বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২
Home > ভ্রমণ > সমুদ্রজলে ক’জন মুসাফির ( ৪র্থ পর্ব)

সমুদ্রজলে ক’জন মুসাফির ( ৪র্থ পর্ব)

Spread the love
 তরুণ লেখক 
ট্রেন ছুটে চলছে আপন গতিতে সঠিক গন্তব্যের উদ্দেশে। বাংলাদেশি ট্রেনগুলো কি অদ্ভুত ধরণের! লোকে গাদাগাদি। নিশ্বাস ফেলানোর জায়গাটুকুও অবশিষ্ট থাকে না। কেউ কেউ তো বড়ো বড়ো ড্রামভর্তি জিনিসপত্র নিয়ে ওঠে। বস্তাভর্তি ডেগচি নিয়েও ওঠে। এই হলো ট্রেনের ভেতরকার অবস্থা। অন্যান্য যাত্রিদের যে এতে প্রবল সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে সেটা যেনো কারো দেখার প্রয়োজনীয়তা নেই। বাঙ্গালী বলে কথা! যে যার স্বার্থরক্ষায় মত্ত।
নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় মনটা প্রফুল্ল লাগছে। কুয়াশাচ্ছন্ন রাত। ট্রেনের ছোট্ট জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি বাহিরে। চাঁদের ঝাপসা ক্ষীণ আলো। দূর কোথাও দিগন্তজোড়া বিস্তৃত ফসলের মাঠে ছোট্ট কুলঙ্গি। মোমবাতির ঝাপসা আলোয় কেউ কেউ রাত্রি যাপন করছে। এসব দৃশ্য মনকে সত্যিই প্রফুল্লিত করে। বিশাল আকাশের চাঁদটা কুয়াশায় ঘেরা। ফাহিমের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। ফাহিম বলল, কি ব্যাপার! অনেকদিন তো হলো আমাদের দেখা সাক্ষাত নেই। আজ সফরে যাওয়ার উপলক্ষে তিন জন একত্রিত হলাম। বাহ্! ভাবতেই ভালো লাগছে। দীর্ঘ সফর। তিনজন পথিক। মনে হচ্ছে দূর কোথাও আমরা হারিয়ে যাচ্ছি।
স্টেশন থেকে বিস্কিট কিনে ছিলাম। রাত প্রায় একটা বেজে গেছে। ফজলে রাব্বি ‘নাটি’ বিস্কিটের প্যাকেটটা নিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। তিনজন মিলে কুটকুট করে খেতে খেতে গল্পে জুড়ে গেলাম। অনেকদিনের জমিয়ে রাখা না বলা কথাগুলো আজই সব মুখ ফুটে বলার জন্য তিনজনই উদগ্রীব হয়েছিলাম। বন্ধুরা একসাথে আড্ডায় বসলে কত যে রঙবেরঙয়ের কথা আবিষ্কার হতে থাকে সেটা কেউ বন্ধু আড্ডায় না বসলে বুঝবে না।
আচমকা, একজন লোক এসে আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত এক আবদার করে বসল। লোকটার স্ত্রী অসুস্থ! কোথাও জার্নিতে গেলে নাকি জানালার কাছেই বসতে হয়, নাহয় বমি করে দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু, ফজলে রাব্বি যেন একদম হাটু গেড়ে বসে আছে, সে কোনভাবেই জানালার পাশ থেকে উঠবেনা। লোকটার দরদমাখা কথাগুলো যেন আমাকে ক্রমশ বেদনার্ত করে তোলছে। ফজলে রাব্বিকে অনেক বুঝানোর পরও কোনো কাজ হল না।পরিশেষে লোকটার স্ত্রীর বেহাল দশা দেখে উঠতে বাধ্য হল। কিন্তু, কাজের কাজ কিচ্ছু হল না। কিছুক্ষণ আগেই ফজলে রাব্বি জানালাটা লাগিয়ে দিয়েছে। এখন কোনোভাবেই জানালা খুলছে না। আমি সহ অনেকেই চেষ্টা করলাম, কাজ হল না।
পরিশেষে অগত্যা লোকটি তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়েই অন্য সিটে গিয়ে বসল। তিনজন মিলে আবারো গল্পগুজবে মেতে উঠলাম। বাংলাদেশের চলমান ইস্যু এবং ব্যক্তিগত অবস্থা সম্পর্কে অনেক আলাপআলোচনা হলো। সবার চোখে নিভু নিভু ভাব চলে এসেছে। সিটে হেলান দিয়ে চোখে ঘুম আনার চেষ্টা করলাম।
ইতোমধ্যে ভৈরব স্টেশনে ট্রেন এসে পৌঁছেছে। চায়ের কাপের টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙল। গরম চায়ের উষ্ণ ধোঁয়া উড়ে উড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূর কোথাও। নিষ্প্রভ আলোয় কেউ কেউ বসে বসে ঝিমুচ্ছে আবার কেউ কেউ স্টেশনের কোনো এক ফাঁকা জায়গায় গুটিশুটি মেরে বসে আছে। আবার কেউ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নাতিশীতোষ্ণ রাতে যদি একটু গরম চায়ের চুমুকে শরীরটাকে চাঙ্গা করা যায় তাতে সমস্য কী! তিন কাপ চা নিয়ে চুকচুক করে গিলে ফেললাম মুহূর্তে।
মাত্র ভৈরব! আরো কতো পথ বাকী আল্লাহ মা’লুম। আজকের অনুভূতিটা অন্যদিনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, আমি তো এক নিভৃত পথচারী। কিন্তু, আজ প্রিয় বন্ধুদের কাছে পেয়ে একাকীত্বটাকে ঢাকা গেল। ফুরফুরে মেজাজে আবার ট্রেনে গিয়ে বসলাম। সিটে হেলান দিয়ে আবার অথৈ সমুদ্রে হারিয়ে গেলাম। মুয়াজ্জিনের আল্লাহু আকবার ধ্বনি কানে ভেসে এলো। চোখ কচলাতে কচলাতে আড়মোড়া ভাব কেটে দৃষ্টি দিলাম ট্রেনের বাহিরে। বুঝলাম ফজরের আজান হচ্ছে। তার কিছুক্ষণ পরই আমাদের গন্তব্যে এসে ট্রেন পৌঁছল।
চলবে…
Facebook Comments