?’
ভেবেই সে হেসে উঠে। মনেমনে বলে- হোয়াট এ কম্বিনেশন!
– ‘এ কি তুমি হাসছ?- তোমার কি লজ্জাবোধ নেই?’
– ‘না মা, নেই?’
– ‘হোয়াট এ রাবিশ! মা কোথায় এখানে? মদ খেয়ে তোমার মাথা গেছে ভাইয়া।’- ইভা রেগে বলে।
সে হাসতে থাকে। ইভা কপাল কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বলে- ‘ওফ্ খোদা, এই মাতাল নিয়া আমি কই যাবো? পথ দেখাও মাবুদ!- এই বলে ইভা গটগট করে চলে যায়। যেতে যেতে বলে- ‘হাতমুখ ধুয়ে আসো, ভাত খাবে।’
সে একবার ফিক করে হাসে। ইভা পেছনে ফিরে বলে- ‘আয় আল্লা!’ তারপর দ্রুত চলে যায়।
আজ সেই ইভা কত বড় হয়ে গেল। কত নিশ্চুপ আর নরম হয়ে গেল।
বাবার মৃত্যুর সময় ঈভার ছিল নয় বছর। তার ছিল বাইশ। বলতে গেলে তারা উভয়েই ছোট।

পাঁচ
– ‘আজ থেকে দু’মাস আগের ঘটনা- মনে পড়ছে কিছু?- একেেক? এবার পালাবার পথ নেই ত আপনার।’ লোকটির মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসল ইন্সপেক্টর। তার চোখগুলো জ্বলছে। সাথে ছয়জন পুলিশ দরজায়। সবার অস্ত্র লোকটির বুকে তাক্ করা।
– ‘ওয়াও! পুরো দুমাস পর… আপনারা কই আছিলেন, বস্?’ লোকটি ইন্সপেক্টরের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
– ‘হাহাহা… সেই যা হোক এবার ত আপনি মেনে নিচ্ছেন তাইলে এই খুন আপনিই করেছেন?’
– ‘আমি আবার না বলেছিলাম কবে? উঁম? হাহাহা…’
– ‘হেসে লাভ নেই ব্রো। এবার আপনার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ-প্রমান পেশ করেছে- তাদের সবাই আপনার সহকর্মী।’
লোকটি তখনও হাসছিল।
ইন্সপেক্টর এবার আফসোসের সূরে বললেন- ‘আপনাকে সারেন্ডার করার জন্য বলেছিলাম- আহা!’ তারপর বসা থেকে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দৃঢ়কন্ঠে বললেন- ‘গণমানুষের বিশিষ্ট নেতা সামাদ মিয়ার হত্যা মামলায় আপনাকে গ্রেফতার করা হল। এ্যারেস্ট হিম!’
পুলিশের গাড়ির ইঞ্জিন চালু হল। লোকটি তার বাড়ির দিকে চেয়ে আছে।

চলবে …

Facebook Comments