Saturday, January 22, 2022
Home > ভ্রমণ > সমুদ্র জলে ক’জন মুসাফির পর্ব-৩

সমুদ্র জলে ক’জন মুসাফির পর্ব-৩

Spread the love
আতিক ফারুক: অতঃপর তাদের আগমনে আমার কুঁচকে যাওয়া ভ্রুদ্বয় যেনো সমান হলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফাহিম আর ফজলে রাব্বির সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলাম। ট্রেনের টিকেট কিনে বসে রইলাম ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষায়। খানিক পরেই জীর্ণশীর্ণ পোশাক পরিহিত এক ৭ বছরের ছেলে তিনটা এক লিটারের বোতল আর কিছু বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে এসে বললো,’ভাইয়া, পানি কিনবেন?’ রাতে খাবারের জন্য যেহেতু কিছু কিনে নেয়া প্রয়োজন, তাই এক লিটারের একটি পানির বোতল আর কিছু বিস্কিটের প্যাকেট নিলাম। ছেলেটির পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে এবং কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে কোনো দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিছুটা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,’ভাইয়া, তোমার নাম কী? বাড়ি কোথায়?’সে অবনত মস্তকে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো,’ভাই, আমার নাম সোহেল, বাড়িঘর নাই।’তার দিকে কিছুটা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলাম,’ মানে? তোমার আব্বু আম্মুর সাথে থাকো না?’ এবার তার চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরতে থাকলো,আর বলতে লাগলো, ‘আমার মা-বাবাও নাই। ছোটকাল থেইক্কা এনই বড়ো অইছি। কিছুদিন ধইরা এই বিস্কুট আর পানির বোতল বেইচ্ছা ভাত খাই।’
তার কান্নামিশ্রিত কথাগুলো শুনে আমারও কেমন যেনো চোখ ছলছল করে উঠলো। রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে অতিরিক্ত কিছু টাকা হাতে গুঁজে দিলাম। এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক।এমন জীর্ণশীর্ণ কিংবা ছেড়াফাঁড়া পোশাক পরে ঢাকা শহরের অলিগলি, রাস্তাঘাট, হাঁটবাজার বা ফুটপাথের কিনারায় কেউ বা ডাস্টবিনের পাশেই রাত অতিবাহিত করে। আবার কেউ ময়লার স্তুপ থেকে বেছে বেছে ভালো খাবারগুলো সংগ্রহ করে খায়। কখনো বা নির্ঘুম রাত কেটে যায়। রাস্তাঘাটে বের হলে টের পাওয়া যায় তাদের আনাগোনা। বাংলাদেশে পথশিশুদের সংখ্যা হাজারের কোটা অতিক্রম করবে। বিশেষ করে ঢাকায় তাদের চলাচল সীমাতিরিক্ত। যখন আমরা শহরের রাস্তাঘাট বা ফুটপাথের কিনারা দিয়ে হাঁটাচলা করি। হঠাৎ কেউ এসে হাত টেনে ধরে, পথের সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। কায়মনোবাক্যে বলতে থাকে,’ভাইয়া টাকা দেন আইজ সারাদিন কিচ্ছু খাই নাই।’ কেউ হয়তো তাদের অনুরোধ গ্রহণ করে কেউ বা দূরদূর করে তাড়িয়ে দেয়। সামান্যতম মনুষত্ববোধ থাকলে হয়তো কেউ তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করবে না। কিন্তু, যারা অমানবিক আচরণ করেন তারা? আমাদের মতো তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন নেই। তারা জানে না মায়ের আদর কেমন! বাবার স্নেহ কেমন! তাদের এমন কেউ নেই মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেবে। মায়ের শূন্যতা পূরণ করবে। এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় হলো, তাদের সাথে নম্র আচরণ করা সাধ্যানুযায়ী একবেলা খাবার খাইয়ে দেওয়া, পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া। এসব বিষয়ে সমাজের বিত্তবানদের জোড়ালোভাবে উদ্যোগ নেওয়া যথাযথ মনে করি আমি। দিনশেষে হয়তো ক্ষুধার্ত পেটে তাদের মুখ থেকে অযাচিত কথা অকপটে বেরিয়ে আসে। কতো রাত রাত নির্ঘুম কেটেছে তা জানা নেই। কতো দিন অনাহারে কেটেছে তার ইয়ত্তা নেই। কতো রাত কেটেছে ঐ আস্তাকুঁড়ের কিনারায়। কতোদিন কেটেছে বিত্তবানের লাথি লেগে গায়। একমুঠো অন্ন দাও মোর উদর পূর্ণ করায়। আমি এক পথশিশু এছাড়া কিছু নয় এই আমার পরিচয়।
(চলবে)
Facebook Comments