রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২
Home > বই আলোচনা > সত্যিই বিষাদ ছুঁয়েছে মন : রুবাইয়া জান্নাত

সত্যিই বিষাদ ছুঁয়েছে মন : রুবাইয়া জান্নাত

Spread the love

রুবাইয়া জান্নাত : প্রচ্ছদের কথা না বললেই নয়; প্রচ্ছদ শিল্পী কাজী যুবাইর মাহমুদ বইটির প্রচ্ছদ এতোটা সুন্দর করে তৈরি করেছেন যা প্রথম দেখাতেই পাঠকের দৃষ্টি কেড়ে নিবে বলে আমার বিশ্বাস। লেখক ১১২ পৃষ্ঠার বইটি মোট বিশটি পরিচ্ছেদে মলাটবদ্ধ করেছেন। প্রতিটি পরিচ্ছেদে উঠে এসেছে একেকটি নতুন ছিদ্রান্বেষণ। ঝরঝরা শব্দচয়ন ও বুক বাইন্ডিং মন কেড়েছে আমার। মন চাইছে সবার হাতে বইটি নিজহাতে তুলে দেই কিন্তু সম্ভব না বিধায় আমার পাঠোপলব্ধি তুলে ধরছি।

রিভিউ : লেখক আমিন ইকবাল সমাজের আইডল হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন সুমাইয়া সুলতানা সায়মাকে। পুরোপুরি ইসলামী পরিবার ও পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোরী। সদ্য রাফিনের সাথে ডিভোর্স হয়ে যায় সায়মার। ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর দিয়েছিলো হাসিমুখেই, বিষাদ মনে থাকলেও মানবরূপী অমানুষের হাত থেকে মুক্তি পেতে।

ডিভোর্স হওয়ার পর মানসিক বিপর্যয় ঘটলেও কিভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়োগ করতে হয়, সেটা লেখক বুঝিয়েছেন সায়মার মাদ্রাসায় খুসুসি জামাতে ভর্তি হওয়া দিয়েই। সায়মার মনে দাগা দিতে শুরু করে ডিভোর্সি মেয়ের হতাশা। সমাজ, লোকলজ্জা, ছাত্রীবোনদের তিরস্কারের ভয় মনে রেখে বিয়েরতত্ত্ব গোপন রেখে টেনশন ঝেড়ে ফেলে মনযোগী হতে হয় পড়াশুনায়।

সায়মার প্রাক্তন ট্রাজেডির কথা মনে পড়লে ছাদে অথবা বালিশে ঠাঁই হয় দু’চোখের। আত্মসম্মানবোধ তাড়া করায় কিভাবে সবার কাছে হাসিমুখেই কথা বলতে হয় সেটি আমিন ইকবাল বুঝিয়েছেন সায়মার চরিত্রের প্রারম্ভে। এতবড় ট্রাজেডি একটি মেয়ের জীবনে চলে গেলেও পরীক্ষার ফলাফলে ক্লাসে গুরুত্ব বেড়ে যায় সায়মার। এতদসত্বেও মাঝে মাঝে মনে পড়ে অতীতের বিষাদ। জীবনের খেলাঘরে উত্থান-পতনের কাব্যমালা।
নিকটাত্মীয় না হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে আপন হয়ে পড়ে কিছু বিশেষ মানুষ, সেটি আমিন ইকবাল বুঝিয়েছেন ঢাকায় পড়ুয়া আরিফের মাধ্যমে। যার দ্বারা উচ্চতর বিভাগ দাওরায়ে হাদিসে ঢাকায় অধ্যয়ন করার সুযোগ হয় সায়মার। লেখনীতে উঠে এসেছে কুরআনের একটি বিশেষ কোর্সের কথা। উঠে এসেছে খাছ পর্দার সহিত কিভাবে ক্লাস করানো হয় মাদ্রাসায় সে ব্যাপারে।

সায়মাকে আরিফের সহযোগিতায় ঢাকায় নামীদামী মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিসে ভর্তি করানো হয়। লেখক আমিন ইকবাল বুঝিয়েছেন গ্রাম্য মেয়ে শহুরে পরিবেশে হঠাৎ তাল মেলাতে না পারলেও আস্তে আস্তে অপরের মানসিক সাপোর্টে কিভাবে মানিয়ে নিতে হয় নিজেকে। সাথে সাথে লেখক মহিলা মাদ্রাসার কড়াকড়ি নিয়ম, দারোয়ানদের হেয়ালিপনার কথাও তুলে ধরেছেন।

আমিন ইকবাল মহামূল্যবান বইখানায় তুলে ধরেছেন কিভাবে মাদ্রাসায় নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে কিছু ছেলে-মেয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। আবার সায়মার চরিত্রে উল্লেখ করেছেন কিভাবে মাদ্রাসার নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অধ্যবসায়ী হতে হয়।

রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সাথে সাথে ভ্রমণ কাহিনী। আবার একটু অসচেতন হলে কিভাবে বিপদে পড়তে হয় তাও উল্লেখ রয়েছে। আরো উল্লেখ রয়েছে পর্দানশিন মেয়ের সচেতনতা। সবচে’ ভালো লেগেছে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে পাশাপাশি বসে থেকেও কিভাবে সম্ভ্রম ও ধর্মের দিকে তাকিয়ে নিজেকে নিবারণ করতে হয়, সেদিকটি।

আবার মাঝখানেই আমিন ইকবাল উল্লেখ করেছেন মাদ্রাসায় বাংলা সাহিত্য চর্চাক্ষেত্র নিয়ে। রয়েছে প্রকাশকদের হেয়ালিপনা ও সাম্প্রতিক বিষয়াদি। আবার উঠে এসেছে শিক্ষকের খেদমতে ছাত্রের আঞ্জাম। কিভাবে পর্দার আড়াল থেকে একটি মেয়ে তার আব্রু ঢেকে গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে কথা বলতে পারে সেটিও রয়েছে প্রিয় বইটিতে। লেখক প্রমাণ করে দিয়েছেন ডিভোর্স থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়াশুনায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে মনের মতো দ্বীনি জীবনসঙ্গী পাওয়া যায়।

পরিশেষে আমিন ইকবাল বুঝিয়েছেন কিভাবে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি একটি পবিত্র সম্পর্কে বিনষ্ট করে দেয়। বুঝিয়েছেন কিভাবে আজকাল উপকার করার প্রতিদান পাওয়া যায়! আসলে পৃথিবী ঠিকই আছে কিন্তু সময়ের বদৌলতে হারিয়ে যায় টান-ভালবাসা, এটাই চরম বাস্তবতা।

নিঃসন্দেহে বইটি পাঠক প্রিয়তা পাবে বলে আমি আশা করছি। সাথে সাথে আমার বুকশেলফে নয়, টেবিলের প্রিয় বইয়ের তালিকাভুক্ত হয়ে পড়লো আমিন ইকবালের বিষাদ ছুঁয়েছে মন। পাঠ শেষে এটাই বলতে পারি যে, সত্যিই বিষাদ ছুঁয়েছে মন।

বই পরিচিতি :
বইয়ের নাম : বিষাদ ছুঁয়েছে মন
লেখক : আমিন ইকবাল
প্রকাশক : নজরুল ইসলাম (আশরাফিয়া বুক হাউজ)
মলাট মূল্য : ১৪০ টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১১২
প্রচ্ছদ : কাজী যুবাইর মাহমুদ
বিষয় : একজন ডিভোর্সি মেয়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন থেকে সরে গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা ও তার সফলতার গল্প।
অনলাইন পরিবেশক : রকমারী ডটকম

Facebook Comments