Saturday, January 22, 2022
Home > গল্প > সব ফুল বাগানে ফোটে না ।। হিমেল হক

সব ফুল বাগানে ফোটে না ।। হিমেল হক

Spread the love

জাফর দাঁড়িয়ে আছে জানালাটা ঘেঁষে, অনেকটা কুঁজো হয়ে। জানালা দিয়ে রোদ এসে জাফরের চোখেমুখে লাগছে। বাবা বিছানাটায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে জাফরের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছেন আর ক্রমাগত পা দোলাচ্ছেন।
‘রাস্তার কুত্তারওতো শরম লজ্জা আছে,তোর মধ্যেতো সেটুকুও দেখছি না!’
বাবার হঠাৎ ধমকে জাফর চমকে উঠেছে।
‘সামান্য একলিটার দুধ সেটাও ঠিকমতো আনতে পারলি না। তোর বদলে যদি আমি একটা কুত্তা পালতাম,তাহলেওতো আমার উপকার হতো!’
জাফরের খুব ইচ্ছে হচ্ছে সত্যটা বলতে। বাজারে দুধ শেষ হয়ে গেলে দোকানদার চার-পাঁচ টাকা বেশি নিতেই পারে তার জন্য এতো চিৎকার-চেচাঁমেচির দরকার কী? জাফর জানে এগুলো বললে আরও ঝামেলা বাড়বে,খামখো ঝামেলা বাড়ানোর দরকার কী!
‘কী হলো,মুখ দিয়া কথা বাইর হয় না,হারামির বাচ্চা। টাকা দিয়া বন্ধুবান্ধব নিয়া ফূর্তি করছোস?’ আচমকা উঠে এসে বাবা জাফরের তলপেটে প্রচণ্ড জোরে লাথি বসিয়ে দেয়। অমানুষিক যন্ত্রণায় জাফর পেটে হাত দিয়ে বসে পড়ে। জাফর বাবার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে,যেনো বিশ্বাসই করতে পারছে না কাজটা কী হলো!
মা এসে জাফরকে ঠেলে বাইরে বের করে দেয়। ভিতর থেকে বাবার গজগজানি শোনা যাচ্ছে,জাফর দ্রুত সরে পড়ে। বাইরে প্রচণ্ড গরম,দশ কদম হাঁটতেই দম বেরিয়ে যায়। ক্ষিধেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে,তাছাড়া গায়ের জামাটাও পাল্টানো দরকার,ঘামের কটু গন্ধ আসছে। জাফর খাবার জায়গা খুঁজছে,কোথায় যাওয়া যায়। কলাবাগান যেতে পারে বড় আপার বাসায়। এখান থেকে অবশ্য হাঁটা পথে অনেকখানি,তবে জাফরের সমস্যা হবে না। হেঁটে অভ্যাস আছে।
জাফর যখন বড় আপাদের বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো,তখন ও ঘেমে নেয়ে একবারে শেষ। দোতালায় সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই জিভ বেরিয়ে আসছে। দু’তিনবার বেল টেপার পর দরজা খুলে দিলো বড় আপার শ্বাশুরি। জাফরকে দেখে এমনভাবে তাকাল যেনো ফকির এসেছে ভিক্ষা চাইতে। জাফর ভিতরে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসতেই বড় আপা এলো। মনে হয় রান্না করছিলো। ক্লান্ত চেহারা,শাড়ি দিয়ে হাত মুছছে।
‘কীরে, তুই কী মনে করে?’
‘এই তো এলাম,অনেকদিন আসা হয়না। দুলাভাই কই?’
‘ও একটু বাইরে গেছে। তুই একটু বস,আমি রান্নাটা সেরে আসি।’
‘না,আজ উঠি। অন্য সময় আসবো।’
‘যাবি কেনো? থাক দুপুরে খেয়ে যা!’
‘আজ না! আজকে একটু কাজ আছে। থাক তাহলে যাই।’
প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকার পরও জাফর খাবারের কথা বলতে পারল না। বড় আপার চোখে কী যেনো ছিলো,বিরক্তি নয় হতাশা। বড় আপার চোখের দিকে তাকিয়ে জাফর কিছু বলতে পারলো না। থাক,একদিন না খেলে মানুষ মরে না। সকালের চেয়ে রোদ এখন গায়ে লাগছে বেশি। জামাটা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। জাফর খুঁড়িয়ে হাঁটছে,পায়ের তলায় জ্বালা করছে। জুতাটার তলা মনে হয় ক্ষয়ে গেছে। রোদটা ভীষণ চড়ে আছে,আর হাঁটা যাচ্ছে না। কোথাও বসা দরকার। হঠাৎ পিছন থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে রাশেদ এলো। রীতিমত হাঁপাচ্ছে,কী যেনো বলবে কিন্তু বলতে পারছে না।
‘ওই,কানে শোনস না,কখন থেকে ডাকছি তোকে!’
‘আরে গাড়ির যে শব্দ,শুনব কীভাবে? কী বলবি বল।’
‘তুই যে আমাকে একটা পাণ্ডুলিপি দিয়েছিলি মনে আছে?’
‘কই? কবে?’
‘আরে গর্দভ,গত মাসে দিলি না। আমরা যে ট্যুরে গেলাম,তখন নিলাম না।’
‘ও! ওটা তো এমনি ডায়রিতে লিখেছিলাম। ক্যান,কি হইছে?’
আমি ওটা একটা প্রকাশনীতে দিয়েছিলাম। গত সপ্তাহে ওরা ফোন করে যেতে বললো,তোকে নিয়ে যাবো কিন্তু তোরই তো কোন খোঁজ নাই। ওরা ওটা ছাপতে চাইল,আমি আর না করি নাই? দোস্ত,ভালো করি নাই।
জাফরের দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। জুতাটার ক্ষয়ে যাওয়া তলা দিয়ে পায়ে প্রচণ্ড তাপ লাগছে।
‘আজকে ওদের অফিসে গিয়ে বইটা আনতে বলেছিলো। একদিন তোকেও সাথে নিয়ে যেতে বলেছে।’
রাশেদ ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে। কাভারের উপর চমৎকার একটা ছবি। হলুদ জমিনের উপর আঁকা। একটা ছেলে তার বাবার হাত ধরে হাঁটছে। জাফর কাভারের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আহা! ও যদি এভাবে বাবার হাত ধরে হাঁটতে পারতো। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চায়, জাফর কপালের ঘামে চোখের জলকে আড়াল করে ফেলে।
‘নে দোস্ত,বইটা রাখ। আর তৈরি থাকিস,একদিন সময় করে যেতে হবে,প্রকাশক সাহেব বারবার বলেছেন।’
রাশেদ ফিরে যাবার জন্য ঘুরে আবার কেনো জানি ফিরে আসে।
‘আরে দোস্ত,আসল কাজটাই তো হয় নাই! প্রকাশনী থেকে দশ হাজার টাকা দিয়েছে,বইয়ের কাটতি নাকি ভালোই। আর, কী জানি চুক্তি-টুক্তির ব্যাপারে ওখানে গিয়ে কথা বলতে বলেছে।’
রাশেদ জাফরের পকেটে টাকাগুলো গুঁজে দিয়ে দ্রুত চলে যায়।
আকাশে মেঘ জমেছে। কুচকুচে কালো। যেকোনো সময় নেমে যেতে পারে অঝোর ধারায়। জাফর বইটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পকেটে যথেষ্ট টাকা আছে কিন্তু কেনো জানি খেতে ইচ্ছে করছে না। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাস্তা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। জাফর তুমুল বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা দিয়ে একা হাঁটছে। আশেপাশের লোকজন অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে। বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে জাফর বইটা শার্টের মধ্যে গুঁজে নিয়েছে। বইয়ের শক্ত মলাটে জাফরের পেটে খোঁচা লাগছে। জাফরের খুব ইচ্ছে করছে ওর বাবাকে বলতে,বাবা আমি একেবারেই রাস্তার কুত্তা নই। এই দেখ,আমার বই বের হয়েছে,তোমার ছেলের বই!

Facebook Comments