রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২
Home > গল্প > রহস্যগল্পঃ “মুখোশ”

রহস্যগল্পঃ “মুখোশ”

Spread the love

লেখকঃ তোফাজ্জল হোসেন।

ট্রিগার চাপার শব্দে আমার হুশ ফিরে আসে, পৃথিবীটা খুব অপরিচিত মনে হচ্ছে, যেন এক হাজার বছর পর আমি আবার পৃথিবীকে দেখছি। চারিদিকে প্রচুর গাছপালা, আমি মাটিতে পড়ে আছি, উপরে গাছের পাতা ছেদ করে উঁকি দিচ্ছে রৌদ্রের প্রখর শিখা। সব কিছু কেমন ভুলিয়ে যাচ্ছে, ব্রেইনে খুব কষ্ট হচ্ছে, মনে করতে পারছি না কিছুই। কীভাবে আসলাম এখানে? আমি কোথায়, উঠে দাঁড়াবো সেই শক্তি আমার গায়ে নেই, কী হয়েছে আমার? মাটি যেন আমাকে খামছে রেখেছে, কিছুতেই ছাড়াতে পারছি না নিজেকে। -বস আসবে তুই ওদিকে খেয়াল রাখ। -ওকে আমি এদিকে আছি। -জাফর তুই পিছন দিকে যা। -আচ্ছা ভাই আমি পেছনে যাচ্ছি। -শিপন তুই বনের বাহিরের দিকে নজর রাখবি। -ঠিক আছে ভাই। কথাগুলো আমার কানে স্পষ্ট বাতাসের সাথে ভেসে আসছে, আমি অনুভব করতে পারছি আটটি পায়ের চরদিকে দৌড়ে যাবার দৃশ্য। কিন্তু অবলোকন হয়নি একটি মানুষও! তাহলে কি আমি এখন চোখ খুলে তাকানোর শক্তি ও হারিয়ে ফেলেছি? হ্যাঁ, আমি এখন তাকাতে পারছি না, খুব রোদ যার কারণে আমার গা একদম একশ তিন ডিগ্রি উত্তপ্ত। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছি না, আজ আমি পৃথবীর সবচেয়ে অসহায়, সম্বলহীন এক প্রাণি, যার নেই দাঁড়াবার ক্ষমতা। আরও একটা গুলির শব্দ! শব্দের তীব্রতায় আমার চোখ খুলে গেছে, বাতাসের সাথে সমস্ত পাখিরাও একদম চুপ হয়ে গেছে, এই কিছুক্ষণ আগেও ঝিরঝির বাতাস বইছিল, পাখিরা মন খুলে গান করছিল, এই এক মুহূর্তের ব্যবধানে সব একেবারে স্তব্ধ। এবার মনে হয় আমার উঠে বসার শক্তি সঞ্চয় হয়েছে, বসার চেষ্টা করতেই আবিষ্কার করলাম আমার হাত পেছন থেকে বাঁধা! এক মুহূর্ত আমাকে মনে করিয়ে দিল সব, এখন আমার কাছে একদম স্পষ্ট কেন আমি এখানে পড়ে আছি। আমি এখানে তো জারিফ আর রদফিন কই? ওদের কোথায় নিয়ে রাখা হয়েছে? দুজনই ঠিক আছে তো! নাকি দুটো ট্রিগার লক্ষ্যস্থল ছিল রদফিন আর জারিফ? ধুর আমি এসব কি ভাবছি, ওদের কিছু হতেই পারে না। আমি বেঁচে থাকতে আমার বন্ধুদের কিছু হতে দিতে পারি না। কাদের সাহেব এর লোকেরা আমাদের ব্রীজ থেকে তুলে নিয়ে আসছে, সন্ধ্যাবেলা আমরা তিন বন্ধু ব্রীজে বসে ঘটনার খোলস ছাড়াচ্ছিলাম, তখন কিছু লোক এসে আমাদের দেখে বলল, ‘ঐ দেখ শয়তান গুলো এক সাথে বসে আছে।’

আমি সাদাফ, ৯ম শ্রেণিতে পড়ি, রদফিন আর জারিফও একই ক্লাসে, আমরা ক্লাস ৪র্থ থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড। সবার বেস্ট ফ্রেন্ড হয় একজন, কিন্তু আমরা তিনজন একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড। কাদের সাহেব আমাদের এলাকার বিত্তবানদের একজন, খুব প্রতাপশালীও বটে, যদি ও ধন-সম্পদের জন্যই তার এত ক্ষমতা, এলাকার রক্তে-ঘামে ফলানো ফসল সব এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে কিনে নেন তিনি, না কেউ কিছু বলতে পারে, না পারে কেউ কিছু করতে। কিন্তু একদিন আমাদের সামনে প্রকাশ পেল নতুন একটি অধ্যায়, যার ব্যাপারে কল্পনা করা তো দূরের কথা, মাথায় এমন কিছু উঁকি দেবে তাও সম্ভব না। ব্যপারটার পুরো খোলস প্রকাশ হয় জারিফের সামনে। জারিফ একদিন দেখে কাদের সাহেবের ক’জন কর্মচারী কাঁচা মালের সব টাগার থেকে তিনটি টাগার খুব ভাল যত্নের সাথে আলাদা করে রাখলেন, যদিও ব্যপারটা নজর কাড়ার মত না। কিন্তু তাদের কথোপকথন বিষয়টা একদম স্পষ্ট করে দেয়। -শুন, গত চালানে ধরা খেতে খেতে বেঁচে গেছিস, এবার খুব সাবধান। -জ্বী বস, এবার কোন ভুল হবে না। -কোথায় পৌঁছাবি মনে আছে তো। -জ্বী বস, একদম ঠিকঠাক মতই পৌঁছে দেব। -গিয়ে কাদের সাহেবেরর সালাম জানাস। -ওকে বস। কাদের সাহেবের ম্যানেজার এতক্ষণ তার কর্মচারীদের কাজ গুছিয়ে দিচ্ছেন, জারিফকে ছোট মনে করে হয়ত কোন তোয়াক্কা করে কথা বলেনি। জারিফ এসে আমাদের কাছে ঘটনা খুলে বললে আমাদের কৌতুহল জাগে বাক্সে কী আছে জানার, তখনই আমরা বেরিয়ে পড়ি কাদের সাহেবের গোডাউনের দিকে। বিকাল পাঁচটার দিকে আমরা গোডাউনের গেটে যেতেই দেখি তিন-চার জন মিলে তিনটি টাগার(বাক্স) নিয়ে গাড়ীতে তুলছেন, পিছু নেব ভাবলেও সম্ভব না, কারণ গাড়ীর সাথে দৌড়ে সম্ভব না, আর আমাদের কাছে কোন গাড়ীও নেই। ফিরে যেতে হবে, আর হয়ত জানাও হবে না বাক্সে কী ছিল, সব মাটি হয়ে গেল। গাড়ী ছাড়ার জন্য একজন সামনে ড্রাইভিং সিটে এসে বসছেন, পেছন থেকে এমন সময় দৌড়ে আসে একজন মধ্যবয়স্ক লোক। -স্যার মালে ঝামে অয়া গেছে। (কাদের সাহেব এর ম্যানেজারকে লক্ষ্য করে) -কী ঝামেলা হয়েছে? -স্যার এডি কালকের চালান, আজকের গুলা ভেতরে। -ওহ তাহলে নামিয়ে দাও সবগুলো। -স্যার বড় সাহেব কইছে আইজগা মাল না পাঠাইতে। -ওকে এগুলো ভেতরে নাও, আমি দেখছি। কথা গুলো স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি, তার মানে আমরা ভেতরে যেতে পারলেই সব রহস্য উন্মোচন হয়ে যাবে।

সামনের গেট থেকে সরে গিয়ে আমরা তিনজন কথা বলে ঠিক করলাম পেছনের জঙ্গল দিয়ে গোডাউনে ঢুকব, যেমন চিন্তা তেমন কাজ। দেয়াল টপকে কাদের সাহেবের সীমানায় পা রাখলাম, এদিকটা একদম নীরব। বিশাল জায়গা নিয়ে এই বাংলো, এর মধ্যেই কাদের সাহেব এর গোডাউন। আস্তে আস্তে এগুচ্ছি , এতক্ষণ ঠিকঠাক থাকলেও এখন কেমন একটা ভয় কাজ করছে, তিনজনই খুব জড়োসড়ো হয়ে হাঁটছি, একদম নীরব, যার ফলে মাটিতে পা ফেলার শব্দ ও মনে হচ্ছে আকাশ থেকে শোনা যাবে, তার মাঝে আবার গাছের একদম কড়মড়ে শুকনো পাতা নিচে পড়ে আছে। আমরা প্রায় গোডাউনেরর কাছে চলে এসেছি। হঠাৎ রদফিন জারিফকে টান মেরে নিচে বসিয়ে দিল আমাকেও ইশারা করতে বসে পড়তে। তারপর যা দেখলাম একদম বিশ্বাস করার মত না, মনে হচ্ছে যেন কোন সিনেমার শুটিং চলছে। দুজন লোক হাতে পিস্তল নিয়ে এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছে, এখন ভয়টা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে গেছে। রদফিন বলছিল চলে যেতে কিন্তু জারিফ রহস্য উন্মোচন না করে পিছু হটবে না, আমিও জারিফের সংগে একমত, ফলে রদফিনের কথার মাটি চাপা দিতে হল। খুব সতর্কতার সাথে সামনে এগুতে হবে, আস্তে আস্তে আমরা সামনের দিকে এগুতে লাগলাম, এখন কটা বাজে জানি না, সন্ধ্যা নেমে আসছে, সব কিছু আবছা হয়ে যাচ্ছে। একটি আওয়াজ শুনে আমরা থমকে গেলাম, মনে হচ্ছে ঘণ্টা বাজছে, যেমন স্কুলে ছুটির সময় বাজানো হয়। হুম ধারণা একদম ঠিক, সবাই নিচের দিকে চলে যাচ্ছে এ সুযোগে আমরা গোডাউনে ঢুকে পড়তে পারি, সাত-পাঁচ ভেবে ঢুকে পরলাম গোডাউনে। ভেতরে এখনও কজন পিস্তল হাতে ঘুরতেছে, আমরা ভেতরে নিরাপদ স্থান গ্রহন করেছি, এখন ম্যানেজার সাহেবও ভেতরে আসলেন পেছনে কয়েকজন কর্মচারীও ছিল, -কী সমস্যা মালের মধ্যে? (ম্যানেজার) -স্যার এডি রাফি সাহেবের মাল, কাল পাঠাতে বলছে। -ওহ্ ঠিক আছে। কাদের সাহেব গোডাউনে ঢুকলেন, এবার সবাই সরে দাঁড়াল, সামনে কাদের সাহেব উনার সাথে ম্যানেজার, আর বাকি সবাই পিছনে। কাদের সাহেব হাতের লাঠি দিয়ে একটি বাক্সে গুঁতো দিতেই পেছন থেকে একজন এসে বাক্সের ঢাকনা সরিয়ে দিল। এমন দৃশ্য দেখার জন্য আমরা একদমই প্রস্তুত ছিলাম না, বাক্সে ভর্তি রিভালবার, হ্যান্ডগান, আর পিস্তলে। এবার কাদের সাহেব একটি পিস্তল হাতে উঠালেন “এম ১৯১১” মডেল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তাহলে উনি ব্যাবসার নামে এসব পাচার করেন! এটাই উনার কালো ব্যবসা, যার চালান সাধারাণ কর্মচারীদের দিয়ে করিয়ে থাকেন। এদিকে জারিফ তার স্মার্ট ফোন দিয়ে সকল দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করে নিচ্ছে। হঠাৎ একটা আওয়াজ হল, -স্যার আমাগো ফডু তুলতাছে। -এই ধরো ওদের (কাদের সাহেব)। তার লোকেরা আমাদের দিকে আসছিল, আমি দরজা টান মেরে খিল তুলে দেই আর দৌড়ে জঙ্গলের পূর্ব দিকে চলে যাই, জারিফ প্রথম আমার পেছনেই ছুটছিল পরে কোথায় চলে গেল দেখি নাই।

রদফিন কই গেল জানি না, পেছন থেকে দরজা ভাঙ্গার শব্দ শুনতে পেলাম। আমি একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম, ওরা পাঁচ-ছয়জন দৌড়ে উত্তর-পশ্চিম কোণে যেতে লাগল, সবার হাতে রিভালবার। আমি আস্তে করে দেয়ালের দিকে সরে যেতে লাগলাম, জারিফ দৌড়ে আসছে এদিকে তার পেছনে একটা কালো শার্ট পরা লোক পিস্তল হাতে দৌড়াচ্ছে আর বলছে, ‘এই ছোকরা খাড়া, নাইলে গুলি কইরা দিমু কইলাম।’ জারিফ নির্বিঘ্নে দৌড়াচ্ছে, মুহুর্তে ট্রিগার চাপার আওয়াজ আমার কর্ণকুহর ছেদ করে ভেতরে গেল। জারিফের ঐ দিক থেকে কোন শব্দ হচ্ছে না আর, আমার চোখে যেন ছানি পড়েছে, কিছুই দেখতে পারছি না, সব অন্ধকার হয়ে আসছে। এদিকে সূর্যের আলো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে, রদফিন এর কী হল? ও নিরাপদে বের হতে পেরেছে তো! আর জারিফ? ওর পেছনের লোকটা তো গুলি করেছে, জারিফ কি সুস্থ আছে? আল্লাহ সহায় হোন। আমি দেয়াল টপকে হাঁটছি বাড়ীর পথে, কোন সমস্যা হয়নি আমার। কিন্তু আমার বন্ধুদের কোন খোঁজ নেই, কী হয়েছে ওদের সাথে জানি না। আমি বাড়ীতে যাইনি পুকুর পাড়ে এসে বসেছি, এটা রদফিনের কাকার পুকুর, উনি এখানে মাছ চাষ করেন। আমরা প্রায় সময় এখানে আড্ডা দেই, বসে আছি আনমনা হয়ে, ভেতরে খুব কষ্ট অনুভূত হচ্ছে। -এই সাদাফ তুই এখানে? (রদফিন) ওকে দেখে আমার দেহে প্রাণ ফিরে এসেছে, -কীরে জারিফ কোথায়..? (আমি) -বলতে পারি না। চল ওদের বাসায় গিয়ে দেখি আসছে কি না। -আচ্ছা চল। আমরা জারিফের বাসায় গেলাম, আন্টিকে জারিফের কথা জিজ্ঞেস করলাম, আন্টি বললেন বিকেলের পর আর বাসায় ফেরেনি, কলিজা মুচড়ে উঠল আন্টির কথা শুনে, ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছিল, খারাপ কিছু হয়নি তো জারিফের সাথে? কিন্তু জারিফ তো চতুর ছেলে ওর সাথে এমনটা হওয়ার কথা না, সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম। রদফিনকে নিয়ে ব্রীজে যাবো এমন সময় দেখি জারিফ দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে। আমি কল্পনায় দেখছি না তো! ওর কথা ভাবতে ভাবতে হয়ত যে কাউকেই জারিফ ভাবছি, কিন্তু না। সমস্ত সংকোচ দূর হয়ে গেলে, জারিফ এসে হাউমাউ করে আমাদের জড়িয়ে ধরে। ওর বা হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে ব্যান্ডিজ করা, এখানে গুলি লেগেছে। জারিফ আমাদের নিয়ে ব্রীজে এসে বসে সব খুলে বলল, দেয়াল টপকানোর সময় একজন গুলি চালালে সেটা এসে জারিফের হাতে লাগে, তাও কোন রকম প্রাণরক্ষে করে জারিফ পালিয়েছে। আর ততক্ষণে জারিফ তার হামিদ আংকেলের বাসায় চলে গিয়েছিল। হামিদ আংকেল আমাদের থানার ভাল পর্যায়ের একজন পুলিশ, সম্পর্কে জারিফের আংকেল হন, উনার কাছে জারিফ সবগুলো পিক দিয়ে আসে আর উনার বাসা থেকেই ব্যান্ডিজ করে আসে। মুহুর্তেই একটা গাড়ী আসে, কয়জন লোক নামে আর বলে, ‘দেখ শয়তানগুলো এখানেই বসে আছে।’ বলতে বলতে আমাদের জোর করে গাড়ীতে উঠিয়ে নেয় আর হাত মুখ বেঁধে ফেলে, একটু নড়াচড়া করতেই যাচ্ছেতাই মারতে থাকে। আমাদের কাদের সাহেবের গোডাউনে এনে একটি অন্ধকার রুমে রাখা হয়। রদফিন খুব কাঁদছিল, ওর পায়ে প্রচুর জোরে লাথি মারে। আমাদের রুমে রেখে সবাই বেরিয়ে গেলেন। কতক্ষণ হবে ঠিক জানি না দরজা খোলার শব্দে চোখ খুলে যায়, তার মানে মার খেয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কাদের সাহেব আর তার ম্যানেজার সাথে কিছু লোক নিয়ে ঘরে ঢুকল, এসেই কাদের সাহেব তার লাঠি দিয়ে জারিফকে গুঁতো দিয়ে বলে, -কীরে ছোকরা গুয়েন্দাগিরি করার খুব শখ তোর তাই না…! জারিফ কোন কথা বলে না, ম্যানেজার জারিফকে লক্ষ্য করে বলে, -বল ছবিগুলো কোথায় রেখেছিস। জারিফ নিশ্চুপে তাকিয়ে আছে , কাদের সাহেব এবার চোখ লাল করে ধমকের সুরে বলে মার শালাদের, আসছে আমার কাজে কাটা হতে, মেরে হাড়গোড় ছাই বানিয়ে দে যতক্ষণ না ছবি গুলোর সন্ধান দেবে। বলেই তিনি আর ম্যানেজার চলে গেলেন, আর আমাদের ঐ লোকগুলো রাতে খুব মার মারলেন। ওরা ক্লান্ত আমাদের মারতে মারতে, কিন্তু জারিফ একটা শব্দও করেনি, একজন সিগারেট জ্বালিয়েছে আর বলছে, ‘ওই তুই ওদের দেখ আমি বাহিরে যাচ্ছি।’ রাত কটা বাজে জানি না, চোখে খুব ঘুম নেমে আসছে। -এই সাদাফ, সাদাফ। এই সাদাফ (জারিফ) আমাকে ফিসফিস করে ডাকছে। আমাদের পাও বেঁধে রাখা হয়েছিল, জারিফ আমার পায়ের বাঁধন খুলে আমাকে জাগিয়ে তোলে। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমাকে বলে বাহিরে গিয়ে লোকদের খবর দিতে, আমি আস্তে আস্তে দরজার দিকে আসি, একটা বয়স্ক লোক পুরনো মডেলের একটি বন্দুক দেয়ালের সাথে খাড়া করে রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। আমি সাবধানে বের হয়ে আসলাম, আমার দুই হাত বাঁধা, বের হয়ে জঙ্গল পেরিয়ে দেয়াল টপকাবো, কিন্তু নসিব খারাপ হলে যা হয়, একজন লোক আমাকে দেখে ফেলে আর বন্দুক তাক করে আমার পিছনে ছুটতে থাকে, তখনও সকাল হয়নি, আকাশের শুভ্রতা জমিনকে আবছা আলোয় সাজিয়ে রেখেছে, একদম স্পষ্ট না হলেও মোটামুটি দেখা যায়, আমি দৌড়াচ্ছি কিন্তু এগুতে পারছি না, একে তো হাত বাঁধা তার উপর সারারাত মার খেয়েছি, কোন অঙ্গ বাদ পড়েছে বলে মনে হয় না। হঠাৎ করেই আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, আমার পায়ে গুলি লেগেছে, আমি নিজেকে আর পরিচালনা করতে পারছি না, আমার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে, পৃথীবি ক্রমশই ঘোর কালো অন্ধাকরে নিমজ্জিত হতে লাগল। এখন আবার দৌড়াদৌড়ির শব্দ কানে আসছে, দুজন লোক এসে আমাকে মাটি থেকে তুললো, ইউনিফর্ম পরা লোক, তার মানে হামিদ আংকেল চলে এসেছে। আমাকে গোডাউনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ওখানে একটা টেবিলে জারিফ আর রদফিন বসা আর ঘরের এক কোণে কাদের সাহেব ও তার ম্যানেজারসহ আরও বেশ কয়েকজন লোক বাঁধা। দ্বিতীয় যে ট্রিগারের শব্দে আমার হুশ ফেরে সেটা ছিল হামিদ আংকেলেরর পিস্তলের গুলির, উনি যখন খবর পান যে জারিফ আর তার সাথে দুজন রাতে বাসায় ফেরে নাই, তখনই তিনি বুঝে ফেলেন যে আমরা কোন বিপদে আছি। গোডাউনের চারদিক ভর্তি সি সি ক্যামেরায়, যার ফলে কাদের সাহেবের লোক আমাদের চিনে ফেলে। সমস্থ অবৈধ মাল সাথে কাদের সাহেবের বাংলো বাড়ি ও পুলিশ জব্দ করে নেন। আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যে হামিদ আংকেলের লোক বাসায় পৌঁছে দেন। পরদিন আবার কোর্টে  সাক্ষ্মী দেবার জন্য আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়, জজ সাহেব রায় শুনানি দেন। প্রাপ্য সাজাই পেয়েছে কাদের সাহেব ও তার দলবল। কোর্ট থেকে বের হতেই কত সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি, একেকজন একেক প্রশ্ন করছেন, সবাই আমাদের অনেক ছবি তুলছেন। কাল পত্রিকায় আমাদের ছবি বেরুবে, ভাবতেই কেমন  আনন্দে  শিহরে উঠে!

Facebook Comments