শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২২
Home > ফিচার > রক্তাক্ত সিরিয়ার ইতিকথা

রক্তাক্ত সিরিয়ার ইতিকথা

Spread the love
মুনশি মুহাম্মদ আরমান : সিরিয়ায় যা হচ্ছে তা ভয়াবহ। সিরিয়া দেশটি ছিলো একসময় আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। প্যান আরব রাজনৈতিক ধ্যান ধারনার উদ্যোক্তাদের একজন। তাদের ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটে ১৯৫৮ সালে, মিশরের সাথে তখন যুক্ত আরব রাষ্ট্র গঠন পর্যন্ত করেছিলো। ফিলিস্তিন ইস্যুতেও শুরু থেকেই কঠোরভাবে ইসরাঈল বিরোধী অবস্থান ছিলো সিরিয়ার। পিওএল’র অভ্যন্তরীণ আল-সাইকা গঠনে সাহায্য করে ইসরাঈলের উপর চাপ প্রয়োগ করতে। ফাত্তাহসহ অন্যান্যদেরও সাহায্য সমর্থন করতো। কিন্তু ইসরাঈলের সাথে ৬৭’র যুদ্ধে মিশরের সাথে যৌথভাবে হারে এবং ইসরাঈলের কাছে সিরিয়ার খুব গুরুত্বপূর্ণ উঁচু ভূমি ‘গোলান’ হারায়। আর তাদের পার্টনার মিশর হারায় ‘সিনাই’। অধারাবাহিকভাবে এই সময়গুলোতে সিরিয়ার গণতন্ত্রের প্রচলন থাকলেও ৬৭’র যুদ্ধ পরবর্তী জরুরী অবস্থার ভেতরে ক্ষমতায় আসে সামরিক বাহিনীর হাফিজ আল-আসাদ। বর্তমান প্রেসিডেন্টের পিতা। হাফিজ আল-আসাদ ছিলো সফল রাষ্ট্রপ্রধান। ৭৯ সালে মিশর এককভাবে ইসরাঈলের সাথে সিনাইয়ের বিনিময়ে শান্তি চুক্তি করে ফেলায় গোলান হাইটস হারিয়ে সিরিয়া আরব বন্ধনে বিশ্বাস ও নিজেদের উপরে ভরসা হারায়। কিন্তু হাফিজ আল-আসাদের তৎপরতায় লেবাননে সিভিল ওয়ার বন্ধে ভূমিকা রাখার দায়িত্ব নিয়ে আবার পাওয়ার গেমে ফিরে আসে। কোল্ডওয়ারের সময় রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলে। উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পশ্চিমাদের সাথেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু করে। আবার ইরানের সাথেও সম্পর্ক ভালো করে তোলে এবং ঘরে বাইরে বিরোধীদের সামাল দিয়ে চলে। এভাবেই ধীরে ধীরে পশ্চিমা-ইসরাঈলী চাপের ভেতর ঘুরে দাঁড়ায় এবং লেবাননের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে রাখতে সক্ষম হয়। সিরিয়ার ফরেন পলিসিকে এক্টিভ এবং সফল করে তোলে। মৃত্যু পর্যন্ত সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের পদটি দখল করে রাখে। মৃত্যুর পর ছেলে বাশারের ক্ষমতা আরোহন নিশ্চিত করে যায়। সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ তার পিতার ন্যায় মেধাবী এবং ক্যারিশম্যাটিক নন। তার উপর ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু আলেভি গোত্রের হবার কারনে সিরিয়ার সংখ্যাগুরু সুন্নিদের তেমন কাছের লোক হিসেবে নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। বর্তমান আরব বিশ্বে গণতন্ত্রের ঢেউয়ে বাশারের বিপর্যয় তরান্বিত করেছে অন্যন্য সুন্নি দেশগুলোর অবস্থান। কাতার, বাহরাইন, সৌদিআরব এবং কুয়েত তাদের মিডিয়া ও আরব লীগের উপর কর্তৃত্ব ব্যবহার করে ইতিমধ্যেই বাশারকে একঘরে করে ব্যবস্থা করে ফেলেছে। শুধু অনর্কলহই না, ইরানের সাথেও সিরিয়া বর্তমানে একটি অত্যন্ত সচল সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ আছে। সুতরাং ইরানের ঐতিহাসিক শত্রু উপসাগরীয় সুন্নি আরব দেশগুলো এটা মানতে পারছে না। সব মিলিয়ে নিজ দেশীয় জনগন এবং আরবের আঞ্চলিক নেতাদের সমর্থন পাচ্ছেন না বাশার। তার পিতার আমল থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছরেরও বেশী সময় ধরে কায়েম করা পারিবারিক ক্ষমতাকে জাস্টিফাই করার মত কোন আচরনও করছেন না বাশার।
এমন পরিস্থিতিতে যখন সিরিয়ায় গণতন্ত্রের দাবি উঠলো তখন তাদের দমনে বাশার চূড়ান্ত কঠোর হলো। ফলে ব্যাপক সংঘর্ষ আরম্ভ হলো। নিজ জনগনের উপর যেই ভয়াবহ সামরিক আক্রমন করলেন বাশার, তা পৃথিবীর সবার কাছেই অগ্রহনযোগ্য হয়েছে। হাজার ১২ থেকে ১৫ হাজার মানুষ প্রান হারিয়েছে। ইতিমধ্যে আরো কয়েক হাজার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অন্যন্য দেশে রিফিউজি হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইতিমধ্যে সিরিয়ার পরিস্থিতিতে কয়েকবার মিটিং করেছেন। সবাই একসুরে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আহবান করছেন। পশ্চিমা দেশগুলো পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতিসংঘের সমর্থনে সরাসরি সিরিয়ায় হস্তক্ষেপে আগ্রহী থাকলেও রাশিয়া এবং চীন তা সমর্থন করেনি। তারা বাশার সরকারকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আহবান জানায়। তাই সবশেষে আরব লীগ ও জাতিসংঘের সিকিউরিট কাউন্সিল যৌথভাবে জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনানকে শান্তি স্থাপনের দায়িত্ব দিয়েছে। কফি আনান শান্তির লক্ষ্যে অস্ত্র বিরতী, সিরিয়ায় জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলকে ঢুকতে দেয়া ও সহায়তা করা, মানবিক সাহায্য পরিবহনে সকল বাঁধা দূর করাসহ ৬ শর্তের শান্তি প্রক্রিয়া উত্থাপন করে এবং নিরাপত্তা পরিষদের সবকটি দেশ তাতে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু সিরিয়া সরকার এবং বিরোধী উভয় পক্ষই নিয়মিত অস্ত্র বিরতিসহ অন্যন্য শর্তও ভঙ্গ করছে। তার উপর এখন নতুন করে শুরু হয়েছে বোমা হামলা। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরাও তৃতীয় শক্তির উপস্থিতি সম্পর্কে সন্দেহ পোষন করছে। সরকার যেমন কঠোর দমন পীড়ন চালাচ্ছে, বর্তমানে সরকার বিরোধী বিদ্রোহীরাও বড় বড় হামলা চালানো শুরু করেছে। যা পরিস্থিতিকে ভয়াবহতার দিকেই ঠেলছে। বোমা হামলায় নিহত হওয়ার পূর্বে এক শিশু বলেছিলো, আমি খোদার কাছে বিচার দিবো এই জালিম রাষ্ট্রপ্রধান সম্পর্কে। ৪০ বছর ধরে চলে আসা এই পারিবারিক শাসনতন্ত্র ২০১৮ সালে কোনো ভাবেই গ্রহনযোগ্য নই। এর অবসান অবশ্যই প্রয়োজন। গণতন্ত্র প্রবর্তন করে ও একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেই সিরিয়া তার গোলান হাইটস পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক মহলের প্রচারনা আবার জাগিয়ে তুলতে পারবে এবং নিজ জনগনের জন্যও ভালো কিছু দিতে পারবে। জনগনের দাবি না মানলে আজ না হোক কাল ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে ঠিকই জনগনের সামনে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। যেমন পড়েছিলো বিন আলী মোবারক, সালেহ এবং গাদ্দাফী।
Facebook Comments